রুক্মিণী মৈত্র নতুন ছবি হাঁটি হাঁটি পা পা র প্রচারে জানালেন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। মায়ের ভালোবাসা, শাসন আর মজা সব মিলিয়ে মা মেয়ের সম্পর্কের সেই টুকরো গল্পই ফুটে উঠেছে তাঁর কথায়।
বাংলা ছবির দুনিয়ায় পারিবারিক আবেগ, সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন আর দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট গল্প খুব কম সময়েই দর্শকের মন জয় করে নিতে পারে। এই ঘরানারই একটি নতুন ছবি ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’, যেখানে মূল আবেগ—বাবা–মেয়ের সম্পর্ক। ২৮ নভেম্বর মুক্তি পেতে চলেছে ছবিটি। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে রুক্মিণী মৈত্রকে, আর তাঁর বাবার ভূমিকায় রয়েছেন অভিজ্ঞ অভিনেতা চিরঞ্জিত। ইতিমধ্যে প্রকাশিত ট্রেলারেই দর্শকদের মধ্যে যথেষ্ট কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ট্রেলারে দেখা যায়, রুক্মিণীর চরিত্রটি বাবাকে শাসনও করে, আবার আদর–যত্নে আগলেও রাখে। বাবা-মেয়ের সম্পর্কের এমন পরিচিত অথচ হৃদয়ছোঁয়া টানাপোড়েন ছবিটির মূল সুর বলেই মনে করছেন অনেকে।
ছবির মুক্তির আগে প্রচারের ব্যস্ততায় এখন চরম ব্যস্ত রুক্মিণী। শহরের একাধিক জায়গায় প্রচার কর্মসূচি, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতা, সামাজিক মাধ্যমে প্রচার—সব মিলিয়ে তাঁর দিনভর দৌড়ঝাঁপ লেগেই আছে। তবে এর মাঝেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি একাধিক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন, যা শুনে হাসিতে ফেটে পড়েছে উপস্থিত সবাই। রুক্মিণী বরাবরই অকপট, অতিরঞ্জনবর্জিত এবং নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে ভালবাসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
প্রচারের একটি অনুষ্ঠানে রুক্মিণীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—ছবিতে যেমন বাবাকে শাসন করতে দেখা যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে বাবা–মায়ের মধ্যে কাকে বেশি বকেন তিনি? প্রশ্নটা শুনেই রুক্মিণী হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “বকে না, মা মারে। এখনও।” তাঁর স্বর ও অভিব্যক্তিতে তখন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল—এটা স্রেফ কোনো মজার মন্তব্য নয়; তাঁর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতারই নির্ভেজাল প্রকাশ।
রুক্মিণীর কথায়, “আমার মা যতটা ভালোবাসতে জানে, ততটাই জানে শাসন করতে। যদি মনে হয় মেয়েকে একটা মারতে হবে, করবে। আমার মায়ের কিছুই যায় আসে না।” নিজের পারিবারিক শাসন–পদ্ধতি নিয়ে এমন অকপট স্বীকারোক্তি সচরাচর সেলিব্রিটিদের মুখে শোনা যায় না। কিন্তু রুক্মিণী যেমন বাস্তব জীবনে সরল ও সোজাসাপটা, তাই তাঁর কথাতেও সেই স্বচ্ছতা স্পষ্ট।
এখানে একটি বড় সামাজিক সত্যও ফুটে ওঠে—বাংলা পরিবারের খুব সাধারণ বাস্তবতা, যেখানে মা–মেয়ের সম্পর্ক কখনো চঞ্চল, কখনো রাগ-অভিমানে ভরা, আবার গভীর মমতায় বাঁধা। এই বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাই শেয়ার করেছেন তিনি, যা দর্শকদের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ সম্পর্ক তৈরি করে দেয়।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা আরও জানতে চান—মেয়ের কাছে মা কি কখনো বকুনি খান? রুক্মিণীর স্পষ্ট উত্তর, “মাকে বকুনি দেওয়ার সাহস আজও আমার নেই।” তাঁর সংযোজন, “আমার মা বাঘিনী। অতটা সাহস কোনোদিন হয়নি, হবেও না।”
