গোয়ার উত্তরাঞ্চলের শান্ত, পর্যটকপ্রিয় গ্রাম Arpora এক উৎসবমুখর রাতেই এখানে নেমে আসে মৃত্যুর ঘনছায়া। ৭ ডিসেম্বর ভোররাতে জনপ্রিয় ও বিলাসবহুল নাইটক্লাব Birch by Romeo Lane এ আচমকা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান অন্তত ২৫ জন। তাঁদের মধ্যে ৪ জন পর্যটক, ১৪ জন স্টাফ এবং আরও কয়েকজন ক্লাব–অতিথি রয়েছেন। গোয়া রাজ্য বহু দুর্ঘটনার সাক্ষী হলেও সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনার স্বাক্ষর রাখল এই আগুন।
গোয়া—দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য, যেখানে রাতভর চলে সঙ্গীত, নাচ, আলোর উল্লাস। কিন্তু ৭ ডিসেম্বরের ভোররাত সেই উদ্যাপনই পরিণত হল বিভীষিকায়। উত্তর গোয়ার ছোট গ্রাম Arpora–তে অবস্থিত Birch by Romeo Lane নামে একটি অভিজাত নাইটক্লাবে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনায় প্রাণ হারালেন কমপক্ষে ২৫ জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় পর্যটক, বিদেশি পর্যটক এবং ক্লাবের স্টাফ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গোয়া রাজ্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হয় এটি।
শুরুতে লোকজন ভাবছিল হয়তো স্বল্পমাত্রার কোনো শর্ট সার্কিট হয়েছে, সহজেই আগুন নেভানো যাবে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্লাবের ভেতরের কাঠের সাজসজ্জা, মোমবাতি ও নরম ফার্নিচার দ্রুত আগুনকে ছড়িয়ে দেয়। প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে অল্প সময়েই নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে অতিথিদের জন্য। যারা বেরোতে চেয়েছিলেন, তাদের সামনে ছিল মাত্র একটি সরু পথ—যেখানে আবার প্রচণ্ড ভিড়। ফলে বহু মানুষ আর বেরোতে পারেননি।
এই প্রতিবেদনে আমরা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, প্রতিক্রিয়া, তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং গোয়ার নাইটলাইফ ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি।
সাক্ষ্য অনুযায়ী রাত প্রায় ১টার দিকে ক্লাবে একটি আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যায়। অনেকেই সেটিকে প্রথমে কোনো ডিজে ইফেক্ট বা আতশবাজির শব্দ ভেবেছিলেন। পরে দেখা যায়, ক্লাবের বার কাউন্টারের কাছে হঠাৎ আগুনের শিখা উঠে আসছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে দেয়াল, সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেশন প্যানেলে।
“প্রথমে কেউ বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ করে কালো ধোঁয়ায় পুরো রুম ভর্তি হয়ে যায়। আমরা দৌড়ে বেরোতে চাই, কিন্তু একটাই দরজা—আর সবাই একসঙ্গে সেখানে ভিড় করে।”
অত্যাধুনিক ডিজাইন করা এই ক্লাবের ইন্টিরিয়র আকর্ষণীয় হলেও, অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে ছিল ভয়াবহভাবে বেহাল। বেশিরভাগ পথই ছিল সজ্জার কারণে আচ্ছাদিত এবং ইমার্জেন্সি এক্সিট সাইন সঠিকভাবে দেখা যায়নি। আবার অনেকেই বলছেন—ইমারজেন্সি এক্সিট থাকলেও তা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত লোকজন একে অপরকে ঠেলে দরজার দিকে দৌড়াতে থাকেন। ধোঁয়ার কারণে অচেতন হয়ে পড়েন অনেকে। জীবিত উদ্ধার হওয়া কয়েকজন জানিয়েছেন—
“দরজার কাছে সবাই পড়ে যাচ্ছিল। আমরা কাউকে টেনে তুলতে পারছিলাম না। ঠিক কী হচ্ছে বুঝতেই পারছিলাম না।”
দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ছিল যে ২৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হলেও, অনেকের দেহ এতটাই পুড়ে যায় যে পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—
৪ জন পর্যটক, যারা দিল্লি, পুনে ও কলকাতা থেকে গোয়া বেড়াতে গিয়েছিলেন।
১৪ জন স্টাফ, যারা ক্লাবের সার্ভিস, বার, কিচেন এবং সিকিউরিটি বিভাগে কাজ করতেন।
বাকিরা স্থানীয় বাসিন্দা এবং কিছু অচেনা পর্যটক।
পরিবারের সদস্যরা যখন খবর পান, তখন অধিকাংশই বিশ্বাস করতে পারেননি। অনেকেই সকালে ফোনে জানতে পারেন যে তাঁদের সন্তান, স্বামী, স্ত্রী বা বন্ধু আর নেই। প্রশাসন হেল্পলাইন চালু করলেও, মরদেহ সনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
এই দুর্ঘটনার পরই উঠে আসে বড় প্রশ্ন—এটি কি প্রতিরোধযোগ্য ছিল?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
Birch by Romeo Lane–এর বিরুদ্ধে অভিযোগ—
Fire NOC মেয়াদোত্তীর্ণ
সঠিক ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম নেই
স্প্রিঙ্কলার নিষ্ক্রিয়
মাত্র ২টি ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার—এরও গ্যাস শেষ
জরুরি নির্গমন পথ ছিল না বা বন্ধ ছিল
ক্লাবে সেই রাতে ১৫০–২০০ জন ছিলেন, যেখানে অনুমোদিত সীমা ছিল ৮০–৯০ জন।
স্টাফদের বেশিরভাগই জানতেন না—আগুন লাগলে কী করতে হয়।
ইন্টিরিয়রে ব্যবহৃত কাপড়, কাঠ, ফোম—সবই আগুন ছড়িয়েছে।
স্পষ্টতই বলা যায়—
এটি একটি মানুষের করা ভুলের কারণে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ গভীর শোক প্রকাশ করেন।
গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত দুর্ঘটনার মাতম দেখে বলেন—
“এটা গোয়ার অন্যতম ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি। প্রতিটি দোষীকে গ্রেফতার করা হবে।”
![]()
আরও খবর
রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে—
মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ
আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়ভার
তদন্ত কমিশন গঠন
পুলিশ ক্লাব মালিক, জেনারেল ম্যানেজার, ইভেন্ট হেডসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে IPC–র ৩০৪ ধারা (অবহেলার কারণে মৃত্যু)–র মামলা দায়ের করেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ পালিয়েছেন, কেউ হেফাজতে।
গোয়া বছরে ৮০ লাখ পর্যটক গ্রহণ করে। এই দুর্ঘটনার পরে প্রশ্ন উঠছে—
নাইটক্লাবের লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হয়?
