কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভিডিওগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।
নয়াদিল্লি, ভারত: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাচ্ছে, তবে এর নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে ডিপফেক ভিডিও এবং আপত্তিকর কনটেন্টের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে, এমন ভিডিওগুলোতে সত্যতা যাচাই করা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
এআই টেকনোলজির মাধ্যমে তৈরি ডিপফেক ভিডিওগুলি (Deepfake videos) সমাজে এক নতুন ধরনের বিপদের সৃষ্টি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই ধরনের ভিডিওরা মিথ্যা তথ্য এবং অশ্লীল কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার ফলে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে যখন তারা দেখে, কোনো জনসচেতনতা বা সেলিব্রিটির নাম ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।
এই বিষয়টি নিয়ে আগেও পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত সরকার। ২০২১ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারের চিন্তা ছিল, এই আইন আরও শক্তিশালী ও কার্যকরী করা দরকার, যাতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে আরো কড়া নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়। এর জন্য ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এক নতুন সংশোধিত আইন তৈরি করেছে, যা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
নতুন এই আইনে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে, যে কোনো আপত্তিকর ভিডিও বা কনটেন্ট, বিশেষ করে ডিপফেক ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট হলে, তা তিন ঘণ্টার মধ্যে সরিয়ে ফেলা বাধ্যতামূলক হবে। এর মানে হলো, যদি কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক বা ইউটিউব এ ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করে, তবে তাদের ৩ ঘণ্টার মধ্যে সেই কনটেন্ট মুছে ফেলতে হবে।
এই নতুন নিয়মকে বলা হচ্ছে ‘ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস অ্যান্ড ডিজিটাল মিডিয়া এথিক্স কোড’ বা সংশোধিত তথ্যপ্রযুক্তি বিধি। এর মাধ্যমে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের কনটেন্টের উপরে আরো বেশি নজরদারি চালাতে হবে এবং কোনো ধরনের মিথ্যা বা অশ্লীল কনটেন্ট বা ডিপফেক ভিডিও ফাঁস হলে, তা দ্রুত মুছে ফেলতে হবে।
তবে শুধু কনটেন্ট মুছে ফেলা নয়, আইনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি করা কনটেন্টে ‘এআই জেনারেটেড’ বা 'এআই তৈরি' কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতাও রাখছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে, তারা যে কনটেন্ট দেখছে তা এআই দ্বারা তৈরি, এবং এই কনটেন্টটি আসল নয়।
এই নিয়মের অধীনে আরো কিছু বিষয়ও পরিষ্কার করা হয়েছে, যেমন ‘সিনথেটিক্যালি জেনারেটেড ইনফরমেশন’ বা ‘এসজিআই’। এই তথ্যগুলিকে ভারতীয় ডিজিটাল শাসন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই ধরনের কনটেন্ট তৈরি এবং প্রচারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত উপাদান, অশ্লীল কনটেন্ট, ভুয়ো পরিচয়, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংক্রান্ত বেআইনি কনটেন্ট তৈরি বা প্রচারের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে আর ব্যবহার করা যাবে না।
এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:
ডিপফেক ভিডিও ও মিথ্যা কনটেন্ট:
ডিপফেক ভিডিওগুলি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেলিব্রিটিদের বা সাধারণ মানুষের মুখ বা কণ্ঠ সেমুলেট করে, তাদের বাস্তবের মত দেখানোর প্রচেষ্টা করে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে, সরকার এই বিষয়টি নিয়ে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিল, কিন্তু এখন আরো কঠোর নিয়ম এসেছে।
নতুন সংশোধিত আইন:
বর্তমান সংশোধিত আইন অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে তিন ঘণ্টার মধ্যে এই ধরনের কনটেন্ট মুছে ফেলতে হবে, অন্যথায় তারা কঠোর শাস্তির মুখে পড়বে।
এআই জেনারেটেড কনটেন্টে উল্লেখ:
নতুন নিয়মে, কোনো ভিডিও বা কনটেন্ট যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি হয়, তবে সেটিতে ‘এআই জেনারেটেড’ শব্দটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে যে, ভিডিওটি বাস্তব নয়, বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি।
ডিজিটাল শাসন কাঠামো ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ:
সরকারের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ডিজিটাল পরিবেশে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীলতা বাড়ানো এবং তাদেরকে আরো বেশি স্বচ্ছতা ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
আগামী দিনে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা কনটেন্ট ছড়ানো কমানো যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।
এই নতুন আইন ভারতের ডিজিটাল পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি ভারতের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে আরো স্বচ্ছ, সুরক্ষিত এবং দায়বদ্ধ করে তুলবে। তবে, এটি বাস্তবায়ন করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো যে বিশ্বের নানা প্রান্তে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে একাধিক ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতের সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ডিজিটাল মিডিয়াকে নিরাপদ এবং নির্ভুল তথ্যের একটি স্থল তৈরি করা।
