Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ডাইনোসরদের রাজা টি-রেক্স কতদিন বাঁচত? চমকপ্রদ তথ্য সামনে

নতুন গবেষণায় টি-রেক্সের আয়ু ও শারীরিক বিকাশ নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে, যা পুরনো ধারণা ও সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

ডাইনোসরদের ‘রাজা’ হিসেবে পরিচিত টির‌্যাইনোসরাস-রেক্স বা সংক্ষেপে টি-রেক্স শুধু নামেই নয়, বাস্তবেও ছিল নিজেদের সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর ও শক্তিশালী শিকারিদের অন্যতম। বিশাল শরীর, ধারালো দাঁত, শক্তিশালী চোয়াল এবং দুর্দান্ত শিকারি প্রবৃত্তি—সব মিলিয়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করত এই প্রাণী। স্টিফেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’ সিরিজের মাধ্যমে টি-রেক্স আধুনিক সংস্কৃতিতেও আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তবে এত দিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই ভয়ংকর শিকারি ডাইনোসররা তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সেই মারা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই বহুদিনের বিশ্বাসে বড়সড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

নতুন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, টি-রেক্সদের গড় আয়ু এত দিন যা মনে করা হত, তার চেয়েও বেশি ছিল। আগে ধারণা করা হত, এই ডাইনোসররা সাধারণত প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচত। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, তারা ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত জীবিত থাকত। শুধু তাই নয়, তাদের শারীরিক বিকাশের ধরণ সম্পর্কেও নতুন তথ্য সামনে এসেছে, যা প্রাগৈতিহাসিক এই প্রাণীদের জীবনচক্র সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে।

টি-রেক্স: ডাইনোসরদের রাজা কেন?

টির‌্যাইনোসরাস-রেক্স নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর ক্ষমতার ইঙ্গিত। ল্যাটিন ভাষায় ‘রেক্স’ শব্দের অর্থ ‘রাজা’। এই নামকরণ যথার্থ, কারণ নিজেদের সময়ে স্থলভাগের সবচেয়ে শক্তিশালী মাংসাশী প্রাণীদের অন্যতম ছিল টি-রেক্স। বিশাল মাথা, প্রায় ৬০টিরও বেশি দাঁত, শক্তিশালী পা এবং ভয়ংকর চোয়ালের জোরে এরা সহজেই বড় শিকার ধরতে পারত।

আজ থেকে প্রায় ৬৮ থেকে ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে, ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগে পৃথিবীতে বিচরণ করত টি-রেক্স। সেই সময়কার বাস্তুতন্ত্রে এরা ছিল শীর্ষ শিকারি। গবেষকদের মতে, তাদের উপস্থিতি গোটা খাদ্যশৃঙ্খলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু এত দিন পর্যন্ত এই ডাইনোসরদের জীবনকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছিল সীমিত।

নতুন গবেষণায় কী জানা গেল?

সম্প্রতি আমেরিকার ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমির অধ্যাপক হলি উডওয়ার্ড এবং তাঁর গবেষক দল টি-রেক্সের জীবাশ্ম নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা চালান। তাঁদের গবেষণায় মূলত টি-রেক্সের পায়ের হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। যেমনভাবে গাছের কাণ্ডে থাকা বলয় দেখে গাছের বয়স নির্ধারণ করা যায়, তেমনই প্রাণীদের হাড়েও বার্ষিক বৃদ্ধির চিহ্ন বা বলয় থাকে। এই বলয়গুলি বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা কোনও প্রাণীর বয়স সম্পর্কে ধারণা পান।

উডওয়ার্ড এবং তাঁর দল টি-রেক্সের ১৭টি জীবাশ্ম পরীক্ষা করে এমন কিছু বলয় খুঁজে পান, যা আগের গবেষণায় নজরে আসেনি। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিশেষ ধরনের আলো ব্যবহার করে তাঁরা এই ‘অদৃশ্য’ বলয়গুলি শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এই নতুন তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা দেখেন, টি-রেক্সদের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর—যা আগের ধারণার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

