Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রামের তিরে রাবণের চোখে গুরুতর আঘাত উত্তরপ্রদেশে ভন্ডুল রামলীলা ঘিরে থানায় অভিযোগ

আক্রান্তের দাবি রামের তিরে চোখ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাহায্যের জন্য বারবার আয়োজক ও অভিযুক্তের কাছে গেলেও কেউ পাশে দাঁড়াননি। আর্থিক সহায়তাও মেলেনি।

রামলীলার পালা চলছিল। চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। ঢাক, কাঁসর, করতালের তালে তালে দর্শকেরা আনন্দে মেতে উঠেছিলেন। মঞ্চের সামনে বসে থাকা মানুষজন হাততালিতে ফেটে পড়ছিলেন। ধর্মীয় আবেশে ভরে উঠেছিল গোটা এলাকা। মঞ্চে তখন মুখোমুখি দুই চরিত্র রাম এবং রাবণ। পৌরাণিক যুদ্ধের দৃশ্য মঞ্চস্থ হচ্ছিল নিখুঁত ছন্দে। ঠিক সেই সময়েই ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তের মধ্যে বদলে দেয় গোটা পরিবেশ।

রামের চরিত্রে অভিনয় করা যুবক নৈতিক পাণ্ডে যুদ্ধের দৃশ্যে প্রতীকী তির ছোড়েন। পরিকল্পনা ছিল তিরটি রাবণের মুকুটে লাগবে। কিন্তু মুহূর্তের ভুলে সেই তির গিয়ে সজোরে লাগে রাবণের চরিত্রে অভিনয় করা সুনীল কুমারের চোখে। তির বিঁধতেই আর্তনাদ করে উঠেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরেন এবং মঞ্চের উপরেই বসে পড়েন। দর্শকেরা প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোঝা যায় ঘটনাটি নিছক অভিনয়ের অংশ নয়, বরং ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

বন্ধ করে দেওয়া হয় পালা। আনন্দ আর ভক্তির পরিবেশ মুহূর্তে আতঙ্কে বদলে যায়। দর্শকদের মধ্যে শুরু হয় চাঞ্চল্য। কেউ কেউ মঞ্চের দিকে ছুটে যান। কেউ আবার হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। রামলীলার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এমন দুর্ঘটনা কেউ কল্পনাও করেননি।

ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরপ্রদেশের সোনভদ্র জেলার শাহগঞ্জ এলাকায়। গত বছরের নভেম্বর মাসে এই রামলীলার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আয়োজক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন রামস্নেহী সিংহ। বহু বছর ধরে ওই এলাকায় নিয়মিত রামলীলার আয়োজন করা হয় বলে জানা গিয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে এই অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে।

সেই অনুষ্ঠানে রামের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নৈতিক পাণ্ডে নামে এক যুবক। আর রাবণের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন সুনীল কুমার। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি স্থানীয় নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন। ঘটনার সময় যুদ্ধের দৃশ্য চলছিল। তিরটি রাবণের মুকুটে লাগার কথা থাকলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তা সরাসরি গিয়ে লাগে সুনীলের চোখে।

দুর্ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে আহত সুনীলকে নিয়ে তেমন কোনও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি বলেই অভিযোগ। তাঁর দাবি, তির লাগার সঙ্গে সঙ্গে চোখে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। ঝাপসা দেখতে শুরু করেন তিনি। রক্তপাতও হয় বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু মঞ্চে উপস্থিত আয়োজক কিংবা অভিযুক্ত যুবক কেউই তাঁকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেননি।

সুনীলের অভিযোগ, ঘটনার পর তিনি একাধিকবার আয়োজক রামস্নেহী সিংহ এবং নৈতিক পাণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। চিকিৎসার খরচ এবং আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন জানান। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কেউ সাহায্যের হাত বাড়াননি। বরং তাঁর অভিযোগ, সাহায্য চাইতে গেলে তাঁকে অবমাননাকর মন্তব্য শুনতে হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একাধিকবার তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। সুনীলের দাবি, সাহায্য চাইলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। তাঁকে বলা হয় বেশি কথা বললে ফল ভালো হবে না। এই হুমকির জেরেই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি চুপ ছিলেন বলে অভিযোগ।

ঘটনাটি ঘটার প্রায় দু মাস পেরিয়ে গেলেও তখন পর্যন্ত কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। সম্প্রতি থানায় অভিযোগ দায়ের করার পরই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ দায়ের হতেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে রামলীলার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা যথাযথ ছিল।

সুনীলের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর তিনি পুলিশের কাছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি। তাঁর দাবি, থানায় গিয়ে পুরো ঘটনার বিবরণ দেওয়ার পরও পুলিশ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। কোনও লিখিত অভিযোগ তখন গ্রহণ করা হয়নি। চিকিৎসা সংক্রান্ত সহায়তার বিষয়েও কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি।

