Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রামধনুর ঝলক ডাইনোসর যুগের জীবাশ্মে! রসায়নবিদদের গবেষণায় মিলল রহস্যের সমাধান

ডাইনোসরদের সঙ্গেই বিলুপ্ত হয়েছিল এই বিস্ময়কর সামুদ্রিক প্রাণীগুলি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের কিছু জীবাশ্ম আজও রামধনুর মতো ঝলমল করে! কীভাবে কোটি বছরের পুরোনো জীবাশ্মে এমন রঙের খেলা সম্ভব? রসায়নবিদদের সাম্প্রতিক গবেষণায় অবশেষে উন্মোচিত হল সেই চমকপ্রদ রহস্য।

ডাইনোসর যুগের জীবাশ্মে রামধনুর রঙ: উন্মোচিত হল কোটি বছরের রত্ন-রহস্য

প্যারিসের লুভ্‌র জাদুঘর থেকে চুরি যাওয়া রত্নের রহস্য এখনও অমীমাংসিত। তবে বিজ্ঞানীরা এবার উন্মোচন করলেন এক ভিন্নধর্মী রত্ন-রহস্য—যার সৌন্দর্য কোনও হীরক বা পান্নার নয়, বরং কোটি বছর পুরনো এক জীবাশ্মের। ডাইনোসর যুগের এই সামুদ্রিক প্রাণীর খোলস আজও রামধনুর সাতরঙে ঝলমল করে, যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক শিল্পকর্ম। এতদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ভাবছিলেন, কীভাবে এত পুরনো জীবাশ্মে এমন উজ্জ্বল রঙ টিকে থাকে? এর পেছনে কি খনিজ, না কি কোনও অজানা জৈব উপাদান কাজ করছে? অবশেষে রসায়নবিদদের আধুনিক গবেষণায় জানা গেল, রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে খোলসের সূক্ষ্ম গঠনে—অ্যারাগনাইট নামের এক খনিজ স্তরে। আলো যখন সেই স্তরে পড়ে, তখন তার প্রতিফলনেই সৃষ্টি হয় এই রামধনুর মতো রঙিন ঝলক। কোটি বছর আগের সেই প্রাণীর অবশিষ্ট খোলস আজও তাই মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি নিজেই এক অসাধারণ শিল্পী, যার তুলির আঁচড়ে সময়ের পাতায় রয়ে গেছে রঙের অনন্ত খেলা।


 কোটি বছরের পুরনো সামুদ্রিক প্রাণী: অ্যামোনাইট

ডাইনোসরদের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছিল পৃথিবীর নানা বিস্ময়কর প্রাণী। তাদেরই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হল অ্যামোনাইট, এক প্রাগৈতিহাসিক সামুদ্রিক প্রাণী, যাদের দেহ ছিল শামুকের মতো সর্পিল খোলসে ঢাকা। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে, ডাইনোসরদের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই অ্যামোনাইটেরও পৃথিবী থেকে প্রস্থান ঘটে।

তবুও, প্রকৃতি যেন তাঁদের এক অমর স্মারক রেখে গিয়েছে — তাদের জীবাশ্ম, যার মধ্যে কিছুতে দেখা যায় রামধনুর মতো ঝলমলে রঙের খেলা। এই উজ্জ্বল খোলসগুলিই আজ পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান জৈবিক রত্ন, যাদের বলা হয় অ্যামোলাইট (Ammolite)


 জীবাশ্ম না রত্ন? অ্যামোলাইটের বিস্ময়

অ্যামোলাইট আসলে এক বিশেষ ধরণের অ্যামোনাইটের খোলস, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চুনাপাথর ও খনিজের স্তরে পরিণত হয়েছে। কোটি বছর ধরে পৃথিবীর ভেতরে থেকে এই খোলসগুলি রূপান্তরিত হয়েছে এক উজ্জ্বল, বহু-বর্ণের রত্নে। কখনও তা সবুজ, কখনও নীল, আবার কখনও রক্তিম আলোয় ঝলমল করে ওঠে।

