দিল্লি বিস্ফোরণে ব্যবহৃত হুন্ডাই আই২০ গাড়ির চালক হিসেবে সন্দেহভাজন উমর উন-নবি ওরফে উমর মহম্মদের কাশ্মীরের বাড়ি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করল নিরাপত্তা বাহিনী। তদন্তে নয়া তথ্য হাতে পাওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেয় বাহিনী। এই ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডে দিন যত যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। সোমবার লালকেল্লার নিকটবর্তী এলাকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আইইডি বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩। সারা দেশ যখন এই ঘটনার রেশে স্তম্ভিত, ঠিক তখনই তদন্তকারীরা এক বিশাল চমক পান বিস্ফোরণে ব্যবহৃত সাদা রঙের হুন্ডাই আই২০ গাড়িটি চালাচ্ছিলেন কাশ্মীরের পুলওয়ামার বাসিন্দা উমর উন-নবি, যাকে স্থানীয়ভাবে উমর মহম্মদ নামেও চেনে অনেকেই। আর সেই প্রমাণ হাতে পেতেই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় তার কাশ্মীরের বাড়িটি।
উমর পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন। ফরিদাবাদের আল ফালাহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইতিমধ্যেই এই বিস্ফোরণকাণ্ডে একাধিকবার সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র এবং গবেষক সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে আসায় তদন্তকারী সংস্থাগুলির নজরে আল ফালাহ দীর্ঘদিন ধরেই। তার মধ্যেই যখন জানা যায় উমরের ফোন রেকর্ডে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সন্দেহভাজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তখন ঘটনাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
উমর নবির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল মুজ়াম্মিল আহমেদ নামের আরও এক ধৃত সন্দেহভাজনের। সোমবার বিস্ফোরণের দিন সকালেই ফরিদাবাদ থেকে বিশাল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের সহযোগিতায় হরিয়ানা পুলিশ। সেখান থেকেই গ্রেফতার হয় মুজ়াম্মিলসহ আরও কয়েকজন। তদন্তকারীরা বলতে শুরু করেন, এটি কোনও একক ঘটনা নয় একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ।
মুজ়াম্মিলের ফোন পরীক্ষা করে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে একাধিকবার তিনি লালকেল্লার সামনে গিয়েছিলেন। তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য রাষ্ট্রপতি দিবসের আগে সম্ভাব্য হামলার রেকি করা হয়েছিল। শুধু মুজ়াম্মিল নয়, ডাক্তার উমর নবিও তার সঙ্গে লালকেল্লা সংলগ্ন এলাকায় গিয়েছিলেন। তাঁদের চলাফেরা, মোবাইলের লোকেশন, ফোন কল ডিটেইলস সব মিলিয়ে ছবিটি পরিষ্কার হতে শুরু করে।
তদন্তকারীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, গাড়িটি হয়তো উমরের নয়। কিন্তু বিস্ফোরণস্থল থেকে পাওয়া দেহাবশেষের উপর যখন ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়, তখনই পুরো ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে যায়। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হওয়া দেহাংশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয় উমরের মায়ের ডিএনএ নমুনা। তদন্তকারীদের কথায়, “১০০ শতাংশ নিশ্চিত যে, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন উমরই।”
ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই নিরাপত্তা বাহিনী সিদ্ধান্ত নেয় কঠোর পদক্ষেপের। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় উমরের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। বাড়িটি ঘিরে ফেলেন সেনা ও জম্মু কাশ্মীর পুলিশের যৌথ বাহিনী। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, রাত ১২টা নাগাদ শুরু হয় তল্লাশি এবং তার কিছুক্ষণ পরই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আইইডি ব্যবহার করে বাড়িটি ধ্বংস করে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী, যাতে কোনও বিস্ফোরক বা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা না করা যায়।
বাড়ি ধ্বংস করার পর রাতভর তল্লাশি চলে পুলওয়ামা ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামে। পুলিশ গ্রেফতার করে ছ’জনকে যার মধ্যে তিন জন উমরের নিকট আত্মীয়। পুলিশের দাবি, উমরের পরিবারও তাঁর কিছু কার্যকলাপ সম্পর্কে জানত। তদন্তকারীরা মনে করছেন, দিল্লি বিস্ফোরণের সঙ্গে যে দুই কাশ্মীরি চিকিৎসকের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের সঙ্গে উমরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাদের মধ্যে আছেন ফরিদাবাদেরই এক মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার।
দিল্লি বিস্ফোরণের পর থেকেই আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয় তদন্তের কেন্দ্রে। একাধিক সন্দেহভাজন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা সাবেক ছাত্র। তদন্তকারীরা অভিযোগ করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অংশে চরমপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে, যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তারা দাবি করেছে, আল ফালাহ শিক্ষায়নের কেন্দ্র, কোনও চরমপন্থার নয়।
বিস্ফোরণের ঘটনার দিন লালকেল্লার কাছে যখন হুন্ডাই আই২০ টি বিস্ফোরিত হয়, তখন ঘটনাস্থল থেকেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। কিন্তু আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থার অবনতি হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩। পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, যা সাধারণত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আইইডির মাধ্যমেই ঘটানো যায়। ফরিদাবাদ থেকে পাওয়া বিস্ফোরক ও লালকেল্লার বিস্ফোরণস্থল থেকে উদ্ধার বস্তুগুলির মিল পাওয়ায় তদন্তকারীরা নিশ্চিত যে একই চক্র কাজ করেছে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো উমর ছিলেন একজন চিকিৎসক, যাঁর দায়িত্ব ছিল প্রাণ বাঁচানো। কিন্তু তদন্ত বলছে, তিনি বিপরীত পথেই হাঁটছিলেন। পুলিশের দাবি, উমর বেশ কিছুদিন ধরে র্যাডিকাল চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর ফোন ও ল্যাপটপ থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি ডকুমেন্টে এই সন্দেহ আরও প্রবল হয়েছে।
উমরের মাকে সোমবার রাতেই আটক করা হয়। কারণ তদন্তকারীদের প্রয়োজন ছিল ডিএনএ নমুনা। বিস্ফোরণের পর উমরের কোনও চিহ্ন না মিললেও ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাবশেষে যে ডিএনএ পাওয়া যায়, তা উমরের মায়ের নমুনার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। এই তথ্য পাওয়ার পরই তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন গাড়িটি চালাচ্ছিলেন উমরই, এবং বিস্ফোরণে তিনিই মারা যান।
দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তদন্তকারীরা এখন নজর দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক যোগসূত্রের দিকে। কিছু কল রেকর্ড ও টেলিগ্রাম চ্যাটের মাধ্যমে পাকিস্তানের বাসিঁধা এমন কয়েকজনের সঙ্গে উমরের কথাবার্তার প্রমাণ মিলেছে। যদিও এখনই নিশ্চিতভাবে কোনও বক্তব্য দেয়নি পুলিশ, তবে তদন্তে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছে না তারা।
দিল্লির ভয়াবহ বিস্ফোরণ শুধু রাজধানীকে নয়, গোটা দেশকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তের প্রথম দিন থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত, গভীরভাবে গোপন নেটওয়ার্ক। কিন্তু উমর উন নবি বা উমর মহম্মদ পেশায় একজন চিকিৎসক এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে থাকার বিষয়টি সমাজের কাছে আরও আতঙ্কজনক। চিকিৎসকের মতো সম্মানজনক পেশায় থাকা একজন ব্যক্তি সন্ত্রাস-যোগে জড়িয়ে পড়েছেন, এই তথ্য গোটা তদন্তকে নতুন মোড় দিয়েছে।
ডিএনএ রিপোর্টে নিশ্চিত হয়েছে দিল্লি বিস্ফোরণে ব্যবহৃত সাদা রঙের হুন্ডাই আই২০ গাড়িটি তিনিই চালাচ্ছিলেন। বিস্ফোরণের তীব্রতায় গাড়িটি সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া দেহাংশের নমুনার সঙ্গে উমরের মায়ের দেওয়া ডিএনএ-র মিল মেলায় তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে গাড়িটির চালক ছিলেন উমর উন-নবি। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তৎপরতা বাড়ায় নিরাপত্তা বাহিনী।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উমরের বাড়িটি উড়িয়ে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। আইইডি ব্যবহার করে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ঘটনাস্থল ঘিরে বহুক্ষণ ধরে সেনা, সিআরপিএফ ও স্থানীয় পুলিশের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। পুরো এলাকা সিল করে রাতভর চিরুনি তল্লাশি চলে। এই অভিযানে গ্রেফতার করা হয় ছ’জনকে, যাদের মধ্যে তিনজন উমরের পরিবারের সদস্য। তাদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
এরই মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে আরও একটি কারণে ফরিদাবাদের আল ফালাহ্ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তদন্তে বার বার উঠে আসছে। উমর পেশায় একজন চিকিৎসক এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ধৃত অন্যান্য সন্দেহভাজনদের সঙ্গেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, দিল্লি পুলিশের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন মুজ়াম্মিল আহমেদের ফোনের ডাটা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে তিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে লালকেল্লার সামনে একাধিকবার গিয়েছিলেন। অনুমান করা হচ্ছে, প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে হামলার রেকি করা হয়েছিল। মুজ়াম্মিলের সঙ্গে উমরেরও লালকেল্লা এলাকায় যাওয়ার তথ্য মিলেছে, যা তদন্তকে আরও জটিল করছে।
এদিকে ফরিদাবাদে তল্লাশির সময় যে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে, তা তদন্তকে আরও স্পষ্ট দিক দেখাচ্ছে। বিস্ফোরক সংগ্রহ, গাড়ি প্রস্তুত, পরিকল্পনার জায়গা নির্বাচন সবটাই একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে এই নেটওয়ার্ক ঠিক কতটা বিস্তৃত? দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কি এর শাখা ছড়ানো রয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা পেশা ও তরুণদের কার্যকলাপ সবই এখন নিরাপত্তা সংস্থার বিশেষ নজরে।
উমরের বাড়ি উড়িয়ে দেওয়া, তার পরিবারের সদস্যদের আটক, বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি এই সবকিছুই স্পষ্ট করছে যে তদন্তকারীরা এবার মূল চক্র ধরে সামনে এগোতে চান। এই নেটওয়ার্কের মূল পাণ্ডাদের খুঁজে বের করাই এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, তবে তদন্তকারীদের কঠোর পদক্ষেপ আস্থা ফিরিয়ে আনছে সাধারণ মানুষের মনে।