ভারতের হসপিটালিটি ও ট্রাভেল-টেক সেক্টরে আবারও বড়সড় আলোড়ন তৈরি করেছে OYO এর প্যারেন্ট কোম্পানি PRISM। বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন পেয়েছে সংস্থাটি। এই অনুমোদনের ফলে PRISM আগামী দিনে প্রায় ৬,৬৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত তহবিল তুলতে পারবে একটি ফ্রেশ ইক্যুইটি ইস্যুর মাধ্যমে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ মহল থেকে শুরু করে বাজার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
আজ (২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫) ভারতীয় স্টক মার্কেটের ইতিহাসে একটি বড় খবর এসেছে। PRISM, যা বিশ্বের জনপ্রিয় হসপিটালিটি ও বিজনেস ব্র্যান্ড OYO Hotels & Homes-এর প্যারেন্ট কোম্পানি, তার শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রায় ₹6,650 কোটি IPO তহবিল সংগ্রহ করার জন্য অনুমোদন পেয়েছে। এর অর্থ হলো কোম্পানি এখন সরকারি অনুমোদন এবং বাজারের পরিস্থিতি লাভজনক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাবলিক ইস্যু (IPO) মাধ্যমে টাকা তুলতে পারবে।
এই খবর ভারতীয় ব্যবসা আর ফিনান্স সেক্টরে এক বিশাল ইভেন্ট হিসেবে ধরা হচ্ছে, কারণ OYO-এর মত শক্তিশালী ব্র্যান্ডের IPO আশা বহু বছর ধরে বিনিয়োগকারীরা প্রতীক্ষা করছে। আজ আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জানব — কিভাবে এই IPO-টি আসে, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং ভবিষ্যতের পথ কী হতে পারে।
PRISM মূলত OYO Hotels & Homes-এর হোল্ডিং কোম্পানি, যা দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছিল। অতীতে একাধিকবার IPO আনার চেষ্টা হলেও বিভিন্ন কারণে তা পিছিয়ে গিয়েছিল। কখনও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না, আবার কখনও আর্থিক কাঠামো ও ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের প্রয়োজন পড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি এবং ধারাবাহিক লাভের ধারা ফেরায় নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়েছে PRISM।
শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতিতে এখন স্পষ্ট যে কোম্পানি আবারও পাবলিক মার্কেটে প্রবেশের পথে হাঁটতে প্রস্তুত। এই IPO-র মাধ্যমে তোলা অর্থ মূলত ব্যবসার সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির পরিকল্পনায় কাজে লাগানো হতে পারে। OYO ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশে তাদের হোটেল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেছে এবং বাজেট থেকে প্রিমিয়াম—সব স্তরের গ্রাহকদের লক্ষ্য করে পরিষেবা বিস্তার করেছে। IPO-র অর্থ সেই গতি আরও বাড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে OYO-এর ব্যবসায়িক মডেলে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে সংস্থাটি অতিরিক্ত খরচ ও লোকসানের কারণে সমালোচিত ছিল, সেখানে এখন লাভজনকতার দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে তারা। ধারাবাহিকভাবে EBITDA-পজিটিভ হওয়া, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং খরচ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোম্পানি নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে PRISM-এর IPO-কে অনেকেই একটি “টাইমড মুভ” হিসেবে দেখছেন।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, PRISM-এর শেয়ার বাজারে প্রবেশ শুধু কোম্পানির জন্য নয়, বরং ভারতের স্টার্টআপ ও টেক-ড্রিভেন হসপিটালিটি সেক্টরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে এই সেক্টরের দিকে নজর দিতে পারেন। পাশাপাশি, OYO-র মতো একটি পরিচিত ব্র্যান্ডের শেয়ার বাজারে আসা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আগ্রহ বাড়াতে পারে।