ভারতের ডিজিটাল পরিবেশে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। তবে, এই প্ল্যাটফর্মগুলির মাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানো দিন দিন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ডিপফেক ভিডিওগুলির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের কনটেন্টের মাধ্যমে শুধু ভুল তথ্যই প্রচারিত হচ্ছে না, বরং এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই, সরকার এই বিষয়ের উপর কড়া নজরদারি রাখার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করেছে।
আগামী দিনে সরকারের পক্ষ থেকে আরো শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা কনটেন্ট ছড়ানো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বর্তমান আইনে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ওপর বেশ কিছু কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে, যাতে তারা দ্রুততার সাথে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি হওয়া কনটেন্টের ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশিকা আরোপ করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সেগুলিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারেন।
এই নতুন আইনটি ভারতে ডিজিটাল পরিবেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির প্রতি তাদের দায়িত্ব আরও কঠোরভাবে পালন করতে বাধ্য করবে, বরং এটি ব্যবহারকারীদেরও একটি নিরাপদ এবং সুরক্ষিত ডিজিটাল অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। তবে, বাস্তবায়ন পর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জও আসবে, কারণ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো শুধুমাত্র ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলির ব্যবহার বিশ্বের নানা প্রান্তে চলছে। এই কারণে, একাধিক ভাষা, সংস্কৃতি, এবং আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার কারণে কিছু দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করা কঠিন হতে পারে।
এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে সঙ্গতি বজায় রাখা। অনেক ক্ষেত্রেই, একটি নির্দিষ্ট দেশের আইনি কাঠামো অন্যান্য দেশের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, যা ডিজিটাল কনটেন্টের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। আবার, অনেক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব নীতিমালা ও কার্যক্রম থাকে, যা তাদের বিভিন্ন দেশে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
তবে, ভারতের সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার এবং স্পষ্ট: ডিজিটাল মিডিয়া যেন নিরাপদ, সঠিক এবং অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না করে, এমন একটি প্ল্যাটফর্মের পরিবেশ তৈরি করা। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং সামাজিক, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া, তা যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে। তাই, সরকারের লক্ষ্য একটিই—নির্ভুল তথ্য প্রচার, মিথ্যাচার রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি।
এই আইনের মাধ্যমে সৃষ্টির সুবিধা অনেকটা জনগণের পক্ষে যাবে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির ওপর কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি এবং মিথ্যা কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলার নতুন নিয়ম প্রণয়ন, ব্যবহারকারীদের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল জগৎ তৈরি করবে। একইসাথে, এটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির কাছে একটি বড় পরীক্ষা হতে চলেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, স্বচ্ছতা, এবং ব্যবহারকারীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে, একাধিক প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রয়োগ করতে হবে।
এদিকে, ভারতে এই নতুন আইনের কার্যকরণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও একটি উদাহরণ হতে পারে। যদি এই আইনের সফল প্রয়োগ করা সম্ভব হয়, তবে অন্যান্য দেশেও এটি একটি নকশা হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং মিথ্যা কনটেন্ট প্রতিরোধে গুরুতর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। তবে, এই আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে, সরকারি এবং শিল্প সম্মেলন, বিশ্বব্যাপী সমন্বয়, এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজের গুরুত্ব অপরিসীম।
এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ থাকবে। প্ল্যাটফর্মগুলোকে অবশ্যই ইউজারদের জন্য আরও নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা মিথ্যা কনটেন্ট এবং বিভ্রান্তিকর ভিডিও থেকে দূরে থাকতে পারে।
সরকারের এই পদক্ষেপ, যদি সফলভাবে কার্যকরী হয়, তা ভারতের ডিজিটাল পরিবেশকে একটি নতুন দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে। তবে, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং সরকারকে অবশ্যই সময়-সময়ে এর বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগ পদ্ধতি পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে, যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ন্যায্যতা বজায় রাখা যায়।