নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, রাগ কমাতে অনেকেই দৌড়ানো বা ব্যায়ামকে সমাধান মনে করেন। এতে শরীর সুস্থ থাকলেও মানসিক ক্রোধের তীব্রতা কমে না। গবেষকরা বলছেন, রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সঠিক মানসিক পদ্ধতি, শুধু শরীরচর্চা নয়।
রাগ মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ যা মানুষের শরীর এবং মন উভয়ের উপরই গভীর প্রভাব ফেলে অনেকেই মনে করেন যে রাগ জমে গেলে তা প্রকাশ করে দেওয়া যায় তাহলে মন হালকা হয়ে যায় এবং রাগ প্রশমিত হয় দীর্ঘ দিন ধরে প্রচলিত এই ধারণা সমাজে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ছিল কারণ মানুষ প্রেশার কুকারের উদাহরণ দিয়ে বোঝাত যে কুকার ভেতরে চাপ ধরে রাখলে বিস্ফোরিত হয় আর ধোঁয়া বেরিয়ে গেলে চাপ কমে যায় একই ভাবে রাগ উগরে দিলেও নাকি মন শান্ত হয় কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এই বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভুল এবং এর কোনও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এই ভুল ধারণা ভাঙতে গবেষকেরা রাগ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল গবেষণা করেছেন এবং নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে একেবারে ভিন্ন বাস্তবতা
আমেরিকার ওহায়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দীর্ঘ সময় ধরে রাগ বিষয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালিয়ে মোট একশো চুয়ান্নটি গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করেন তাঁদের গবেষণায় দেখা যায় যে রাগ প্রকাশ করা মানেই রাগ কমে যাওয়া নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে রাগ প্রকাশ করার ফলে মানুষের ভেতরে জমে থাকা উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং রাগের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় গবেষকেরা জানান যে মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস হলো রাগ উগরে দিলে মন হালকা হয়ে যায় কিন্তু বাস্তবে এই ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল এই বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন লিঙ্গের বিভিন্ন সংস্কৃতির বিভিন্ন জাতির এবং বিভিন্ন জীবনধারার দশ হাজারের বেশি মানুষ মানুষের আবেগগত প্রতিক্রিয়া এবং শারীরিক উত্তেজনা মিলিয়ে গবেষকেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে রাগ প্রকাশ করা কখনও কখনও সাময়িক স্বস্তি আনতে পারে কিন্তু সেই স্বস্তি মনের গভীরে স্থায়ীভাবে রাগ কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর হয় না বরং অনেক ক্ষেত্রে রাগ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং মানুষের আচরণ অসংযমী হয়ে যায়
গবেষক ব্র্যাড বুশম্যান বলেন যে রাগ প্রকাশ করলে রাগ কমবে এই দীর্ঘদিনের ধারণা ভাঙা দরকার কারণ এই ধারণার পেছনে শক্ত কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই মানুষ অল্প সময়ের জন্য মনে করতে পারে যে রাগ প্রকাশ করলে মন শান্ত হলো কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এই আচরণ মানুষের ভেতরের রাগকে আরও উস্কে দেয় কারণ দেহে তখন শারীরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যায় মস্তিষ্কে চাপ বাড়ে এবং চিন্তাভাবনার স্বাভাবিক নিয়ম ব্যাহত হয় ফলে রাগ প্রকাশ করার পর মানুষ আরও সহজে উত্তেজিত হয় এবং একই পরিস্থিতিতে বারবার রাগ দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়
গবেষকেরা জানান যে রাগ প্রকাশের প্রক্রিয়া অনেক সময়েই মানুষের মনের ভেতরের স্নায়বিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় যার ফলে রাগের তরঙ্গ আরও তীব্র হয় এবং মনের অভ্যন্তরে তৈরি হয় আরও বেশি অস্থিরতা গবেষণা বলছে যে রাগ প্রকাশ করা মানে রাগকে প্রশমিত করা নয় বরং রাগকে একটি সক্রিয় চক্রে ঢুকিয়ে দেওয়া যা মানুষকে আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করে ফলে ব্যক্তির আচরণ আরও কর্কশ হয়ে ওঠে এবং সে আরও সহজে রাগান্বিত হয়ে পড়ে
এই গবেষণা স্পষ্ট করে দেয় যে রাগ প্রকাশ করা মানুষের দীর্ঘ দিনের অভ্যাস হলেও এটি রাগ কমানোর সঠিক উপায় নয় গবেষকেরা বলছেন যে রাগ নিয়ন্ত্রণের আসল পথ হলো শান্ত মন গড়ে তোলা শারীরিক উত্তেজনা কমানো এবং আবেগকে বুঝে কার্যকরভাবে সামলানো মানুষের আবেগগত ক্ষমতা উন্নত হলে রাগ সহজে প্রশমিত হতে পারে কিন্তু রাগ প্রকাশ করা সেই প্রশমন প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত
গবেষণা আরও জানাচ্ছে যে রাগ কমানোর জন্য অনেকেই শরীরচর্চা করেন দৌড়ান বা ভারোত্তোলন করেন তাঁদের ধারণা বেশি এনার্জি ব্যয় করলে রাগও বেরিয়ে যাবে কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে যে এ ধরনের কাজ শরীরের পেশি এবং হৃদ্যন্ত্রের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও রাগের মূল কারণকে প্রশমিত করতে পারে না কারণ দৌড়ানো বা ভারোত্তোলন করার সময় শারীরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় ফলে শরীর আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাগের তীব্রতাও কমে না বরং তার তীব্রতা একই রকম থাকে কখনও কখনও আরও বাড়তেও পারে ফলে রাগের সময় দৌড়ে এলে রাগ হালকা হবে এই ধারণাও ভুল
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন কিছু জায়গা রয়েছে যাকে বলা হয় রেজ রুম যেখানে মানুষ রাগ হলে টাকা দিয়ে গিয়ে জিনিসপত্র ভাঙাভাঙি করে তাঁদের ধারণা জিনিস ভাঙলে রাগ কমে যায় গবেষকেরা সেই রেজ রুমেও গিয়েছিলেন এবং খতিয়ে দেখেছেন সেখানে কেমনভাবে মানুষ রাগ প্রকাশ করছে গবেষণায় দেখা গেছে যে রেজ রুমে ভাঙাভাঙি করলে সাময়িক উত্তেজনা বেরিয়ে গেলেও রাগের গভীরতা কোনওভাবেই কমে না বরং কিছু ক্ষেত্রে সেই অভ্যাস মনের ভেতরে আরও রোষ সঞ্চয় করে এবং মানুষ পরবর্তীতে আরও ঘন ঘন রাগ প্রকাশ করতে থাকে বিজ্ঞানী সোফি কেজায়েরভিক বলেন শারীরিক উত্তেজনা কমাতে না পারলে রাগের প্রকৃত প্রশমন সম্ভব নয় কারণ রাগের দুটি স্তর রয়েছে একটি শারীরবৃত্তীয় আরেকটি জ্ঞান সম্পর্কিত মানুষের আবেগের এই শারীরিক স্তরে যদি উত্তেজনা কমানো না যায় তবে রাগ প্রশমনের কোনও উপায় কার্যকর হয় না
বিজ্ঞানীরা বলছেন যে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে এই রাগ কীভাবে শরীরে কাজ করে রাগ উঠলে শরীরের হরমোন বাড়ে হৃদ্স্পন্দন বৃদ্ধি পায় রক্তচাপ বাড়ে এবং শরীরে উত্তেজনার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় ফলে মানুষ হঠাৎ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে এই অবস্থায় যদি আরও বেশি এনার্জি খরচ করে এমন কাজ করা হয় যেমন দৌড়ানো বা ভারী ব্যায়াম তাহলে শরীরের উত্তেজনা আরও বাড়বে কমবে না ফলে রাগও কমবে না তাই রাগের সময় দৌড়ানো শরীরের জন্য উপকারী হলেও রাগ প্রশমনের জন্য উপযোগী নয়
গবেষকেরা পরামর্শ দিচ্ছেন রাগের সময় শারীরিক উত্তেজনা কমাতে হবে তার জন্য দরকার শরীর এবং মনকে একই সঙ্গে শান্ত করা সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল হালকা যোগ অভ্যাস পেশি শিথিল করার সহজ ব্যায়াম গভীর শ্বাস নেওয়া এবং ধীরে ধীরে ছেড়ে দেওয়া এই প্রক্রিয়ায় শরীরের উত্তেজনা কমে এবং মনও শান্ত হতে শুরু করে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে শ্বাসপ্রশ্বাসের সহজ ব্যায়াম শারীরিক উত্তেজনাকে তাৎক্ষণিকভাবে কমাতে পারে ফলে রাগও দ্রুত প্রশমিত হয় অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে শ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানুষ তার মনোসংযোগ এবং স্থিরতা বজায় রাখতে সক্ষম হয় ফলে রাগ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত হয়
বিশেষজ্ঞারা আরও বলেন যে রাগকে উপেক্ষা করা বা চেপে রাখা কোনও সঠিক সমাধান নয় কারণ রাগ মানুষের একটি স্বাভাবিক আবেগ এবং এর পেছনে থাকে কোনও না কোনও কারণ রাগকে সম্পূর্ণ দমন করলে তা মনের গভীরে জমে থাকে এবং পরে আরও বড় বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে তাই রাগ অনুভব হলে সেটিকে বোঝা প্রয়োজন এবং ধীরে ধীরে তার উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে নিজের আবেগকে যাচাই করা এবং মনের মধ্যে কোন অনুভূতি কাজ করছে তা বোঝাও রাগ নিয়ন্ত্রণের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
রাগ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন রাগ উঠলে এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনে নেওয়া এই পদ্ধতিটি বহুদিন ধরে মনোবিজ্ঞানীরা ব্যবহার করে থাকেন কারণ এই ছোট সময়টুকুতে মানুষের মস্তিষ্ক রাগ থেকে সামান্য দূরত্ব তৈরি করতে পারে ফলে আকস্মিক প্রতিক্রিয়া কমে আসে এবং মানুষ পরিস্থিতিকে আরও পরিষ্কার ভাবে বিচার করতে পারে
অতএব গবেষণা প্রমাণ করে দিয়েছে যে রাগ প্রকাশ করলে রাগ কমে এই ধারণা ভুল রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার শান্ত মন ধীর শ্বাস শারীরিক উত্তেজনা কমানো এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অভ্যাস রাগের সময় দৌড়ানো নয় বরং রাগকে বুঝে তার উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করাই হল শান্তিপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়