Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

স্নান করার সময়ে রোজ গায়ে সাবান দিয়ে ঘষেন নিয়মিত এই অভ্যাসে উপকারের বদলে ক্ষতি হচ্ছে না তো

লুফা দিয়ে ভাল করে গা না ঘষলে অনেকের স্নানই সম্পূর্ণ হয় না। বাজারে সিন্থেটিক লুফার ছড়াছড়ি। আবার অনেকেও লুফার বদলে গা ঘষার জালিও ব্যবহার করেন। তবে স্নানের সময়ে অযথা ত্বক ঘষাঘষি করার কি আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে?

স্নান—আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু শরীর পরিষ্কার রাখাই নয়, মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার জন্যও অনেকেই স্নানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হিসেবে মনে করেন। তবে এই সাধারণ অভ্যাসটিকেই আমরা অনেক সময় অজান্তেই জটিল করে তুলি। বিশেষ করে লুফা, স্ক্রাবার বা গা ঘষার জালির অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করেন, যত বেশি ঘষাঘষি করা যাবে, ততই ত্বক পরিষ্কার ও উজ্জ্বল হবে। কিন্তু চর্ম বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে।

প্রথমেই বুঝতে হবে, আমাদের ত্বক একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অঙ্গ। এটি নিজেই নিজের যত্ন নিতে সক্ষম। প্রতিদিন আমাদের ত্বক থেকে লক্ষ লক্ষ মৃত কোষ ঝরে পড়ে এবং নতুন কোষের জন্ম হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্কিন সেল টার্নওভার। সাধারণত ২২ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ত্বকের উপরিভাগ সম্পূর্ণভাবে নবায়ন হয়ে যায়। অর্থাৎ, আমাদের শরীর নিজেই প্রতিনিয়ত পুরোনো স্তর ছেড়ে নতুন স্তর তৈরি করছে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে জোর করে ত্বরান্বিত করার কোনও প্রয়োজন নেই।

এখানেই আসে লুফা বা স্ক্রাবের প্রসঙ্গ। অনেকেই মনে করেন, লুফা দিয়ে গা ঘষলে মৃত কোষ দ্রুত উঠে যাবে এবং ত্বক আরও উজ্জ্বল হবে। কিন্তু বাস্তবটা উল্টো। লুফা দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষি করলে শুধু মৃত কোষই নয়, ত্বকের নতুন ও জীবন্ত কোষগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর বা স্কিন ব্যারিয়ার দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ব্যারিয়ার আমাদের ত্বককে বাইরের ধুলো, দূষণ, ব্যাকটেরিয়া এবং ক্ষতিকর উপাদান থেকে রক্ষা করে। যখন এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ত্বক সহজেই শুষ্ক, সংবেদনশীল এবং সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

অনেক সময় দেখা যায়, নিয়মিত লুফা ব্যবহারকারীদের ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানি, জ্বালা বা র‍্যাশের সমস্যা দেখা দেয়। এর অন্যতম কারণ হল অতিরিক্ত ঘষাঘষি। ত্বকের উপরিভাগে ছোট ছোট ক্ষত তৈরি হয়, যা বাইরে থেকে দেখা না গেলেও ভেতরে ভেতরে ত্বককে দুর্বল করে তোলে। বিশেষ করে যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও দ্রুত দেখা দিতে পারে।

আরও একটি বড় সমস্যা হল সিন্থেটিক লুফার স্বাস্থ্যবিধি। বাজারে যে ধরনের লুফা সহজলভ্য, তার বেশিরভাগই প্লাস্টিক বা সিন্থেটিক উপাদানে তৈরি। এই লুফাগুলির গঠন এমন যে, এর ভেতরে জল সহজে শুকোয় না। স্নানের পরে লুফার জালির মধ্যে সাবানের ফেনা, ত্বকের ময়লা এবং আর্দ্রতা জমে থাকে। এই পরিবেশ ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসের বংশবিস্তার করার জন্য একেবারে আদর্শ।

