জাহ্নবী, খুশি ছাড়াও শ্রীদেবীর আরও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। যিনি থাকেন পাকিস্তানে। পেশাদার অভিনেত্রী তিনি। মৃত্যুর আগে এই কন্যেকেই নিজের তৃতীয় সন্তানের স্বীকৃতি দেন শ্রীদেবী।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা কেবলমাত্র অভিনেত্রী নন—তাঁরা এক একটি যুগের প্রতীক। সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছেন Sridevi। তাঁকে বলা হয় ভারতীয় সিনেমার প্রথম মহিলা সুপারস্টার। একাধারে দক্ষিণী ও হিন্দি ছবিতে তাঁর অসামান্য সাফল্য, অভিনয়ের বৈচিত্র্য, নাচের দক্ষতা এবং পর্দায় অনবদ্য উপস্থিতি তাঁকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। জন্মসূত্রে তামিল হলেও, ভাষা ও প্রাদেশিকতার সীমানা পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বভারতীয় তারকা—এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়।
১৯৬৩ সালের ১৩ অগস্ট তামিলনাড়ুতে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীদেবী। খুব অল্প বয়সেই অভিনয় জগতে পা রাখেন। শিশু শিল্পী হিসেবে তামিল, তেলুগু ও মালয়ালম ছবিতে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি দক্ষিণী ছবির প্রথম সারির নায়িকা হয়ে ওঠেন। তাঁর অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা, নাচের ছন্দ—সব মিলিয়ে তিনি দ্রুতই দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
আশির দশকে বলিউডে তাঁর প্রবেশ কার্যত নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ‘হিম্মতওয়ালা’, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’, ‘চালবাজ’, ‘লামহে’—একটির পর একটি ছবিতে তিনি প্রমাণ করেন, নায়িকাকেন্দ্রিক ছবিও বক্স অফিসে সাফল্য পেতে পারে। সেই সময় পুরুষ তারকাদের প্রাধান্য থাকলেও, শ্রীদেবী নিজের প্রতিভা দিয়ে সেই ধারণা বদলে দেন। তিনি ছিলেন এমন এক অভিনেত্রী, যার নামেই ছবি হিট হতো।
হিন্দি ছবির প্রযোজক Boney Kapoor-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর মুম্বইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন শ্রীদেবী। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান—Janhvi Kapoor ও Khushi Kapoor। দু’জনেই বর্তমানে বলিউডে নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। জাহ্নবী ইতিমধ্যেই একাধিক ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের নজর কেড়েছেন, আর খুশি সদ্য অভিনয়জগতে পা রেখেছেন।
কিন্তু শ্রীদেবীর জীবনের এক আবেগঘন অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে আর এক তরুণী অভিনেত্রীকে ঘিরে—Sajal Aly। যদিও রক্তের সম্পর্কে কোনও যোগ ছিল না, তবু শ্রীদেবী তাঁকে নিজের ‘তৃতীয় কন্যা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ আবেগের, মমতার, এবং শিল্পের বন্ধনে গাঁথা।
২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত Mom ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেন শ্রীদেবী ও সজল আলি। ছবিতে সজল অভিনয় করেন শ্রীদেবীর মেয়ের চরিত্রে। গল্পের কেন্দ্রে ছিল এক মায়ের প্রতিশোধ ও সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। বাস্তব জীবনেও শুটিং চলাকালীন তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর স্নেহের সম্পর্ক।
দীর্ঘ সময় বিদেশে শুটিং, প্রচারপর্বে একসঙ্গে উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সজল যেন হয়ে উঠেছিলেন শ্রীদেবীর পরিবারেরই একজন। একাধিক সাক্ষাৎকারে শ্রীদেবী স্নেহভরে বলেছিলেন, “সজল আমার তৃতীয় সন্তানের মতো।” এই উক্তি শুধু সৌজন্যমূলক ছিল না, বরং তাঁদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতারই প্রতিফলন।
সজল আলি পাকিস্তানের বিনোদন জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী। টেলিভিশন ধারাবাহিক ও চলচ্চিত্রে তাঁর সাফল্য তাঁকে সে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাহ্নবীর সমবয়সি হলেও অভিজ্ঞতায় তিনি অনেকটাই এগিয়ে। পাকিস্তানি দর্শকের কাছে তিনি যেমন প্রিয়, তেমনই আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি পরিচিত মুখ।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি। দুবাইয়ে আত্মীয়ের বিয়েতে যোগ দিতে গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। হঠাৎ খবর আসে—বাথটবে দুর্ঘটনাজনিত ডুবে যাওয়ার ফলে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে এমন আকস্মিক প্রয়াণে স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা দেশ। বলিউড থেকে দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রি—সব জায়গায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
এই মৃত্যু যেন শুধু এক অভিনেত্রীর জীবনাবসান নয়, বরং এক যুগের অবসান। তাঁর শেষকৃত্যে অসংখ্য ভক্ত ও তারকা উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বন্ধুরা, সহকর্মীরা।
সজল আলিও সেই শোক বহন করেছিলেন গভীরভাবে। যাঁকে তিনি পর্দায় মা বলে ডাকতেন, বাস্তবেও যাঁর স্নেহ পেয়েছিলেন, তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে ছিল ব্যক্তিগত আঘাত।
