সহজ কিছু যোগাসনেই ঘাড়–কাঁধের ব্যথা থেকে মিলতে পারে দ্রুত আরাম। যোগ মানেই যে জটিল আসন বা কঠিন অনুশীলন—তা নয়। যারা নতুন শুরু করছেন, তারাও চাইলে কিছু সহজ স্ট্রেচিং চেয়ারেই বসে করতে পারেন। ব্যস্ততার মধ্যেও কয়েক মিনিট সময় বের করলেই এই অভ্যাস শরীরকে করবে হালকা ও ব্যথামুক্ত।
আধুনিক কর্মজীবনের চাপে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন দ্রুত পাল্টে গেছে। বিশেষ করে অফিসে কাজ করা মানুষদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। দিনের বড় একটি অংশ ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের সামনে বসে কাটানো এখন যেন স্বাভাবিক নিয়ম। অনবরত টাইপ করা, রিপোর্ট তৈরি, মিটিং, অনলাইন আলোচনা—সব মিলিয়ে ঘাড় গুঁজে কাজ করার অভ্যাসের ফলে শরীরের উপরের অংশে নিত্যদিনই চাপ জমতে থাকে। দ্রুত কাজ শেষ করার তাড়নায় মাথা খানিকটা ওঠানোরও সময় থাকে না। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে বসে থাকার অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীরের পেশিগুলিকে দুর্বল করে তোলে।
শুরুতে হয়তো হালকা ব্যথা, টান ধরা কিংবা অস্বস্তি অনুভূত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সামান্য অসুবিধাই পরিণত হতে পারে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায়। ঘাড় বা কাঁধ নাড়াতে সমস্যা হওয়া, হাত উঁচু করতে ব্যথা লাগা, এমনকি ভারী কিছু ধরতে গেলেই শক্তি কমে যাওয়া—এসবই এই সমস্যার পরিচিত লক্ষণ। প্রতিদিন ৮–৯ ঘণ্টা একটানা একইভাবে বসে থাকার ফলে কাঁধ ও ঘাড়ের পেশিগুলি তাদের স্বাভাবিক সক্রিয়তা হারায় এবং শক্ত হয়ে পড়ে। এই কঠিন অবস্থারই নাম ‘ফ্রোজ়েন শোল্ডার’, যা অনেকের চলাফেরা এবং কাজকর্মকে আরও কঠিন করে তোলে।
এই সঙ্গে যোগ হয় মাউস ব্যবহারের চাপ। বাহ্যিক চোখে এটি সাধারণ একটি কাজ মনে হলেও, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাউস ব্যবহার করলে হাতের কব্জি, আঙুল এবং তালুতে অস্বস্তি দেখা দেয়। অনেকেই জানান, আঙুলে টান লাগে, তালুতে জ্বালা হয় কিংবা হাত কাঁপতে থাকে। এর ফলে কার্পাল টানেল সিনড্রোমের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে, যা মোটেও অবহেলা করার মতো নয়।
অধিকাংশ মানুষ প্রথমদিকে এই ব্যথা কমাতে দ্রুত উপশমের পথ খোঁজেন—মলম, স্প্রে বা গরম সেঁক। এতে সাময়িক আরাম মিললেও ব্যথা খুব দ্রুতই ফিরে আসে। কারণ সমস্যার মূল উৎস—দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, ভুল ভঙ্গি এবং পেশির অনিয়মিত ব্যবহার—চিকিৎসা না হলে ব্যথা বারবার ফিরে আসবে। অনেকেই ব্যথা সহ্য করতে না পেরে ব্যথানাশক ওষুধ খেতে শুরু করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। লিভার, কিডনি বা পেটে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা পরে আরও বড় স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করে।
