মাত্র তিন বছর বয়সেই দাবার দুনিয়ায় নজির গড়ে সর্বকনিষ্ঠ রেটেড দাবাড়ু হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এক খুদে প্রতিভাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অল্প বয়সেই আন্তর্জাতিক রেটিং পাওয়ার এই অভূতপূর্ব সাফল্য দাবা মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই তাকে ভবিষ্যতের বিশ্বমানের দাবাড়ু হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে সেই উত্থানের আনন্দ খুব বেশি দিন স্থায়ী হল না। সম্প্রতি তার রেটিং ও ম্যাচ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হওয়ায় পুরো বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, খুদে খেলোয়াড়ের কিছু ম্যাচে নিয়ম মেনে খেলা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে ম্যাচ আয়োজন, প্রতিপক্ষ নির্বাচন এবং ফলাফল নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল কি না, সে বিষয়েই তদন্তের দাবি উঠেছে। যদিও শিশুটির পরিবার ও প্রশিক্ষকরা সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন যে তার প্রতিভা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং নিয়ম মেনেই সে রেটিং অর্জন করেছে। এই ঘটনায় দাবা জগতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে খুব কম বয়সী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে রেটিং দেওয়ার নিয়ম কতটা কঠোর হওয়া উচিত। তদন্তের ফলাফল কী হয়, তার দিকেই এখন নজর গোটা দাবা মহলের।
দাবা এমন একটি খেলা যেখানে বয়সকে ছাপিয়ে যায় মেধা, ধৈর্য এবং গভীর কৌশলগত চিন্তাভাবনা। বিশ্ব দাবা ইতিহাসে বহু কিশোর-কিশোরী নিজেদের প্রতিভা দেখিয়ে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক ঘটনা সেই প্রচলিত ধারণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে—মাত্র তিন বছর বয়সে আন্তর্জাতিক রেটিং অর্জন! তবে এই বিস্ময়কর উত্থানের পরপরই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক, যা সেই খুদে দাবাড়ুর ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই অবিশ্বাস্য কীর্তিটি গড়েছেন ভারতের মধ্যপ্রদেশের সর্বজ্ঞ সিং কুশওয়াহা। তিনি মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ২০ দিন বয়সে আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন (FIDE)-এর আনুষ্ঠানিক রেটিং (১,৫৭২ র্যাপিড রেটিং) অর্জন করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। এর আগে এই রেকর্ড ছিল আরেক ভারতীয় খুদে দাবাড়ু অনীশ সরকার-এর দখলে (৩ বছর ৮ মাস ১৯ দিন বয়সে রেটিং অর্জন)।
একটি শিশু যখন ঠিকমতো কথা বলতেও শেখেনি, সেই বয়সে চৌষট্টি খোপের জটিল দাবার বোর্ডকে আয়ত্তে আনাটা সত্যিই অভূতপূর্ব। সর্বজ্ঞ শুধুমাত্র ঘুঁটি চেনেন তাই নয়, বরং একাধিক আন্তর্জাতিক রেটেড খেলোয়াড়কে পরাজিত করে তিনি এই রেটিং অর্জন করেছেন বলে জানা যায়। এই খবর সামনে আসতেই বিশ্বজুড়ে দাবা মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অনেকেই তাঁকে 'নতুন যুগের দাবা বিস্ময়' বা 'ফিউচার গ্র্যান্ডমাস্টার' হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেন।
রেকর্ডধারী: সর্বজ্ঞ সিং কুশওয়াহা (ভারত)
বয়স: ৩ বছর ৭ মাস ২০ দিন
অর্জন: আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন (FIDE) রেটিং (১,৫৭২ র্যাপিড রেটিং)
পূর্ববর্তী রেকর্ড: অনীশ সরকার (ভারত)