পুলিশের এই ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সুনীল। তাঁর বক্তব্য, যদি প্রথম থেকেই অভিযোগ গ্রহণ করা হত, তাহলে হয়তো তিনি সময়মতো ন্যায়বিচার পেতেন। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেত।

শেষ পর্যন্ত সম্প্রতি সুনীলের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করেছে পুলিশ। রামলীলার আয়োজক রামস্নেহী সিংহ এবং রামের চরিত্রে অভিনয় করা নৈতিক পাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

এই ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মঞ্চ নাটক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। বিশেষ করে যেখানে অস্ত্রের প্রতীকী ব্যবহার করা হয়, সেখানে কি পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। কাঠ বা ধাতব তির ব্যবহারের আগে প্রশিক্ষণ এবং সুরক্ষা যাচাই কতটা জরুরি, তা নিয়ে আলোচনার দাবি উঠেছে।

news image
আরও খবর

স্থানীয়দের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ধরনের পালায় অনেক সময় অভ্যাসের বশে নিরাপত্তাকে হালকাভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু এই দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সামান্য অবহেলাও কত বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে সুনীলের পরিবারও এই ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁদের দাবি, চোখের আঘাতের কারণে সুনীল এখন ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবার চরম আর্থিক সমস্যার মুখে পড়েছে। অথচ যে অনুষ্ঠানের মঞ্চে তিনি আহত হলেন, সেই অনুষ্ঠানের আয়োজকের কাছ থেকেই কোনও সহানুভূতি বা সাহায্য পাননি।

রামলীলার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িয়ে থাকে। সেই আবেগের আড়ালে যদি অবহেলা বা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা লুকিয়ে থাকে, তবে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ। এখন সকলের নজর পুলিশের তদন্তের দিকে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আদৌ কি আক্রান্ত ব্যক্তি ন্যায়বিচার পাবেন, সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সোনভদ্র জুড়ে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়। এটি দায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং মানবিকতার প্রশ্নও তুলে ধরছে। ধর্মীয় আবেশের মঞ্চে ঘটে যাওয়া এই রক্তাক্ত অধ্যায় দীর্ঘদিন মানুষের মনে দাগ কেটে থাকবে।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে রামলীলার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে। বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের পালা গ্রামগঞ্জ থেকে শহরের মঞ্চে আয়োজিত হয়ে আসছে। দর্শকদের কাছে তা শুধু বিনোদন নয়, ধর্মীয় অনুভূতিরও অংশ। কিন্তু সেই আবেগের ভিড়েই যদি নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়িত্ব উপেক্ষিত হয়, তবে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত একাধিক মানুষ জানিয়েছেন, মঞ্চে প্রতীকী অস্ত্র ব্যবহার করার আগে পর্যাপ্ত মহড়া এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তির ধনুকের মতো সরঞ্জাম যদি শক্ত উপাদান দিয়ে তৈরি হয়, তবে সামান্য ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। অথচ গ্রামীণ বা স্থানীয় রামলীলার পালায় এই বিষয়গুলো অনেক সময় অবহেলিত থাকে।

এই ঘটনায় আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে সামাজিক আচরণ নিয়ে। সুনীলের দাবি অনুযায়ী, আহত হওয়ার পর সাহায্য চাইতে গেলে তাঁকে অবমাননাকর মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। বিষয়টি যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু আইনি অপরাধই নয়, মানবিক দিক থেকেও গভীর উদ্বেগের।

স্থানীয়দের একাংশের মতে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজকদের দায়িত্ব শুধু অনুষ্ঠান সফল করা নয়। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে আহত ব্যক্তির চিকিৎসা ও সুরক্ষার দায়িত্বও তাঁদেরই নিতে হয়। কিন্তু এই ঘটনায় সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টাও দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুনীলের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার পর থানায় গিয়ে অভিযোগ জানালেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ববোধ নিয়েও। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে একটাই দাবি উঠছে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা যেন আর না ঘটে। তার জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট নির্দেশিকা এবং কড়াকড়ি নিরাপত্তা বিধি। বিশেষ করে যেখানে নাটক বা পালার মধ্যে যুদ্ধের দৃশ্য থাকে, সেখানে শিশু বা অনভিজ্ঞ অভিনেতাদের দিয়ে বিপজ্জনক সরঞ্জাম ব্যবহার করানো কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সুনীলের পরিবার এখন শুধু ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তাঁদের আশা, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য সামনে আসবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁরা চান, এই ঘটনার মাধ্যমে প্রশাসন এবং আয়োজকেরা শিক্ষা নিক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও শিল্পী বা অভিনেতাকে এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে না হয়।

ধর্মীয় বিশ্বাসের মঞ্চে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা মানুষের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ভক্তি আর আবেগের আড়ালে দায়িত্বহীনতা থাকলে তার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এখন দেখার, তদন্ত শেষে এই ঘটনার পরিণতি কোন পথে যায় এবং আদৌ কি আহত সুনীল ন্যায়বিচার পান।

Preview image