এ অবস্থায় প্রয়োজন এমন সমাধান, যা ওষুধ বা রাসায়নিক নির্ভর না হয়ে দেহের স্বাভাবিক শক্তি ও নমনীয়তাকে ফিরিয়ে আনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত স্ট্রেচিং, ছোট ছোট বিরতি এবং সহজ যোগাভ্যাসই পারে ঘাড়–কাঁধ–হাতের পেশিকে সক্রিয় রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে। দিনে মাত্র কয়েক মিনিট সময় বের করেও এ ধরনের অনুশীলন করা যায়, এবং তা চেয়ারেই বসে সম্ভব।
শরীরের পেশিগুলিকে সচল রাখা, রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো এবং মনকে সতেজ রাখার জন্য এই ধরনের প্রাকৃতিক পদ্ধতির বিকল্প নেই। ওষুধ নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে ব্যথামুক্ত জীবনের দিকে এগোতে সহায়ক হয় এমন সহজ ব্যায়াম বা যোগাসন। নিয়মিত অনুশীলনে শরীরের কাঠিন্য কমে, নমনীয়তা বাড়ে এবং অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যথার প্রকোপ কমে আসে।
সুতরাং, একটানা ডেস্ক জবে ব্যথাকে জীবনের অংশ ভেবে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সামান্য সচেতনতা আর প্রতিদিন একটু অনুশীলনেই ব্যথাহীন ও স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্মজীবন ফিরে আসতে পারে।
যোগ প্রশিক্ষকদের মতে, ডেস্ক জব করা মানুষদের শরীরের উপরের অংশে জমে থাকা চাপ কমানোর সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর উপায় হল কয়েকটি সহজ যোগাসন। এ ধরনের আসন বিশেষত এমনভাবে সাজানো যে, শুরু করছেন এমন মানুষও যেন সহজেই করতে পারেন। যোগ মানেই জটিল বাঁক বা শরীর মুচড়ে ধরা কঠিন আসন নয়—এই ধারণা এখন বদলানো উচিত। খুবই সাধারণ স্ট্রেচিং বা মাসল অ্যাক্টিভেশন যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা চেয়ারেই বসে করা যায়।
এরই মধ্যে সবচেয়ে উপকারী ও সহজ আসন হল ঊর্ধ্ব হস্তাসন (Urdhva Hastasana)। নিয়মিত অভ্যাস করলে ঘাড়, কাঁধ ও হাতের ব্যথা কার্যকরভাবে কমে। পেশির উপর চাপ কমে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, শরীর অনেকটা হালকা লাগে এবং মনঃসংযোগও বৃদ্ধি পায়।
নিচে দেয়া হলো বিস্তারিত নির্দেশিকা—কীভাবে করবেন, কতক্ষণ করবেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে এই আসন আপনার জন্য বেশি উপকারী।
চেয়ারে বসে অভ্যাস শুরু করুন। পা মাটিতে ঠেকিয়ে রাখুন এবং পিঠ সম্পূর্ণ সোজা রাখুন। চেয়ারে হেলান না দেওয়াই ভালো। কারণ পিঠ সোজা রাখলেই পেশির সক্রিয়তা বাড়ে এবং স্ট্রেচিং সঠিকভাবে হয়।
পা দুটি সমানভাবে মাটিতে ছোঁয়া
হাঁটু ৯০ ডিগ্রি
কোমর টানটান
পেট হালকা শক্ত
কাঁধ ঢিলে
এই ভঙ্গিই পুরো স্ট্রেচিংয়ের ভিত্তি।
ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে শুরু করুন। শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত কানের পাশ দিয়ে উপরের দিকে তুলুন।
হাত একেবারে সোজা থাকবে
কাঁধ কান থেকে দূরে
তালু একে-অপরের দিকে মুখ করে থাকবে
হাত তুলতে তুলতে বুকে চাপ কমবে, বুক প্রসারিত হবে এবং কাঁধের পেশিগুলি সক্রিয় হতে শুরু করবে।