পর্যটক নিরাপত্তা কি অবহেলিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“এই দুর্ঘটনা গোয়ার ব্র্যান্ড ইমেজ–কে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”
একজন বেঁচে ফেরা ব্যক্তি বলেন—
“আমি বন্ধুকে খুঁজতে গিয়ে যেন মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলাম।”
অন্য এক নারীর কথায়—
“আমি শুধু চিৎকার শুনেছি… তারপর শুধু ধোঁয়া… আর কিছু মনে নেই।”
এই সাক্ষাৎকারগুলো মানবিক দিকটি তীব্রভাবে তুলে ধরে।
ভারতের বিভিন্ন শহরে নাইটক্লাব অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়।
এই ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা পাঁচটি জরুরি পরিবর্তন চেয়েছেন—
কঠোর অডিট
Fire NOC বাধ্যতামূলক
সাপ্তাহিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ
ভিড় নিয়ন্ত্রণ
জরুরি নির্গমন পথ বাধ্যতামূলক
ঘটনাটি ঘটে রাত প্রায় ১টা নাগাদ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে—হঠাৎ একটি ছোট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা প্রথমে অনেকে আতশবাজির শব্দ বলে ভুল করেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্লাবের বার কাউন্টারের দিক থেকে আগুন জ্বলে উঠেছে এবং তা দ্রুত দেয়ালের সাজসজ্জা, আসবাবপত্র ও সাউন্ড সেটআপে ছড়িয়ে পড়ছে। ক্লাবটি অভিজাত সাজসজ্জায় সজ্জিত হলেও অগ্নি–নিরাপত্তার মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। ভেতরে ছিল দাহ্য উপকরণ—কাঠ, কৃত্রিম ফোম, কাপড়, প্লাস্টিক–সাজসজ্জা—যা কয়েক সেকেন্ডেই ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে অতিথিদের মধ্যে।
অনেকেই জানান, ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আলো নিভে যাওয়ায় কেউ বুঝতে পারছিলেন না কোনদিকে যাবেন। ক্লাবের মূল প্রবেশপথই ছিল একমাত্র নির্গমন পথ, আর সেই দরজার দিকে ছুটতে গিয়ে প্রচণ্ড ভিড় তৈরি হয়। অনেকে দরজার কাছে পড়ে যান, অনেকে ধাক্কাধাক্কিতে আঘাত পান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য—“ইমার্জেন্সি এক্সিট ছিল না, আর স্টাফও কাউকে বের করতে সাহায্য করতে পারেননি। সবাই বাঁচার তাগিদে ছুটছিলেন।”
দ্রুতগতিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় মাত্র মিনিটের মধ্যে বহু মানুষ অচেতন হয়ে পড়েন। কেউ ধোঁয়া–শ্বাস নিতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, কেউ আগুনে পুড়ে যান। ফায়ার ব্রিগেড ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও, ততক্ষণে পরিস্থিতি ভয়াবহ মাত্রা ধারণ করেছে। উদ্ধারকারীরা অনেক মৃতদেহ এমন অবস্থায় পেয়েছেন যে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। রাজ্য প্রশাসন পরে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে ডিএনএ যাচাইয়ের ব্যবস্থা করে।
এই অগ্নিকাণ্ডের পিছনে যে ভয়ঙ্কর নিরাপত্তা ব্যর্থতা ছিল, তা তদন্তেই সামনে আসতে শুরু করেছে। জানা গেছে—Birch by Romeo Lane–এর Fire NOC (No Objection Certificate)–এর মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছিল। ক্লাবে কার্যকর অ্যালার্ম সিস্টেম ছিল না, সপ্রিঙ্কলার নিষ্ক্রিয় ছিল, এবং যেসব ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার ছিল—সেগুলোর গ্যাসও কাজ করছিল না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য—ইমার্জেন্সি এক্সিট বা জরুরি নির্গমন পথ হয় ছিলই না, নয়তো তালাবদ্ধ ছিল।
এই দুর্ঘটনা শুধু ২৫টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি—
এটি গোয়ার নাইটলাইফ সংস্কৃতি, পর্যটন শিল্প, প্রশাসনিক কাঠামো এবং নিরাপত্তা মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের আসল কারণ তদন্তে সামনে আসবে, কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—
অপরিকল্পিত বিলাসবহুল ব্যবসা কি মানুষের জীবনকে এভাবে বিপদে ঠেলে দিতে পারে?
এই ২৫টি প্রাণের উত্তর সময়কেই দিতে হবে।