শ্রীদেবীর মৃত্যুর পর তাঁর দুই কন্যা জাহ্নবী ও খুশি বলিউডে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে নেমেছেন। জাহ্নবীর অভিষেক হয় ‘ধড়ক’ ছবির মাধ্যমে। ধীরে ধীরে তিনি নিজের অভিনয়দক্ষতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। খুশিও নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
অন্যদিকে, সজল আলি পাকিস্তানি ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছেন। যদিও তিনি ভারতের ছবিতে নিয়মিত নন, তবু ‘মম’-এর স্মৃতি তাঁকে ভারতের দর্শকের কাছেও পরিচিত করে তুলেছে।
শ্রীদেবীর জীবন যেন এক রূপকথা—শিশুশিল্পী থেকে সুপারস্টার, সাফল্যের শিখর থেকে পারিবারিক জীবনের উষ্ণতা, আর শেষ পর্যন্ত এক রহস্যময় বিদায়। কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার রয়ে গেছে তাঁর কাজের মধ্যে, তাঁর দুই কন্যার মধ্যে, আর সেই ‘তৃতীয় কন্যা’র স্মৃতিতেও।
একজন শিল্পী কেবল নিজের পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকেন না—তাঁর স্নেহ, প্রভাব, অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে পড়ে সহকর্মীদের মধ্যেও। সজল আলির প্রতি শ্রীদেবীর মমতা সেই কথাই প্রমাণ করে।
আজও যখন পর্দায় ভেসে ওঠে তাঁর নাচ, তাঁর হাসি, তাঁর অভিব্যক্তি—দর্শক বুঝতে পারেন, সুপারস্টার হওয়া শুধু জনপ্রিয়তার বিষয় নয়, এটি হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতা। শ্রীদেবী সেই ক্ষমতার অধিকারিণী ছিলেন।
তাঁর জীবনকাহিনি তাই শুধু এক তারকার উত্থান-পতনের গল্প নয়; এটি শিল্প, মমতা, পরিবার এবং সীমান্ত পেরোনো মানবিক সম্পর্কের এক অনন্য দলিল।
শ্রীদেবীর জীবন ও কর্মজীবন যেন এক বিস্তৃত ক্যানভাস—যেখানে সাফল্য, সংগ্রাম, ভালোবাসা, মাতৃত্ব এবং শিল্পীসত্তা একসূত্রে গাঁথা। তিনি কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক যুগের প্রতিনিধি, এক পরিবর্তনের মুখ। পুরুষপ্রধান চলচ্চিত্র জগতে নিজের প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রমের জোরে যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর অভিনয়ের ভঙ্গি, সংলাপ বলার ধরণ, নাচের অভিব্যক্তি—সব কিছুতেই ছিল স্বকীয়তা। সেই স্বকীয়তাই তাঁকে “প্রথম মহিলা সুপারস্টার” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শ্রীদেবীর ব্যক্তিজীবনও ছিল গভীর আবেগে ভরা। সংসার, সন্তান, কাজ—সবকিছুর মধ্যে তিনি এক অদ্ভুত ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। জাহ্নবী ও খুশির প্রতি তাঁর স্নেহ যেমন ছিল নিখাদ মাতৃত্বের প্রতীক, তেমনই সজল আলির প্রতি তাঁর মমতা প্রমাণ করে—মায়ের ভালোবাসা কখনও কখনও রক্তের সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়েও যেতে পারে। ‘মম’ ছবির শুটিংয়ের সময় গড়ে ওঠা সম্পর্ক কেবল সহকর্মিতার ছিল না; সেটি ছিল এক আন্তরিক মানবিক বন্ধন। একজন অভিজ্ঞ শিল্পী কীভাবে নবীন প্রজন্মকে আগলে রাখেন, পথ দেখান—তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ এই সম্পর্ক।
শ্রীদেবীর আকস্মিক মৃত্যু ভারতীয় সিনেমাকে যেন মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তাঁর চলে যাওয়া ছিল অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও শিল্প কখনও মরে না। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি আজও দর্শকের মনে জীবন্ত। নতুন প্রজন্ম ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁর ছবি দেখে বিস্মিত হয়—কী অনায়াসে তিনি কমেডি, ট্র্যাজেডি, রোমান্স বা থ্রিলার—সব ধারার চরিত্রে নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারতেন!
আজ যখন জাহ্নবী ও খুশি নিজেদের কেরিয়ার গড়ার পথে এগোচ্ছেন, তখন তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপে তুলনা চলে আসে মায়ের সঙ্গে। সেই তুলনা যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই আশীর্বাদও। কারণ তাঁরা এমন এক উত্তরাধিকার বহন করছেন, যা গর্বের। অন্যদিকে, পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হিসেবে সজল আলির সাফল্যও যেন শ্রীদেবীর সেই আশীর্বাদেরই প্রতিফলন—যেখানে শিল্প সীমান্ত মানে না, সম্পর্ক ভাষা মানে না।
সবশেষে বলা যায়, শ্রীদেবীর জীবন কেবল রূপালি পর্দার গ্ল্যামারের গল্প নয়; এটি এক নারীশক্তির জয়গাথা। ছোটবেলা থেকে অবিরাম পরিশ্রম, ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস, পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবারকে আগলে রাখার দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্মৃতি আজও অমলিন, কারণ তিনি কেবল চরিত্রে অভিনয় করেননি—তিনি চরিত্রগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
সময়ের স্রোত বয়ে চলে, নতুন মুখ আসে, নতুন গল্প তৈরি হয়। কিন্তু কিছু নাম ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়। শ্রীদেবী সেই বিরল নামগুলির একটি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যিকারের তারকাখ্যাতি কেবল আলোয় নয়, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াতেই। আর সেই জায়গাটি তিনি চিরকাল ধরে রাখবেন, তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে, তাঁর সন্তানের স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে, আর সেই ‘তৃতীয় কন্যা’র স্মৃতিতে জড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।