হাত দুইটি মাথার উপর নিয়ে গিয়ে তালু দুটি জোড়া করে ‘নমস্কার’ ভঙ্গি করুন। এবার ধীরভাবে মাথা তুলুন এবং হাতের দিকে তাকান।
এই অবস্থায়:
সারা শরীর লম্বা ও সোজা থাকবে
বুক প্রসারিত হবে
ঘাড়ের পেশি হালকা টান অনুভব হবে
এটি করলেই কাঁধ, ঘাড়, হাত—সবকিছু একসঙ্গে স্ট্রেচ হয়।
এই ভঙ্গিতে ৩০ সেকেন্ড ধরে থাকুন।
শরীর যেন কোনও দিকেই বাঁক না নেয়—সে দিকে লক্ষ রাখুন।
শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে ধীরে ধীরে দুই হাত নামিয়ে নিন। মাথাও সোজা করুন।
এভাবে উঠানামার মধ্যেই পেশির স্বাভাবিক অ্যাক্টিভেশন ঘটে।
প্রতিবার ৩০ সেকেন্ড ধরে ৫–৭ বার পুনরাবৃত্তি করুন।
প্রতিটি সেটের মাঝে ১০–২০ সেকেন্ড গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিন।
এই বিরতি শরীরকে অক্সিজেন দেয়, রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং স্ট্রেচিংয়ের প্রভাব বাড়ায়।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে কাঁধের পেশি দুর্বল ও শক্ত হয়ে পড়ে। এই আসন কাঁধের জয়েন্ট খুলে দেয়, পেশিকে সক্রিয় করে এবং ‘ফ্রোজ়েন শোল্ডার’-এর সমস্যা কমায়।
বাইসেপ, ট্রাইসেপ এবং কব্জির অংশ সক্রিয় হয়। বাতের ব্যথা কমে, দুর্বলতা কমে।
স্পন্ডিলাইটিস বা ঘাড় না ঘোরাতে পারার সমস্যা থাকলে আসনটি অত্যন্ত কার্যকর। পেশি নমনীয় হয়, ব্যথা কমে।
হাত উঁচু করে রাখলে শরীরের উপরের অংশ থেকে নিচের দিকে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয়। এর ফলে শরীরের ক্লান্তি কমে, শক্তি বাড়ে।
হাত ও বাহুর অতিরিক্ত জমে থাকা চর্বি ঝরাতে সাহায্য করে। আসনটি শারীরিক মেটাবলিজমও বাড়ায়।
যেকোনো যোগাভ্যাসের মতোই গভীর শ্বাসের সঙ্গে এ আসন মনকে শান্ত করে, ফোকাস বাড়ায় এবং উদ্বেগ কমায়।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে এই আসন এড়িয়ে চলা উচিত।
মাইগ্রেন থাকলে প্রশিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া করবেন না।
স্নায়ুর রোগ বা প্রেসক্রিপশনে স্নায়ুর ওষুধ খেলে চিকিৎসকের পরামর্শ আবশ্যক।
এ ছাড়া যারা সদ্য অস্ত্রোপচার করেছেন বা কাঁধের তীব্র ব্যথা রয়েছে, তারাও এই আসন করার আগে বিশেষজ্ঞের অনুমতি নেবেন।
ডেস্ক জবে ব্যথা হওয়া আজকাল খুবই সাধারণ সমস্যা। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধানও ততটাই সহজ—যদি প্রতিদিন মাত্র কয়েক মিনিট সময় বের করা যায়। ঊর্ধ্ব হস্তাসন এমন একটি আসন, যা চেয়ারেই বসে অনায়াসে করা যায় এবং যার প্রভাব অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত অভ্যাস করলে ঘাড়, কাঁধ, হাতের অস্বস্তি দূর হবে, রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হবে, মনও সতেজ থাকবে। ব্যথানাশক বা স্প্রের উপর নির্ভর করতে হবে না।
চাইলে আরও ২–৩টি চেয়ার যোগের আসন যোগ করে পুরো একটি ১০ মিনিটের রুটিনও বানিয়ে দিতে পারি।
চাইলে কি সেটাও বানিয়ে দেব?