শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে নজর কাড়লেন ভারতের তারকা ব্যাটার ঋষভ পন্থ।
একটা সময় ছিল, যখন ঋষভ পন্থের টেস্ট ক্রিকেটে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। একের পর এক চোট, দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা, প্রত্যাবর্তনের পর ধারাবাহিকতার অভাব—সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটে পন্থকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। কিন্তু ঋষভ পন্থ যে অন্য ধাতুতে গড়া, তা আরও একবার প্রমাণিত হল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গল টেস্টে।
ভারত-শ্রীলঙ্কা প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিনে গল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ব্যাট হাতে ইতিহাস তৈরি করলেন ভারতের তারকা উইকেটকিপার-ব্যাটার। নিজের পরিচিত আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে লাহিরু কুমারার বলে ছক্কা হাঁকিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে পূর্ণ করলেন ১০০টি ছক্কা। আর সেই ছক্কার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক রেকর্ড নিজের নামে করে ফেললেন তিনি।
ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ১০০ ছক্কা হাঁকানোর নজির গড়লেন পন্থ। শুধু তাই নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেও তৈরি করলেন নতুন রেকর্ড। মাত্র ৮৯টি ইনিংসে ১০০ টেস্ট ছক্কা পূর্ণ করে তিনি বিশ্বের দ্রুততম ব্যাটার হিসেবে এই মাইলফলকে পৌঁছলেন। তাঁর আগে এই রেকর্ড ছিল ইংল্যান্ডের বেন স্টোকসের দখলে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে; পন্থ তাঁর ৫১তম টেস্টেই সেই মাইলফলক পেরিয়ে গেলেন।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম টেস্ট শুরু হয়েছিল ১৫ আগস্ট গলে। দুই ম্যাচের এই সিরিজটি ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চলতি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রের অংশ। প্রথম টেস্টটি ১৫ থেকে ১৯ আগস্ট গলে এবং দ্বিতীয় টেস্টটি ২৩ থেকে ২৭ আগস্ট কলম্বোয় হওয়ার কথা রয়েছে।
গল টেস্টে পন্থের সামনে শুধু রান করার চ্যালেঞ্জ ছিল না। দলের প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত রান করে চাপ কমানো এবং ইনিংসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর মূল দায়িত্ব। প্রথম ইনিংসে ৩৯ রান করেছিলেন পন্থ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে এল আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
দ্বিতীয় ইনিংসে ভারত যখন একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে, তখন নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলেন পন্থ। তাঁর ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আক্রমণ করা। ৫৩ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি এবং শেষ পর্যন্ত ৬৯ বলে ৬৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। সেই ইনিংসেই এল তাঁর কেরিয়ারের ঐতিহাসিক ১০০তম টেস্ট ছক্কা।
এটি শুধু একটি ছক্কা ছিল না। ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ছিল।
টেস্ট ক্রিকেটকে সাধারণত ধৈর্য, টেকনিক এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট করার ফরম্যাট হিসেবে দেখা হয়। সেখানে ১০০ ছক্কার মাইলফলক স্পর্শ করা যে কোনও ব্যাটারের কাছেই অত্যন্ত কঠিন কৃতিত্ব।
আর ভারতীয় ক্রিকেটের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভারতের বহু কিংবদন্তি ব্যাটার দীর্ঘদিন টেস্ট ক্রিকেটে রাজত্ব করলেও ১০০ ছক্কার মাইলফলকে পৌঁছতে পারেননি।
