Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

সংসার থেকে সাধনার পথে প্রেমানন্দের আশ্রমে বিরুষ্কার আগমন তুলসীর মালায় ধরা দিল বিশ্বাস

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ প্রেমানন্দের আশ্রমে পৌঁছান বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মা। তুলসীর মালা গলায় দিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শান্তি ও আশীর্বাদ কামনা করেন তারকা দম্পতি।

বলিউড ও ক্রিকেটের ঝলমলে জগতের বাইরে গিয়ে যখন কোনও তারকা দম্পতি নিঃশব্দে আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের দিকে পা বাড়ান, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে আলোচনা, আগ্রহ ও অনুপ্রেরণার বিষয়। ঠিক এমনই এক দৃশ্য আবারও ধরা পড়ল যখন ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা দম্পতি Virat KohliAnushka Sharma ফের একবার আধ্যাত্মিক গুরু Premanand Maharaj-এর শরণাপন্ন হলেন।

দু’দিন আগেই মুম্বই বিমানবন্দরে তাঁদের দেখা গিয়েছিল। সেখানেই প্রথম নজর কেড়েছিল অনুষ্কার গলায় থাকা তুলসীর মালা—যা কেবল একটি ধর্মীয় অলঙ্কার নয়, বরং আধ্যাত্মিক সাধনার এক প্রতীক। বিমানবন্দরের সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্ত থেকেই অনুরাগীদের অনুমান শুরু হয়—কোথায় যাচ্ছেন বিরুষ্কা? সেই প্রশ্নের উত্তর মেলে পরের দিন ভোরে, যখন তাঁরা পৌঁছে যান বৃন্দাবনের Kelikhunj Ashram-এ।

ভোরের নীরবতা আর ভক্তির আবেশ

মঙ্গলবার ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আশ্রমে পৌঁছন বিরাট ও অনুষ্কা। দিনের শুরুতেই আশ্রমে উপস্থিত হওয়া তাঁদের জীবনে আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলার গুরুত্বকেই তুলে ধরে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাঁরা বিভিন্ন আধ্যাত্মিক কর্মসূচিতে অংশ নেন—কীর্তন শোনা, বাণী শ্রবণ, ধ্যান ও নীরব প্রার্থনা। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিয়োতে দেখা যায়, ভিড়ের মাঝেও চুপচাপ বসে আছেন তাঁরা। কোনও আড়ম্বর নেই, নেই কোনও তারকাসুলভ আচরণ—শুধু গভীর মনোযোগে গুরুদেবের বাণী শোনা।

অনুষ্কার পরনে ছিল নীল রঙের চুড়িদার ও ওড়না, গলায় তুলসীর মালা—যা তাঁর আধ্যাত্মিক অনুশীলনের ধারাবাহিকতাকেই নির্দেশ করে। বিরাটের গলায়ও ছিল তুলসীর মালা, পরনে সাদা শার্ট। দু’জনেরই কপালে তিলক—যা তাঁদের বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।

পুত্র অকায়ের জন্মদিন ও পারিবারিক মঙ্গল কামনা

এই সফরের পেছনে ছিল এক বিশেষ কারণ। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বিরুষ্কার পুত্র অকায়ের জন্মদিন। সন্তানের জন্মদিনে কেবল উৎসব নয়, তার ভবিষ্যৎ মঙ্গল কামনায় ঈশ্বরের শরণ নেওয়াই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। পরিবার, সন্তান ও নিজেদের জীবনের স্থিতি ও শান্তির জন্যই তাঁরা আশ্রমে গিয়েছেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে সন্তানের জন্মদিনে আশীর্বাদ গ্রহণের রীতি বহু প্রাচীন। বিরাট–অনুষ্কা সেই ঐতিহ্যকেই আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে অনুসরণ করছেন—যা তাঁদের অনুরাগীদের কাছেও এক গভীর বার্তা দেয়।

