Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

গ্লোবাল পিস অনার্সের মঞ্চে রণবীর সিং: শহিদ পরিবারে সাহস ও আশার বার্তা !

গ্লোবাল পিস অনার্স ২০২৫-এর জমকালো মঞ্চে রণবীর সিং স্মরণ করলেন ভারতের তিনটি মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার নিহতদের—২৬/১১ মুম্বাই, পাহালগাম বিস্ফোরণ এবং দিল্লির বাজারে হওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণ। হাজারো অতিথির সামনে তিনি তুলে ধরেন বীর পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এবং মানবতার প্রতি অবিচল বিশ্বাসের গল্প। রণবীরের আবেগঘন বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয় শান্তি ও সহমর্মিতার আহ্বান। তিনি বলেন, সন্ত্রাসের অন্ধকারকে আলো দিয়েই পরাজিত করতে হবে, আর সেই আলো ছড়াতে পারে তরুণ প্রজন্মই। নিহতদের পরিবার, বিশেষ করে শিশুদের দৃঢ় মনোবল তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বলেও জানান তিনি। রাতের শেষে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় স্মৃতি, শ্রদ্ধা, এবং মানবতার নতুন প্রতিশ্রুতির এক অনন্য মুহূর্তে।

গ্লোবাল পিস অনার্স ২০২৫—একটি রাত যা কেবল পুরস্কার বিতরণের জন্য নয়, বরং মানবতার প্রতি শপথ নবায়নের প্রাঙ্গণ হিসেবেই ইতিহাসে স্থান করে নিল। আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের আকাশছোঁয়া গম্বুজ আলোয় ঝলমল করছিল, লাল কার্পেটে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শান্তির দূত, মানবাধিকার কর্মী, শিল্পী, রাষ্ট্রপ্রধান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। কিন্তু এই জমকালো আবহের ভিড়ে দাঁড়িয়েও এক মুহূর্তে নীরবতা নেমে আসে যখন বলিউড তারকা রণবীর সিং মঞ্চে এগিয়ে আসেন। তাঁর উপস্থিতি ছিল দৃপ্ত, আত্মবিশ্বাসী, অথচ চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল এক বিশেষ শোকের ভার। এই রাত তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ভারতের তিনটি মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার শহিদ ও নিহত সাধারণ মানুষদের—২৬/১১ মুম্বাই হামলা, পাহালগাম পর্যটন অঞ্চলে হওয়া বিস্ফোরণ, এবং দিল্লিতে সংঘটিত তা-ব যে বিস্ফোরণ যার ক্ষত এখনো অনেকের জীবনে অমোচনীয়।

হলরুমটিতে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষ নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলেন রণবীরের দিকে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ থেমে গিয়ে যেন এক অদৃশ্য আলো পুরো প্রেক্ষাগৃহকে আচ্ছন্ন করেছিল। রণবীর তাঁর বক্তব্য শুরু করেন মুম্বাইয়ের ২৬/১১-এর ভয়াবহ রাতের কথা দিয়ে। সেই রাত যেদিন শুধু একটি শহর নয়, পুরো দেশ শিউরে উঠেছিল। তিনি বললেন, ২৬/১১ শুধুমাত্র একটি তারিখ নয়, এটি আমাদের জাতির ইতিহাসে খচিত এক বেদনার অধ্যায়, যা আমাদের শেখায় একতা, ধৈর্য, সাহস এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার শক্তি কতটা গভীর হতে পারে। তাঁর কণ্ঠের কম্পনেই বোঝা যাচ্ছিল এই যন্ত্রণার স্মৃতি তিনি নিজের অন্তরেও ধারণ করেন।

মুম্বাই হামলার পরে দেশের পুলিশ বাহিনীর বীরত্ব, তাজ হোটেলের কর্মচারীদের অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের একে অপরের প্রতি নিঃস্বার্থ সাহায্যের কথাও তিনি স্মরণ করেন। রণবীর বলেন, যে আতঙ্কের মধ্যে থেকেও শহরের মানুষ একে অপরকে রক্ষা করতে ছুটে গিয়েছিলেন, তা মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবিগুলোর একটি। সন্ত্রাসের লক্ষ্য ভয় সৃষ্টি করা, কিন্তু আমরা সেই ভয়কে শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছি। এই শক্তিই আমাদের পরিচয়।

এরপর তিনি কথা বলেন পাহালগামের ঘটনার কথা। প্রকৃতি ও শান্তির প্রতীক সেই উপত্যকা, যেখানে প্রতি বছর হাজারো পর্যটক সৌন্দর্যের খোঁজে ভিড় জমান। কিন্তু সেখানেই বিদীর্ণ হয়েছিল নিরীহ মানুষের জীবন। রণবীর স্মরণ করালেন সেই পরিবারগুলোর কথা যারা আনন্দযাত্রায় বের হয়ে পরিণত হয়েছিল এক শোকাবহ ঘটনার সাক্ষী। তিনি বলেন, পাহালগাম কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি ভারতের হৃদয়ের সৌন্দর্যের প্রতীক। সেই সৌন্দর্য যখন রক্তে ভিজে যায়, তখন শুধু প্রশ্ন জাগে মানুষ কি সত্যিই ঘৃণার থেকে মুক্ত হতে পারবে? তাঁর এই প্রশ্ন হলজুড়ে নিস্তব্ধতা সৃষ্টি করে। যেন উপস্থিত প্রত্যেকে নিজের মনে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন।

রণবীর এরপর উল্লেখ করেন দিল্লির বিস্ফোরণের ঘটনার কথা একটি শহর যা দেশের রাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, সংস্কৃতির ধারক, আবার বৈচিত্র্যের প্রতিচ্ছবি। বাজারের ভিড়ে হওয়া সেই বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু সাধারণ মানুষ যাদের কেউ ছিলেন চাকরিজীবী, কেউ ছাত্র, কেউ বা পথচারী। এই শহরের কোলাহল যে মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল, সেই মুহূর্ত দেশের প্রতি গভীর ক্ষত রেখে গেছে। রণবীর বলেন, দিল্লি হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সন্ত্রাসের কোনও ধর্ম নেই, কোনও দেশ নেই, কোনও আদর্শ নেই। সন্ত্রাস কেবল ধ্বংসের ভাষা বোঝে। আর আমাদের কাজ হলো সেই অন্ধকারকে আলো দিয়ে দূর করা, সংহতি দিয়ে জবাব দেওয়া।

তাঁর বক্তব্য আরও গভীর আবেগময় হয়ে ওঠে যখন তিনি নিহতদের পরিবারের কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন কয়েকজন শহিদের সন্তানদের কথা, যাদের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেছিলেন একটি স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে। তারা কেউ হারিয়েছে বাবা, কেউ মা, কেউ বা দুজনকেই। তবুও তাদের চোখে তিনি দেখেছেন আশার দীপ্তি। রণবীর বলেন, এই শিশুরা আমাকে শিখিয়েছে সাহস কী, বেঁচে থাকার লড়াই কী, আর কষ্টের মধ্যেও মানুষের হাসি কত অমূল্য হতে পারে। তাদের এই মনোবল আমাদের নতুন প্রজন্মের শক্তি।

গ্লোবাল পিস অনার্স ২০২৫-এর মঞ্চটি শুধু স্মরণ বা শোকের জায়গা ছিল না; এটি ছিল প্রতিজ্ঞা করার স্থান যে পৃথিবীর যেদিকে ঘৃণা ছড়ায়, সেদিকে আমরা আলো বহন করব। মঞ্চে বড় স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছিল বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের ছবি শিক্ষক, দোকানদার, সৈনিক, পর্যটক, রিকশাচালক, নিরাপত্তারক্ষী, যে কেউ। এই ছবিগুলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গের সীমারেখা ভেঙে দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার কোনও আলাদা পরিচয় নেই। মানুষের পরিচয় একটাই সে মানুষ।

news image
আরও খবর

রণবীর তাঁর বক্তব্যে একাধিকবার শান্তির গুরুত্বের কথা বলেন। কিন্তু এটি সাধারণ শান্তির কথা নয়, বরং সক্রিয় শান্তি যা নিজের ভেতর থেকে শুরু করতে হয়। তিনি বলেন, আমরা যদি নিজেদের ছোট ছোট বিদ্বেষ, অপছন্দ, রাগ, বিভাজন ভেতর থেকে দূর করতে না পারি, আমরা বড় করে শান্তির কথা বলতে পারি না। শান্তি মানে যুদ্ধের অভাব নয়; শান্তি মানে সহমর্মিতা, বোঝাপড়া, মানবিকতা।

বক্তৃতার মধ্যবর্তী মুহূর্তে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন নিরাপত্তারক্ষী, পুলিশ, এনএসজি কমান্ডো এবং চিকিৎসকদের। এই মানুষেরা প্রতিটি ঘটনার সময় নিজেদের জীবন বাজি রেখে অন্যকে রক্ষা করেছিলেন। তাদের এই আত্মত্যাগের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং হলজুড়ে উপস্থিত অতিথিরা উঠে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে সেই সম্মানকে আরও শক্তিশালী করেন। এই করতালির আওয়াজ ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ছিল মানুষের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য কৃতজ্ঞতার প্রতিধ্বনি।

রাতটি আবেগে ভরপুর হয়ে উঠলে রণবীর গাইলেন একটি বিশেষ কবিতার অংশ, যা তিনি নিজেই লিখেছেন শান্তিকে উৎসর্গ করে। কবিতার পংক্তিগুলো ছিল:
রক্তে রঙিন পথের ধুলো, তবু জেগে থাকে আলো,
ঘৃণার দেয়াল ভেদ করবে ভালবাসার চাল। 
এই কয়েকটি লাইনে যেন তিনি গোটা রাতের অনুভূতিকে এক সুরে বেঁধে দিলেন। হলজুড়ে নীরবতা নেমে আসে, সবার চোখে যেন জল চিকচিক করছিল।

অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে রণবীর আহ্বান জানান বিশ্বের তরুণ প্রজন্মকে। তিনি বলেন, “তরুণরাই পরিবর্তনের নায়ক। আপনারা যদি শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেন, ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো আর কোনো মা সন্তানের লাশ বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়বেন না, হয়তো আর কোনো শহর আগুনে জ্বলবে না, হয়তো কোনো শিশু রাতের ঘুম ভেঙে আতঙ্কে দৌড়াবে না।” তাঁর এই কথাগুলো শুধু একটি আবেদন ছিল না, বরং একটি দায়িত্ববোধের আলোড়ন তুলল সবার মনে।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর যখন পুরো অডিটোরিয়ামটি ধীরে ধীরে আলো কমিয়ে ফেলছে, তখনো রণবীরের বলা শব্দগুলো ভেসে বেড়াচ্ছিল বাতাসে মানবতার প্রতি বিশ্বাস, শান্তির প্রতি প্রতিশ্রুতি, এবং অতীতের ক্ষত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান। বাইরে রাতের আকাশে টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছিল, যেন তারাও সম্মতি জানাচ্ছিল এই বার্তাকে—যে আলো আছে, এবং আমরা চাইলে তা আরও উজ্জ্বল হতে পারে।

গ্লোবাল পিস অনার্স ২০২৫-এর এই বিশেষ অনুষ্ঠানের মূল বার্তাটি ছিল অত্যন্ত গভীর—স্মৃতি শুধু অতীতকে ধরে রাখে না, তা ভবিষ্যতের পথও দেখায়। রণবীর সিং এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে সেই বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি কেবল তিনটি সন্ত্রাসী হামলার নিহতদের সঙ্গে মানবিক বন্ধন তৈরি করেনি, বরং বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যেখানে ঘৃণা জন্ম নেয়, সেখানে ভালোবাসার বীজ বপন করাই আমাদের প্রকৃত কাজ।

এই রাতটি তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল অশ্রু, স্মৃতি, প্রতিজ্ঞা, ভালবাসা, আত্মত্যাগ এবং শান্তির গাথা। আর রণবীর সিং সেই গাথার সারথি হয়ে দাঁড়ালেন, যিনি মানুষের হৃদয়ে আবারও আলো জ্বালিয়ে দিলেন অন্ধকার কখনোই চিরস্থায়ী নয়, যদি মানুষ আলোকে বেছে নিতে জানে। তিনি বলেন, সন্ত্রাসের অন্ধকারকে আলো দিয়েই পরাজিত করতে হবে, আর সেই আলো ছড়াতে পারে তরুণ প্রজন্মই। নিহতদের পরিবার, বিশেষ করে শিশুদের দৃঢ় মনোবল তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বলেও জানান তিনি। রাতের শেষে পুরো অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় স্মৃতি, শ্রদ্ধা, এবং মানবতার নতুন প্রতিশ্রুতির এক অনন্য মুহূর্তে।

Preview image