গুজরাটের পরিবর্তে এবার পশ্চিমবঙ্গে ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চলেছে আমুল। এই বৃহৎ বিনিয়োগ রাজ্যের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, দুগ্ধশিল্পের প্রসার এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে চলেছে দেশের অন্যতম পরিচিত দুগ্ধ সমবায় ব্র্যান্ড আমুল। গুজরাট কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন বা জিসিএমএমএফ পরিচালিত আমুল পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার সাঁকরাইল ফুড পার্কে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি বৃহৎ সমন্বিত ডেয়ারি কমপ্লেক্স তৈরি করছে। ১৯ জুলাই ২০২৬ প্রকল্পটির ভূমিপুজোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি শুধু একটি সাধারণ দুধ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হবে না; দুধ প্যাকেজিং, দই, মিষ্টি দই, লস্যি, ইউএইচটি দুধ, আইসক্রিম, পনির, ঘি, মিষ্টি এবং ফ্লেভার্ড মিল্ক উৎপাদনের একাধিক আধুনিক ইউনিট একই প্রকল্পের মধ্যে থাকবে। োগের গুরুত্ব কেবল ৭০০ কোটি টাকার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের দুগ্ধ উৎপাদন, দুধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন এবং পরিবহণ ব্যবস্থার মধ্যে একটি বৃহৎ ও সংগঠিত সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে প্রত্যক্ষভাবে কারখানায় কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ স্তরে পশুপালন, দুধ সংগ্রহ, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহণ এবং বিপণন সংক্রান্ত বহু পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
এই খবর নিয়ে প্রচারের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অনেক জায়গায় বলা হচ্ছে, “গুজরাটের পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করছে আমুল।” এই বক্তব্যটি পুরোপুরি সঠিক নয়। আমুল গুজরাটভিত্তিক একটি কৃষক-মালিকানাধীন সমবায় ব্র্যান্ড। সংস্থাটি গুজরাটে তার কার্যক্রম বন্ধ করে বা সেখানকার কোনো প্রকল্প সরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসছে—এমন তথ্য সরকারি ঘোষণায় নেই।
বরং সঠিক বক্তব্য হলো, গুজরাটভিত্তিক আমুল তার জাতীয় সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে নতুন একটি বৃহৎ ডেয়ারি কমপ্লেক্স তৈরি করছে। অর্থাৎ এটি প্রতিস্থাপনমূলক বিনিয়োগ নয়; এটি একটি নতুন সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ। সংবাদ পরিবেশন এবং SEO কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। এতে প্রতিবেদনটি যেমন বিশ্বাসযোগ্য হবে, তেমনই বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কমবে।
আমুলের নতুন সমন্বিত ডেয়ারি কমপ্লেক্সটি তৈরি হচ্ছে হাওড়ার সাঁকরাইল ফুড পার্কে। সাঁকরাইলের ভৌগোলিক অবস্থান শিল্প এবং পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা এবং হাওড়া শহরের বাজারের কাছাকাছি হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় সড়ক, রেলপথ, বন্দর এবং পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যাওয়ার যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা রয়েছে এই অঞ্চলে।
এই অবস্থান থেকে উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্য পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারেও তুলনামূলক দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাজারের জন্য নয়, আমুলের পূর্ব ভারতীয় ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও বণ্টনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে সমন্বিত ডেয়ারি কমপ্লেক্সটির প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ লিটার দুধ প্রক্রিয়াকরণের সামগ্রিক ক্ষমতা থাকবে। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ লিটার পাউচ দুধ প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি দুই লাখ লিটার ইউএইচটি দুধ এবং এক লাখ লিটার আইসক্রিম উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। েষ নয়। প্রকল্পে প্রতিদিন প্রায় ২০ মেট্রিক টন পনির, ১০ মেট্রিক টন ঘি এবং ১০ মেট্রিক টন মিষ্টি উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকার কথা। ফ্লেভার্ড মিল্ক উৎপাদন ইউনিটে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ প্যাকেট তৈরি করা সম্ভব হবে বলে সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়েছে। খী উৎপাদনক্ষমতা দেখায় যে প্রকল্পটি শুধুমাত্র কাঁচা বা প্যাকেটজাত দুধ বিক্রির উপর নির্ভরশীল থাকবে না। দুধকে বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্যে রূপান্তর করার মাধ্যমে একটি বড় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হিসেবে এটি কাজ করবে।