এই প্রথম নয়, আধ্যাত্মিক পথে বহুবার

এটাই প্রথম নয় যখন বিরুষ্কাকে প্রেমানন্দ মহারাজের কাছে দেখা গেল। এর আগেও বহুবার তাঁরা এই আশ্রমে এসেছেন। গত বছর ডিসেম্বরেও তাঁরা গুরুদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সময় অনুষ্কা বলেছিলেন,
“আমরা দু’জনে আপনাকে স্মরণ করছি। আপনার কাছে নিজেদের সমর্পণ করছি।”

এর উত্তরে প্রেমানন্দ মহারাজ যে বাণী দিয়েছিলেন, তা আজও বহু ভক্তের মনে গেঁথে রয়েছে—
“আমরা সকলেই শ্রীজির সন্তান। আমাদের মাথার উপরে যে আকাশ রয়েছে, সেই মস্ত ছাতার তলায় আমরা রয়েছি। সকলকে রাধানাম জপে যেতে হবে।”

এই বাণী শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়, বরং জীবনের দুঃখ–সুখের ঊর্ধ্বে উঠে এক সার্বজনীন মানবিক দর্শনের কথা বলে।

খ্যাতির শীর্ষে থেকেও বিনয়

বিরাট কোহলি আজ বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। অনুষ্কা শর্মা বলিউডের সফল অভিনেত্রী ও প্রযোজক। খ্যাতি, অর্থ ও সাফল্যের শীর্ষে থেকেও তাঁরা যে বিনয় ও আধ্যাত্মিকতার পথ বেছে নিচ্ছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক শক্তিশালী বার্তা দেয়—সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানসিক শান্তি ও আত্মিক স্থিতি।

news image
আরও খবর

আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতামুখর জীবনে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিরুষ্কার এই আধ্যাত্মিক যাত্রা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে।

আধ্যাত্মিকতার জনপ্রিয়তা ও সমাজমাধ্যম

সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই মুহূর্তগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ প্রশংসা করেছেন তাঁদের বিশ্বাসের, কেউ আবার অনুপ্রাণিত হয়েছেন নিজের জীবনে আধ্যাত্মিক চর্চা শুরু করতে। তারকাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও যে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিরুষ্কার এই সফর তারই উদাহরণ।

উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রেমানন্দ মহারাজের কেলিকুঞ্জ আশ্রমে বিরাট ও অনুষ্কার এই সফর নিছক একটি ধর্মীয় সফর নয়। এটি পারিবারিক বন্ধন, সন্তানের ভবিষ্যৎ, মানসিক শান্তি ও আত্মিক উন্নতির এক সম্মিলিত যাত্রা। খ্যাতির আলো ছেড়ে কিছু সময় নীরবতা ও প্রার্থনায় কাটানোর এই সিদ্ধান্ত তাঁদের ব্যক্তিত্বের আর এক গভীর দিক তুলে ধরল।

এই প্রেক্ষাপটে বিরাট ও অনুষ্কার সফরটি আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। বর্তমান সময়ে যেখানে সমাজমাধ্যমে তারকাদের জীবনযাপন প্রায়শই ভোগবাদ, বিলাসিতা ও চমকের প্রতীক হিসেবে উঠে আসে, সেখানে বিরুষ্কার এই নীরব আধ্যাত্মিক যাত্রা একেবারেই ভিন্ন বার্তা দেয়। তাঁদের এই উপস্থিতি দেখিয়ে দেয়, সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেও মানুষ নিজের ভিতরের শূন্যতা, প্রশ্ন ও উদ্বেগের উত্তর খুঁজতে পারে আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে। বহু অনুরাগী মন্তব্য করেছেন, এই দৃশ্য তাঁদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে জীবনের আসল সাফল্য শুধু ট্রফি, পুরস্কার বা খ্যাতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানসিক শান্তি ও আত্মিক তৃপ্তিই প্রকৃত অর্জন।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বার্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে তরুণদের বড় অংশই অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এমন সময়ে যখন একজন আন্তর্জাতিক তারকা ক্রিকেটার Virat Kohli ও একজন সফল অভিনেত্রী Anushka Sharma প্রকাশ্যে আধ্যাত্মিকতার পথে হাঁটেন, তখন তা অনেকের মনে সাহস জোগায়। অনেকেই মনে করছেন, ধ্যান, প্রার্থনা কিংবা গুরুসান্নিধ্যে সময় কাটানো কোনও দুর্বলতার চিহ্ন নয়, বরং তা মানসিক শক্তি বাড়ানোর একটি উপায়।