সাফল্য যত বড় হয়, তাকে ঘিরে ' scrutiny' বা খুঁটিয়ে দেখার প্রবণতা তত বেড়ে যায়। সর্বজ্ঞের অবিশ্বাস্য উত্থানের পরই কিছু দাবা বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষক এবং সংগঠকের মনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এত কম বয়সে রেটিং অর্জনের প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত, তা নিয়েই মূলত বিতর্ক শুরু হয়। প্রথমে এই সন্দেহ ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, দ্রুতই তা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের রূপ নেয়।
মূল অভিযোগের ক্ষেত্রগুলি:
১. ম্যাচ আয়োজনের পদ্ধতি: অভিযোগ উঠেছে, যে টুর্নামেন্ট বা ম্যাচগুলির মাধ্যমে এই শিশুটি রেটিং অর্জন করেছে, সেগুলির আয়োজন পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে করা হয়নি। এমনভাবে ম্যাচগুলি সাজানো হয়েছিল, যাতে দ্রুত রেটিং বাড়ানো যায়।
২. প্রতিপক্ষ নির্বাচন: অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষদের খেলার মান বা অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিছু ম্যাচ দুর্বল প্রতিপক্ষের সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলানো হয়েছে।
৩. ফলাফলের স্বচ্ছতা: ম্যাচগুলির স্কোরশিট এবং ফলাফল নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
৪. বাহ্যিক সহায়তা: সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হল—তিন বছর বয়সী একটি শিশুর জন্য ম্যাচ চলাকালীন বাহ্যিক বা অসৎ সহায়তা (External Aid) সম্পূর্ণরূপে এড়ানো সম্ভব কিনা। যদিও এর সরাসরি কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি, তবে এই সন্দেহ রেটিং প্রক্রিয়ার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর সর্বজ্ঞের পরিবার এবং তাঁর প্রশিক্ষকরা সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন।
পরিবারের বক্তব্য: তাঁরা জানিয়েছেন, শিশুটির প্রতিভা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং নিয়মিত কঠোর অনুশীলনের ফল। তাঁর বাবা-মা শুরু থেকেই লক্ষ্য করেন যে, অন্য শিশুদের মতো কার্টুন বা খেলনার বদলে তাঁদের সন্তানের আগ্রহ দাবার দিকে। তাকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি এবং সে আনন্দের সঙ্গে দাবা খেলে।
কোচের যুক্তি: প্রশিক্ষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত প্রশিক্ষণ পদ্ধতির কারণে বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা খুব অল্প বয়সেই জটিল বিষয় আয়ত্ত করতে সক্ষম। তাঁরা প্রতিভাকে সন্দেহের চোখে না দেখে, তাকে সঠিকভাবে বিকশিত করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন।
অনীশ সরকারের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রশিক্ষক গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া শিশুটির প্রতিভাকে উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে অনীশ প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা অনুশীলন করত। পরিবারগুলো বরাবরই শিশুদের ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার কথা বারবার উল্লেখ করেছে।
এই বিতর্ক বিশ্ব দাবা মহলকে দু'টি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত করেছে:
নিয়ম ও নৈতিকতার পক্ষ:
এই দলের মতে, এত কম বয়সে রেটিং দেওয়ার ক্ষেত্রে FIDE-এর নিয়ম আরও কঠোর হওয়া উচিত। তাঁরা মনে করেন, রেটিং অর্জনের জন্য খেলা ম্যাচগুলির গুণগত মান, প্রতিপক্ষের রেটিং এবং নিরপেক্ষ আরবিটারের উপস্থিতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা আবশ্যক। তাদের প্রধান উদ্বেগ:
শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের দিকটি যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
অল্প বয়সে রেটিং-এর লোভে যেন কোনো অসৎ উপায় অবলম্বন না করা হয়, যা খেলার নৈতিকতা নষ্ট করবে।
প্রতিভা ও সমর্থনের পক্ষ:
এই দল মনে করে, প্রতিভার কোনো বয়স হয় না এবং যদি নিয়ম মেনেই ম্যাচ খেলা হয়ে থাকে, তবে শুধুমাত্র বয়সের কারণে সাফল্যকে বাতিল করা উচিত নয়। তাঁদের মতে, অতীতেও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে প্রথমদিকে সন্দেহের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই ধরনের খুদে প্রতিভাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত, যাতে তারা ভবিষ্যতে বিশ্বনাথন আনন্দ বা ম্যাগনাস কার্লসেনের মতো কিংবদন্তি হতে পারে।
এই বিতর্কের আরও একটি গভীর দিক হল—শিশুদের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও মিডিয়ার চাপের বাস্তবতা।
মানসিক চাপ: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক খ্যাতি, মিডিয়ার নজর এবং এই ধরনের তীব্র বিতর্ক একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশবকে ব্যাহত করতে পারে। তাদের উপর মানসিক চাপ বাড়ার কারণে 'বার্নআউট' বা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারানোর ঝুঁকি থাকে।
শৈশবের সুরক্ষা: মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিভা যেমনই হোক না কেন, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিযোগিতার জগতে খুব তাড়াতাড়ি প্রবেশ করা এবং ক্রমাগত প্রত্যাশার চাপ মোকাবিলা করার জন্য শিশুর পারিবারিক ও প্রশিক্ষক স্তরের সমর্থন থাকা অপরিহার্য। অনীশ সরকারের পরিবারও এই বিষয়ে সচেতনতা দেখিয়েছিল, যেখানে তাঁর মা গ্র্যান্ডমাস্টার না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের পরিচয় প্রকাশ্যে জানাতে চাননি, যাতে তাঁর সন্তানের উপর চাপ না পড়ে।
বর্তমানে সংশ্লিষ্ট দাবা সংস্থা, সম্ভবত FIDE এবং ভারতের জাতীয় দাবা ফেডারেশন, এই অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই তদন্তে নিম্নলিখিত নথিগুলি পরীক্ষা করা হচ্ছে:
অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত ম্যাচের স্কোরশিট ও ভিডিও ফুটেজ।
ম্যাচগুলি আয়োজনের নিয়মকানুন ও নিরপেক্ষ আরবিটারদের ভূমিকা।
প্রতিপক্ষের রেটিং এবং ম্যাচের সময় তাদের খেলার মান।
তদন্তের রায়ই এই খুদে দাবাড়ুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়: শিশুটির সাফল্য আরও বড় স্বীকৃতি ও সম্মান পাবে এবং সে বিশ্বরেকর্ডকারী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।
যদি নিয়মভঙ্গের প্রমাণ মেলে: তবে এটি কেবল একজন খেলোয়াড়ের স্বপ্নের সমাপ্তি নয়, বরং তা পুরো দাবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার উপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেবে।
তিন বছর বয়সে আন্তর্জাতিক রেটিং অর্জনের এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক বিস্ময়। এটি একদিকে যেমন ভারতীয় দাবার উত্থান এবং শিশুদের দ্রুত শেখার ক্ষমতাকে নির্দেশ করে, তেমনই অন্যদিকে এটি আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়মের প্রয়োগ, নৈতিকতা এবং শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নটিও সামনে নিয়ে এসেছে।
এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত দাবা জগতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে: সর্বকনিষ্ঠ প্রতিভাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত? এবং আন্তর্জাতিক রেটিং-এর আকাঙ্ক্ষায় যেন খেলার পবিত্রতা ও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য কোনোভাবেই বলি না হয়। তদন্তের রায় যাই হোক না কেন, সর্বজ্ঞ সিং কুশওয়াহা (বা অনীশ সরকারের মতো অন্য খুদে দাবাড়ু) এর এই কাহিনিটি ইতিহাসে হয় বিস্ময়কর অনুপ্রেরণা হিসেবে, নতুবা এক তীব্র বিতর্কের অধ্যায় হিসেবে লেখা হবে। গোটা বিশ্ব এখন সেই চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায়।