Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

৪৭ বছর বয়সেও রানির জেল্লা নজর কাড়ে! কোন উপকরণটি রোজ মুখে মাখতে ভোলেন না অভিনেত্রী?

ইতিমধ্যেই ৪৭ ছাড়িয়েছে রানির বয়স। তবে অভিনেত্রীকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তাঁর জেল্লাদার ত্বকের পিছনে রয়েছে একটি পরিচিত তেল।সিনেমার জগতে প্রায় ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায়। ‘কুছ কুছ হোতা হ্যয়’-এর মতো রোম্যান্টিক ছবিতে কলেজছাত্রীর ভূমিকায় হোক বা ‘মর্দানি’-র মতো ছবিতে দাপুটে পুলিশ অফিসারের চরিত্র— সব রকম রোলেই দর্শকের মন জয় করেছেন তিনি। বয়স তাঁর ইতিমধ্যেই ৪৭ ছাড়িয়েছে। তবে অভিনেত্রীকে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। অভিনেত্রী জানিয়েছেন, তাঁর জেল্লাদার ত্বকের পিছনে রয়েছে একটি পরিচিত তেল।

এক সাক্ষাৎকারে রানি বলেন, তিনি রূপচর্চা করেন অতি সাধারণ ভাবে। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি নারকেল তেল ব্যবহার করে আসছেন। রানির কথায়, ‘‘আমি শুধু নারকেল তেল ব্যবহার করি। নারকেল তেল ভীষণ ভালবাসি আমি। রূপচর্চাতেও যেমন কাজে লাগাই, তেমনই খেতেও ভাল লাগে। নারকেল তেলের থেকে ভাল কিছু হতে পারে না।’’ রানি মনে করেন ত্বকের পরিচর্যায় কী ব্যবহার করবেন তা অনেকটাই আপনি কোথায় থাকছেন তার উপর নির্ভর করবে। আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে রূপচর্চার উপকরণও বদলে ফেলা জরুরি।

রানির ব্যাখ্যা , ‘‘আমি জুহুতে বড় হয়েছি। জুহু সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা। আর সেই অঞ্চলে বেড়ে উঠেছি বলেই নারকেল তেল আমার ত্বকের জন্য ভীষণ উপকারী। যাঁরা সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় থাকেন তাঁরা নারকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন। আমার ত্বকে এই তেল ম্যাজিকের মতো কাজ করে। তবে যাঁরা পাহাড়ে থাকেন তাঁদের ত্বকে এটি কাজ না-ও করতে পারে।’’

এক সাক্ষাৎকারে রানি যে ভাবে নিজের রূপচর্চার কথা বলেছেন, তা আজকের ঝাঁ-চকচকে স্কিনকেয়ার দুনিয়ায় সত্যিই আলাদা করে নজর কাড়ে। হাজারো দামি ক্রিম, সিরাম, ট্রিটমেন্টের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর সোজাসাপটা স্বীকারোক্তি—“আমি শুধু নারকেল তেল ব্যবহার করি”—অনেকের কাছেই অবাক করার মতো। কিন্তু এই বক্তব্যের ভিতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর দর্শন, যা রূপচর্চাকে বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে জুড়ে দেখার কথা বলে।

রানির মতে, রূপচর্চা মানেই জটিল রুটিন বা অগুনতি প্রোডাক্ট নয়। বরং নিজের শরীর, ত্বক এবং পরিবেশকে বুঝে নেওয়াই আসল। দীর্ঘদিন ধরে নারকেল তেল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই বিশ্বাসে পৌঁছেছেন যে, প্রকৃতির দেওয়া সাধারণ উপাদান অনেক সময় আধুনিক প্রসাধনীর থেকেও বেশি কার্যকর হতে পারে। তাঁর কথায়, নারকেল তেল শুধু ত্বকের যত্নেই নয়, খাবার হিসেবেও তাঁর ভীষণ প্রিয়। এই দ্বৈত ব্যবহারই যেন নারকেল তেলকে তাঁর জীবনে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।