যদি লুফা প্রতিবার ব্যবহারের পরে ভালো করে পরিষ্কার ও শুকনো না করা হয়, তাহলে তা দ্রুত সংক্রমণের উৎসে পরিণত হতে পারে। প্রতিদিন সেই একই লুফা দিয়ে গা ঘষলে, সেই জীবাণুগুলি আবার ত্বকের উপর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্রণ, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, ফলিকিউলাইটিস (চুলের গোড়ায় সংক্রমণ) ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এছাড়াও অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে স্নান করেন এবং বারবার লুফা ব্যবহার করেন। এতে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল বা ন্যাচারাল অয়েল ধুয়ে যায়। এই তেল ত্বককে নরম ও আর্দ্র রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন এই তেল কমে যায়, তখন ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং সহজেই ফেটে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একজিমা বা ডার্মাটাইটিসের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

তাহলে কি একেবারেই লুফা ব্যবহার করা উচিত নয়? চর্ম চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না হলেও এর ব্যবহার খুবই সীমিত হওয়া উচিত। সপ্তাহে এক বা দুইবার হালকা করে ব্যবহার করা যেতে পারে, তাও যদি প্রয়োজন হয়। তবে প্রতিদিন বা অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ঘষাঘষি করা একেবারেই উচিত নয়।

অনেকেই ভাবেন, লুফা ছাড়া স্নান করলে শরীর ঠিকমতো পরিষ্কার হবে না। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা। একটি মৃদু সাবান বা বডি ওয়াশ এবং হাতের সাহায্যেই শরীর পরিষ্কার করা সম্ভব। হাতের স্পর্শ ত্বকের জন্য অনেক বেশি কোমল এবং নিরাপদ। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

যদি কেউ এক্সফোলিয়েশন করতে চান, তাহলে প্রাকৃতিক বা ডার্মাটোলজিস্ট-পরামর্শিত পদ্ধতি বেছে নেওয়া উচিত। যেমন—হালকা কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট (AHA বা BHA), যা ত্বকের ক্ষতি না করে মৃত কোষ সরাতে সাহায্য করে। তবে এগুলি ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

স্নানের সময় কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে ত্বক অনেক বেশি সুস্থ ও সুন্দর থাকতে পারে। যেমন—

news image
আরও খবর
  • খুব গরম জল ব্যবহার না করা
  • দীর্ঘ সময় ধরে স্নান না করা
  • মৃদু ও ত্বক-বান্ধব সাবান ব্যবহার করা
  • স্নানের পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগানো
  • লুফা বা স্ক্রাব কম ব্যবহার করা

ত্বকের যত্ন মানেই জোর করে কিছু করা নয়, বরং ত্বকের প্রাকৃতিক ছন্দকে সম্মান করা। আমাদের শরীর নিজেই অনেক কিছু সামলাতে পারে, যদি আমরা তাকে অযথা চাপ না দিই। অতিরিক্ত যত্ন অনেক সময় উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়—এটাই এই আলোচনার মূল বার্তা।

সবশেষে বলা যায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু তা যেন অতিরিক্ত না হয়। স্নান একটি আরামদায়ক এবং স্বস্তিদায়ক অভ্যাস হওয়া উচিত, কোনও কঠোর স্কিন ট্রিটমেন্ট নয়। লুফা বা স্ক্রাবের প্রতি অযথা নির্ভরশীলতা কমিয়ে, সহজ ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে স্নান করাই ত্বকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী পথ।

