Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পহেলগাঁওয়ের ১০ মাস পর চাকরির জন্য এখনও হন্যে হয়ে ঘুরছেন নিহত সমীর গুহের স্ত্রী বলছেন খোঁজই নেয়নি কেন্দ্র

সমীর কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করতেন এবং কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়ে জঙ্গিদের গুলিতে নিহত

সমীর গুহের পরিবারের অস্থির পরিস্থিতি ও সরকারের প্রতিশ্রুতি

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের এক মর্মান্তিক ঘটনায় গুলিতে নিহত হন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী সমীর গুহ। সমীর গুহ যিনি কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন সেই দিন জঙ্গিদের গুলিতে নিহত হন। ঘটনার সময় তাঁর স্ত্রী শবরী গুহ এবং তাদের নাবালিকা কন্যা উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের চোখের সামনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পহেলগাঁও হামলায় নিহত ২৬ জনের মধ্যে ছিলেন সমীরও। এই ঘটনার পর ১০ মাস পার হলেও সমীরের পরিবার এখনও এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। শবরী গুহ যিনি এখন একা পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে চলছেন এখনও চাকরি পাননি। সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিছু আর্থিক সাহায্য দেওয়া হলেও চাকরির জন্য তাঁকে এখনও খোঁজ করতে হচ্ছে। এক সময় সুখী পরিবারে এক পিতার উপস্থিতি ছিল কিন্তু সেই পিতা আজ আর নেই এবং তার স্থানটি এখন শূন্য। শবরী গুহ এখন একা হয়ে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করছেন তবে তাঁর জন্য এখনও সরকারি চাকরির আশা রয়েছে। তবে সেই চাকরি পাওয়া যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সরকার বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের তরফে যতটা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাতে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। শবরী এখন শুধুই অপেক্ষা করছেন সেই চাকরির আশায় যাতে তার সংসার আবার স্বাভাবিক পথে চলতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা এবং চাকরির অনিশ্চয়তা

সমীরের মৃত্যুর পর শবরী গুহের জীবন একেবারে পাল্টে গেছে। ঘরের ভরণপোষণ এবং কন্যার পড়াশোনার খরচের জন্য একদিকে যেমন তাঁকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে অন্যদিকে চাকরি না পাওয়ার কারণে তাদের পারিবারিক জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। সমীরের মৃত্যুর পর শবরী একা হয়ে গেছেন এবং তার জীবন একেবারে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তিনি জানান যে তার স্বামীকে হারানোর পর একা হয়ে পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব সামলানো তার জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে যে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তা এখনও পূর্ণ হয়নি। শবরী গুহ জানিয়েছেন যে, সরকার কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ তিনি দেখেননি। পরিবার চালানোর জন্য শবরী এখন একা সংগ্রাম করছেন কিন্তু সরকারের তরফে কিছুটা সহানুভূতিরও দেখা মেলেনি। শবরী এখন শুধু একটি চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন যাতে তার পরিবারটি কিছুটা স্বাভাবিক জীবন পেতে পারে।

কন্যার ভবিষ্যৎ এবং শবরীর সংগ্রাম

সমীরের পরিবারের একমাত্র ভরসা এখন কন্যা শুভাঙ্গী, যিনি বর্তমানে কলকাতার একটি বেসরকারি কলেজে সাইকোলজি নিয়ে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করছেন। শবরী জানান, "মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারব না। তাই ওর পড়াশোনায় কোনো খামতি রাখতে চাই না।" তবে, চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শবরী জানিয়েছেন, তাঁর সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে আসছে, এবং তার কোনও স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকার কারণে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। সমীরের চাকরির জন্য শবরী আবেদন করেছেন, কিন্তু এখনও কোনও জবাব পাননি। সরকারি দফতর জানিয়েছে, তাঁর আবেদন দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে, তবে এর বেশি আর কিছু জানানো হয়নি।

রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতা

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তবে শবরী রাজ্য সরকারের কাছে চাকরির জন্য আবেদন করেননি। তাঁর আবেদনটি সমীরের অফিসে করা হয়েছিল যেখানে সমীর কাজ করতেন। ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও শবরী এখনও কোনো আশ্বাস পাননি। শবরী বলছেন, "এতদিনে চাকরি দেওয়া হতো না কি এই ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে এতটা সময় লাগে?" তার এই কথায় বোঝা যায় যে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন এবং সরকারী সহায়তা পাওয়ার জন্য খুবই প্রতীক্ষিত। শবরীর জন্য এই দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁর জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। চাকরি পাওয়ার জন্য তাঁর অভ্যন্তরীণ চাপ ও অস্থিরতা বেড়েছে এবং তাঁর আশার দিকে যদি কোনো সাড়া না আসে তবে তাঁর জন্য ভবিষ্যত আরও অন্ধকার হয়ে উঠবে।

