IndiGo র একের পর এক ফ্লাইট বাতিল ও ব্যাপক দেরির জেরে দেশের বিমান পরিবহণ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন অচলাবস্থা। হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়ে দিশেহারা অবস্থায় পড়েন। এই চরম পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এগিয়ে আসে Indian Railways, যারা জরুরি ভিত্তিতে একাধিক স্পেশাল ট্রেন এবং অতিরিক্ত কোচ চালুর ঘোষণা করেছে। রেলওয়ে মোট ৮৪টি স্পেশাল ট্রেন, প্রায় ১০০টি অতিরিক্ত ট্রিপ এবং ৩৭টি প্রিমিয়াম ট্রেনে ১১৬টি বাড়তি কোচ যোগ করেছে, যাতে বিমানে আটকে পড়া যাত্রীরা বিকল্প যাতায়াতের সুযোগ পান।
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা IndiGo–র নজিরবিহীন বিপর্যয়ের জেরে কয়েকদিন ধরে দেশজুড়ে বিমান পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে পড়ে। ফ্লাইট বাতিল, দীর্ঘ বিলম্ব, যাত্রী তথ্য গোপন, লাগেজ ফেরত পেতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা—সমস্ত মিলিয়ে ভারতীয় বিমানবন্দরগুলিতে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় যা দেশের সাম্প্রতিক অতীতে আর দেখা যায়নি।
এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিমানযাত্রীদের দুঃসহ অবস্থার কথা মাথায় রেখে ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসে Indian Railways, যারা একাধিক স্পেশাল ট্রেন ও অতিরিক্ত কোচ ঘোষণা করেছে যাতে যাত্রীরা বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থা পান।
গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে IndiGo–র পাইলট ও ক্রু শিডিউলিং সফটওয়্যারে গুরুতর সমস্যার কারণে হঠাৎ করে শতাধিক বিমান বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তী দিনগুলিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, এবং মোট বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলে কয়েকশত।
ফলে—
দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, কলকাতা, চেন্নাইসহ বড় শহরের বিমানবন্দরে যাত্রীদের হাহাকার
বিমান সংস্থার কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন
টিকিট রিফান্ড পেতে বিঘ্ন
পরিবর্তিত ফ্লাইটের অনিশ্চয়তা
প্রবীণ, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ
সামগ্রিকভাবে, দেশের বিমান নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় রেলমন্ত্রী আষীষ বৈষ্ণব ও রেল বোর্ড জরুরি বৈঠকে বসে এবং যাত্রীদের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
IndiGo–র যাত্রী সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় ২.৫ লাখ।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায়—
হাজার হাজার যাত্রী বিভিন্ন শহরে আটকা পড়েন
ব্যবসায়িক সফর, অফিস মিটিং, মেডিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট—সব ভেস্তে যায়
যাত্রীদের ভ্রমণ বিকল্প বলতে ট্রেন ছাড়া উপায় থাকে না
এই কারণেই ভারতীয় রেল জরুরি ভিত্তিতে স্পেশাল ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
রেলওয়ের উদ্দেশ্য ছিল—
বিমানবন্দরে আটকে থাকা যাত্রীদের বিকল্প দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা দেওয়া
যাত্রীদের চাপ কমানো
ভাড়া–নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা (কারণ ওই সময় বিমানের ভাড়া হঠাৎ করেই ৫ গুণ বেড়ে যায়)
গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিকে জরুরি পরিষেবা হিসেবে সংযুক্ত রাখা
Indian Railways নিম্নোক্ত জরুরি পদক্ষেপ নেয়:
বিভিন্ন জোনে যাত্রীদের ভ্রমণ সহায়তার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ ৮৪টি বিশেষ ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত জানায়।
এর মধ্যে—
হাওড়া–CSMT
দিল্লি–মুম্বাই
বেঙ্গালুরু–হায়দরাবাদ
চেন্নাই–ত্রিবান্দ্রম
সেকেন্দ্রাবাদ–বিশাখাপত্তনম
পাটনা–দিল্লি
কলকাতা–বেঙ্গালুরু
প্রভৃতি রুটে স্পেশাল ট্রেন যুক্ত করা হয়।
শুধু স্পেশাল ট্রেনই নয়, বিদ্যমান ট্রেনগুলিকে অতিরিক্ত ট্রিপ চালানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত যাত্রী চাহিদা দ্রুত পূরণে অত্যন্ত কার্যকর হয়।
A/C কোচ, স্লিপার ও জেনারেল—সব বিভাগের আসন বাড়ানো হয়।
দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই ও হায়দরাবাদ বিমানবন্দরে IRCTC কাউন্টার খুলে যাত্রীদের—
অন–স্পট টিকিট
ট্রেনের সিট–স্টেটাস
দ্রুত বুকিং
রুট সাজেশন
দেওয়া শুরু হয়।
বিমানবন্দরে আটকে থাকা বহু যাত্রী রেলের এই সিদ্ধান্তকে “উদ্ধারকারী পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেন।
তাদের বক্তব্য—
“ফ্লাইটের ভাড়া একদম নাগালের বাইরে চলে যায়।”
“RAC বা ওয়েটিং হলেও ট্রেনের টিকিট পাওয়া ফ্লাইটের চেয়ে অনেক সহজ।”
“বাচ্চা ও বয়স্কদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করার চেয়ে ট্রেনে ওঠা অনেক ভালো।”
এদিকে রেলের এই উদ্যোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসিত হয়।
IndiGo–র বিমান সংকটের সময়ে ভারতীয় রেলের ঘোষণা করা বিশেষ পরিষেবা শুধু একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই নয়; বরং এটি দেশের পরিবহন নেটওয়ার্কের ওপর রেলের গভীর নিয়ন্ত্রণ ও সাড়া–দেওয়ার ক্ষমতার এক বিরল উদাহরণ। এই অংশে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করব—কীভাবে রেলওয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় পরিকাঠামো, কর্মী এবং রোলিং স্টক–সমস্ত ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগিয়েছে।
ভারতীয় রেলওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কগুলির একটি।
তবে বিশেষ ট্রেন চালাতে সাধারণত ২–৫ দিন সময় লাগে।
কিন্তু IndiGo বিপর্যয়ের এই সময়ে রেল যা করেছে, তা প্রায় “জরুরি সামরিক মোতায়েনের” সমতুল্য।
রোলিং স্টক পুনর্বিন্যাস
দেশের বিভিন্ন জোনে দাঁড়িয়ে থাকা কোচগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারযোগ্য করা হয়।
অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন
রেলওয়ের অপারেশন, সেফটি, টিকিটিং, সিগন্যালিং বিভাগ—সব জায়গায় স্টাফ বৃদ্ধি করা হয়।
রেক–শেডে অতিরিক্ত মেইনটেন্যান্স শিফট
ট্রেন বেরোনোর আগে ভ্যাকুয়াম ব্রেক, ইঞ্জিন ফিটনেস, সিগন্যালিং সিস্টেম—সবই পুনরায় চেক করা হয়।
জোন–ভিত্তিক বোঝাপড়া
Northern Railway, Eastern Railway, South Central Railway, Southern Railway, Western Railway—সব জোন একযোগে এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।
একজন রেল আধিকারিক এ বিষয়ে The Hindu–কে বলেন—
“বিমানযাত্রীদের অসুবিধাকে আমরা দেশের জরুরি অবস্থা হিসেবে ধরেছি। তাই সব জোনকে ‘ওয়ার ফুটিং’–এ কাজ করতে বলা হয়েছিল।”
IndiGo বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলো মূলত মেট্রো শহর ও ব্যবসাকেন্দ্রগুলিকে প্রভাবিত করেছিল। সেই অনুযায়ী রেলওয়ে রুট নির্বাচন করে।
দিল্লি → মুম্বাই
দিল্লি → বেঙ্গালুরু
বেঙ্গালুরু → হায়দরাবাদ
হায়দরাবাদ → চেন্নাই
হাওড়া → মুম্বাই (CSMT)
কলকাতা → বেঙ্গালুরু
চেন্নাই → ত্রিবান্দ্রম
পাটনা → দিল্লি
লখনউ → দিল্লি
এই রুটগুলিতেই বিমানযাত্রার বিকল্প হিসেবে ট্রেনের চাহিদা ৪ গুণ বেড়ে গিয়েছিল।
রেলের এক অভিজ্ঞ অফিসার বলেন—
“যাত্রীদের গন্তব্য কোথায়, কতটা দূরত্ব—এসব বিবেচনা করে আমরা সবচেয়ে বেশি চাপের রুট চিহ্নিত করেছি।”
IndiGo সংকটের সময় রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রেল নেয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ:
RAC, ওয়েটিং লিস্ট ও তৎকাল পরিষেবা দ্রুত করার জন্য কর্মী বাড়ানো হয়।
IRCTC–র সার্ভারে অতিরিক্ত ব্যান্ডউইথ যোগ করা হয় যাতে ওয়েবসাইটে চাপ থাকলেও বুকিং না থামে।
বড় স্টেশনগুলিতে হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হয় যেখানে বিমানযাত্রীরা—
বিকল্প ট্রেন
সিট–স্টেটাস
আপডেটেড প্ল্যাটফর্ম তথ্য
দ্রুত বুকিং সুযোগ
পেয়ে যান।
রেলে যাত্রীর চাপ বাড়ায় RPF (Railway Protection Force) স্টেশনভিত্তিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে।
রেল মন্ত্রক জানিয়েছে—
“দেশের যাত্রীদের অসুবিধা কমাতে রেল তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।”
কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবহন বিভাগ, সিভিল অ্যাভিয়েশন মন্ত্রক ও রেল মন্ত্রকের যৌথ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়—
বিমানযাত্রীরা যেন সহজে ট্রেনের বিকল্প পান
টিকিটে নমনীয়তা রাখা হবে
প্রয়োজনে আরও স্পেশাল ট্রেন চালানো হবে
একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রক কর্মকর্তা বলেন—
“এটি শুধু রেলের সিদ্ধান্ত নয়; এটি কেন্দ্রের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া।”
IndiGo বিপর্যয়ের সময় রেলওয়ের যাত্রীসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
তবে রেল জানিয়েছে—
এই ট্রেন চালানো লাভের উদ্দেশ্য নয়
যাত্রী–স্বার্থই প্রথম
ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সিদ্ধান্ত নেই
বিশেষজ্ঞদের মতে:
রেলের ব্র্যান্ড–বিশ্বাস বাড়বে
এটি রেলওয়ের জনসম্পর্ক উন্নত করার বড় সুযোগ
ভবিষ্যতে রেলই হবে “emergency transport backbone”
IndiGo–র ফ্লাইট বিপর্যয় যে কেবল বিমান পরিষেবাকেই অচল করেছে তা নয়; এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে দেশের পরিবহন কাঠামো কতটা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এক সেক্টরে বিপর্যয় ঘটলে তার চাপ সরাসরি অন্যান্য সেক্টরের ওপর এসে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় রেলওয়ে একপ্রকার দেশের পরিবহন ব্যাকবোন হিসেবে কাজ করেছে।
এই অংশে আমরা আলোচনা করব—রেলের এই ‘জরুরি দায়িত্ব পালন’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং কীভাবে এটি যাত্রীসাধারণের আস্থা বজায় রেখেছে।
IndiGo বাতিলের ফলে কিছু বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল—
বিমান ভাড়া বাড়ার কারণে বহু মধ্যবিত্ত যাত্রীর পক্ষে ভ্রমণ অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রেল একটি স্বল্প–মূল্যের বিকল্প তৈরি করে।
ফ্লাইট বাতিল হলে কীভাবে বাড়ি ফিরতে হবে—যাত্রীরা জানতেন না।
রেল পরিষ্কার নির্দেশনা, ট্রেন স্ট্যাটাস, টিকিট বুকিং হেল্পডেস্ক—সবই দ্রুত দেয়।
হাজার হাজার অফিস কর্মী, প্রতিনিধির মিটিং বাতিল হয়ে যায়।
রেলের বিকল্প ব্যবহার করে তাঁদের অনেকেই নির্ধারিত শহরে পৌঁছতে পারেন।
যেসব রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছতে চাইছিলেন, তাঁরা বিশেষ করে রেল পরিষেবার ওপর নির্ভর করেছিলেন।
বহু ছাত্র–ছাত্রী পরীক্ষার সময় আটকা পড়েছিলেন। রেলের বিশেষ ট্রেন তাঁদের যাত্রা সহজ করে।
রেল যেভাবে এই সমস্যাগুলি লাঘব করেছে, তা যাত্রী–স্বার্থ রক্ষায় বিরল দৃষ্টান্ত।
The Hindu–এর প্রতিবেদন অনুসারে বেশ কিছু যাত্রী তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন:
“বেঙ্গালুরু থেকে হায়দরাবাদ যাওয়ার ফ্লাইট দু’বার বাতিল হয়। পরে রেল টিকিট পাই। রেলের বিশেষ ট্রেনই আমাকে সময়মতো পৌঁছে দেয়।”
“বিমানবন্দরে রাত কাটানোর চেয়ে ট্রেনের মধ্যে ওঠা অনেক নিরাপদ ও আরামদায়ক।”
“ফ্লাইট বাতিল হলে আমরা ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। রেলের সাহায্য না পেলে কী যে করতাম!”
এই প্রতিক্রিয়াগুলি দেখাচ্ছে—রেলের উদ্যোগ কেবল ভ্রমণকে সহজই করেনি, বরং মানুষের মনেও নিরাপত্তা ও ভরসার অনুভূতি তৈরি করেছে।
বিমানবন্দরে অনেক যাত্রীর লাগেজ আটকে গিয়েছিল।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায়—
লাগেজ ফেরত পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
ভুল লাগেজ চলে যাওয়া
চিহ্নিতকরণে সমস্যা
এই অবস্থায় রেল যাত্রীদের জন্য একটি বিশেষ সুবিধা দেয়—
“লাগেজ কনফার্মেশন সার্ভিস”
যাত্রীরা জানাতে পারতেন—
তাঁরা লাগেজ ছাড়া ভ্রমণ করছেন
গন্তব্যে পৌঁছনোর পর বিমানবন্দরের লাগেজ কাউন্টার থেকে সংগ্রহ করবেন
এর ফলে বহু যাত্রীর ভ্রমণ দ্রুত হয়।