শারীরিক বিকাশের ক্ষেত্রেও বদলাল ধারণা

এই গবেষণা শুধু টি-রেক্সদের আয়ু নয়, তাদের শারীরিক বিকাশ সম্পর্কেও নতুন আলোকপাত করেছে। এত দিন মনে করা হত, টি-রেক্সরা প্রায় ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ আকারে পৌঁছে যেত এবং তারপর তাদের দেহে খুব বেশি পরিবর্তন হতো না। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই ডাইনোসররা জীবনের বেশির ভাগ সময়ই মাঝারি আকারের শরীর নিয়ে কাটাত। তার পরে তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের শরীর দ্রুত বড় হয়ে উঠত।

গবেষকদের মতে, এই ধীরগতির বিকাশই টি-রেক্সদের সফল শিকারিতে পরিণত করেছিল। কারণ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা বিভিন্ন আকারের শিকার ধরতে পারত। ছোটবেলায় তারা অপেক্ষাকৃত ছোট প্রাণী শিকার করত, আর পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরে বিশাল আকারের শিকারও সহজেই ধরতে পারত। এই অভিযোজন ক্ষমতাই সম্ভবত তাদের নিজেদের সময়ে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল।

অতীত গবেষণার সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

টি-রেক্সদের নিয়ে গত কয়েক দশকে বহু গবেষণা হয়েছে। তবে আগের গবেষণাগুলিতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে হাড়ের কিছু বলয় চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ চিত্রটি দেখতে পাননি। উডওয়ার্ডের দল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ফাঁকগুলি পূরণ করেছেন এবং দেখিয়েছেন, আগের হিসাবের তুলনায় টি-রেক্সদের জীবনকাল বেশি ছিল।

এই নতুন তথ্য প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের জীবনচক্র বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একটি প্রজাতির আয়ু ও শারীরিক বিকাশের ধরন জানা গেলে তার আচরণ, বাস্তুতন্ত্রে ভূমিকা এবং বিবর্তনগত অভিযোজন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’ বিতর্কে নতুন দিশা

এই গবেষণা কয়েক মাস আগে প্রকাশিত আরেকটি বিতর্কিত গবেষণাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২০০৬ সালে আমেরিকার মন্টানায় পাওয়া যায় একটি বিরল জীবাশ্ম—দুটি ডাইনোসরের কঙ্কাল একসঙ্গে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া যায়। গবেষকরা এই জীবাশ্মের নাম দেন ‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’। অনুমান করা হয়, দুটি ডাইনোসর লড়াই করতে করতেই মারা গিয়েছিল। যদিও এই ধারণার পক্ষে এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই জীবাশ্মের একটি ছিল তৃণভোজী ট্রাইসেরাপটস হরাইডাসের। অন্যটি এত দিন ধরে একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স বলে মনে করা হত, যার বয়স ছিল প্রায় ২০ বছর। কিন্তু গত অক্টোবর মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়, ওই জীবাশ্মটি আদৌ টি-রেক্স নয়, বরং ন্যানোটাইর‌্যানাস নামে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসরের।

news image
আরও খবর

তবে সেই গবেষণার ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে, টি-রেক্সদের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৩০ বছর এবং ২০ বছর বয়সেই তারা প্রায় পূর্ণাঙ্গ হয়ে যেত। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ওই বয়সে টি-রেক্সদের শারীরিক বিকাশ সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে ওই জীবাশ্মটি সত্যিই অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স হতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি

গবেষকদলের প্রধান হলি উডওয়ার্ড বলেন, এই নতুন তথ্য টি-রেক্সদের বিবর্তন ও আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাঁর কথায়, “টি-রেক্স কেন নিজেদের সময়ে সেরা মাংসাশী প্রাণী হয়ে উঠেছিল, তা বুঝতে সাহায্য করবে এই গবেষণা। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে চেহারা বড় হওয়ার ফলে তারা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের শিকার ধরতে পারত। শেষ দিকে যখন তারা পূর্ণাঙ্গ আকারে পৌঁছত, তখন এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠত যে অন্য টি-রেক্সদেরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারত।”

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, টি-রেক্সদের সাফল্যের পেছনে শুধু তাদের আকার বা শক্তি নয়, বরং তাদের ধীর কিন্তু কার্যকর শারীরিক বিকাশের কৌশলও বড় ভূমিকা পালন করেছিল।