এই ‘বাঘিনী’ শব্দটির ব্যবহারে মজাই পেয়েছেন সকলেই। রুক্মিণীর মা–মেয়ে সম্পর্কের বর্ণনায় শ্রদ্ধা, মমতা, ভয়, ভালোবাসা—সব কিছুর সংমিশ্রণ রয়েছে। তাঁর কণ্ঠে মাকে ‘বাঘিনী’ বলা কোনো নেতিবাচক ইঙ্গিত নয়; বরং স্নেহ–ভরা, দুষ্টুমি করে বলা এক affectionate nickname। ঠিক যেমন অনেকেই বাড়িতে বাবাকে ‘হাতুড়ি’, মাকে ‘বাঘমামা’ বা দাদুকে ‘সেনাপতি’ বলে মজা করেন।
তবে এখানেই থেমে যান না রুক্মিণী। একটু লাজুক হাসি হেসে যোগ করেন, “তবে হ্যাঁ, আজকাল মা মাঝে মাঝে আমার কাছেও বকা খায়।” তাঁর মুখে এই অর্ধ-ঠাট্টা, অর্ধ-স্বীকারোক্তি শুনে অনুষ্ঠানস্থলে হাসির রোল পড়ে।
রুক্মিণী পরবর্তীতে বলেন—বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় সন্তানই বাবা–মায়ের অভিভাবকে পরিণত হয়। বিশেষত ব্যস্ত জীবনে যখন মা–বাবার নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা দেখা যায়, তখন সন্তানই তাঁদের দেখে রাখতে চায়।
রুক্মিণীর কথায়, “আমার মা নিজের যত্ন সবসময় নেয় না। তখন আমার ভয় করে—কেনো তুমি নিজের খেয়াল রাখছ না? সেই চিন্তা থেকেই রাগ হয়, বকিও দিই।” তাঁর এই বক্তব্য শুধু সেলিব্রিটিদের জীবন নয়, প্রতিটি মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবারেরই প্রতিচ্ছবি। অনেক সন্তানই আজ সেই অবস্থায় থাকে—নিজের ক্যারিয়ার সামলানোর পাশাপাশি মায়ের ও বাবার স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা, বার বার বলা ‘ওষুধ খেয়েছ?’ বা ‘এত রাত পর্যন্ত জেগে থেকো না’—এসবই আজকের প্রজন্মের বাস্তবতা।
এই প্রসঙ্গে অভিনেত্রী আরও বলেন, “আমরা যত বড় হই, তত দেখছি বাবা–মায়ের ওপর দায়িত্ব আসে। ছোটবেলায় তাঁরা আমাদের হাত ধরে চলতে শিখিয়েছেন, এখন তাঁদেরই হাত ধরা প্রয়োজন হয়।” এই মানবিক কথাগুলো তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যেন অদ্ভুতভাবে মিল খুঁজে দেয়।
রুক্মিণী আরও জানান, তাঁর নিজের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ছবির চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই মিলে যায়। ছবিতে তাঁর চরিত্র বাবাকে মাঝে মাঝে বকেও, আবার খুব যত্নে আগলেও রাখে। বাবা-মেয়ের সম্পর্কের এই মিশ্র আবেগ—অভিমান, ভালোবাসা, মমতা, দায়িত্ব—সবই চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রে।
ট্রেলারে দেখা যায়, চিরঞ্জিতের চরিত্রটি এক ধরনের মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—হয়তো বয়সের কারণে, অথবা জীবনের কোনো দুঃসময় থেকে। আর সেই কঠিন সময়ে মেয়ে হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ান রুক্মিণী—হালকা বকুনি, কিছুটা তিরস্কার, আবার গভীর আদরে বাবাকে আগলে রাখা—সব মিলিয়ে একটি পারিবারিক সম্পর্কের নরম–কঠিন অংশগুলি বাস্তবের মতোই তুলে ধরা হয়েছে।
পরিচালকের মতে, বাংলা সিনেমায় বাবা–মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে অনেক ছবি হলেও ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ তাতে নতুনত্ব এনেছে তার উপস্থাপনায়। এখানে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক শুধুমাত্র স্নেহময় নয়; বরং সম্পর্কের ভিতর লুকিয়ে থাকা vulnerability-ও দেখা যাবে। মেয়ের কাছে বাবা কখনো শক্তিশালী, কখনো শিশুসুলভ, কখনো পরিণত, আবার কখনো ভঙ্গুর—এই বহুমাত্রিক দিকগুলোই রুক্মিণী ও চিরঞ্জিতের অভিনয়ে উঠে এসেছে।