এই খনিজ রূপান্তরের ফলেই অ্যামোলাইট আজ শুধু বিজ্ঞান নয়, রত্নবিজ্ঞান এবং অলঙ্কার শিল্পেরও এক বিস্ময়। কানাডার অ্যালবার্টা প্রদেশের রকি পর্বতমালা ও সেন্ট মেরি নদীর ধারে এই অ্যামোলাইট সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। সেখানকার মাটিতেই লুকিয়ে রয়েছে কোটি বছরের ইতিহাস, যা প্রতিদিন খননের মাধ্যমে নতুন রহস্য প্রকাশ করছে।


 গবেষণার সূত্র: জাপানের কেইয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা

জাপানের কেইয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ অধ্যাপক হিরোকি ইমাই এবং তাঁর দল সম্প্রতি এই রামধনু-জীবাশ্ম নিয়ে এক গভীর গবেষণা চালান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই — বোঝা, কেন শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট অ্যামোনাইট জীবাশ্মেই এমন উজ্জ্বল রঙের প্রতিফলন দেখা যায়, অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে তা অনেক কম বা অনুপস্থিত।

এই গবেষণায় তাঁরা বিশ্লেষণ করেন কানাডা ও মাদাগাস্কার থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন অ্যামোনাইট জীবাশ্মের খোলস, এবং তুলনা করেন আজও জীবিত দুই সামুদ্রিক প্রাণীর সঙ্গে — অ্যাবালননটিলাস। অ্যাবালন মূলত পূর্ব এশিয়ার উপকূলে পাওয়া এক প্রজাতির ঝিনুক জাতীয় প্রাণী, যা খাবার হিসেবেও জনপ্রিয়। অন্যদিকে, নটিলাসকে বলা হয় "living fossil" — কারণ কোটি বছরেও এর শরীরের গঠন প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।


 রহস্যের চাবিকাঠি: অ্যারাগনাইট স্তর

সব নমুনার খোলসের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন এক সাধারণ উপাদান — অ্যারাগনাইট (Aragonite), যা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের এক স্ফটিক রূপ। শামুক, ঝিনুক ও মুক্তোর খোলস তৈরিতেও এই খনিজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অ্যারাগনাইট স্তরই জীবাশ্মের রঙের মূল চাবিকাঠি।

গবেষণায় দেখা যায়, কানাডার উজ্জ্বল অ্যামোলাইটে অ্যারাগনাইটের স্তরের মধ্যে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ফাঁক বা ছিদ্র রয়েছে, যেগুলির প্রতিটি প্রায় চার ন্যানোমিটার প্রশস্ত এবং সমান দূরত্বে বিন্যস্ত। এই ছিদ্রগুলির কারণেই আলো পড়লে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতিফলন ঘটে, যা মানুষের চোখে রামধনুর রঙ হিসেবে প্রতিভাত হয়।


 আলোর খেলা কীভাবে ঘটে?

ইমাই ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে, জীবাশ্মের খোলসের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফাঁক বা ছিদ্রগুলির বিন্যাসই এর রঙের আসল রহস্য। এই ফাঁকগুলির আকার ও ব্যবধান নির্ধারণ করে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত হবে। যখন সূর্যের আলো সেই ন্যানোমিটার স্তরে আঘাত করে, তখন আলো বিভাজিত হয়ে বিভিন্ন রঙে প্রতিফলিত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বিজ্ঞানীরা বলেন Structural Coloration — অর্থাৎ এমন রঙ যা রঞ্জক নয়, বরং গঠনের কারণেই তৈরি হয়। প্রকৃতিতে এই ধরনের রঙ আমরা দেখি প্রজাপতির ডানায়, ময়ূরের পালকে বা কিছু গিরগিটির ত্বকে।

তবে সব জীবাশ্মেই এই উজ্জ্বলতা দেখা যায় না। গবেষকরা জানাচ্ছেন, মাদাগাস্কারের অ্যামোনাইট বা অ্যাবালনের খোলসে এই ছিদ্রগুলির ব্যবধান কানাডার জীবাশ্মের তুলনায় ভিন্ন। ফলে সেখানে আলোর প্রতিফলন কম হয়, রঙও তেমন দীপ্ত নয়। কানাডার অ্যামোলাইট নামের এই অ্যামোনাইট জীবাশ্মেই দেখা যায় সবচেয়ে উজ্জ্বল রামধনু রঙের খেলা—যা কোটি বছর ধরে টিকে রয়েছে প্রকৃতির এক অনবদ্য গঠনের কারণে। এভাবেই বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, সময়ের স্রোতেও প্রকৃতির নকশা কখনও ফিকে হয় না।

news image
আরও খবর

 রসায়ন ও প্রকৃতির মেলবন্ধন

এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি ‘Scientific Reports’ নামের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক ইমাই বলেন,

“অ্যামোলাইটের উজ্জ্বল রঙ কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ও প্রাণীজ জৈব রসায়নের এক অভূতপূর্ব মিশ্রণ। এটি প্রকৃতির এক জীবন্ত শিল্পকর্ম।”

এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, পৃথিবীর ভূত্বক, তাপমাত্রা, খনিজ এবং সময়ের দীর্ঘ প্রভাব মিলেই এই রঙিন সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ, অ্যামোলাইট শুধু জীবাশ্ম নয় — এটি প্রকৃতির তুলি দিয়ে আঁকা এক চিত্রকর্ম।


 ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

গবেষকরা আরও জানান, কানাডার আলবার্টা অঞ্চলের ভূস্তরে অ্যামোনাইটের জীবাশ্মগুলি বহু বছর ধরে নির্দিষ্ট চাপে এবং খনিজ-সমৃদ্ধ মাটির সংস্পর্শে থেকেছে। এতে ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের স্তরে পরিবর্তন এসেছে, এবং আলো প্রতিফলনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কারণেই ওই অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে উজ্জ্বল অ্যামোলাইট পাওয়া যায়।

অন্যদিকে, মাদাগাস্কারের জীবাশ্মগুলি অপেক্ষাকৃত কম চাপে ও ভিন্ন খনিজ উপাদানে সংরক্ষিত থাকায় তাতে রঙের তীব্রতা কম দেখা যায়।


 বিজ্ঞান থেকে বাজার: অ্যামোলাইটের বাণিজ্যিক গুরুত্ব

আজ অ্যামোলাইট শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার নয়, রত্ন ব্যবসারও এক মূল্যবান সম্পদ। এর অনন্য রঙ ও উজ্জ্বলতা একে মুক্তো, পান্না বা ওপাল থেকেও আলাদা করে তোলে। রত্নবিশ্বে এটি "Gemstone of the New Age" নামে পরিচিত।

বিশেষত জাপান, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে অ্যামোলাইটের চাহিদা বিপুল। অনেকে বিশ্বাস করেন, এই রত্ন ইতিবাচক শক্তি ও মানসিক শান্তি প্রদান করে। ফেং শুইতেও অ্যামোলাইটকে শুভ শক্তির উৎস হিসেবে ধরা হয়।


 বিজ্ঞান যা জানাল

গবেষণার সারমর্ম অনুযায়ী, জীবাশ্মের উজ্জ্বল রঙ কোনও জৈব রঞ্জক বা পিগমেন্টের কারণে নয়, বরং সম্পূর্ণই ভৌত কাঠামো ও আলোর প্রতিফলনের ফল
এই আবিষ্কার কেবল অ্যামোলাইট নয়, অন্য প্রাকৃতিক পদার্থের রঙ-বিকিরণ বোঝাতেও নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।


 প্রকৃতির হাতে তৈরি শিল্প

যখন কোটি বছর আগের কোনও প্রাণীর খোলস আজও রামধনুর মতো ঝলমল করে, তখন তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় — প্রকৃতি নিজেই এক শিল্পী, আর সময় তার ক্যানভাস। অ্যামোলাইট সেই শিল্পেরই এক জীবন্ত নিদর্শন, যেখানে রসায়ন, ভূতত্ত্ব এবং জীববিজ্ঞানের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয়েছে এক অপূর্ব রঙিন জগৎ।


 উপসংহার

ডাইনোসরের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হলেও, অ্যামোনাইট পৃথিবীকে দিয়েছে এমন এক উপহার যা সময়ের সীমা পেরিয়ে আজও বিস্মিত করে বিজ্ঞানী ও শিল্পী উভয়কেই।
অ্যামোলাইট প্রমাণ করে দেয়, মৃত্যু কখনও শেষ নয় — বরং তা নতুন রূপে সৌন্দর্যের জন্ম দেয়।
যে খোলস একদিন সমুদ্রের তলায় হারিয়ে গিয়েছিল, আজ সে-ই হয়ে উঠেছে পৃথিবীর রঙিন ইতিহাসের এক দীপ্ত প্রতীক

Preview image