Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রাতের অন্ধকারে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব, বর্ধমানের বর্ণিলপুরে একের পর এক চারচাকা গাড়ির কাঁচ ভাঙচুর

বর্ধমান শহরের বর্ণিল পুর এলাকায় গভীর রাতে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব। পার্কিং করা একাধিক চারচাকা গাড়ির কাঁচ ভেঙে আতঙ্ক ছড়াল অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা।

স্থানীয় সংবাদ

বর্ধমান শহরে রাতের অন্ধকারে দুষ্কৃতীদের দাপট: বর্ণিল পুর এলাকায় আতঙ্ক, একের পর এক চার চাকা গাড়ির কাঁচ ভেঙে চুরমার

বর্ধমান শহরের শান্তিপ্রিয় পরিবেশে এক ভয়াবহ রাতের ঘটনা শহরবাসীর মনে গভীর আতঙ্কের ছাপ ফেলেছে। গভীর রাতে, যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক সেই সময় বর্ধমানের বর্ণিল পুর এলাকায় দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পার্কিং করা একের পর এক চার চাকা গাড়ির কাঁচ ভেঙে চুরমার করে দেয় অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতীরা। এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ ছড়িয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে চরম ভয় ও অনিশ্চয়তা।

গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, রাত আনুমানিক ২টা থেকে ৪টার মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটে। বর্ণিল পুর এলাকার বেশ কয়েকটি আবাসিক গলিতে সারি সারি গাড়ি পার্ক করা ছিল। রাতের নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা এলাকায় ঢুকে পড়ে এবং পরিকল্পিতভাবে একের পর এক গাড়ির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে। প্রথমে জানালার কাঁচ, তারপর কোথাও কোথাও সামনের উইন্ডশিল্ড পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়।

অনেক গাড়ির ভিতরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী—যেমন ব্যাগ, কাগজপত্র, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ—তছনছ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ। যদিও সব গাড়ি থেকে চুরি হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে দুষ্কৃতীদের উদ্দেশ্য যে শুধু ভাঙচুর নয়, বরং চুরিও ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

সকালে উঠে আতঙ্কিত গাড়ির মালিকরা

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বহু মানুষই নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলির ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে ছিল চারদিকে। কোনও গাড়ির দরজার কাঁচ নেই, কোনওটির সামনের কাঁচ পুরোপুরি চুরমার। অনেক গাড়ির ভিতরে ঢুকে আসন ও ড্যাশবোর্ড এলোমেলো করে রাখা হয়েছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“আমরা রাতে কোনও আওয়াজ পাইনি। সকালে উঠে দেখি আমার গাড়ির ডান দিকের কাঁচ পুরো ভাঙা। শুধু আমারই নয়, আশেপাশে অন্তত ১০-১২টা গাড়ির একই অবস্থা। এটা ভীষণ ভয়ের ব্যাপার।”

আর এক গাড়ির মালিক জানান,
“এই এলাকাটা এতদিন নিরাপদ বলেই পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন আর সেই নিশ্চয়তা নেই। রাতে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”

কতগুলি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, তদন্তে পুলিশ

প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, অন্তত ১৫ থেকে ২০টি চার চাকা গাড়ি এই ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। তবে পুলিশি তদন্তে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর পেয়ে বর্ধমান থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় এবং এলাকাটি ঘিরে তদন্ত শুরু করে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আশেপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুষ্কৃতীরা কোন দিক দিয়ে এলাকায় ঢুকেছে, কতজন ছিল, তারা হেঁটেই নাকি বাইকে এসেছিল—সব দিক খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। যদিও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

এক পুলিশ আধিকারিক জানান,
“ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”

প্রশ্নের মুখে শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বর্ধমান শহরের রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। বর্ণিল পুর এলাকা শহরের একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও পরিচিত আবাসিক এলাকা। সেখানে এমন দুষ্কৃতীমূলক ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

অনেকেরই অভিযোগ, রাতে নিয়মিত পুলিশ টহল থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে গভীর রাতে পুলিশের উপস্থিতি খুব কম বলেই দাবি স্থানীয়দের। কেউ কেউ আবার বলছেন, পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট না থাকায় দুষ্কৃতীরা সহজেই অন্ধকারের সুযোগ নিতে পেরেছে।

একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন,
“শহরের মধ্যে এমন ঘটনা হলে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ, সেটা ভেবে ভয় লাগছে। রাতে টহল বাড়ানো দরকার।”