ঋষভ পন্থ সেই তালিকায় সম্পূর্ণ নতুন একটি রেকর্ড যোগ করলেন। গল টেস্টে লাহিরু কুমারার বলে ছক্কা মেরে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে নিজের ১০০তম ছক্কা পূর্ণ করেন। এর ফলে তিনি হয়ে গেলেন প্রথম ভারতীয় ব্যাটার, যিনি টেস্টে ১০০টি ছক্কা মেরেছেন। একই সঙ্গে বিশ্বের মাত্র চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে এই নজিরে পৌঁছলেন তিনি।
এই রেকর্ড পন্থের ব্যাটিংয়ের ধরনকেও আলাদা করে তুলে ধরে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর আগ্রাসী মানসিকতা বরাবরই আলোচনার বিষয়। পরিস্থিতি কঠিন হলেও তিনি রক্ষণাত্মক হয়ে ম্যাচের গতি কমিয়ে দেওয়ার বদলে নিজের শট খেলার সুযোগ খোঁজেন। গল টেস্টেও সেই পরিচিত পন্থকেই দেখা গেল।
১০০ ছক্কা পূর্ণ করাই যেখানে বিরাট কৃতিত্ব, সেখানে পন্থের রেকর্ডের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হল তিনি কত দ্রুত এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন।
মাত্র ৮৯টি টেস্ট ইনিংসে ১০০ ছক্কা পূর্ণ করেছেন ঋষভ পন্থ। অর্থাৎ, টেস্ট ক্রিকেটে ১০০ ছক্কা মারার জন্য তিনি ৯০টি ইনিংসও নেননি।
এই কৃতিত্ব তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের দ্রুততম ব্যাটারে পরিণত করেছে। এর আগে এই রেকর্ডের সঙ্গে বেন স্টোকসের নাম জড়িত ছিল। পন্থের এই কৃতিত্ব সেই রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেল। একই সঙ্গে পন্থ প্রমাণ করলেন, টেস্ট ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের অন্যতম ব্যতিক্রমী ক্রিকেটার।
পন্থের এই রেকর্ডের গুরুত্ব বোঝার জন্য তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুটা মনে করা প্রয়োজন। অভিষেকের পর থেকেই তিনি এমন এক ধরনের ক্রিকেট খেলেছেন, যা প্রচলিত টেস্ট ব্যাটিংয়ের ধারণাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে তাঁর রিভার্স সুইপ, পুল, স্লগ এবং স্পিনারদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শট তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
ঋষভ পন্থের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তাঁর মানসিকতা।
টেস্ট ম্যাচে অধিকাংশ ব্যাটার যেখানে পরিস্থিতি অনুযায়ী ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ার চেষ্টা করেন, পন্থ সেখানে অনেক সময় বোলারের উপর চাপ ফিরিয়ে দিতে চান। তাঁর দর্শনটা সহজ—বোলারকে সুযোগ না দিয়ে নিজের শটের মাধ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
এই কারণেই পন্থের টেস্ট ক্যারিয়ারে ছক্কার সংখ্যা এত বেশি।
তবে তাঁর ছক্কা শুধুমাত্র বিনোদনের বিষয় নয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ম্যাচে তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ভারতের ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাঁর একাধিক ইনিংস দেখিয়েছে যে, তিনি শুধু রান সংগ্রাহক নন; তিনি ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেন।
গল টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসও তার ব্যতিক্রম নয়।
দলের প্রয়োজনের সময়ে তাঁর ৬৬ রানের ইনিংস ভারতকে অতিরিক্ত রান যোগ করতে সাহায্য করে। আর সেই ইনিংসেই এল এমন একটি রেকর্ড, যা বহু বছর ধরে ভারতীয় ক্রিকেটে কেউ করতে পারেননি।
ঋষভ পন্থের গল্প শুধুমাত্র ১০০ ছক্কার গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রত্যাবর্তনের গল্পও।
২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সময় টেস্ট ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন পন্থ। ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার পর তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ার নিয়েও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। পুনর্বাসন, ফিটনেস ফিরে পাওয়া এবং প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার লড়াই—সবকিছু পেরিয়ে তিনি জাতীয় দলে ফিরে আসেন।
