ধুরন্ধর এই বছরের অন্যতম প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র যেখানে ট্রেলারে দেখা যায় বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি একটি গল্প পাকিস্তানের মাটিতে ভারতীয় এক সাহসী সেনার অদম্য লড়াই এবং বিজয়কে ঘিরে এই সিনেমায় উঠে আসছে দেশপ্রেম সাহস এবং অনুপ্রেরণার শক্তিশালী ছবি
বলিউডে যখনই কোন বড় বাজেটের অ্যাকশন ড্রামা ছবি ঘোষণা করা হয় তখন থেকেই দর্শকদের চোখে থাকে বিশেষ প্রত্যাশা আর সেই প্রত্যাশার তালিকায় এই বছর সবচেয়ে উপরের দিকে যে ছবিটির নাম জ্বলজ্বল করছে তা হল ধুরন্ধর ছবিটির ঝলক প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সারা ভারতজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড় গোলাগুলি বিস্ফোরণ রক্ত মারপিট ভয়াবহ সব চরিত্র এবং বাস্তব অনুপ্রেরণায় গড়া এক রহস্যময় কাহিনি মিলে ধুরন্ধর ইতিমধ্যেই দর্শকদের মনে তৈরি করেছে তীব্র কৌতূহল ছবির পরিচালনায় রয়েছেন আদিত্য ধর আর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন রণবীর সিংহ তবে ছবির বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন সঞ্জয় দত্ত যাঁর চরিত্রকে ঘিরেই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা
ধুরন্ধর ছবির ট্রেলারে প্রথম থেকেই বোঝা যায় যে গল্পটি কোন না কোন বাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত অন্তত নির্মাতা পক্ষ থেকে তেমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে ট্রেলার দেখার পর দর্শকের ধারণা হয় যে ছবিতে পাকিস্তানের ভেতর এক ভারতীয় বীরের অভিযান এবং তাঁর বিজয়ের ইতিহাস তুলে ধরা হবে আর এই কাহিনিতে থাকতে পারে পাকিস্তানের ভিতরে থাকা সন্ত্রাসবাদ দমন সংক্রান্ত বাস্তব ঘটনার প্রতিফলন রণবীর সিংহের পাশাপাশি ছবিতে রয়েছেন সঞ্জয় দত্ত আর মাধবন অক্ষয় খন্না অর্জুন রামপাল এবং সারা অর্জুন যাঁদের প্রত্যেকের লুক ইতিমধ্যেই দর্শকের মন কেড়ে নিয়েছে বিশেষত সঞ্জয় দত্তের উপস্থিতি দর্শকদের উত্তেজিত করে তুলেছে কারণ তাঁর চরিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে এক ভয়ঙ্কর পুলিশ অফিসারের ব্যক্তিত্ব
ধুরন্ধর ছবির বাজেট প্রায় দুইশো আশি কোটি টাকা এবং ছবিটি মুক্তি পেতে চলেছে পাঁচ ডিসেম্বর নির্মাতাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে যে এটি মূলত একটি বহু পর্বের কাহিনি এবং পরবর্তী সময়ে ধুরন্ধরের সিক্যুয়েলও মুক্তি পাবে ছবির প্রচার শুরু হতেই উঠে এসেছে প্রশ্ন রণবীর সিংহ অভিনীত চরিত্রটি কি ভারতের বীর সেনা মেজর মোহিত শর্মার জীবনের উপর তৈরি প্রথমে এমন জল্পনা ছিল প্রবল কিন্তু পরিচালক আদিত্য ধর স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ছবিটি মেজর মোহিত শর্মার জীবনের উপর ভিত্তি করে নয় তবে ছবির অন্য চরিত্রগুলো সম্পর্কে দর্শকদের ধারণা ভিন্ন অনেকেই মনে করছেন যে সঞ্জয় দত্তের চরিত্র বাস্তবের দুঁদে পুলিশ অফিসার চৌধরি আসলামের উপর ভিত্তি করে তৈরি
চৌধরি আসলাম ছিলেন পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের করাচির অন্যতম কুখ্যাত এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট তিনি ছিলেন এমন এক পুলিশ অফিসার যাঁকে দেখে কঠিন কঠিন গ্যাংস্টাররাও ভয় পেত তাঁর হাতে সব সময় থাকত সিগারেট এবং পরনে থাকত সাদা পাজামা পাঞ্জাবি তাঁর আচরণ ছিল কঠোর তেজি এবং নির্ভীক তিনি মুহাজির কওমি মুভমেন্ট তেহরিক ই তালিবান পাকিস্তান বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি লশকর ই ঝাংভি সিপাহ ই সাহাবা পাকিস্তান সহ অসংখ্য সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছেন তিনি ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম শক্তিশালী এবং নির্ভীক পুলিশ অফিসার হিসাবে পরিচিতি পান
চৌধরি আসলামের জন্ম ১৯৬৩ সালে মানসেহরা জেলার ধোদিয়ালের কাছে তাঁর বাবা ছিলেন পেশায় আইনজীবী প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি বাবার সঙ্গে করাচিতে চলে আসেন পরে নিজের সাহসিকতা এবং গুর্জর গোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ মানসিকতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের নামের সঙ্গে সরকারি ভাবে চৌধরি উপাধি যুক্ত করেন ১৯৮৪ সালে সিন্ধ পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইনস্পেক্টর পদে যোগ দেয়ার পর থেকেই তিনি নজরে আসতে শুরু করেন কারণ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অপরাধী দমনের এক বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন
১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ এবং আবার ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত তিনি পাক পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট হিসাবে কুখ্যাতি এবং খ্যাতি দুটোই অর্জন করেন অপরাধী দমন করতে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠে যার ফলে কিছু সময়ের জন্য তাঁকে বরখাস্তও করা হয় কিন্তু ২০০৪ সালে তিনি আবার চাকরিতে ফিরে আসেন এবং করাচির ভয়ঙ্কর টার্গেট কিলার দমনের দায়িত্ব পান সেই সময় করাচির ল্যারি অঞ্চল ছিল সন্ত্রাসী গ্যাংস্টার এবং মাফিয়াদের অভয়ারণ্য প্রতিদিন কোথাও না কোথাও রক্ত ঝরছিল সেই ল্যারিকে অপরাধমুক্ত করার দায়িত্ব পান আসলাম আর তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ল্যারি টাস্ক ফোর্স
২০১০ সালে চৌধরি আসলামকে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের তদন্ত বিভাগের প্রধান করা হয় ২০১২ সালে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ল্যারি গ্র্যান্ড অপারেশন করাচিতে অপরাধ দমনে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে এই সময়েই তাঁর উপর একাধিকবার হামলা হয় ২০১২ সালে তাঁর বাড়িতে ভয়ঙ্কর বোমা হামলা চালানো হয় অর্ধেক বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় আটজন নিহত হন কিন্তু আসলাম অলৌকিকভাবে বেঁচে যান হামলার দায় স্বীকার করে টিটিপি বলে যে আসলাম তাঁদের দলের সদস্যদের নির্দয়ভাবে হত্যা করছিলেন তাই তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু আসলাম তাঁর অবস্থান থেকে সরেননি বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত হাতে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন
কিন্তু অবশেষে ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি পাক তালিবানদের একটি ভয়ঙ্কর হামলায় নিহত হন চৌধরি আসলাম ল্যারি জাতীয় সড়কে তাঁর কনভয় লক্ষ্য করে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় নিহত হন আরও দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর নিজের রক্ষী এবং গাড়িচালক পরে তদন্তে উঠে আসে যে তাঁর গাড়িচালকই বিদ্রোহীদের সঠিক তথ্য দিয়েছিলেন যাতে হামলা সফল হয়
আসলামের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং স্বীকার করেন যে চৌধরি আসলাম পাকিস্তানের অন্যতম সাহসী পুলিশ অফিসার ছিলেন ২০২২ সালে তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে চৌধরি দ্য মার্টার নামে একটি ছবি মুক্তি পায় সেই ছবিতে তাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেন তাঁর খুড়তুতো ভাই তারিক ইসলাম
ধুরন্ধর ছবির ট্রেলারে সঞ্জয় দত্তকে দেখা মাত্রই দর্শকের মধ্যে নতুন উত্তেজনা জন্ম নিয়েছে কারণ তাঁর চরিত্রে ফুটে উঠেছে এক ভয়ঙ্কর এবং রহস্যময় পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি সঞ্জয়ের চোখের দৃষ্টি তাঁর হাঁটার ভঙ্গি এবং তাঁর কঠোর গলার সংলাপ সব মিলিয়ে দর্শকের মনে তৈরি হয়েছে একটি প্রশ্ন এই চরিত্র কি বাস্তবের দুঁদে পাক পুলিশ অফিসার চৌধরি আসলামের উপর ভিত্তি করে তৈরি ট্রেলারে তাঁর নামও রাখা হয়েছে চৌধরি আসলাম এবং সেও পেশায় একজন পুলিশ অফিসার ফলে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে
চৌধরি আসলামের নাম পাকিস্তানের অপরাধ দমনের ইতিহাসে এক অমোঘ অধ্যায় তিনি ছিলেন এমন এক পুলিশ অফিসার যার নাম শুনলেই কেঁপে উঠত গ্যাংস্টাররা সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি তাঁর অভিযানকে ভয় করত কারণ তিনি ছিলেন নির্ভীক এবং আপসহীন তিনি মুহাজির কওমি মুভমেন্ট তেহরিক ই তালিবান পাকিস্তান লশকর ই ঝাংভি বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি সহ বহু সন্ত্রাসী সংগঠনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন তিনি করাচির মধ্যে ল্যারি এলাকায় গ্যাংওয়ার বন্ধ করতে তিনি পরিচালনা করেছিলেন অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান আর এই সব কাজের মধ্যেই তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে গোটা পাকিস্তানে