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

news image

ঘটনার পর শহরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে। কেউ কেউ প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন, আবার কেউ শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠনের সদস্য জানান,
“এটা শুধু গাড়ি ভাঙার ঘটনা নয়, এটা শহরের নিরাপত্তার উপর আঘাত। আজ গাড়ি, কাল হয়তো বাড়ি বা মানুষও আক্রান্ত হতে পারে।”

ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক যন্ত্রণা

এই ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। একটি গাড়ির কাঁচ বদলাতে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে কয়েক দশ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তার উপর অনেকের গাড়ি বীমার আওতায় না থাকায় পুরো খরচটাই নিজেদের পকেট থেকে দিতে হবে।

শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানসিক দিক থেকেও মানুষ বিপর্যস্ত। রাতের অন্ধকারে এমন নির্বিচারে ভাঙচুর ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পুলিশের আশ্বাস, বাড়ানো হবে নজরদারি

ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, এলাকায় রাতের টহল বাড়ানো হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।

পুলিশের এক আধিকারিক জানান,
“শহরবাসীর নিরাপত্তাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এই ঘটনার পর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।”

শহরবাসীর প্রত্যাশা

সব মিলিয়ে, বর্ধমান শহরের বর্ণিল পুর এলাকায় রাতের অন্ধকারে দুষ্কৃতীদের এই তাণ্ডব শহরের মানুষকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শহরবাসীর আশা—এই ঘটনার থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও মজবুত হবে, যাতে বর্ধমান আবারও তার শান্ত ও নিরাপদ শহরের পরিচয় ফিরে পায়। 

এই ঘটনার পর শহরবাসীর মধ্যে শুধু আতঙ্কই নয়, ক্ষোভও ক্রমশ বাড়ছে। অনেকেরই প্রশ্ন, শহরের ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কীভাবে রাতের পর রাত এ ধরনের দুষ্কৃতী কার্যকলাপ ঘটে যেতে পারে, অথচ তা আগে থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় না। নাগরিকদের মতে, অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল নজরদারির অভাব এবং অপরাধের পর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘাটতি। ফলে প্রশাসনের কাছ থেকে কেবল আশ্বাস নয়, বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চাইছেন তাঁরা।

বিশেষ করে বর্ণিল পুরের মতো আবাসিক এলাকায় নিয়মিত রাতের টহল বাড়ানোর দাবি উঠেছে জোরালোভাবে। অনেক বাসিন্দার মত, পুলিশি ভ্যান বা বাইক টহল যদি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এলাকায় ঘোরে, তাহলে দুষ্কৃতীরা এমন কাজ করার আগে বহুবার ভাবতে বাধ্য হবে। পাশাপাশি, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং অকেজো স্ট্রিট লাইট দ্রুত সারানোর দাবিও জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অন্ধকারই যে অপরাধীদের সবচেয়ে বড় সহায়, তা এই ঘটনায় আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের দিকেই তাকিয়ে না থেকে, অনেকেই নিজেদের দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে শুরু করেছেন। কিছু আবাসিক সংগঠন ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পাড়ায় পাড়ায় যৌথভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে এবং রাতের দিকে স্বেচ্ছাসেবী নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে একদিকে যেমন অপরাধের আশঙ্কা কমবে, তেমনই কোনও সন্দেহজনক গতিবিধি দ্রুত প্রশাসনের নজরে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

এ ছাড়াও শহরের নাগরিক সমাজ চাইছে, এই ঘটনার তদন্ত যেন কোনওভাবেই ঢিলেমি না হয়। দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে তা ভবিষ্যতে অপরাধ দমনে বড় ভূমিকা নেবে বলে মত সাধারণ মানুষের। কারণ একবার অপরাধীরা বুঝে গেলে যে আইনের হাত শক্ত এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তখন এ ধরনের তাণ্ডব চালানোর সাহস তারা আর সহজে দেখাতে পারবে না।

সবশেষে বলা যায়, বর্ধমান শহরের মানুষ আজ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছেন। আতঙ্কের আবহে থেকেও তাঁদের প্রত্যাশা একটাই—প্রশাসন, পুলিশ ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও শক্তপোক্ত করবে। যাতে ভবিষ্যতে রাতের অন্ধকার আর দুষ্কৃতীদের সাহসের আড়াল হয়ে উঠতে না পারে, আর বর্ধমান শহর আবারও নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ নগরজীবনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। 

Preview image