বীরভূমে একটি স্করপিও গাড়ি থেকে STF বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সন্দেহজনকভাবে টাকা পরিবহনের অভিযোগে গাড়িটি আটক করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
বীরভূমের জনজীবন গত কয়েকদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে একমাত্র একটি ঘটনা—একটি সাদা রঙের স্করপিও গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নানা ঘটনার মাঝেই এই বিপুল অর্থ উদ্ধারের ঘটনা রাজ্যজুড়ে নতুন করে সন্দেহের আবহ সৃষ্টি করেছে। STF–এর হাতে ধরা পড়া এই নগদ অর্থের প্রকৃত উৎস, গন্তব্য, এবং উদ্দেশ্য—সবকিছু নিয়েই উঠেছে একের পর এক প্রশ্ন। ঘটনার গুরুত্ব বুঝেই তদন্তে নেমেছে STF–এর পাশাপাশি জেলা পুলিশও। যে স্করপিও গাড়িটি আটক করা হয়েছে, সেটি কোথা থেকে আসছিল, কোন রুট ধরে চলছিল, কার মালিকানাধীন, গাড়িতে উপস্থিত ব্যক্তিরা কারা—সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে তদন্তকারীদের তরফে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় তখন, যখন বীরভূমের একটি চেকপোস্টে STF নিয়মিত তল্লাশি চালাচ্ছিল। উৎসবের মরসুম, নির্বাচন ঘনিয়ে আসা কিংবা আন্তঃজেলা অপরাধ দমনে এমন তল্লাশি চলতেই পারে। কিন্তু তল্লাশিতে যে পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার হয়েছে, তা অনুমান করেনি কেউই। সাধারণত এই ধরনের গাড়ি আটক হলে ড্রাইভার বা যাত্রীদের প্রাথমিক জেরা করেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দেখা গেল, উপস্থিত ব্যক্তিদের কথাবার্তায় অসঙ্গতি রয়েছে, তারা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারছিল না এত টাকা কেন এবং কী উদ্দেশ্যে পরিবহন করা হচ্ছিল। এরপরই STF আরও কঠোর ভাবে গাড়িটি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। গাড়ির দরজা খুলতেই দেখা যায়, সিটের নিচে, ড্যাশবোর্ডের ভেতর, এমনকি লাগেজ স্পেসেও থরে থরে সাজানো কাঁধে চাপিয়ে নেওয়া যায় এমন একাধিক ব্যাগ। সেই ব্যাগগুলোতেই ছিল নোটের পাহাড়।
টাকার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে গণনার জন্য আলাদা টিম ডাকা হয়। আধুনিক মেশিন দিয়ে নোট গোনা হয় এবং প্রথম দফায় যে অঙ্ক উঠে আসে, তাতে তদন্তকারীরা বিস্মিত হয়ে যান। কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ সাধারণ মানুষের নাগালের বিষয় নয়, আর যদি থাকে, তবে তার নথিপত্রও থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায়নি কোনও বৈধ কাগজপত্র, কোনও রসিদ, কোনও হিসেব-নিকেশ। এই অস্বাভাবিক অবস্থাই ঘটনাকে আরও জটিল করে তোলে। STF–এর সন্দেহ আরও গাঢ় হয় যে টাকা কোনও অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—সম্ভবত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা বড় কোনও অপরাধমূলক সিন্ডিকেটের সঙ্গে। তবে তদন্তকারীরা কোনও অনুমান করতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, পর্যাপ্ত প্রমাণ ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সব প্রকাশ্যে আনা হবে।
এই ঘটনার পর বীরভূমে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই টাকা কোথা থেকে এলো? কার? কোথায় যাওয়ার কথা ছিল? কোনও নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ? নাকি কোনও চোরাচালান বা বেআইনি লেনদেন? কারণ পশ্চিমবঙ্গে অতীতে বেশ কয়েকবার দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে বা বড় কোনও রাজনৈতিক ঘটনার আগে নগদ অর্থের অস্বাভাবিক গতিবিধি। এই ঘটনা কি সেই ধরনের আরেকটি উদাহরণ নাকি কোনও নতুন ধরনের অপরাধ-চক্র কাজ করছে—তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
তল্লাশিতে থাকা অফিসারদের একাংশ জানিয়েছেন, গাড়ির চালক এবং যাত্রীদের কথাবার্তা ও আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। তারা প্রথমে দাবি করেছিলেন যে টাকা ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত হবে। কিন্তু যখন বৈধ নথির কথা জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তারা কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। যে অঙ্কের অর্থ গাড়িতে ছিল, তাতে সাধারণ ব্যবসায়ীর পক্ষে এত নগদ বহন করা অসম্ভব বলে মনে করেন তদন্তকারীরা। সাধারণত এত বড় পরিমাণ লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করা হয়। হাতে নগদ নিয়ে চলাফেরা করা শুধু বিপজ্জনক নয়, সন্দেহজনকও বটে।
গাড়িটির মালিকানা সম্পর্কেও ওঠে নানান প্রশ্ন। দেখা যায়, গাড়িটি অন্য কারও নামে রেজিস্টার্ড হলেও চালাতেন অন্য কেউ। মালিক কোথায়, তিনি এ ব্যাপারে জানতেন কি না—সবই এখন তদন্তাধীন। এ ছাড়া মোবাইল ফোন, গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া নথি, গাড়ির GPS রুট হিস্ট্রি সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা গাড়ির গত কয়েকদিনের চলাচলের তথ্য, কোন পাম্পে ঢুকেছে, কোথায় থেমেছে, কার সঙ্গে দেখা করেছে সবই বিশ্লেষণ করছেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে অপরাধ তদন্তের এই পদ্ধতিটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মধ্যে নানা রকম মতামত, অনুমান এবং সন্দেহ ঘুরপাক খেতে থাকে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই টাকা কোনও বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কেউ বলছেন, বড় কোনও রাজনৈতিক সংগঠন বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম সামনে আসতে পারে। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, টাকা সম্ভবত স্থানীয় কোনও সিন্ডিকেটের। যেটাই হোক, STF এবং পুলিশ এখন এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালাচ্ছে এবং কেউ গুরুত্বপূর্ণ হলে তাকে ডেকে পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছে।
একদিকে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। জানা গিয়েছে, এই স্করপিও গাড়িটি বীরভূম থেকে বেরিয়ে অন্য জেলায় যাচ্ছিল। কেন এত টাকা নিয়ে গাড়িটি চলছিল, কোন জেলায় যেতে চাইছিল—এসব প্রশ্নের কোনও সন্তোষজনক উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে IPC এবং মানি লন্ডারিং-সংশ্লিষ্ট দফায় মামলা দায়েরের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।
ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতিতেও আলোড়ন ফেলেছে। বিরোধী শিবির প্রশ্ন তুলেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। তাঁদের দাবি, এত বড় অঙ্কের নগদ অর্থ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় সরকারকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে হবে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল জানিয়েছে, তারা তদন্তের উপর পুরোপুরি আস্থা রাখছে এবং কোনও অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবে রাজনৈতিক আক্রমণ পাল্টা আক্রমণের মধ্যেই তদন্তকারীরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোটি টাকার বেশি অর্থ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গোপনে পরিবহন করা হলে তা কালো টাকার চলাচলের ইঙ্গিত হতে পারে। অর্থনীতি তাতে বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়ে। সমাজের সাধারণ মানুষ, ছোট ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি যেখানে প্রতিদিন হিসেব করে চলেন, সেখানে কয়েক কোটি টাকা নগদ ভাবে বহন করা—যা বৈধতার প্রশ্ন তোলে—তা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
স্থানীয়রা মনে করছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে আরও বড় কোনও অপরাধচক্র বা সিন্ডিকেটের সন্ধান মিলতে পারে। অনেকেই বলছেন, STF–এর এই তৎপরতা আগামী দিনে আরও অনেক দুষ্কর্মের রহস্য উন্মোচন করবে। বীরভূম জেলাকে নিয়ে গত কয়েক বছরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপের অভিযোগ ওঠেছে—তাই এই উদ্ধার ঘটনা আবারও জেলার নাম সংবাদ মাধ্যমে বারবার উঠে আসার কারণ হয়েছে।
বীরভূমের মানুষ এখন তদন্তের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে। STF এবং পুলিশ যদি কোনও বড় অপরাধচক্রের হদিস পায়, তাহলে তা রাজ্যজুড়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে। তবে এখনও পর্যন্ত তদন্ত চলছে এবং প্রশাসন কাউকে নাম করে অভিযুক্ত করতে নারাজ। তাদের দাবি, তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে না।
মানুষের মধ্যে যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তার পেছনে শুধু টাকার পরিমাণই নয়, ঘটনাটির রহস্যও রয়েছে। অস্বাভাবিক পরিমাণ নগদ অর্থ, গাড়ির যাত্রীদের অসঙ্গত বক্তব্য, বৈধ কাগজপত্রের অভাব, গাড়ির নিয়মবহির্ভূত রুট—সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টি জটিল। তদন্তকারীরা এখন একে একে সব দিক খতিয়ে দেখছেন। তারা মনে করছেন, এই অর্থ উদ্ধার কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পিছনে বড় পরিকল্পনা থাকতে পারে।
রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে STF এবং পুলিশ যে তৎপর, এই ঘটনাটি তারই প্রমাণ। তারা বারবার জানিয়েছেন, কেউ প্রভাব খাটাতে চাইলে কোনও লাভ হবে না। পুরো ঘটনার নথিপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে। আইন নিজের মতো চলবে।
সার্বিক ভাবে দেখে বলা যায়, বীরভূমে স্করপিও গাড়ি থেকে কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ তল্লাশি অভিযান নয়। এটি রাজ্যের অর্থনৈতিক অপরাধ, রাজনৈতিক তৎপরতা, অপরাধচক্রের গতিবিধি এবং প্রশাসনিক ভূমিকার জটিল পারস্পরিক সম্পর্কের একটি জীবন্ত উদাহরণ। তদন্ত যত এগোবে, ততই পরিষ্কার হবে এই টাকার পেছনে লুকিয়ে থাকা সত্য।