সঞ্জয় দত্তের চরিত্রের সাজসজ্জা এবং ব্যক্তিত্ব দেখে দর্শকের মনে হয়েছে যে চলচ্চিত্রে দেখানো চরিত্রটি সেই বাস্তব চৌধরি আসলামের শক্তি এবং ইচ্ছাশক্তিকে প্রতিফলিত করছে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি সিগারেট হাতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং মৃত্যুভয়হীন মনোভাব এসবই যে চৌধরি আসলামের পরিচিত বৈশিষ্ট্য তা তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি পূর্ববর্তী দলিল এবং সাক্ষাৎকার থেকেই জানা যায় তাই ধুরন্ধর ট্রেলারের পর থেকে অনেকেই দাবি করছেন যে সঞ্জয়ের চরিত্র সম্ভবত তারই ছায়া অবলম্বন
তবে এই জল্পনার সত্যতা এখনও নির্মাতা পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি পরিচালক আদিত্য ধর জানিয়েছেন যে ছবিটি বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি হলেও এটি কোনও জীবনীমূলক চলচ্চিত্র নয় তাই বাস্তবের কোন চরিত্রকে সরাসরি তুলে আনা হয়নি তবুও দর্শকের ধারণা অন্যদিকে যাচ্ছে কারণ চৌধরি আসলামের জীবন নিজেই ছিল এমন এক উপাখ্যান যা সিনেমার মতই রহস্য দুঃসাহস ভয় উদ্দীপনা এবং উত্তেজনায় ভরপুর
আসলাম তার জীবনে বহুবার মৃত্যুচেষ্টার সম্মুখীন হয়েছেন তাঁর করাচির বাড়িতে হামলা তাঁর অফিসে হামলা রাস্তায় হামলা বারবার তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলি কিন্তু তিনি থামেননি বরং প্রতিটি হামলার পর তিনি আরও কঠোর মনোভাব নিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে গেছেন তিনি বিশ্বাস করতেন যে অপরাধ এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় তাই তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং শক্তিশালী পুলিশ অফিসার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে
ধুরন্ধর ছবির ট্রেলারে সঞ্জয়ের চরিত্রে যে আবহ সৃষ্টি হয়েছে তা যেন সেই বাস্তব আসলামের দৃঢ়তা এবং তেজকে প্রতিফলিত করেছে বিশেষত তাঁর মুখের কঠোর অভিব্যক্তি এবং বলিষ্ঠ সংলাপ যা দর্শকের মনে সেই বাস্তব অফিসারের কথা জাগিয়ে তোলে যার সামনে কেউ মাথা তুলতে সাহস পেত না সঞ্জয়ের চরিত্রেও দেখা যায় সেই একই তেজ সেই একই লড়াইয়ের প্রস্তুতি এবং সেই একই মৃত্যুকে তুচ্ছ করার মনোভাব ফলে জল্পনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে
তবে ছবিটি মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত কোনও কিছুই নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয় নির্মাতারা ইচ্ছাকৃতভাবেই চরিত্র নিয়ে রহস্য বজায় রেখেছেন যাতে দর্শকের মধ্যে কৌতূহল থাকে এবং ছবির মুক্তির সময় উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে তবুও দর্শকের আশা রয়েছে যে যদি এই চরিত্র সত্যিই চৌধরি আসলামের অনুপ্রেরণায় তৈরি হয় তবে তাঁর দুঃসাহসিক জীবন বড় পর্দায় এক মহাকাব্যের মতই ধরা দেবে কারণ তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল নায়কোচিত এবং প্রতিটি অভিযানই ছিল ভয়ের মুখে দাঁড়িয়ে সাহস দেখানোর উদাহরণ
আসলামের জীবন আজও পাকিস্তানে কিংবদন্তির মতো স্মরণ করা হয় তাঁর সাহসিকতা তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং তাঁর নির্মম দৃঢ়তা আজও অনেক মানুষের মনে বিস্ময় তৈরি করে তাঁর মৃত্যু ছিল এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ফল কিন্তু মৃত্যুর পরেও তিনি হয়ে আছেন পাকিস্তানের সবচেয়ে নির্ভীক পুলিশ অফিসারদের একজন তিনি হয়ে আছেন সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অদম্য প্রতীক
এখন প্রশ্ন একটাই ধুরন্ধর ছবিতে কি সত্যিই তাঁর জীবনকে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ছবির মুক্তির আগে এর সঠিক উত্তর জানা যাবে না তবে যা স্পষ্ট তা হল দর্শকদের মনে তাঁর গল্প আজও বেঁচে আছে এবং ধুরন্ধর ছবির মাধ্যমে সেই গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে আরও একবার ফিরে আসছে বড় পর্দায় যেখানে সাহস এবং ত্যাগের কাহিনি নতুন করে আলো ছড়াবে