তবে এই আশাবাদের মধ্যেও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। IPO-র সঠিক সময়, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ, বাজারের সামগ্রিক অবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত এই ইস্যুর সাফল্য নির্ভর করবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ভারতীয় শেয়ার বাজারেও পড়ছে, যা IPO-র ক্ষেত্রে একটি বড় ফ্যাক্টর।
তারপরও PRISM-এর শেয়ারহোল্ডারদের সবুজ সংকেত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কোম্পানি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। OYO-এর ব্র্যান্ড ভ্যালু, বিশাল গ্রাহক বেস এবং প্রযুক্তি-নির্ভর পরিষেবা মডেল এই IPO-কে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে PRISM-এর এই পাবলিক ইস্যু আগামী দিনের অন্যতম আলোচিত IPO হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, PRISM-এর IPO অনুমোদন শুধুমাত্র একটি কর্পোরেট সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিনিয়োগকারী, বাজার বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষ—সবার নজর এখন একটাই প্রশ্নের দিকে, কবে এবং কীভাবে OYO-এর এই বহু প্রতীক্ষিত বাজারে প্রবেশ ঘটবে।
PRISM হল OYO-এর মূল হোল্ডিং কোম্পানি, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে Oravel Stays নাম থেকে PRISM-এ রিব্র্যান্ড করা হয়েছিল।
এটি OYO-র বিভিন্ন বিজনেস ইউনিটের উপর একটি প্যারেন্ট কোম্পানি হিসাবে কাজ করে এবং হসপিটালিটি, আবাসন, কর্মস্থল, টেক সলিউশন এবং অন্যান্য সেবার ব্যবসাগুলোকে পরিচালনা করে। OYO-র গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১০০ মিলিয়ন থেকে বেশি, এবং এটি ৩৫ এরও বেশি দেশে কাজ করে।
PRISM-এর IPO রেশিও, আকার, স্ট্র্যাটেজি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা শুধু OYO-এর বৃদ্ধি নয়, বরং সমগ্র হসপিটালিটি-টেক সেক্টরের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
PRISM-এর শেয়ারহোল্ডাররা আগামী IPO-র জন্য ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫-এ অনুষ্ঠিত এক্সট্রা অর্ডিনারি জেনারেল মিটিং (EGM)-এ অনুমোদন দিয়েছেন।
এই অনুমোদনের অর্থ:
PRISM এখন মাঠে নেমেছে — IPO-র মাধ্যমে ₹6,650 কোটি (~$744 মিলিয়ন) ফান্ড তুলবে।
অনুমোদনটিতে কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়া হয়নি, ফলে PRISM যখনই বাজারের পরিস্থিতি অনুকূলে মনে করবে তখনই IPO করতে পারে।
IPO-র জন্য কোম্পানি এখন SEBI (Securities and Exchange Board of India)-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকবে।
এই প্রক্রিয়াটি তাত্ক্ষণিকভাবে শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত (listed) হওয়ার টিকিট নয়, বরং IPO-এর পর IPO রেটিং, প্রাইসিং, ফ্লোট সাইজ, বুক বিল্ডিং ইত্যাদি ধাপগুলো সম্পন্ন হবে।
ধরুন একটি কোম্পানি বাজারে আসতে চায় — তখন IPO ঘটে। সাধারণভাবে দেখলে:
স্বল্প/মধ্যমেয়াদে ব্যবসার বৃদ্ধির জন্য, কোম্পানি নতুন শেয়ার ইস্যু করে টাকা সংগ্রহ করে — যাকে বলা হয় fresh issue।
PRISM-এর ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হচ্ছে — নতুন ইক্যুইটি শেয়ার ইস্যু করে ₹6,650 কোটি তোলা হবে।
IPO সফলভাবে সম্পন্ন হলে কোম্পানিটি পাবলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার কিনতে পারবে।
IPO-র মাধ্যমে তোলা টাকা কোম্পানির বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রসার, টেক সলিউশন উন্নয়ন এবং অপারেশনাল কার্যক্রম সম্প্রসারণে ব্যবহার করা যেতে পারে।
OYO বা PRISM-এর আর্থিক কার্যকারিতা বর্তমানে শক্তিশালী দিক দেখাচ্ছে:
FY25 (2024-25)-এ রাজস্ব ১৬% বৃদ্ধি পেয়েছে ₹62,530 কোটি পর্যন্ত।
নিট মুনাফা ৬.৬% বৃদ্ধি পেয়ে ₹245 কোটি পৌঁছেছে।
১২তম ধারাবাহিক ত্রৈমাসিক EBITDA-positive ফলাফল নিশ্চিত করেছে কোম্পানি।
এছাড়াও Q1 FY26-এ রাজস্ব ৪৭% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং GBV (Gross Booking Value) ১৪৪% বেড়েছে — যা প্রতীয়মান করছে যে OYO-এর ব্যবসা অব্যাহতভাবে বাড়ছে।
এই উন্নয়নের কারণগুলো হলো —
প্রিমিয়াম সেগমেন্টে ফোকাস,
নতুন হোটেল ব্র্যান্ডের অন্তর্ভুক্তি,
প্রযুক্তি-চালিত অপারেশন ইম্প্রুভমেন্ট,
বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা ইত্যাদি।
যদিও IPO-র খবর আজ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, কিন্তু PRISM/ OYO-এর IPO ইতিহাস নতুন নয়:
২০২১ সালে কোম্পানি প্রথমবারের মতো IPO-র জন্য আবেদন করেছিল এবং $12 বিলিয়ন ভ্যালুয়েশন টার্গেট করেছিল।
এরপর ডিলয়েড, রিব্র্যান্ড ও বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তনের কারণে IPO বারবার পিছিয়ে গিয়েছিল।
২০২৩ সালে কোম্পানি আবার IRDAI-র কাছে গোপন ফাইলিং করেছে তবে IPO শুরু হয়নি।
বর্তমান বাজার ও আপেক্ষিক ইকোনমিক মেট্রিক্স অনুযায়ী:
বিনিয়োগকারীরা বলছেন PRISM-এর সম্ভাব্য ভ্যালুয়েশন হতে পারে $7-8 বিলিয়ন (প্রায় ₹60,000-70,000 কোটি)।
IPO-র প্রাইসিং ও ফাইনাল ফ্লোট সাইজ স্থির হবে বাজার পরিস্থিতি ও বুক বিল্ডিং শেষে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টর ও ডোমেস্টিক হ্যান্ডগুলো বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে যদি কোম্পানির আর্থিক এবং বৃদ্ধির ডাটা শক্তিশালী থাকে।
যেহেতু OYO একটি বড় গ্রাহক বেস ও গ্লোবাল উপস্থিতি কার্যকর করছে, সফল IPO হলে বেশ কিছু লাভের সুযোগ থাকতে পারে।
PRISM-এর IPO সফল হলে স্টক মার্কেটের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে — বিশেষত হসপিটালিটি ও টেক সেক্টরে।
OYO-এর মতো ব্র্যান্ড গ্লোবাল সূচকে আরও দৃঢ় অবস্থান নেবে।
যদিও IPO আকর্ষণীয়, তবুও স্টক মার্কেটের ওঠানামা, SEBI-এর রেটিং ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই IPO-র সাফল্য নির্ধারণ করবে।
PRISM IPO ইতিমধ্যেই শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন পেয়েছে ₹6,650 কোটি তহবিল সংগ্রহের জন্য।
এটি এখন এসইবিআই অনুমোদনের অপেক্ষায়, এবং বাজারের পরিস্থিতি সহ IPO-র সময় নির্ধারণ করবে।
OYO-এর ব্যবসা গত কয়েক বছর সুদৃঢ়ভাবে উন্নতি করেছে, এবং এই IPO তা আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
একটি সফল IPO স্টক মার্কেট, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব এবং OYO-এর ব্র্যান্ড ইমেজে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।