২০২৪ সালে টেস্ট ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনের পরই তিনি আবার নিজের পুরনো ছন্দের ইঙ্গিত দেন। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চেন্নাইয়ে টেস্ট সেঞ্চুরি করে প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন তিনি। সেই ইনিংসের মাধ্যমে পন্থ ভারতীয় উইকেটকিপারদের মধ্যে টেস্ট শতরানের ক্ষেত্রে এমএস ধোনির রেকর্ডের সমকক্ষ হয়েছিলেন। ICC-ও তাঁর প্রত্যাবর্তনকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছিল।
তারপরও পথটা একেবারে মসৃণ ছিল না। প্রত্যাবর্তনের পর তাঁকে আবারও নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেটকিপিংয়েও ধারাবাহিকতা দেখানোর চাপ ছিল।
কিন্তু গল টেস্টের এই পারফরম্যান্স যেন সেই সব প্রশ্নের আরও একটি উত্তর।
১০০ ছক্কার মাইলফলকে পৌঁছনোর পাশাপাশি পন্থ যে ৫১তম টেস্টে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, সেটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অর্থাৎ, মাত্র ৫১টি টেস্ট ম্যাচেই তিনি এমন একটি রেকর্ড তৈরি করেছেন, যা ভারতীয় ক্রিকেটে আগে কেউ করতে পারেননি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ৮৯ ইনিংসে ১০০ ছক্কা মানে তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কতটা ধারাবাহিক ছিল, তারও একটি পরিসংখ্যানগত প্রমাণ।
গল টেস্টের আগে পন্থের ১০০ ছক্কার মাইলফলক নিয়ে আলোচনা চলছিল। শ্রীলঙ্কা সফরের আগে তাঁর ছক্কার সংখ্যা ছিল ৯৭ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে মাত্র তিনটি ছক্কা দূরে ছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষা বেশিদিন স্থায়ী হল না।
গলেই তিনি তিনটি ছক্কা পূর্ণ করে ১০০-তে পৌঁছে গেলেন।
ভারতীয় ক্রিকেটে টেস্ট ব্যাটিংয়ের ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সুনীল গাভাসকর থেকে শচীন তেন্ডুলকর, রাহুল দ্রাবিড় থেকে বীরেন্দ্র শেহওয়াগ, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় থেকে বিরাট কোহলি—প্রজন্মের পর প্রজন্ম অসাধারণ ব্যাটার ভারতকে টেস্ট ক্রিকেটে গৌরবান্বিত করেছেন।
কিন্তু ১০০ ছক্কার মাইলফলকে তাঁদের কেউ পৌঁছতে পারেননি।
এই জায়গাতেই পন্থের রেকর্ডের আলাদা গুরুত্ব।
তিনি শুধু রান বা সেঞ্চুরির সংখ্যা দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করেননি। তিনি টেস্ট ক্রিকেটে ছক্কাকে নিজের ব্যাটিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত করেছেন।
ভারতীয় ক্রিকেটে আগ্রাসী টেস্ট ব্যাটিংয়ের ইতিহাসে বীরেন্দ্র শেহওয়াগের নাম যেমন বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়, তেমনই আধুনিক প্রজন্মে পন্থের নামও সেই আলোচনায় আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
১০০ টেস্ট ছক্কার ক্লাবে ঢোকার মাধ্যমে পন্থ এখন বিশ্বের নির্বাচিত কয়েকজন ব্যাটারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এটি এমন একটি ক্লাব, যেখানে জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়। টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত খেলতে হয়, দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হয় এবং একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মানসিকতাও ধরে রাখতে হয়।
পন্থের আগে বেন স্টোকসের মতো ক্রিকেটার এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন। পন্থের কৃতিত্ব হল, তিনি তাঁদের তুলনায় দ্রুত এই সংখ্যায় পৌঁছেছেন।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পন্থ কেবল একজন ব্যাটার নন। তিনি একজন উইকেটকিপারও। উইকেটের পিছনে ৯০ ওভার দায়িত্ব পালন করার পর ব্যাট হাতে এমন আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলা শারীরিক ও মানসিকভাবে যথেষ্ট কঠিন।
