হঠাৎ ঘটে যাওয়া ভূকম্পনে পুরো দেশ জুড়ে মুহূর্তের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভোর বা সন্ধ্যার শান্ত পরিবেশ হঠাৎ কেঁপে ওঠার ফলে মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ভূকম্পনের কম্পন অনুভূত হয়, যার স্থায়িত্ব ছিল কয়েক সেকেন্ড। যদিও বৃহৎ ধ্বংসযজ্ঞের খবর নেই, তবুও কিছু এলাকায় একাধিক বাড়ি হেলে পড়ার ঘটনা স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো ও দুর্বল স্থাপনা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্পের উৎস ও মাত্রা নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-মিয়ানমার বা বঙ্গোপসাগর এলাকায় সক্রিয় ফাটল রেখায় কম্পন ঘটে থাকতে পারে।
হঠাৎ অনুভূত হওয়া ভূকম্পনটি মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও তার প্রভাব পুরো দেশজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। দিনের শুরু বা শেষ—যে সময়েই হোক না কেন, মানুষ যখন নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিল, তখন আকস্মিক কম্পন সেই স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে দেয়। মাটির গভীর থেকে উঠে আসা সেই শক্ত কাঁপুনি যেন মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে থাকা ভবনগুলোকে দুলিয়ে দেয়। ঘরের দেয়াল কেঁপে ওঠে, দরজা-জানালার কাচ কটকট শব্দ করতে থাকে, আর বাসিন্দারা ভয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে ছুটে যান। অনেকেই আতঙ্কে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ছোটখাটো দুর্ঘটনারও শিকার হন।
রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও বিভিন্ন জেলার মানুষ সমানভাবে এই কম্পন অনুভব করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই স্ট্যাটাস, ভিডিও ও পোস্টের বন্যা নেমে আসে—“ভূমিকম্প! সবাই ঠিক আছ?” অনেকেই শেয়ার করতে থাকেন তাদের অনুভূতি, অনেকে আবার আতঙ্কে পরিবার-পরিজনের খোঁজ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
যদিও রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা তুলনামূলক কম ছিল, তবে এর প্রভাব বেশ বিস্তৃত ছিল। কারণ, এ কম্পন এসেছে সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি এলাকা থেকে, যার কারণে কম্পনের ঢেউ দেশের বড় অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্ষুদ্র মাত্রার কম্পন হলেও যদি গভীরতা কম থাকে, তবে তা অধিকতর তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন, বড় দর্শনীয় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে এই ধরণের কম্পন। বিশেষত রাজধানীর মানুষ বেশি আতঙ্কিত হন, কারণ এখানে ভবন ঘনবসতি ও নড়বড়ে স্থাপনার সংখ্যা বেশি।
পরবর্তীতে জানা যায়—ঢাকার পুরান এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামের কয়েকটি জায়গায় পুরোনো বা নড়বড়ে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বাড়ি হেলে পড়েছে, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ভবনের কাঠামো পুরোনো হওয়ায় সামান্য কম্পনে সেগুলো ভারসাম্য হারিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
সবচেয়ে আশার খবর হলো—এই ভূমিকম্পে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়নি। তবুও এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে বাংলাদেশ ভূমিকম্প–ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। ভবন নির্মাণে অনিয়ম, নরম মাটি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ—সব মিলিয়ে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। ফলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, শুধুমাত্র একে স্রেফ “ছোট কম্পন” ভাবলে হবে না; বরং এটিকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখে ভবনগুলোকে নিরাপদ করা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
এই সামান্য ভূকম্পনই প্রমাণ করে দিয়েছে—প্রস্তুত না থাকলে কখন, কোথায়, কীভাবে বড় বিপদ নেমে আসবে কেউ বলতে পারে না।
ঢাকার পুরান এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সিলেট এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটি বাড়ি হেলে পড়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভবনের অধিকাংশই ২৫ থেকে ৫০ বছর আগের নির্মাণ, যখন আধুনিক নকশা, ভূমিকম্প–সহনশীল স্থাপত্য বা শক্তিশালী নির্মাণবিধি তেমনভাবে অনুসরণ করা হতো না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনগুলোর বয়স বেশি হওয়া, নরম মাটিতে ভিত্তি দুর্বল থাকা এবং নির্মাণের সময় যথাযথ মানদণ্ড না মানার কারণেই সামান্য কম্পনেও সেগুলো ভারসাম্য হারিয়ে পাশে হেলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভূমিকম্পের সময় তারা হঠাৎ মাথার ওপরে পাখা দুলতে দেখে প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ঘর দুলে উঠলে তারা আতঙ্কে বাইরে ছুটে যান। পরে বাইরে এসে দেখেন—কিছু ভবনের এক পাশ নিচের দিকে ঝুঁকে গেছে। এতে এলাকাজুড়ে দ্রুত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পরিদর্শন শুরু করে। বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য এসব ভবন থেকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। সম্ভাব্য বিপদের কথা মাথায় রেখে হেলে পড়া ভবনগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং আশপাশে সাধারণ চলাচল সীমিত রাখতে সতর্কতা জারি করা হয়। কর্তৃপক্ষ ভবনগুলোর কাঠামোগত স্থিতি মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ দলও নিয়োগ করেছে।