এই সফরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পারিবারিক মূল্যবোধ। সন্তান অকায়ের জন্মদিন উপলক্ষে আশ্রমে গিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণের সিদ্ধান্ত বিরুষ্কার পারিবারিক চিন্তাভাবনাকেই তুলে ধরে। আধুনিক জীবনে যেখানে জন্মদিন মানেই বড়সড় পার্টি, আলোকসজ্জা ও সামাজিক প্রদর্শন, সেখানে তাঁরা বেছে নিয়েছেন নীরবতা, প্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতার পথ। এতে বোঝা যায়, সন্তানকে ঘিরে তাঁদের ভাবনায় শুধুমাত্র আনন্দ নয়, বরং দায়িত্ব, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের চিন্তাও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমে তাঁদের বারবার উপস্থিতি এটাও প্রমাণ করে যে এই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক কোনও ক্ষণিক আবেগের ফল নয়। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে। গুরুদেবের বাণীতে যে মানবিকতা, সমতা ও আত্মসমর্পণের কথা উঠে আসে, তা তাঁদের জীবনের দর্শনের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে প্রেমানন্দ মহারাজের “আমরা সকলেই শ্রীজির সন্তান” এই বক্তব্য সমাজে বিভেদ ভুলে একতার বার্তা দেয়, যা আজকের সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

সমাজমাধ্যমে এই সফর নিয়ে আলোচনা চলাকালীন অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও ভাগ করে নিয়েছেন। কেউ লিখেছেন, বিরুষ্কার ভিডিও দেখে তিনি নিয়মিত নামজপ শুরু করেছেন, কেউ আবার বলেছেন দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতার পরে ধ্যানের দিকে ঝুঁকছেন। অর্থাৎ তারকাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কেবল সংবাদমূল্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের অনুপ্রেরণাও হয়ে উঠছে।

এখানেই বিরুষ্কার এই সফরের সামাজিক প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। তাঁরা কোনও উপদেশ দেননি, কোনও বক্তব্য রাখেননি—শুধু নিজের মতো করে বিশ্বাসের পথে হেঁটেছেন। তাতেই বহু মানুষ নিজেদের জীবনের দিকে নতুন করে তাকানোর সুযোগ পেয়েছেন। খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার দায়িত্ব যে শুধু বিনোদন দেওয়া নয়, বরং অজান্তেই সমাজে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে—এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

সবশেষে বলা যায়, প্রেমানন্দ মহারাজের কেলিকুঞ্জ আশ্রমে বিরাট ও অনুষ্কার এই যাত্রা তাঁদের জীবনের এক অন্তর্মুখী অধ্যায়কে সামনে এনেছে। এটি দেখিয়েছে, ব্যস্ততার মাঝেও থামা যায়, আলো–ক্যামেরার বাইরে গিয়েও নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। পারিবারিক মঙ্গল, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও আত্মিক শান্তির জন্য নেওয়া এই সিদ্ধান্ত তাঁদের ব্যক্তিত্বকে আরও মানবিক, সংবেদনশীল ও অনুপ্রেরণাদায়ী করে তুলেছে। সেই কারণেই এই সফর শুধু এক দিনের ঘটনা নয়, বরং বহু মানুষের মনে দীর্ঘদিনের জন্য রয়ে যাওয়ার মতো এক শান্ত, নীরব অথচ গভীর বার্তা।

Preview image