Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কলকাতা বহু দিন ধরে টানছে ভারত সফরে আসার মুখে বললেন রবিশঙ্করের শিল্পী-কন্যা অনুষ্কা

কলকাতায় অনুষ্ঠান করবেন সেতারশিল্পী অনুষ্কাশঙ্কর। তার আগে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় পণ্ডিত রবিশঙ্করের লন্ডনবাসী কন্যা।

বাবার স্মৃতি, কলকাতার টান আর ৩০ বছরের সঙ্গীতযাত্রা: অনুষ্কা শঙ্করের ‘ইন্ডিয়া ট্যুর’ ঘিরে উচ্ছ্বাস

কলকাতা:
সব ভাবনায়, সব কাজেই যেন আজও বাবার ছায়া—এই অনুভূতি গোপন করেন না বিশ্ববিখ্যাত সেতারশিল্পী অনুষ্কা শঙ্কর। কলকাতার এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনে বারবার উঠে আসে তাঁর বাবা, সঙ্গীতসম্রাট পণ্ডিত রবিশঙ্করের কথা। শুধু সঙ্গীতের পাঠই নয়, জীবনদর্শন, আত্মবিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মানবিকতার শিক্ষা—সবকিছুর নেপথ্যেই বাবার অবদান রয়েছে বলে মনে করেন অনুষ্কা। কথায় কথায় তিনি বুঝিয়ে দেন, আজও তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরে বাবার প্রভাব কতটা গভীরভাবে ছড়িয়ে আছে।

বাবার শহর কলকাতা, কিন্তু নিজের কাছেও আবেগের শহর

কলকাতা অনুষ্কার জন্মশহর নয়, তাঁর বেড়ে ওঠাও হয়নি এখানে। তবুও এই শহর তাঁর কাছে এক আলাদা আবেগের নাম। এটি তাঁর বাবার শহর—সেই সূত্রেই কলকাতা যেন তাঁর শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত একটি আত্মিক ঠিকানা। এ দেশে এলে একবার কলকাতা না গেলে মন ভালো লাগে না বলে অকপটে জানিয়েছেন তিনি।
কলকাতায় শুধু তাঁর বাবার পরিবারের মানুষজনই থাকেন না, সঙ্গীতজগতের বহু কাছের মানুষও এখানেই বাস করেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা করার তীব্র ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন শিল্পী। তাঁদের সান্নিধ্য তাঁকে বাবার জগতের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়—এই অনুভূতিও ভাগ করে নিয়েছেন অনুষ্কা।

এ কারণেই ব্যস্ত সফরের মাঝেও তিনি কলকাতার জন্য আলাদা করে একটি পুরো দিন রাখছেন। সাধারণত ভারতে তাঁর আসা খুব ঘনঘন হয় না। লন্ডনে দুই পুত্রকে নিয়ে তাঁর সংসার, একা মা হিসেবে দায়িত্বও অনেক বেশি। ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক জো রাইটের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকেই সন্তানদের একাই দেখভাল করছেন তিনি।
নিজের ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করে অনুষ্কা বলেন, “একা মায়ের অনেক ব্যস্ততা থাকে। বুঝতেই পারছেন, খুব বেশি সময় বাড়ি থেকে দূরে কাটাতে পারি না।”
তবুও আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা তাঁর কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের ভারত সফরের পরিকল্পনা যখন করা হচ্ছিল, তখনই তিনি বলে রেখেছিলেন—কলকাতা অবশ্যই যেতে হবে।

৩০ বছরের সঙ্গীতজীবনের মাইলফলক

২০২৬ সালে ভারতে আসার ঘোষণা তিনি আগেই করেছিলেন। কারণ, এবছর তাঁর সঙ্গীতজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পূর্ণ হচ্ছে—৩০ বছর।
১৯৯৫ সালে তাঁর সঙ্গীতযাত্রা শুরু হয়েছিল। সেতার হাতে একা মঞ্চে সেই প্রথম দেখা গিয়েছিল তাঁকে, এবং আশ্চর্যের বিষয়, সেই অভিষেক হয়েছিল ভারতেই। পণ্ডিত রবিশঙ্করের ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে অনুষ্কার প্রথম বড় মঞ্চে আত্মপ্রকাশ ঘটে।
সেই মুহূর্ত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, তিন দশক ধরে অনুষ্কা শঙ্কর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। ভারতীয় রাগসংগীত, ফিউশন, জ্যাজ, ইলেকট্রনিক মিউজিক, বিশ্বসংগীত—সব ক্ষেত্রেই তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষা তাঁকে সমসাময়িক সঙ্গীতজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীতে পরিণত করেছে।

‘ইন্ডিয়া ট্যুর ২০২৬’: সঙ্গীত ও স্মৃতির এক যাত্রা

এই ৩০ বছরের সঙ্গীতজীবন উদ্‌যাপন উপলক্ষে শুরু হচ্ছে অনুষ্কার বিশেষ ‘ইন্ডিয়া ট্যুর’। শুক্রবার থেকে শুরু হতে চলেছে এই বহুচর্চিত সফর।
প্রথম গন্তব্য হায়দরাবাদ। এরপর তিনি যাবেন বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুণে ও দিল্লিতে।
সবশেষে আসবেন কলকাতায়—৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন সন্ধ্যায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তাঁর বিশেষ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।
কলকাতার অনুষ্ঠানের কথা বলতে গিয়ে টেলিফোনের ওপার থেকেই তাঁর কণ্ঠে উত্তেজনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতার দর্শকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বরাবরই আবেগঘন। বাবার স্মৃতি, শহরের ঐতিহ্য, সঙ্গীতের উত্তরাধিকার—সব মিলিয়ে এই শহর তাঁর কাছে এক বিশেষ অধ্যায়।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের উত্তরাধিকার ও অনুষ্কার নিজস্ব পথ

পণ্ডিত রবিশঙ্কর ছিলেন বিশ্বসঙ্গীতের এক কিংবদন্তি। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে পাশ্চাত্যের মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। জর্জ হ্যারিসন থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত অর্কেস্ট্রা—অগণিত আন্তর্জাতিক শিল্পীর সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা ভারতীয় সঙ্গীতকে এক বৈশ্বিক ভাষা দিয়েছে।
অনুষ্কা শঙ্কর সেই উত্তরাধিকার বহন করলেও তিনি নিজেকে শুধুমাত্র বাবার ছায়ায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নিজের স্বতন্ত্র সত্তা তৈরি করেছেন।
তাঁর সৃষ্টিতে যেমন রয়েছে খাঁটি ভারতীয় রাগসংগীতের গভীরতা, তেমনই রয়েছে আধুনিকতা, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন। তাঁর অ্যালবামগুলোতে ভারতীয় তাল-রাগের সঙ্গে পাশ্চাত্যের জ্যাজ, ফ্লামেঙ্কো, ইলেকট্রনিক সাউন্ডস্কেপের সমন্বয় নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে ভারতীয় সঙ্গীতকে নতুনভাবে পরিচিত করেছে।

একা মা, শিল্পী ও বিশ্বনাগরিক

অনুষ্কার জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। দুই পুত্রকে নিয়ে লন্ডনে তাঁর সংসার। বিচ্ছেদের পর সন্তানদের একাই বড় করার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
বিশ্বভ্রমণ, কনসার্ট, স্টুডিও রেকর্ডিং—সবকিছুর মাঝেই তিনি একজন মা। সময় ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ তাঁর জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী।
তবুও তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্পী হিসেবে তাঁর দায়িত্বের পাশাপাশি একজন মায়ের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘ সফরে বেরোনোর আগে সন্তানদের কথা, পরিবারের কথা ভেবেই পরিকল্পনা করেন তিনি।

কলকাতার সঙ্গে আবেগী বন্ধন

কলকাতার সঙ্গীত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক আবহ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা—সবকিছুই অনুষ্কার কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। রবীন্দ্রসংগীত থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান থেকে থিয়েটার—এই শহরের সংস্কৃতির বহমান ধারা তাঁকে মুগ্ধ করে।
পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক ছিল গভীর। তাঁর শিক্ষাগুরুদের অনেকেই এই শহরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এবং এখানকার সঙ্গীত মহল তাঁকে বিশেষ সম্মান দিত। সেই উত্তরাধিকার অনুষ্কার মধ্যেও বর্তমান।
এ কারণেই কলকাতায় প্রতিবার আসা তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি কনসার্ট নয়, বরং এক ধরনের তীর্থযাত্রা।

বিশ্বমঞ্চে অনুষ্কার অবস্থান

অনুষ্কা শঙ্কর বহুবার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মিউজিক ফেস্টিভ্যাল, কনসার্ট হল ও অর্কেস্ট্রার সঙ্গে কাজ করেছেন।
তিনি শুধুমাত্র সেতারশিল্পী নন, বরং একজন সুরকার, প্রযোজক ও সঙ্গীত ভাবুক। তাঁর কাজ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
ডিজিটাল যুগে তাঁর কাজ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে।

ভারত সফর ঘিরে প্রত্যাশা

এই ‘ইন্ডিয়া ট্যুর ২০২৬’ শুধুমাত্র একটি কনসার্ট সিরিজ নয়। এটি তাঁর তিন দশকের সঙ্গীতজীবনের এক উদ্‌যাপন, স্মৃতির পুনরাবিষ্কার এবং ভারতীয় শ্রোতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নতুন অধ্যায়।
হায়দরাবাদ থেকে কলকাতা—প্রতিটি শহরে তাঁর অনুষ্ঠান ঘিরে সঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। টিকিট বিক্রি, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা, সঙ্গীত মহলের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এই সফর ভারতের সাংস্কৃতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে চলেছে।

 

উপসংহার: স্মৃতি, উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন

অনুষ্কা শঙ্করের ভারত সফর এবং কলকাতায় আগমন শুধুমাত্র একটি সঙ্গীত সফরের ঘটনা নয়, বরং এটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাস, উত্তরাধিকার এবং সমসাময়িক সংস্কৃতির এক গভীর সেতুবন্ধনের প্রতীক। তাঁর জীবনের প্রতিটি স্তরে বাবার স্মৃতি, নিজের শিল্পীসত্তা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং বিশ্বসঙ্গীতের অগ্রযাত্রা মিলেমিশে এক অনন্য গল্প তৈরি করেছে—যার প্রতিটি অধ্যায় আজকের প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

news image
আরও খবর

পণ্ডিত রবিশঙ্করের উত্তরাধিকার কেবল একটি বিখ্যাত নাম নয়, বরং একটি দর্শন, একটি দৃষ্টিভঙ্গি। ভারতীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, অনুষ্কা সেই স্বপ্নকে শুধু বহন করেননি, বরং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকে নতুন রূপ দিয়েছেন। তাঁর সেতারের সুরে যেমন প্রাচীন রাগের গভীরতা আছে, তেমনই আছে আধুনিক মানুষের অনুভূতির ভাষা। এই দ্বৈত পরিচয়—ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন—তাঁকে সমকালীন বিশ্বসঙ্গীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীতে পরিণত করেছে।

কলকাতা তাঁর কাছে শুধুমাত্র একটি শহর নয়; এটি স্মৃতির ভাণ্ডার, আত্মিক টান এবং বাবার উত্তরাধিকারের এক প্রতীকী কেন্দ্র। এখানে তাঁর বাবার পরিবার, গুরুজন, সহশিল্পী এবং সঙ্গীতপ্রেমীদের উপস্থিতি তাঁকে এক বিশেষ আবেগে আবদ্ধ করে। এই শহরের মাটি, সংস্কৃতি, ভাষা এবং সঙ্গীতচর্চার ঐতিহ্য তাঁর হৃদয়ে এক গভীর স্থান দখল করে আছে। তাই ভারত সফরের পরিকল্পনায় কলকাতা তাঁর কাছে ছিল অনিবার্য এক গন্তব্য—যেন শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি প্রয়োজনীয় অধ্যায়।

একই সঙ্গে অনুষ্কার জীবন কেবল মঞ্চ, কনসার্ট ও সুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন একা মা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব, সন্তানদের বড় করে তোলার সংগ্রাম, বিশ্বভ্রমণের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বহুমাত্রিক ও বাস্তবসম্মত। আধুনিক নারীর প্রতিনিধিত্বকারী এই শিল্পী দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব একসঙ্গে বহন করাও সম্ভব। তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় আত্মবিশ্বাস, সংযম এবং জীবনের প্রতি গভীর উপলব্ধি—যা তাঁকে শুধুমাত্র একজন সঙ্গীতশিল্পী নয়, বরং একজন জীবনদর্শনের ধারক হিসেবে তুলে ধরে।

তাঁর ৩০ বছরের সঙ্গীতযাত্রা এক দীর্ঘ পথচলার গল্প। ১৯৯৫ সালে বাবার জন্মদিন উপলক্ষে প্রথম বড় মঞ্চে আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বমঞ্চে তাঁর অবস্থান—এই পথচলা সহজ ছিল না। বাবার ছায়া যেমন ছিল আশীর্বাদ, তেমনই ছিল এক বড় প্রত্যাশার বোঝা। সেই প্রত্যাশা অতিক্রম করে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা একজন শিল্পীর জন্য সহজ কাজ নয়। কিন্তু অনুষ্কা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন এবং নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধুমাত্র রবিশঙ্করের কন্যা নন, তিনি নিজেই এক স্বতন্ত্র সত্তা।

‘ইন্ডিয়া ট্যুর ২০২৬’ তাই শুধুমাত্র কনসার্টের ধারাবাহিকতা নয়; এটি তাঁর জীবনের এক প্রতীকী অধ্যায়। হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুণে, দিল্লি হয়ে কলকাতা—এই সফর যেন ভারতের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে তাঁর স্মৃতির পুনর্গঠন। প্রতিটি শহর তাঁর সঙ্গীতযাত্রার এক একটি অধ্যায়, এক একটি স্মৃতির পুনরাবিষ্কার।
বিশেষ করে কলকাতার অনুষ্ঠান তাঁর কাছে এক আবেগঘন মুহূর্ত। বাবার শহরে, বাবার স্মৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে সেতারের সুর তোলা মানে শুধুমাত্র একটি পারফরম্যান্স নয়; এটি এক ধরনের আত্মিক সংলাপ—অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক নীরব কথোপকথন।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। তরুণ প্রজন্ম কি এই সঙ্গীতের গভীরতা উপলব্ধি করবে? আধুনিক প্রযুক্তির যুগে কি রাগ-তালের ঐতিহ্য টিকে থাকবে? অনুষ্কার মতো শিল্পীরা এই প্রশ্নের উত্তর। তিনি দেখিয়েছেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে আধুনিক ভাষায় উপস্থাপন করলে তা নতুন প্রজন্মের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ফিউশন, বিশ্বসঙ্গীত, ইলেকট্রনিক সাউন্ডস্কেপের সঙ্গে ভারতীয় রাগের মেলবন্ধন তাঁর কাজকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক করেছে।

একই সঙ্গে তাঁর কাজ ভারতীয় সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও অংশ। যখন তিনি ইউরোপ, আমেরিকা বা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সেতারের সুর তোলেন, তখন তিনি কেবল একজন শিল্পী নন; তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির এক দূত। তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে বিশ্ব জানতে পারে ভারতের হাজার বছরের সঙ্গীত ঐতিহ্য, দর্শন ও অনুভূতির ভাষা।

এই সফর ঘিরে ভারতের সঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে যে উত্তেজনা, তা শুধুমাত্র একটি কনসার্টের প্রত্যাশা নয়। এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতির পুনর্জাগরণ। অনেকের কাছে অনুষ্কা রবিশঙ্করের উত্তরাধিকার, আবার অনেকের কাছে তিনি আধুনিক বিশ্বসঙ্গীতের এক আইকন। তাঁর কনসার্ট মানে শুধুমাত্র সেতারের সুর শোনা নয়; এটি ইতিহাস, স্মৃতি, আধুনিকতা এবং ভবিষ্যতের এক সম্মিলিত অভিজ্ঞতা।

কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ৮ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যা তাই শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। সেই সন্ধ্যা হয়ে উঠতে পারে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—যেখানে বাবার স্মৃতি, কন্যার সুর, শহরের আবেগ এবং শ্রোতাদের ভালোবাসা একসঙ্গে মিশে যাবে।
সেতারের প্রতিটি তারে যেন শোনা যাবে অতীতের প্রতিধ্বনি, বর্তমানের সৃজনশীলতা এবং ভবিষ্যতের আশার সুর।

সবশেষে বলা যায়, অনুষ্কা শঙ্করের এই ভারত সফর তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনে এক বিশেষ মুহূর্ত।
বাবার ছায়া, নিজের আলো এবং ভবিষ্যতের পথ—এই তিনের সমন্বয়ে অনুষ্কা শঙ্করের সঙ্গীতযাত্রা যেন এক অনন্ত সুরযাত্রা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে রাখবে।

Preview image