তাই তাঁর ১০০ ছক্কার রেকর্ডকে শুধু ব্যাটিং পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে কৃতিত্বের পুরো ছবিটা পাওয়া যাবে না।
একটি টেস্ট ম্যাচে পরিস্থিতি কখনও একই থাকে না। কখনও ব্যাটারদের জন্য পরিস্থিতি সহজ, কখনও কঠিন। গলের মতো স্পিন সহায়ক পরিবেশে চতুর্থ ইনিংস বা দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করা অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে পন্থের ব্যাটিংয়ের মূল্য আরও বেড়ে যায়।
তিনি যখন ক্রিজে আসেন, তখন তাঁর কাজ ছিল শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলক পূর্ণ করা নয়। ভারতের স্কোরবোর্ডে যত বেশি সম্ভব রান যোগ করা এবং শ্রীলঙ্কার সামনে বড় লক্ষ্য তৈরি করা ছিল দলের প্রয়োজন।
পন্থ সেই কাজটাই করেছেন নিজের স্টাইলে।
তিনি ৫৩ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন। এরপরও আক্রমণ থামাননি। শেষ পর্যন্ত ৬৬ রানে তাঁর ইনিংস শেষ হয়। কিন্তু তার আগেই নিজের নাম লিখে ফেলেন ইতিহাসের পাতায়।
এই কারণেই গল টেস্টের পন্থের ইনিংসকে শুধুমাত্র '১০০ ছক্কার ইনিংস' বললে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা হবে না। এটি ছিল পরিস্থিতির মধ্যে থেকে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার আরও একটি উদাহরণ।
এই রেকর্ডের পর সেই প্রশ্নের উত্তর আরও জোরালোভাবেই 'হ্যাঁ'।
পন্থের বয়স এখনও মাত্র ২৮। অর্থাৎ তাঁর সামনে রয়েছে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার। ইতিমধ্যেই তিনি ১০০ টেস্ট ছক্কা পার করেছেন। সামনে যদি তিনি ফিট থাকেন এবং নিয়মিত টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারেন, তাহলে তাঁর ছক্কার সংখ্যা আরও অনেক দূর যেতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় হল তাঁর বয়স এবং খেলার ধরন।
টেস্ট ক্রিকেটে ১০০ ছক্কা যেখানে অধিকাংশ ব্যাটারের কাছে কেরিয়ারের শেষদিকে এসে পাওয়া একটি মাইলফলক, সেখানে পন্থ তাঁর কেরিয়ারের তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়েই এই সংখ্যায় পৌঁছে গেছেন।
এর ফলে ভবিষ্যতে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে ছক্কার সংখ্যায় আরও বড় রেকর্ড তৈরি করতে পারেন।
পন্থের ব্যাটিং নিয়ে বিতর্ক বরাবরই রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, তাঁর অতিরিক্ত আগ্রাসী মানসিকতা কখনও কখনও তাঁকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে। আবার অন্য একটি মত হল, পন্থের সবচেয়ে বড় শক্তিই তাঁর এই আগ্রাসন। তাঁকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত বা রক্ষণাত্মক ব্যাটারে পরিণত করার চেষ্টা করলে তাঁর স্বাভাবিক ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
গল টেস্টের ইনিংস যেন দ্বিতীয় মতকেই সমর্থন করে।
তিনি যখন আক্রমণ করেছেন, তখন শুধু নিজের রান বাড়েনি; ম্যাচের পরিস্থিতিতেও প্রভাব পড়েছে। তাঁর ছক্কাগুলি শ্রীলঙ্কার বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেছে এবং ভারতকে দ্রুত রান সংগ্রহের সুযোগ দিয়েছে।
এটাই পন্থের বিশেষত্ব।
তিনি এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি কয়েক ওভারের মধ্যে ম্যাচের আবহ বদলে দিতে পারেন।
ক্রিকেটে পরিসংখ্যান অনেক কিছু বলে। কিন্তু সব পরিসংখ্যান ক্রিকেটারের চরিত্রকে সমানভাবে প্রকাশ করে না।
ঋষভ পন্থের ১০০ টেস্ট ছক্কা এমন একটি পরিসংখ্যান, যা তাঁর ক্রিকেটীয় পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তিনি কে?
