লিভার খারাপ হলে শরীরে একের পর এক জটিল সমস্যা দেখা দেয় তাই এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি সুস্থ রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন সঠিক কিছু খাবার প্রতিদিনের ডায়েটে রাখলে লিভার পরিষ্কার ও কার্যক্ষম থাকে এই প্রতিবেদনে জেনে নিন এমন পাঁচটি খাবারের কথা যা লিভারের যত্ন নিতে সাহায্য করে
আধুনিক জীবনযাত্রার দ্রুত গতি অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং শারীরিক কসরতের অভাব শরীরের নানা অঙ্গের উপর চাপ সৃষ্টি করে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় লিভার। লিভার মানবদেহের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যা শরীরকে বিষমুক্ত রাখা হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখা রক্ত পরিষ্কার করা এবং শক্তি উৎপাদনের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। অথচ এই অঙ্গটি নীরবে কাজ করে যায় বলে প্রাথমিক অবস্থায় তার অসুস্থতা সহজে ধরা পড়ে না। অল্প বয়সেই বর্তমানে বহু মানুষের মধ্যে লিভারের সমস্যা দেখা যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
লিভার অসুস্থ হলে শরীরে ধীরে ধীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয় যেমন অতিরিক্ত ক্লান্তি হজমের সমস্যা পেট ফাঁপা ত্বক ও চোখে হলুদ ভাব ওজন বৃদ্ধি কিংবা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলি গুরুত্ব না দিলে লিভার ফ্যাটি লিভার হেপাটাইটিস কিংবা সিরোসিসের মতো জটিল রোগে পরিণত হতে পারে। তাই চিকিৎসকেরা সব সময়ই লিভার সুস্থ রাখতে জীবনযাত্রায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলে থাকেন।
লিভার সুস্থ রাখতে প্রথম শর্ত হল কম তেল মশলা দেওয়া খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত ভাজাভুজি ও প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলা। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা অত্যন্ত জরুরি কারণ জল শরীরের ভিতর জমে থাকা দূষিত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে। প্রয়োজন ছাড়া বেদনানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস লিভারের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে তাই এই ধরনের ওষুধ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। মদ্যপান ও ধূমপান লিভারের সবচেয়ে বড় শত্রু তাই লিভার সুস্থ রাখতে এই অভ্যাসগুলি ত্যাগ করাই শ্রেয়।
জীবনযাত্রার এই পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় কিছু বিশেষ খাবার রাখলে লিভার পরিষ্কার রাখতে এবং তার কর্মক্ষমতা বাড়াতে অনেকটাই সাহায্য পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক কিছু খাবার রয়েছে যেগুলি নিয়মিত খেলে লিভারের ভিতরে জমে থাকা বিষাক্ত উপাদান দূর হয় এবং লিভার নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে। এই প্রতিবেদনে এমন পাঁচটি খাবারের কথা বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হল যেগুলি লিভার সুস্থ রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
রসুন লিভার পরিষ্কারের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাকৃতিক উপাদান। রসুনে থাকা সালফার যৌগ লিভারের এনজাইম সক্রিয় করতে সাহায্য করে যা শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। প্রতিদিন রান্নার সময় দুই থেকে তিনটি রসুন ব্যবহার করলে লিভারের জন্য ভালো ফল পাওয়া যায়। অনেকেই সকালে খালি পেটে কাঁচা রসুন খেয়ে থাকেন যা লিভার পরিষ্কার রাখতে আরও বেশি কার্যকর। রসুন কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে ফলে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিও কমে যায়। নিয়মিত রসুন খাওয়ার অভ্যাস লিভারকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে সহায়ক।
পাতিলেবু লিভার যত্নে অত্যন্ত পরিচিত একটি উপাদান। পাতিলেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে যা লিভারের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস ঈষদুষ্ণ জলে আস্ত একটি পাতিলেবুর রস মিশিয়ে খেলে লিভার পরিষ্কার হয় এবং হজম প্রক্রিয়া উন্নত হয়। এই অভ্যাস শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়াতে সাহায্য করে ফলে লিভারে অতিরিক্ত ফ্যাট জমার সম্ভাবনা কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই পানীয় নিয়মিত খেলে লিভার নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে পারে।
গ্রিন টি বর্তমানে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। লিভার সুস্থ রাখতে গ্রিন টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিন টিতে থাকা ক্যাটেচিন নামক অ্যান্টি অক্সিডেন্ট লিভারে জমে থাকা দূষিত পদার্থ দূর করতে সাহায্য করে। লিভারে দূষিত পদার্থ জমলে স্থূলতা ও ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দেখা দেয়। গ্রিন টি সেই ক্ষতিকর উপাদান কমিয়ে লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এক কাপ গ্রিন টি পান করলে শুধু লিভারই নয় সারা শরীরই উপকৃত হয়। তবে অতিরিক্ত গ্রিন টি খাওয়ার বদলে দিনে দুই থেকে তিন কাপই যথেষ্ট।