প্রথম পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, কম্পনের উৎস ছিল দেশের বাইরের কোনো সক্রিয় ফল্ট লাইন—যা নেপাল বা মিয়ানমারের দিক থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রভাব ফেলেছে। ভূকম্পবিদরা বলেন—বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ঘেরা।
বিশেষ করে—
ইন্ডিয়ান প্লেট,
ইউরেশিয়ান প্লেট এবং
বার্মা মাইক্রো প্লেট
—এদের সংঘর্ষে চাপ সৃষ্টি হয়, যা মাঝেমধ্যে ভূমিকম্পের জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলগুলোতে প্লেট মুভমেন্ট বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে ছোট-বড় ভূমিকম্পের মাত্রাও বাড়ছে।
বাংলাদেশে বহু ভবন এখনো সংবেদনশীল ও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কারণগুলো হলো—
নির্মাণে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার
নকশায় ভুল
ভূমিকম্প-সহনশীল প্ল্যান অনুসরণ না করা
অতিরিক্ত তলা সংযোজন
পুরনো ও অযত্নে থাকা ভবন
নরম মাটিতে গভীর ভিত্তি না করা
বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করলেও অনেক জায়গায় এখনও ভবন নির্মাণে সঠিক মানদণ্ড মানা হয় না। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঘর থেকে বেরিয়ে আসা মানুষদের মধ্যে শিশু, প্রবীণ থেকে শুরু করে কর্মজীবী সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কেউ ফোন করে জানতে চান—“তুমি ঠিক আছ?” কেউ আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে থাকেন—“ভূমিকম্প, সবাই সাবধান!”
অনেকে জানান—
“যখন কম্পন শুরু হয়, আমরা ভেবেছিলাম মাথা ঘুরছে। তারপর বুঝলাম পুরো ঘরই কাঁপছে।”
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে—
এমন ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূকম্প ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে প্রস্তুতির অভাব বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
জরুরি ভিত্তিতে সব পুরনো ভবন কাঠামোগতভাবে পরীক্ষা করা উচিত।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে
ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি শনাক্ত
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সতর্কতা জারি
জরুরি উদ্ধার দল প্রস্তুত রাখা
ভবনের কাঠামো মূল্যায়ন
ইত্যাদি কাজ শুরু করেছে।
এছাড়া বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—
ভবন নির্মাণে রেগুলেশন কঠোরভাবে মানা
ভূমিকম্প ড্রিল নিয়মিত করা
জনগণকে সচেতন করা
জরুরি ব্যাগ/সেফটি কিট ঘরে রাখা
বাংলাদেশের ভূগোলগত অবস্থান এমন যে, দেশের অধিকাংশ শহরই বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট এলাকা তিনটি প্রধান সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় এ অঞ্চলে কম্পনের মাত্রা তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং নরম মাটির কারণে এসব শহরে ভূমিকম্পের ক্ষতির সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। তাই সচেতনতা ও প্রস্তুতি ছাড়া বড় ধরনের বিপদ এড়ানো প্রায় অসম্ভব।
ভূমিকম্পের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় অনুসরণ করলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কম্পন শুরু হলে প্রথমেই ঘাবড়ে না গিয়ে মাথা রক্ষা করা জরুরি। ঘরের ভেতর থাকলে মজবুত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে খোলা জায়গায় চলে যেতে হবে, তবে দৌড়াদৌড়ি না করাই ভালো। লিফট কখনই ব্যবহার করা যাবে না, কারণ কম্পনের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট আটকে যেতে পারে।
একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ বা চুলার আগুন দ্রুত বন্ধ করার চেষ্টা করতে হবে যাতে আগুন লাগার ঝুঁকি কম থাকে। ভবনের দুর্বল অংশ, জানালার কাচ, আলমারি বা ভারী জিনিসের কাছ থেকে দূরে থাকা উচিত। ভূমিকম্প থেমে গেলে নিরাপদ জায়গায় অবস্থান নিশ্চিত করে আশপাশের মানুষকে সহায়তা করাও জরুরি।
সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলেই বড় বিপর্যয় অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
হঠাৎ ঘটে যাওয়া এ ভূমিকম্পটি হয়তো বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেনি, কিন্তু কিছু ভবনের হেলে পড়া পুরো পরিস্থিতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশ, এবং এখানে মাঝারি মাত্রার কম্পনেও নড়বড়ে বা পুরনো স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন—দেশের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট, বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই ঝুঁকি এড়াতে এখনই কাঠামোগত প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নিয়ম না মানা, নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার, নরম মাটিতে অপরিকল্পিত স্থাপনা তৈরি—এসবই বিপদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে ভূমিকম্পের সময় জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ভবনের নকশা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে কঠোরতা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে জনগণের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার অভ্যাস, জরুরি সেফটি কিট প্রস্তুত রাখা—এসব পদক্ষেপ জীবন বাঁচাতে কার্যকর হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ক্ষতি কম হলেও এটি একটি সতর্কবার্তা—এখনই প্রস্তুতি নিলে ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।