তিনি এমন একজন ব্যাটার, যিনি স্পিনারকে ক্রিজ থেকে বেরিয়ে এসে মারতে পারেন। পেসারকে পুল করতে পারেন। ফিল্ডারদের মাথার উপর দিয়ে বল পাঠাতে পারেন। ম্যাচের পরিস্থিতি কঠিন হলেও ঝুঁকি নিয়ে রান তুলতে পারেন।
এই সবকিছুর যোগফলই তাঁর ১০০ ছক্কা।
আর সেই কারণেই গল টেস্টের এই মাইলফলক তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
১০০ ছক্কা হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য এখানেই শেষ নয়।
এখন সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হল টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। চোট থেকে ফিরে এসে তিনি যে জায়গায় পৌঁছেছেন, সেখানে নিজেকে দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ভারতীয় টেস্ট দলে উইকেটকিপার-ব্যাটারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পন্থ যদি নিয়মিতভাবে রান করতে পারেন এবং একই সঙ্গে উইকেটের পিছনে নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স দেন, তাহলে ভারতীয় টেস্ট দলের জন্য তাঁর গুরুত্ব আরও বাড়বে।
বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে তাঁর অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে ঋষভ পন্থের ব্যাটিং থেকে সবচেয়ে বড় বার্তাটি হল—তিনি এখনও নিজের ক্রিকেটীয় পরিচয় বদলাননি।
চোট তাঁকে থামিয়েছে।
বিরতি তাঁকে থামিয়েছে।
সমালোচনাও তাঁকে থামাতে পারেনি।
বরং ফিরে এসে আবার সেই পুরনো পন্থকেই দেখা যাচ্ছে—নির্ভীক, আক্রমণাত্মক এবং পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে বদলে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন।
গল টেস্টে তাঁর ৬৬ রানের ইনিংস হয়তো পরিসংখ্যানের দিক থেকে শতরান নয়। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে সেটি নিঃসন্দেহে বিশেষ একটি ইনিংস। কারণ সেই ইনিংসেই তিনি প্রথম ভারতীয় ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ১০০ ছক্কা পূর্ণ করেছেন এবং মাত্র ৮৯ ইনিংসে এই কৃতিত্ব অর্জন করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।
ঋষভ পন্থের কেরিয়ারকে যদি একটি শব্দে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে সেটি হতে পারে—'প্রত্যাবর্তন'।
চোটের পর ফিরে এসেছেন। সমালোচনার পর ফিরে এসেছেন। ব্যর্থতার পরও ফিরে এসেছেন।
এবার গলের মাটিতে তিনি ফিরলেন রেকর্ডের মঞ্চে।
মাত্র ৫১তম টেস্টে এবং ৮৯তম ইনিংসে ১০০ ছক্কা। প্রথম ভারতীয়। বিশ্বের দ্রুততম। টেস্ট ক্রিকেটে মাত্র চতুর্থ ব্যাটার।
এই চারটি তথ্যই যথেষ্ট বোঝাতে যে ঋষভ পন্থ ভারতীয় ক্রিকেটে কতটা বিশেষ এক চরিত্র।
আর সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হল—২৮ বছর বয়সেই যদি তাঁর টেস্ট ছক্কার সংখ্যা ১০০ হয়ে যায়, তাহলে সামনে আরও বহু রেকর্ড তাঁর অপেক্ষায় থাকতে পারে।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গল টেস্ট তাই শুধু ভারতের একটি টেস্ট ম্যাচ নয়। পন্থের জন্য এটি তাঁর প্রত্যাবর্তনের গল্পের আরও একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। যে ক্রিকেটারকে একসময় নিজের জায়গা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল, তিনিই আজ টেস্ট ক্রিকেটে এমন একটি বিশ্বরেকর্ডের মালিক, যা ভারতীয় ক্রিকেটে আগে কেউ করতে পারেননি।
ঋষভ পন্থ আবারও প্রমাণ করলেন—তাঁকে নিয়ে যত প্রশ্নই উঠুক, ব্যাট হাতে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর এখনও অটুট।