হলুদ ভারতীয় রান্নার একটি অপরিহার্য উপাদান এবং আয়ুর্বেদে হলুদের গুরুত্ব অপরিসীম। হলুদের মধ্যে থাকা কারকিউমিন নামক উপাদান লিভার পরিষ্কার করতে খুব দ্রুত কাজ করে। এটি লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং নতুন কোষ গঠনে সহায়ক ভূমিকা নেয়। নিয়মিত হলুদ মেশানো খাবার খেলে লিভার দীর্ঘদিন ভালো থাকে। অনেকেই প্রতিদিন রাতে দুধের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে খান যা লিভার ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুইয়ের জন্যই উপকারী। হলুদ শরীরের ভিতরের বিষাক্ত উপাদান দূর করে লিভারকে হালকা রাখে।
অ্যাভোকাডো আধুনিক সময়ে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং পুষ্টিকর ফল হিসেবে পরিচিত। সুপারফুড শব্দটি সাধারণত সেই সব খাবারের জন্য ব্যবহার করা হয় যেগুলির পুষ্টিগুণ খুব বেশি এবং যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে সুস্থ রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। অ্যাভোকাডো ঠিক তেমনই একটি ফল যা লিভারের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ফলে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায় এবং একই সঙ্গে লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে দেয় না। অ্যাভোকাডোতে থাকা গ্লুটাথিয়ন নামক শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট লিভারকে ফ্রি র্যাডিকেলজনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
ফ্রি র্যাডিকেল হল এমন ক্ষতিকর অণু যা শরীরের কোষের ক্ষতি করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জটিল রোগের জন্ম দেয়। লিভার যেহেতু শরীরের প্রধান ডিটক্সিফাইং অঙ্গ তাই এই ফ্রি র্যাডিকেলের আক্রমণ প্রথমেই লিভারের উপর পড়ে। অ্যাভোকাডো নিয়মিত খেলে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলির প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। ফলে লিভারের কোষ দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে এবং দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
লিভারের কোষ সুস্থ থাকলে তার কার্যকারিতাও স্বাভাবিক থাকে। লিভার শরীরের মধ্যে জমে থাকা বিষাক্ত উপাদান ছেঁকে বের করে দেয় এবং হজম প্রক্রিয়াকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। অ্যাভোকাডো লিভারের এনজাইমের কার্যকারিতা উন্নত করে যার ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া সঠিকভাবে চলতে পারে। লিভারের এনজাইম ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে ফ্যাট জমতে শুরু করে এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ে। অ্যাভোকাডো সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
এই ফলটি প্রতিদিন অল্প পরিমাণে খাওয়া যায়। স্যান্ডউইচের সঙ্গে অ্যাভোকাডো ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা সালাদে মিশিয়েও খাওয়া যায়। কেউ চাইলে শুধু ফল হিসেবেও অ্যাভোকাডো খেতে পারেন। নিয়মিত অল্প পরিমাণে অ্যাভোকাডো খেলে লিভারের পাশাপাশি হৃদযন্ত্র ত্বক এবং স্নায়ুতন্ত্রও উপকৃত হয়। কারণ এতে থাকা ভালো ফ্যাট শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।
লিভার সুস্থ রাখা কোনও এক দিনের কাজ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক এবং নিয়মিত যত্নের বিষয়। আজ দুদিন ভালো খেয়ে আবার অনিয়মিত জীবনযাত্রায় ফিরে গেলে লিভার সুস্থ রাখা সম্ভব নয়। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে সুস্থ অভ্যাস গড়ে তুললেই লিভারের প্রকৃত যত্ন নেওয়া যায়। তেল মশলা কম দেওয়া খাবার খাওয়া পর্যাপ্ত শাকসবজি এবং ফল খাওয়া পর্যাপ্ত জলপান করা এই সব বিষয় লিভার ভালো রাখতে সাহায্য করে।
লিভারের উপর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার মদ্যপান এবং ধূমপানের কারণে। তাই লিভার সুস্থ রাখতে হলে এই অভ্যাসগুলি নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি অপ্রয়োজনে বেদনানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস লিভারের জন্য ক্ষতিকর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন কোনও ওষুধ খেলে তা লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা লিভারের জন্য খুবই উপকারী। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট হাঁটা যোগব্যায়াম বা হালকা ব্যায়াম করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ঠিক থাকে এবং লিভারে ফ্যাট জমার আশঙ্কা কমে যায়। পর্যাপ্ত ঘুমও লিভারের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কম ঘুম হলে শরীর ঠিকমতো নিজেকে মেরামত করতে পারে না যার প্রভাব লিভারের উপরও পড়ে।
মানসিক চাপ লিভারের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন মানসিক চাপ থাকলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং লিভারের কাজেও তার প্রভাব পড়ে। তাই মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান যোগব্যায়াম বা নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া খুবই প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে লিভার ভালো থাকলে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও সুস্থ থাকে। লিভার ঠিকমতো কাজ করলে হজম ভালো হয় শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। তাই ভবিষ্যতে সুস্থ জীবন কাটাতে চাইলে আজ থেকেই লিভারের যত্ন নেওয়া শুরু করা উচিত। নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার অ্যাভোকাডোর মতো উপকারী ফল সঠিক জীবনযাত্রা এবং সচেতন অভ্যাসই পারে লিভারকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে।