Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রামপুরহাট মেডিক্যালে ডাক্তারদের রেস্ট রুমে আগুন, আতঙ্কে হাসপাতাল চত্বর

রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারদের রেস্ট রুমে হঠাৎ আগুন লাগায় পুরো হাসপাতাল চত্বরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

দুর্ঘটনা

রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল— বীরভূমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য-চালিত চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার-হাজার রোগী এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন। জেলাশহর তো বটেই, সংলগ্ন গ্রামাঞ্চলের মানুষও জীবনরক্ষায় নির্ভর করেন এই হাসপাতালে। সেই হাসপাতালের মধ্যেই যখন হঠাৎ আগুন লাগে, তাও আবার চিকিৎসকদের রেস্ট রুমে— তখন স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক ছড়ানো অনিবার্য। মঙ্গলবার সন্ধেবেলা রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারদের নির্দিষ্ট বিশ্রামকক্ষে হঠাৎ করে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। আগুন একবার রুমে ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতাল চত্বর জুড়ে চাপে পড়ে যায় রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী, নার্সিং স্টাফ থেকে শুরু করে চিকিৎসকেরা পর্যন্ত।

প্রথম আতঙ্ক: হঠাৎ ধোঁয়া, দৌড়াদৌড়ি ও বিশৃঙ্খলার শুরু

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে উঠে আসে, প্রথমে এক ধরনের পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে করিডোরে। প্রথমে অনেকে ভেবেছিলেন সম্ভবত কোনও ইলেকট্রিক বোর্ডে ছোটখাটো শর্ট সার্কিট হয়েছে। তবে গন্ধের তীব্রতা দ্রুত বাড়তে থাকায় চিকিৎসকরা আশঙ্কা করেন যে ব্যাপারটি স্বাভাবিক নয়। কয়েকজন সিনিয়র ও জুনিয়র ডাক্তার রুমটির দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখেন দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে ঘন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তখনই তাঁরা সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং শব্দ করে অন্যদের ডাকেন।

হাসপাতালে উপস্থিত ইন্টার্ন চিকিৎসকের একজন বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো কোনও কেতলি বা ইলেকট্রিক ওভেনে গরম জলের চা বানাতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে। কিন্তু দরজা খুলতেই দেখি কালো ধোঁয়ায় রুম ভরে গেছে। ভিতরে থাকা সামগ্রী গরম হয়ে উঠছে, আর আগুন লাফাচ্ছে। সত্যিই ভয়ের মুহূর্ত ছিল।”

ধোঁয়া ছড়াতেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়। অনেকে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠেন, কেউ বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেন, আবার কেউ চোখ ও নাকে জ্বালা অনুভব করেন। হাসপাতালের ওয়ার্ডের বাইরে— বিশেষ করে মেডিসিন, সার্জারি ও পেডিয়াট্রিক বিভাগে ভিড় বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষী ও নার্সিং স্টাফরা ছুটে এসে রোগীদের সামলাতে শুরু করেন।

আগুনের উৎস: কীভাবে লাগল? প্রাথমিক অনুমান বনাম তদন্ত

এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— কীভাবে ডাক্তারদের রেস্ট রুমে হঠাৎ করে আগুন লাগল?

রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজের প্রশাসনিক কর্তারা প্রথমেই জানিয়ে দেন, রুমটিতে একাধিক ইলেকট্রিক ডিভাইস থাকে— পাখা, চার্জার, ইলেকট্রিক কেটলি, ওভেন, কিছু ক্ষেত্রে হিটারও রাখা থাকে। আধুনিক হাসপাতালগুলোয় ডাক্তারদের দীর্ঘ শিফটের কথা মাথায় রেখে রেস্ট রুমে সাধারণত এইসব সুবিধা থাকে। আগুনের কারণ হিসাবে প্রাথমিকভাবে দুটি সম্ভাবনার কথা বলা হয়:

  1. ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট — পুরনো তার, ওভারলোড, অথবা কোনও যন্ত্রের ত্রুটি।

  2. ইলেকট্রিক কেটলি বা ওভেন অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরা

তবে কয়েকজন চিকিৎসক দাবি করেন, রেস্ট রুমের ইলেকট্রিক লাইন নিয়ে আগেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। মাঝে-মধ্যে ফিউজ উড়ে যাওয়া বা সুইচ বোর্ডে স্পার্ক দেখা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতাল সূত্রে এক কর্মী বলেন, “বিপুল লোড পড়ে লাইনগুলির উপর। AC, ফ্যান, চার্জিং, লাইট— সব একসঙ্গে চলে। টেকনিক্যাল টিমকে বার বার বলা হয়েছিল কিন্তু সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি।”

অন্যদিকে হাসপাতালের সুপার বলেন, “পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনও বক্তব্য দেওয়া ঠিক নয়। দমকল ও ইলেকট্রিক বিভাগের বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করবেন। তার পরে আমরা নিশ্চিত হতে পারব।”

দমকলের ভূমিকা: দ্রুত হস্তক্ষেপেই নিয়ন্ত্রিত আগুন

ধোঁয়া ও আগুন দেখা মাত্রই হাসপাতাল প্রশাসন দমকল বিভাগে খবর দেয়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই দমকল কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। তাদের তৎপরতা হাসপাতালে বড় বিপর্যয় ঠেকাতে সাহায্য করে।

দমকলের এক কর্মী বলেন, “ঘটনাটি গুরুতর হতে পারত। রুমটি ডাক্তারদের বিশ্রামের জায়গা, ভিতরে বালিশ, ম্যাগাজিন, ব্যাগ, বিছানা— সব inflammable জিনিসে ভর্তি। যদি আগুন আরও পাঁচ বা দশ মিনিট দেরি করে দেখতে পেতেন, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতে পারত। আমরা সঙ্গে সঙ্গে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি।”

বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাসপাতালের মতো জায়গায় আগুন লাগার ঝুঁকি অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশি কারণ সেখানে অনেক ছোটখাটো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়মিত ব্যবহার হয়। যেগুলো সময়মতো সার্ভিসিং না করা হলে বিপদ ডেকে আনে।

রোগী, চিকিৎসক ও নার্সদের আতঙ্ক: চোখে-নাকে জ্বালা, দমবন্ধ অবস্থা

ধোঁয়া ছড়ানোর পর প্রায় ১৫–২০ মিনিট হাসপাতালের কিছু অংশে দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। অনেক রোগী বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুদের শ্বাসকষ্টের অভিযোগ ওঠে। নার্সরা দ্রুত মাস্ক বিলি করেন এবং কিছু রোগীকে অন্য ওয়ার্ডে সরিয়ে দেন। শিশু বিভাগ বিশেষভাবে সতর্ক ছিল, কারণ ধোঁয়া শিশুদের ফুসফুসে দ্রুত প্রভাব ফেলে।

একজন রোগী বলেন, “হঠাৎ দেখি সবাই দৌড়াচ্ছে, নার্সরা বলছে বাইরে যেতে। আমি তো ভয় পেয়ে গেছি। ভেবেছিলাম হাসপাতালেই আগুন লেগে গেছে। আমরা বেরোতেই ধোঁয়া নাকে লাগে। চোখ জ্বালা করছিল।”

চিকিৎসকদের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা যায়। অনেকেই তখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বা শিফট পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন। আগুন রেস্ট রুমে লাগায় তাঁদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একজন ডাক্তার বলেন, “ব্যাগ, বই, চার্জার, কিছু নথি— অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে গেছে। তবে প্রাণহানি না হওয়া সবচেয়ে বড় বিষয়।”

হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠল প্রশ্ন

এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে হাসপাতালের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন। চিকিৎসাকেন্দ্র এমনিতেই জটিল পরিবেশ— এখানে অক্সিজেন সিলিন্ডার, ওষুধ, রাসায়নিক, নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্র একসঙ্গে থাকে। ফলে ছোটখাটো আগুনও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বেশ কয়েকজন চিকিৎসক দাবি করেন—

এক চিকিৎসকের কথায়, “আমরা প্রতিদিন ১২–১৬ ঘণ্টা কাজ করি। রেস্ট রুমটুকু যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে সেটা খুবই উদ্বেগজনক বিষয়। সকলের জীবন হুমকির মুখে পড়ে।”

অভিভাবকদের আশঙ্কা: রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হবে কি?

ঘটনার পর বহু রোগীর পরিবারের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে— চিকিৎসা পরিষেবা কি বন্ধ হবে? হাসপাতালে কি ওয়ার্ড বদল হবে? কেউ কি ভর্তি রোগীদের অন্যত্র পাঠানো হবে?

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেন যে আগুন খুব সীমিত পরিসরে ছিল এবং সেটি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। কোনও ওয়ার্ড বন্ধ করা হয়নি, চিকিৎসা পরিষেবা স্বাভাবিক। তবে প্রতিটি বিভাগে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: বিরোধীদের অভিযোগ বনাম প্রশাসনের জবাব

ঘটনার পরপরই বিরোধী দলগুলির তরফে অভিযোগ ওঠে যে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে—

  • রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা

  • বৈদ্যুতিক লাইনের পুরনো অবস্থা

  • নিরাপত্তার অভাব

  • ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেটের অভাব

ইত্যাদি সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।

এক বিরোধী নেতার মন্তব্য, “সরকার শুধু ভবন বান্ডিল করছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ নেই। ডাক্তারদের রেস্ট রুমে আগুন লাগে— এটা কল্পনাতীত।”

হাসপাতাল প্রশাসনের দাবি, “অভিযোগ রাজনৈতিক। সমস্ত দিক যাচাই করে তবেই মন্তব্য করা উচিত। আপাতত আমাদের মূল লক্ষ্য— রোগীদের নিরাপত্তা ও পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: জরুরি অডিট ও আধুনিক সুরক্ষা প্রয়োজন

আগুন লাগার এই ঘটনা নতুন করে সতর্ক করল সকলকে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন—

  1. ইলেকট্রিক্যাল লাইনের সম্পূর্ণ অডিট

  2. রেস্ট রুমে লোড কমানো বা আলাদা সার্কিট দেওয়া

  3. ফায়ার অ্যালার্ম ও সেন্সর বাধ্যতামূলক করা

  4. নিয়মিত ফায়ার ড্রিল

  5. ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ

  6. প্রশাসনিক তদারকি বাড়ানো

প্রাণহানি না হলেও সতর্কবার্তা রইল

ঘটনায় সৌভাগ্যবশত কেউ আহত বা নিহত হননি। আগুন খুব বড় আকার ধারণ করেনি। কিন্তু এই ধরনের দুর্ঘটনা বাস্তবে গভীর সমস্যা নির্দেশ করে। হাসপাতালে রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক— সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ভবিষ্যতে বড় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আজকের ঘটনায় বড় শিক্ষা পাওয়া গেল।

শেষ কথা

রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারদের রেস্ট রুমে লাগা আগুন— যদিও স্বল্পক্ষণের আতঙ্ক তৈরি করেছে— কিন্তু এটি আরও বড় বার্তা রেখে গেল: অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় ‘সেফটি ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এই ঘটনা সেই প্রয়োজনের দিকেই আঙুল তুলল।

Preview image