মাঝে পেটব্যথার জন্য খুবই ভুগতে হয়েছে অভিনেত্রী শ্রীময়ী চট্টরাজকে। এ বার পায়ে বড় চোট পেয়েছেন তিনি। কী ঘটেছে তাঁর সঙ্গে?
পায়ে শক্ত করে জড়ানো ক্রেপ ব্যান্ডেজ, হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, তবু থামছে না কাজ। এই দৃশ্য এখন নিয়মিত শুটিং ফ্লোরে দেখা যাচ্ছে অভিনেত্রী শ্রীময়ী চট্টরাজ–এর ক্ষেত্রে। ছোট পর্দার জনপ্রিয় মুখ তিনি। বর্তমানে তাঁকে দেখা যাচ্ছে ধারাবাহিক মিলন হবে কতদিনে-তে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। গল্পের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই চোট পেয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিনেত্রী। কিন্তু বিশ্রামে না গিয়ে বরং ব্যথা সঙ্গী করেই শুটিং চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সম্প্রতি এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন শ্রীময়ী। অনুষ্ঠান শেষে স্টুডিয়ো চত্বরে বেরোনোর সময় ঘটে বিপত্তি। জায়গাটি ছিল অসমান ও উঁচু-নিচু। পায়ে ছিল উঁচু হিলের জুতো। অসাবধানতার এক মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে পা মচকে যায় তাঁর। প্রথমে তিনি বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই যন্ত্রণা বাড়তে শুরু করে। পা ফুলে ওঠে, ঠিক করে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
অভিনেত্রী জানিয়েছেন, সেই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল—হয়তো পা ভেঙে গেছে। কারণ ব্যথার তীব্রতা ছিল অসহনীয়। শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও পরের দিনই তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এক্স-রে করানো হয়। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি মেলে—হাড় ভাঙেনি। কিন্তু চিকিৎসক জানান, লিগামেন্টে গুরুতর চোট লেগেছে। লিগামেন্ট ইনজুরি সাধারণ ভাঙনের মতোই কষ্টদায়ক, অনেক সময় আরও বেশি সময় ধরে সেরে ওঠে। বিশ্রাম, ব্যান্ডেজ, বরফ সেক এবং চলাফেরায় সতর্কতা—এসবই এখন তাঁর নিয়মিত সঙ্গী।
চিকিৎসকের প্রথম পরামর্শ ছিল সম্পূর্ণ বিশ্রাম। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এত সহজ ছিল না। ধারাবাহিকের গল্পে এই মুহূর্তে তাঁর চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রয়েছে। একাধিক আবেগঘন দৃশ্য, টানটান নাটকীয়তা—সব কিছুতেই তাঁর উপস্থিতি অপরিহার্য। টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিদিনের শুটিং মানেই নির্দিষ্ট সময়সীমা। এক দিনের কাজ পিছিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পুরো ইউনিটের উপর। ফলে পুরোপুরি বিরতি নেওয়া সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে।
তবে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নেননি শ্রীময়ী। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ জড়িয়ে, প্রয়োজনে অ্যাঙ্কল সাপোর্ট ব্যবহার করে, সীমিত গতিবিধি নিয়েই শুটিং করছেন। শুটিং ফ্লোরেও ইউনিটের তরফে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। যেসব দৃশ্যে বেশি হাঁটা বা দৌড়ানোর প্রয়োজন, সেগুলি আপাতত এড়িয়ে চলা হচ্ছে। ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, ব্লকিং এবং শট ডিভিশনে পরিবর্তন আনা হয়েছে যাতে তাঁর হাঁটার প্রয়োজন কম হয়। অনেক ক্ষেত্রে বসে থাকা দৃশ্য বা ক্লোজ শটের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
টেলিভিশনের দর্শকরা পর্দায় যা দেখেন, তার পিছনে থাকে অনেক অদৃশ্য পরিশ্রম। শ্রীময়ীর এই পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। একটি দৃশ্যের জন্য হয়তো কয়েকবার টেক দিতে হয়। প্রতিবার উঠে দাঁড়ানো, অবস্থান বদলানো—সবটাই এখন তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য। তবু পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে তিনি চেষ্টা করছেন কাজের মান যেন একটুও কম না হয়।
শ্রীময়ী জানিয়েছেন, এ ধরনের চোট তিনি আগে-ও পেয়েছেন। টানা শুটিং, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, আউটডোর লোকেশনে কাজ—সব মিলিয়ে শারীরিক চাপ কম নয়। তার উপর অনুষ্ঠান, প্রোমোশনাল ইভেন্ট, সামাজিক উপস্থিতি—সব সামলাতে হয় সমানভাবে। ফলে শরীরকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এই ঘটনার পর তিনি আরও সতর্ক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে উঁচু হিল পরার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সচেতন থাকবেন বলেই জানিয়েছেন।
লিগামেন্ট ইনজুরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সেরে ওঠার সময়। অনেক সময় বাহ্যিকভাবে চোট গুরুতর মনে না হলেও ভিতরে টিস্যুর ক্ষতি থেকে যায়। ঠিকমতো বিশ্রাম না নিলে তা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারণ হতে পারে। চিকিৎসকও তাঁকে সতর্ক করেছেন—অতিরিক্ত চাপ দিলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। তাই শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকেই বরফ সেক, পা উঁচু করে রাখা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়া—এসব নিয়ম মেনে চলছেন তিনি।
ইউনিটের সহকর্মীরাও পাশে দাঁড়িয়েছেন। সহ-অভিনেতা ও টেকনিশিয়ানরা চেষ্টা করছেন যাতে তাঁকে কম হাঁটতে হয়। কেউ জল এনে দিচ্ছেন, কেউ চেয়ার এগিয়ে দিচ্ছেন। শুটিংয়ের মতো ব্যস্ত পরিবেশে এই সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ধারাবাহিক আসলে দলগত পরিশ্রমের ফল—এখানে এক জনের সমস্যাই পুরো ইউনিটের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতি দর্শকদের কাছেও এক অন্য বার্তা বহন করে। পর্দায় ঝকঝকে উপস্থিতির আড়ালে থাকে অগণিত ব্যক্তিগত লড়াই। অভিনেতাদের জীবন বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা ততটাই পরিশ্রমসাধ্য। শারীরিক অসুবিধা, মানসিক চাপ—সব সামলে নিয়মিত ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো সহজ নয়।
তবে শ্রীময়ীর মনোবল যথেষ্ট দৃঢ়। তিনি জানিয়েছেন, প্রথম দিন শুটিং ফ্লোরে ফিরতে একটু ভয় লাগছিল। যদি আবার পা মচকে যায়? যদি ব্যথা বাড়ে? কিন্তু ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। এখন তিনি অনেকটাই সাবধানে চলাফেরা করছেন। প্রয়োজন হলে দৃশ্যের আগে রিহার্সাল করছেন বসে বসেই, যাতে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না হয়।
গল্পের প্রয়োজনে কখনও কখনও চরিত্রকে দৌড়তে হয়, আবেগে ছুটে যেতে হয়। আপাতত সেই ধরনের দৃশ্য এড়ানো হচ্ছে। চিত্রনাট্যে সামান্য বদল এনে পরিস্থিতি সামলানো হচ্ছে। টেলিভিশন জগতের এটাই বাস্তবতা—পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এই ঘটনা আরও এক বার মনে করিয়ে দেয়, কর্মজীবনে দায়িত্ববোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সহজেই তিনি কয়েক সপ্তাহের বিরতি নিতে পারতেন। কিন্তু তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হত ধারাবাহিকের ধারাবাহিকতা, সহকর্মীদের কাজ এবং দর্শকের প্রত্যাশা। তাই ঝুঁকি না নিয়ে, চিকিৎসা মেনে, নিয়ন্ত্রিত ভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে এই ঘটনাকে তিনি শিক্ষা হিসেবেও দেখছেন। শরীরের যত্ন নেওয়া, বিশেষ করে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা পেশায়, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সঠিক জুতো নির্বাচন, বিশ্রামের সময় বের করা, নিয়মিত ব্যায়াম—এসব ভবিষ্যতে আরও গুরুত্ব দেবেন বলেই জানিয়েছেন।
এখন তাঁর লক্ষ্য দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। চিকিৎসকের মতে, সঠিক যত্ন নিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অনেকটাই সেরে ওঠা সম্ভব। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত ব্যান্ডেজই তাঁর ভরসা।
সব মিলিয়ে, পায়ে চোট নিয়েও শ্রীময়ী চট্টরাজের শুটিং চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনার খবর নয়। এটি পেশাদারিত্ব, দায়বদ্ধতা এবং মনোবলের এক বাস্তব উদাহরণ। পর্দায় আমরা যে চরিত্র দেখি, তার পিছনে থাকা মানুষের সংগ্রাম অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়। কিন্তু এই ধরনের ঘটনাই সেই অদৃশ্য লড়াইকে সামনে নিয়ে আসে। শ্রীময়ীর এই লড়াই নিঃসন্দেহে তাঁর অনুরাগীদের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে শ্রীময়ী চট্টরাজের এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি দুর্ঘটনার বিবরণ নয়, বরং একজন পেশাদার শিল্পীর দায়বদ্ধতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং কর্মনিষ্ঠার জীবন্ত উদাহরণ। পায়ে গুরুতর লিগামেন্টের চোট, অসহনীয় যন্ত্রণা, চিকিৎসকের বিশ্রামের পরামর্শ—এসবের পরেও তিনি থেমে যাননি। কারণ তাঁর কাছে অভিনয় শুধু পেশা নয়, এক গভীর দায়বদ্ধতা। একটি ধারাবাহিকের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানে কেবল নিজের চরিত্র নয়, গোটা ইউনিটের প্রতি দায়িত্ব নেওয়া। সহ-অভিনেতা, পরিচালক, টেকনিশিয়ান, প্রযোজনা সংস্থা—সবাই মিলেই একটি কাজকে সফল করে তোলেন। সেই জায়গা থেকেই নিজের কষ্টকে আড়াল করে তিনি শুটিং ফ্লোরে দাঁড়িয়েছেন।
এই ঘটনা আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—পর্দার আড়ালের বাস্তবতা। দর্শকরা টেলিভিশনের পর্দায় যে মসৃণ, নিখুঁত অভিনয় দেখেন, তার পিছনে কতখানি শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় আমাদের অজানাই থেকে যায়। একটি দৃশ্যের জন্য বহুবার টেক, দীর্ঘক্ষণ আলো-গরমে দাঁড়িয়ে থাকা, আবেগঘন সংলাপ—সবকিছুর মাঝেই শরীরকে মানিয়ে নিতে হয়। তার উপর ব্যক্তিগত জীবনের চাপ, অনুষ্ঠান, প্রচার—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময়সূচির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় শিল্পীদের। শ্রীময়ীর চোট সেই কঠোর বাস্তবতারই এক স্পষ্ট উদাহরণ।
তবে এই ঘটনাকে শুধুমাত্র আত্মত্যাগের গল্প হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। এর মধ্যে রয়েছে সচেতনতার বার্তাও। শরীরই শিল্পীর মূল সম্পদ। লিগামেন্টের চোট ছোট বলে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই কাজের পাশাপাশি শরীরের যত্ন নেওয়া, সঠিক বিশ্রাম, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা—এসব সমান গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীময়ী নিজেও স্বীকার করেছেন, ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকবেন। বিশেষ করে উঁচু হিলের মতো বিষয়েও সচেতন সিদ্ধান্ত নেবেন।
এই ঘটনার আর একটি দিক হল সহমর্মিতা। শুটিং ফ্লোরে সহকর্মীদের সহযোগিতা প্রমাণ করে, বিনোদন জগত কেবল প্রতিযোগিতার জায়গা নয়, বরং পারস্পরিক সহায়তারও ক্ষেত্র। একজন শিল্পী বিপদে পড়লে বাকিরা এগিয়ে আসেন—এই মানসিকতা শিল্পচর্চাকে আরও মানবিক করে তোলে।
সবচেয়ে বড় কথা, শ্রীময়ীর এই লড়াই তাঁর দর্শকদের কাছেও এক অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করে। জীবনে বিপত্তি আসবেই। হঠাৎ আঘাত, অপ্রত্যাশিত সমস্যা—সবই জীবনের অংশ। কিন্তু সেই বাধাকে কীভাবে সামলে উঠে দাঁড়ানো যায়, সেটাই আসল শক্তি। ব্যথা নিয়েও দায়িত্ব পালন, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়া—এই মানসিক দৃঢ়তাই একজন মানুষকে আলাদা করে তোলে।
অতএব, পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ জড়িয়ে শুটিং চালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি শুধু এক দিনের খবর নয়; এটি একজন শিল্পীর অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও পেশাদারিত্বের প্রতীক। সুস্থ হয়ে আরও শক্তভাবে পর্দায় ফিরবেন—এই প্রত্যাশাই এখন তাঁর অনুরাগীদের। আর এই অভিজ্ঞতা হয়তো তাঁকে আরও পরিণত, আরও সচেতন করে তুলবে। জীবনের প্রতিটি চোটই শেষ নয়—কখনও কখনও তা নতুন দৃঢ়তার শুরু।