চিরঞ্জিত ও রুক্মিণীর জুটি বাংলা ছবিতে বিরল। বয়সের বিশাল ফারাক, অভিজ্ঞতার পার্থক্য, অবস্থানের ভিন্নতা—সব মিলিয়ে এই দুজনের একসঙ্গে স্ক্রিনে হাজির হওয়া দর্শকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা বটে। রুক্মিণী নিজেও বলেছেন, “চিরঞ্জিত স্যার আমার কাছে শুধু অভিনেতা নন, সিনেমার একটা প্রতিষ্ঠান। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি—শুটিংয়ের শৃঙ্খলা, সংলাপ বলার স্টাইল, আবেগ প্রকাশের সূক্ষ্মতা—সবই এক অভিজ্ঞতা।”
অন্যদিকে, চিরঞ্জিতও রুক্মিণীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ছবির প্রচারে তিনি বলেছিলেন, “রুক্মিণী নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত রাখে, সেটা খুব প্রশংসনীয়। ওর কাজের প্রতি নিষ্ঠা রয়েছে। এই ছবিতে ওকে দেখে আমার ভালো লাগছে।” এই দুই প্রজন্মের দুই শিল্পীর রসায়নই ছবির বড় আকর্ষণ।
রুক্মিণীর প্রচারপর্ব সবসময়ই প্রাণবন্ত, তবে এবার যেন একটু আলাদা। ব্যক্তিগত কথা, মা–মেয়ের মিষ্টি সম্পর্ক, হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে প্রচারের প্রতিটি মুহূর্তই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে। তাঁর সাবলীলতা, মজা করে কথা বলা, নিজের বাস্তব গল্প শেয়ার করার অভ্যাস দর্শকদের আরও কাছাকাছি টেনে আনে।
এর পাশাপাশি ছবির প্রচারের মাধ্যমে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তাও দিচ্ছেন—"পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক যতটাই স্বাভাবিক হোক, যতটাই মিষ্টি হোক, সেই সম্পর্কের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।"
আজকের ব্যস্ত জীবনে বাবা–মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বেড়ে যাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। কাজের চাপ, জীবনের বিভিন্ন দায়িত্বের কারণে অনেক সময়ই পরিবারের সঙ্গে বসে কথা বলার সময় থাকে না। এই অবস্থায় রুক্মিণীর কথাগুলি মনে করিয়ে দেয়—সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন যেমন স্বাভাবিক, তেমনই তা যত্নে রাখাটাও জরুরি।
ট্রেলার দেখে দর্শকরা ইতিমধ্যেই বুঝেছেন—এটি কোনো কৌতুকপূর্ণ ফ্যামিলি ড্রামা নয়; বরং আবেগঘন, হৃদয়ছোঁয়া গল্প। অনেকে বলছেন, বাংলা সিনেমার এই ধরনের পারিবারিক গল্পের অভাব ছিল। আর বাবা–মেয়ের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যে কয়েকটি ছবি তৈরি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেও ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ ভিন্ন আবেগের ছোঁয়া আনবে।
এছাড়াও রুক্মিণীর অভিনয়, চিরঞ্জিতের স্ক্রিন প্রেজেন্স, এবং দুজনের সম্পর্কের পরিপক্ক উপস্থাপনা—এসবই দর্শকদের চোখে বড় আকর্ষণ।
প্রচারপর্বে মজা করে বলা কয়েকটি কথা থেকেই স্পষ্ট—রুক্মিণীর বাস্তব জীবন আর তাঁর অভিনীত চরিত্র, দুই ক্ষেত্রেই সম্পর্কের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খুবই আন্তরিক। মা–মেয়ের সম্পর্ক তাঁর কাছে যেমন মিষ্টি, তেমন বাস্তব; যেমন শাসনে ভরা, তেমন গভীর ভালোবাসায় বাঁধা। আর ঠিক সেই আবেগই তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ ছবিতে।
ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও পরিবারের কথা মনে পড়লে যে হাসি তাঁর মুখে খেলে যায়—সেই হাসিই যেন ছবির প্রচারকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা—২৮ নভেম্বর মুক্তির পর ছবিটি দর্শকের মন ছুঁতে পারে কি না।
বাংলা সিনেমার ভুবনে এই ছবিটি হয়তো নতুন করে মনে করিয়ে দেবে—
পরিবারের সম্পর্ক সবচেয়ে সহজ, আবার সবচেয়ে গভীর; সবচেয়ে সাধারণ, আবার সবচেয়ে মূল্যবান।