উপসংহার হিসেবে বলা যায়, ত্বকের যত্নের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় অজান্তেই এমন কিছু অভ্যাস গড়ে তুলি, যা দেখতে যতই স্বাস্থ্যকর মনে হোক, বাস্তবে তা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। স্নানের সময় লুফা বা স্ক্রাবার দিয়ে বারবার এবং জোরে গা ঘষা সেই ধরনেরই একটি অভ্যাস। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ইচ্ছা থেকেই এর শুরু হলেও, অতিরিক্ত ব্যবহারে তা ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ত্বক কেবল শরীরের বাইরের একটি আবরণ নয়—এটি একটি জীবন্ত, সক্রিয় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। প্রতিদিন নিজস্ব ছন্দে এটি পুরোনো কোষ ঝরিয়ে নতুন কোষ তৈরি করে, বাইরের জীবাণু ও দূষণ থেকে আমাদের রক্ষা করে এবং শরীরের আর্দ্রতা ধরে রাখে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানোই ত্বকের প্রকৃত যত্ন। সেখানে অপ্রয়োজনীয় ঘষাঘষি, অতিরিক্ত স্ক্রাব বা অনিয়ন্ত্রিত লুফার ব্যবহার সেই স্বাভাবিক ছন্দে বিঘ্ন ঘটায়।

বিশেষ করে সিন্থেটিক লুফার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ মানুষই ব্যবহার করার পর সেটি ঠিকমতো পরিষ্কার বা শুকনো রাখেন না। ফলে অদৃশ্যভাবে সেখানে ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস জমে ওঠে, যা পরবর্তী ব্যবহারের সময় সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে আসে। এতে করে ত্বকের বিভিন্ন সংক্রমণ, র‍্যাশ, ব্রণ কিংবা চুলকানির মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, যেটিকে আমরা পরিষ্কার হওয়ার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছি, সেটিই উল্টো সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে—এ এক বড় ধরনের বৈপরীত্য।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ত্বকের প্রাকৃতিক তেল বা ময়েশ্চার লেয়ার। অতিরিক্ত ঘষাঘষি এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্নান করার ফলে এই প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ত্বক শুষ্ক, রুক্ষ এবং সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একজিমা বা অন্যান্য ত্বকের সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেকেই তখন আবার আলাদা করে নানা প্রসাধনী ব্যবহার করতে শুরু করেন, যা অনেক ক্ষেত্রে সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

এই প্রেক্ষিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল—সচেতনতা এবং সংযম। ত্বকের যত্ন মানেই বেশি কিছু করা নয়; বরং সঠিকভাবে, প্রয়োজনমতো যত্ন নেওয়াই আসল। প্রতিদিনের স্নানে একটি মৃদু সাবান বা বডি ওয়াশ এবং হাতের স্পর্শই যথেষ্ট। যদি এক্সফোলিয়েশন প্রয়োজন হয়, তবে তা সীমিত পরিমাণে এবং সঠিক পদ্ধতিতে করা উচিত। সপ্তাহে এক-দু’বার হালকা এক্সফোলিয়েশন যথেষ্ট, তার বেশি নয়।

এছাড়া, স্নানের সময়কাল নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে গরম জলে স্নান ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তার বদলে হালকা গরম বা কুসুম গরম জল ব্যবহার করা এবং স্নানের পরপরই ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগানো ত্বককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলিই দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, ত্বকের যত্নের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—সহজ, স্বাভাবিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করা। বাহ্যিক উপকরণের উপর অতি নির্ভরশীলতা না বাড়িয়ে, নিজের শরীরের প্রাকৃতিক ক্ষমতার উপর আস্থা রাখা দরকার। কারণ, প্রকৃতি নিজেই আমাদের শরীরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যাতে তা নিজেকে সুরক্ষিত ও সুস্থ রাখতে পারে—আমাদের শুধু সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে হবে, বাধা নয়।

অতএব, স্নানের সময় লুফা দিয়ে জোরে ঘষাঘষি করার অভ্যাস যদি থেকে থাকে, তবে এখনই তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। অল্পে সন্তুষ্ট থাকা, নিয়ম মেনে চলা এবং ত্বকের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াই প্রকৃত সৌন্দর্যের চাবিকাঠি। সুস্থ ত্বকই সুন্দর ত্বক—আর সেই সুস্থতা আসে যত্ন, সচেতনতা এবং সংযমের মাধ্যমে।

Preview image