নারকেল তেল ভারতীয় উপমহাদেশে নতুন কিছু নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি চুলে, ত্বকে, রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহুরে জীবনে অনেকেই এটিকে ‘পুরনো দিনের জিনিস’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। রানি সেই প্রবণতার ঠিক উল্টো পথে হাঁটছেন। তাঁর মতে, নারকেল তেলের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের শক্তি আমরা অনেক সময় অবমূল্যায়ন করি, কারণ সেগুলো খুব সহজলভ্য।

রানির বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—ত্বকের পরিচর্যা কোনও সার্বজনীন নিয়মে বাঁধা নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কোথায় থাকছেন, কোন আবহাওয়ায় বাস করছেন, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করে কী ব্যবহার করবেন। এই কথাটা আজকের দিনে খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া আর বিজ্ঞাপনের দৌলতে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, এক দেশের বা এক শহরের স্কিনকেয়ার রুটিন অন্য জায়গায় হুবহু কাজ নাও করতে পারে।

রানি যেহেতু জুহুতে বড় হয়েছেন, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলের আবহাওয়ার সঙ্গে তাঁর ত্বক অভ্যস্ত। জুহুর বাতাসে নোনা ভাব, আর্দ্রতা এবং উষ্ণতা—এই সবকিছু মিলেই ত্বকের আলাদা চাহিদা তৈরি করে। নারকেল তেল এই ধরনের আবহাওয়ায় ত্বককে আর্দ্র রাখে, প্রাকৃতিক ভাবে ময়েশ্চারাইজ করে এবং ত্বকের উপর একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করে। রানি বলেছেন, তাঁর ত্বকে নারকেল তেল ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এই ‘ম্যাজিক’ আসলে ত্বক আর পরিবেশের মধ্যে সঠিক সমন্বয়ের ফল।

তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পাহাড়ি এলাকায় বা শুষ্ক আবহাওয়ায় থাকা মানুষের ক্ষেত্রে নারকেল তেল একই ভাবে কাজ নাও করতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলে তাপমাত্রা কম, বাতাস শুষ্ক, সেখানে ত্বকের প্রয়োজন আলাদা। নারকেল তেল ভারী হওয়ায় অনেক সময় শুষ্ক আবহাওয়ায় এটি ত্বকে ঠিকমতো শোষিত নাও হতে পারে। এই বাস্তবতা মেনেই রানি বলছেন—রূপচর্চা মানে অন্ধভাবে কিছু অনুসরণ করা নয়, বরং নিজের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এই বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আজকের দিনে অনেকেই সেলিব্রিটির স্কিনকেয়ার রুটিন দেখে সেটাই হুবহু নকল করতে চান। কিন্তু রানি যেন সেই প্রবণতার বিরুদ্ধেই কথা বলছেন। তিনি নিজে উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছেন, তাঁর জন্য যা কাজ করছে, তা সবার জন্য সমান ভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। এই স্বচ্ছতা অনেক সেলিব্রিটির মধ্যেই দেখা যায় না।

news image
আরও খবর

নারকেল তেলের প্রতি রানির ভালোবাসা শুধু ব্যবহারিক নয়, আবেগেরও। ছোটবেলার স্মৃতি, বাড়ির পরিবেশ, মা-ঠাকুমার হাতের যত্ন—এই সবকিছুর সঙ্গেই নারকেল তেল জড়িয়ে থাকে অনেকের জীবনে। রানি সেই স্মৃতির দিকটাও অস্বীকার করেন না। তাঁর কথায়, নারকেল তেল শুধু একটি প্রসাধনী নয়, বরং জীবনের অংশ। এই আবেগই হয়তো তাঁকে এত দিন ধরে একই জিনিসে বিশ্বাসী করে রেখেছে।

চুলের যত্নের ক্ষেত্রেও নারকেল তেলের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। রানি যদিও ওই সাক্ষাৎকারে মূলত ত্বকের কথা বলেছেন, তবু ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নারকেল তেল মানেই চুলের যত্ন। চুলে তেল মালিশ, স্ক্যাল্পের পরিচর্যা, চুলের শিকড় মজবুত করা—এই সব ক্ষেত্রেই নারকেল তেল বহু পরীক্ষিত। রানির মতো কেউ যখন প্রকাশ্যে এর প্রশংসা করেন, তখন অনেকের মধ্যেই আবার নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়।