প্রাগৈতিহাসিক জীবজগৎ বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব

টি-রেক্সদের আয়ু ও বিকাশ নিয়ে এই নতুন তথ্য শুধু একটি প্রজাতি সম্পর্কে ধারণা বদলায় না, বরং গোটা প্রাগৈতিহাসিক বাস্তুতন্ত্র বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনও প্রাণীর জীবনকাল যত দীর্ঘ হয়, সে তত বেশি সময় ধরে পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। টি-রেক্সদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ জীবনকাল মানে তারা দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থান করত এবং অন্যান্য প্রাণীদের বিবর্তন ও আচরণকে প্রভাবিত করত।

এছাড়া, এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে প্রাচীন প্রাণীদের জীবনচক্র বোঝার ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে যেসব তথ্য সীমিত প্রযুক্তির কারণে অজানা ছিল, এখন তা নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে। ফলে ডাইনোসরদের জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণা ক্রমশ আরও সমৃদ্ধ ও নির্ভুল হয়ে উঠছে।

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে টি-রেক্সের প্রভাব

স্টিফেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার মাধ্যমে টি-রেক্স আধুনিক সংস্কৃতিতে এক আইকনিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে। সিনেমায় তাকে দেখা গেছে এক ভয়ংকর, অপ্রতিরোধ্য শিকারি হিসেবে, যা দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। তবে বাস্তবের টি-রেক্স সম্পর্কে নতুন গবেষণায় যে তথ্য সামনে আসছে, তা এই প্রাণীটির চরিত্রকে আরও জটিল ও আকর্ষণীয় করে তুলছে।

তারা শুধু ভয়ংকর শিকারি ছিল না, বরং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের আচরণ ও শিকারের কৌশল অবলম্বন করত। এই দিকটি টি-রেক্সদের বাস্তব জীবনের গল্পকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে।

ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনা

উডওয়ার্ডদের এই গবেষণা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন অন্যান্য ডাইনোসর প্রজাতির হাড়ের বলয় বিশ্লেষণ করে তাদের আয়ু ও বিকাশের ধরন সম্পর্কে নতুন তথ্য পেতে পারেন। এর ফলে গোটা ডাইনোসর যুগের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

এছাড়া, ‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’-এর মতো বিতর্কিত জীবাশ্মগুলির পুনর্মূল্যায়নও এই নতুন তথ্যের আলোকে করা যেতে পারে। এতে করে বহু পুরনো প্রশ্নের নতুন উত্তর মিলতে পারে এবং ডাইনোসর গবেষণায় নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে।

উপসংহার

ডাইনোসরদের ‘রাজা’ টি-রেক্স সম্পর্কে এত দিন যে ধারণা প্রচলিত ছিল, সাম্প্রতিক গবেষণা তা আমূল বদলে দিয়েছে। আগে মনে করা হত, এই ভয়ংকর শিকারি ডাইনোসররা প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচত। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, তাদের গড় আয়ু ছিল ৩৫ থেকে ৪০ বছর। শুধু তাই নয়, তাদের শারীরিক বিকাশও ছিল ধীরগতির, যা তাদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শিকার ধরতে সাহায্য করত।

এই নতুন তথ্য শুধু টি-রেক্সদের জীবন সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলায় না, বরং প্রাগৈতিহাসিক জীবজগৎ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকেও আরও গভীর করে তোলে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অতীতের বহু অজানা তথ্য সামনে আসছে, যা দেখিয়ে দিচ্ছে—বিজ্ঞান কখনও থেমে থাকে না। নতুন প্রমাণ এলেই পুরনো ধারণা ভাঙতে পারে, আর সেই ভাঙন থেকেই জন্ম নেয় নতুন জ্ঞান।

টি-রেক্সদের দীর্ঘায়ু ও ধীরগতির বিকাশের এই নতুন ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি প্রাণীর গল্পই জটিল, বৈচিত্র্যময় এবং বিস্ময়কর। ভবিষ্যতে আরও গবেষণার মাধ্যমে হয়তো এই রাজকীয় শিকারিদের জীবন সম্পর্কে আরও অজানা অধ্যায় সামনে আসবে—যা আমাদের অতীত পৃথিবী সম্পর্কে ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে

Preview image