প্রকল্পটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো দই এবং অন্যান্য কালচার্ড ডেয়ারি পণ্য উৎপাদন ইউনিট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই ইউনিটে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন, অর্থাৎ ১০ লাখ কিলোগ্রাম দই ও অন্যান্য কালচার্ড দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম দই ও কালচার্ড ডেয়ারি পণ্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ে সাধারণ দইয়ের পাশাপাশি মিষ্টি দই, ইয়োগার্ট, লস্যি, বাটারমিল্কসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে মিষ্টি দইয়ের ঐতিহ্য এবং স্থানীয় বাজারে দইয়ের বিপুল চাহিদা বিবেচনা করলে এই প্রকল্পের বিশেষ বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে।
বাংলার মিষ্টি দই শুধু রাজ্যের মধ্যেই জনপ্রিয় নয়; দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও এর পরিচিতি রয়েছে। আধুনিক উৎপাদন, প্যাকেজিং এবং কোল্ড চেনের সঙ্গে স্থানীয় স্বাদ ও পণ্যের বৈচিত্র্য যুক্ত করা গেলে এই বাজার আরও বড় হতে পারে। তবে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সঙ্গে বড় শিল্পের একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
পশ্চিমবঙ্গে আমুলের উপস্থিতি একেবারেই নতুন নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি ২০০৪ সাল থেকে রাজ্যে দুধ সংগ্রহের কাজ করছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি দুধ উৎপাদনকারী কৃষক আমুলের সমবায় নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার মহিলা দুধ উৎপাদক রয়েছেন। ঙ্গে যুক্ত এই কৃষকেরা ৮৮০টি গ্রামীণ দুগ্ধ সমবায় সমিতি এবং ১০৭টি বাল্ক মিল্ক কুলিং সাইটের মাধ্যমে দুধ সরবরাহ করেন। পূর্ব বর্ধমান, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিংসহ বিভিন্ন জেলায় এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। বর্তমানে রাজ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে আমুলের দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিদিন ৯ লাখ লিটার থেকে বাড়িয়ে প্রায় ২০ লাখ লিটারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে রাজ্যের আরও বেশি পশুপালক ও ক্ষুদ্র দুধ উৎপাদক সংগঠিত বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ের জন্য স্থায়ী বাজারের সম্ভাবনা
গ্রামীণ দুধ উৎপাদকদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো উৎপাদিত দুধ দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। শস্য বা অন্য কিছু কৃষিপণ্যের মতো দুধ দীর্ঘ সময় সাধারণভাবে সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে কৃষকের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দুধ বিক্রি করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। স্থানীয় ক্রেতা বা অসংগঠিত ব্যবসায়ীর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে অনেক সময় কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।
একটি বড় সংগঠিত ডেয়ারি নেটওয়ার্ক নিয়মিত দুধ সংগ্রহ করলে কৃষকদের কাছে স্থায়ী বাজার তৈরি হতে পারে। দুধের ফ্যাট এবং অন্যান্য গুণমান পরীক্ষা করে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণ করা হলে কৃষক নিজের উৎপাদনের মান অনুযায়ী দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে প্রকল্পটি কৃষকের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে দুধের ক্রয়মূল্য, পেমেন্টের সময়, গুণমান পরীক্ষার স্বচ্ছতা, পরিবহণ ব্যয় এবং সমবায় সমিতিগুলোর পরিচালন ব্যবস্থার উপর। শুধু বৃহৎ কারখানা তৈরি হলেই কৃষকের আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। উৎপাদকদের সঙ্গে ন্যায্য ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গের বহু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক শুধু ফসল উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষিকাজে আবহাওয়া, বাজারদর, বন্যা, অতিবৃষ্টি,
আমুলের এই বৃহৎ বিনিয়োগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র দুধ উৎপাদক, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী, পশুপালক এবং গ্রামীণ যুবকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র, কোল্ড চেন, পরিবহণ, প্যাকেজিং, গুণমান পরীক্ষা এবং খুচরো বিপণন ব্যবস্থার প্রসারের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষ কাজের সুযোগ পেতে পারেন।
একই সঙ্গে রাজ্যে উন্নত জাতের গবাদিপশু পালন, পশুখাদ্য উৎপাদন, পশুচিকিৎসা পরিষেবা এবং দুগ্ধ সমবায় গঠনের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে। কৃষকেরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সঠিক বাজারদর এবং দ্রুত পেমেন্ট পেলে পশুপালনকে স্থায়ী ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করতে উৎসাহিত হবেন। তবে প্রকল্পের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার, স্বচ্ছ দুধ ক্রয়নীতি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে। পরিকল্পিতভাবে কাজ করা গেলে আমুলের এই উদ্যোগ বাংলার শিল্পায়ন ও কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।