news image
আরও খবর

অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা

প্রথমদিকে শবরী কোনো ক্ষোভ দেখাননি। তিনি জানিয়েছেন যে গত ১০ মাসে তিনি স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে সব ধরনের সাহায্য পেয়েছেন। এলাকার কাউন্সিলর প্রায়ই তাঁর খোঁজখবর নিয়ে যান এবং শবরী জানিয়ে দিয়েছেন যে স্থানীয় প্রশাসন তাঁর পাশে ছিল। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা বা যোগাযোগ তিনি এখনও পাননি। শবরী বলেন, "এটা তো স্বাভাবিক কোনো মৃত্যু নয়। যাঁদের সঙ্গে ঘটেছে একমাত্র তাঁদেরই কষ্টটা বুঝতে পারছেন। বাকি সকলে আস্তে আস্তে ভুলে গিয়েছেন।" তার এই কথাগুলিতে এক গভীর অনুভূতি ফুটে উঠেছে যে, তার পরিবারের জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যে উপযুক্ত সহানুভূতি বা কার্যকরী পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল, তা অনুপস্থিত। তিনি আরও জানান, যাঁরা এই বিপদের মুখোমুখি, তারা একমাত্র বুঝতে পারেন কতটা কষ্টের মধ্যে দিয়ে তাঁরা যাচ্ছেন। বাকি সবাই হয়তো এই ঘটনা ভুলে গিয়েছে কিন্তু শবরী আজও সেই স্মৃতি এবং কষ্টের মধ্যে দিন পার করছেন।

পহেলগাঁও হামলার পরিণতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি

পহেলগাঁও হামলায় নিহত ২৬ জনের পরিবারগুলোর প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার কোনও দৃষ্টিভঙ্গি নেয়নি, এবং প্রতিশ্রুতি মেটানোর ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যাচ্ছে। সমীরের পরিবার এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি এখনও একটি নিশ্চিত সরকারি চাকরি পায়নি। নিহত সন্তোষ জগদালের কন্যা আশাবরী জগদালেও চাকরির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন করছেন, তবে সেই বিষয়ে এখনো কোনও সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

অপেক্ষা এবং হতাশা

শবরী গুহ এখনও চাকরির জন্য আশাবাদী যদিও তার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো ইতিবাচক উত্তর আসেনি। শবরী বলেন, "কিন্তু আমার স্বামী আর নেই আমাদের পরিবারকে কী হবে কেউ চিন্তা করেনি।" সমীর গুহের বদলির চাকরি ছিল এবং তাঁর পরিবারটি এমন এক স্বাভাবিক জীবনের অংশ ছিল যেখানে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে সময় কাটাত এবং একসঙ্গে খুশির মুহূর্তগুলো উপভোগ করত। এটি ছিল তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ কিন্তু সেই জীবনের ধারা একদিন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সমীরের অকাল মৃত্যুর পর শবরী গুহ একা হয়ে গেছেন এবং তাঁর জীবন বদলে গেছে। সেই সুখী স্মৃতিগুলি এখন শুধুই মধুর কিন্তু বেদনা-filled হয়ে আছে। সংসার চালানোর জন্য শবরী এখন একা সংগ্রাম করছেন কিন্তু তিনি এখনও বিশ্বাস করেন যে একদিন কিছু পরিবর্তন হবে যদি তাকে একটি চাকরি দেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে প্রতিশ্রুতি মেটানোর কোনো সঠিক সময়সীমা নেই এবং এটি তার জন্য এক বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বেহালার গুহ পরিবার এবং পহেলগাঁও হামলার স্মৃতি

বেহালার জগৎ রায়চৌধুরী রোডে গুহ পরিবারের বাড়ির সামনে এখন শুধুই একটি ভয়াবহ স্মৃতি থেকে গেছে। ১০ মাস আগে পহেলগাঁও হামলার ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই স্মৃতি আজও গুহ পরিবারের জন্য এক অসম্ভব যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পহেলগাঁওয়ের সেই ভয়ঙ্কর হামলা সমীর গুহ এবং তাঁর পরিবারের জীবনে চিরকালীন এক শূন্যতা রেখে গেছে। এক সময়ে যেটি ছিল একটি সুখী পরিবার, আজ সেটি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। শবরী গুহ বলেন, "একটা চাকরি যদি আমি পাই, তাহলে কিছুটা চাপমুক্ত হতে পারব। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার যদি আমাদের দিকে ফিরে তাকায় তখন কিছু পরিবর্তন হবে।" তার এই কথায় যেন এক দারিদ্র্যের চিত্র ফুটে ওঠে। যেভাবে সমীরের পরিবার এক সময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিল, সেই রুটিন আজ ভেঙে গেছে। শবরীর এখন একমাত্র আশা একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার। যাতে তার সংসার আবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং তার মেয়েটি ভবিষ্যতে সুস্থ এবং সুরক্ষিত জীবন পেতে পারে। কিন্তু সেই চাকরি পাওয়ার প্রতিশ্রুতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পূর্ণ হয়নি। শবরী আজও সেই আশা নিয়েই বেঁচে আছেন, যদিও তার হৃদয়ে ক্ষত গভীর এবং অদৃশ্য, যা কোনো চাকরি বা সাহায্যেও পূর্ণ হতে পারে না।

Preview image