রানির বক্তব্যে আর একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষণীয়—তিনি রূপচর্চাকে কোনও চাপ হিসেবে দেখেন না। তাঁর কথায় কোথাও ‘আমাকে এটা করতেই হবে’ বা ‘এটা না করলে চলবে না’—এই ধরনের বাধ্যবাধকতার সুর নেই। বরং তিনি বিষয়টিকে স্বাভাবিক, আরামদায়ক এক অভ্যাস হিসেবে দেখেন। এই মানসিকতাই হয়তো তাঁর সৌন্দর্যের অন্যতম রহস্য। কারণ ত্বকের যত্ন শুধু বাহ্যিক নয়, মানসিক স্বস্তির সঙ্গেও গভীর ভাবে জড়িত।

আবহাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে রূপচর্চার উপকরণ বদলানোর যে কথা রানি বলেছেন, তা খুবই বাস্তবসম্মত। গ্রীষ্মে ত্বক বেশি তেলতেলে হতে পারে, বর্ষায় আর্দ্রতা বাড়ে, শীতে শুষ্কতা দেখা দেয়—এই প্রতিটি অবস্থার জন্য আলাদা যত্ন প্রয়োজন। কিন্তু আমরা অনেক সময় একই প্রোডাক্ট সারা বছর ব্যবহার করি, তারপর ফল না পেয়ে হতাশ হই। রানি সেই ভুলটাই ধরিয়ে দিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতামতও প্রায় একই রকম। ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলেন, পরিবেশের সঙ্গে ত্বকের সম্পর্ক খুব গভীর। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় আর্দ্রতা বেশি থাকায় ত্বক তুলনামূলক ভাবে কম শুষ্ক হয়, সেখানে ভারী তেলও সহ্য করতে পারে ত্বক। কিন্তু শুষ্ক বা ঠান্ডা অঞ্চলে হালকা ময়েশ্চারাইজার বা ভিন্ন ধরনের তেল প্রয়োজন হতে পারে। রানির অভিজ্ঞতা সেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সঙ্গেই মিলে যায়।

রানির এই সরল রুটিন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা মনে করেন, ভালো ত্বকের জন্য প্রচুর টাকা খরচ করা ছাড়া উপায় নেই। রানি যেন দেখিয়ে দিচ্ছেন, নিজের ত্বককে বোঝা আর নিয়মিত যত্ন নেওয়াই আসল চাবিকাঠি। দামি প্রোডাক্ট না ব্যবহার করেও সুস্থ, উজ্জ্বল ত্বক পাওয়া সম্ভব—এই বিশ্বাসটাই তাঁর কথায় ফুটে উঠেছে।

তবে এখানেও একটি ভারসাম্যের কথা বলা জরুরি। রানি নিজেই বলেছেন, নারকেল তেল তাঁর ত্বকে কাজ করে, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে নাও করতে পারে। কারও ত্বক ব্রণপ্রবণ হলে নারকেল তেল ব্যবহার করলে সমস্যা বাড়তে পারে। তাই তাঁর বক্তব্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নেওয়া যায়, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ করা ঠিক নয়। এই সতর্কতার জায়গাটাও রানির কথার মধ্যেই নিহিত।

সব মিলিয়ে, রানির এই সাক্ষাৎকার আমাদের আবার প্রকৃতির দিকে ফিরে তাকাতে শেখায়। আধুনিক জীবনে আমরা অনেক সময় সহজ জিনিসের মূল্য ভুলে যাই। নারকেল তেলের মতো একটি সাধারণ উপাদান যে ত্বকের জন্য কতটা উপকারী হতে পারে, তা তিনি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রূপচর্চা কোনও ফর্মুলা নয়—এটি ব্যক্তিগত, পরিবেশ-নির্ভর এবং সময়ের সঙ্গে বদলানো প্রয়োজন।

রানির কথায় তাই শুধু সৌন্দর্যের টিপস নয়, আছে এক ধরনের জীবনদর্শনও। নিজের শরীরকে ভালোবাসা, তার কথা শোনা, প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা—এই তিনটি বিষয়ই যেন তাঁর রূপচর্চার মূলমন্ত্র। আর সেই কারণেই হয়তো তাঁর সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক নয়, ভিতর থেকেও উজ্জ্বল।

Preview image