Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে! বিশ্বকাপের আগেই কলকাতায় পা রাখছেন মেসি, যুবভারতীতে আর্জেন্টিনার প্রদর্শনী ম্যাচ এবং ফুটবলের মক্কায় আবারও ইতিহাসের হাতছানি

 ফুটবল পাগল বাঙালির জন্য এর চেয়ে বড় খবর আর হতে পারে না। ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে কলকাতায় আসছে বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা দল। নেতৃত্বে খোদ লিওনেল মেসি। রাজ্য সরকার এবং এআইএফএফ-এর যৌথ উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী মে মাসে। প্রতিপক্ষ সম্ভবত জাপানের জাতীয় দল। ২০১১ সালের পর আবারও জাদুকরকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে তিলোত্তমা। টিকিটের খোঁজ শুরু আজ থেকেই।  

কলকাতা মানেই আবেগ, কলকাতা মানেই মিছিল, আর কলকাতা মানেই ফুটবল। এই শহরের ধমনীতে রক্তের বদলে ফুটবল প্রবাহিত হয়। চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে অফিসের ক্যান্টিন, লোকাল ট্রেন থেকে মেট্রো—সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। এই শহর দুই ভাগে বিভক্ত। একদল পেলের ব্রাজিলের সাম্বায় মজে থাকে, অন্যদল মারাদোনা আর মেসির জাদুতে বিশ্বাসী। তবে আজ, ২০২৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি, সেই বিভাজন রেখা মুছে গেছে। আজ গোটা কলকাতা এক সুরে গান গাইছে। কারণ, ফুটবল ঈশ্বর আবারও পা রাখতে চলেছেন এই শহরের মাটিতে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর, সল্টলেক স্টেডিয়াম বা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আবারও নামতে চলেছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। তার আগে এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে কলকাতায় একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA)। আজ দুপুরে নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (AIFF)-এর সভাপতি কল্যাণ চৌবে যৌথভাবে এই খুশির খবরটি ঘোষণা করেন। খবরটি শোনার পর থেকেই তিলোত্তমা কলকাতা যেন নতুন করে সেজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ফিরে দেখা ২০১১: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন অধ্যায়?

ফুটবল প্রেমীদের মনে আছে ২০১১ সালের সেই সেপ্টেম্বরের সন্ধে। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে খেলতে কলকাতায় এসেছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। তখন তিনি বার্সেলোনার মহাতারকা, ব্যালন ডি'অর জয়ী, কিন্তু তখনো তিনি বিশ্বকাপ জেতেননি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ট্রফি না পাওয়ার যন্ত্রণা তখনো তার চোখেমুখে ছিল। কলকাতার মানুষ সেদিন তাকে বরণ করেছিল রাজপুত্রের মতো। যুবভারতী কানায় কানায় পূর্ণ ছিল।

আর আজ, ১৫ বছর পর তিনি ফিরছেন। কিন্তু এবারের মেসি আর সেই ২০১১ সালের মেসির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। আজ তিনি বিশ্বজয়ী অধিনায়ক। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সেই সোনালি ট্রফি তার ক্যাবিনেটে। তিনি এখন সর্বকালের সেরা বা 'গোট' (GOAT)। ২০২৬ বিশ্বকাপই সম্ভবত মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তার আগে তাকে চোখের দেখা দেখার জন্য যে জনসমুদ্র হবে, তা বলাই বাহুল্য। ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, "বাঙালির আবেগের কথা মাথায় রেখেই আমরা আর্জেন্টিনা বোর্ডের সাথে গত এক বছর ধরে কথা বলছিলাম। অবশেষে তারা রাজি হয়েছে। এটি কেবল একটি ম্যাচ নয়, এটি বাংলার ফুটবলের জন্য এক উৎসব। মেসি কথা দিয়েছিলেন তিনি ফিরবেন, তিনি তার কথা রেখেছেন।"

কবে, কোথায় এবং প্রতিপক্ষ কে?

ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬-এর ২০শে মে। ভেন্যু অবশ্যই এশিয়ার অন্যতম সেরা এবং বৃহত্তম স্টেডিয়াম—যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতীয় দলের খেলার কথা থাকলেও, ফিফা র‍্যাঙ্কিং এবং প্রতিযোগিতার মানের কথা ভেবে জাপানের জাতীয় দল 'ব্লু সামুরাই'-দের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জাপান বর্তমানে এশীয় ফুটবলের অন্যতম শক্তি এবং বিশ্বকাপে তারা বড় বড় দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ, মেসি, দি মারিয়া, ডি পলদের বিরুদ্ধে মিতোমা বা কুবো-র লড়াই দেখার সুযোগ পাবে কলকাতাবাসী। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির অনুরোধেই এমন একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নির্বাচন করা হয়েছে যাতে বিশ্বকাপের আগে দলের ভালো প্রস্তুতি হয়।

ম্যাচটি হবে ফ্লাডলাইটের আলোয়, কিক-অফ সন্ধে ৭টায়। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, স্টেডিয়ামের ঘাস এবং ড্রেসিংরুম আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়ে গেছে। মেসির নিরাপত্তার জন্য 'জেড প্লাস' ক্যাটাগরির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এয়ারপোর্টে নামার পর থেকে স্টেডিয়াম এবং হোটেল—পুরো রাস্তাটি মুড়ে ফেলা হবে নিরাপত্তার চাদরে।

মেসি ম্যানিয়া এবং নীল-সাদা কলকাতা

খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই ময়দানে উৎসব শুরু হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনার ফ্যান ক্লাবগুলো ইতিমধ্যেই বিশাল সব ফ্ল্যাগ এবং টিফো তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছে। উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা—রাস্তার মোড়ে মোড়ে মেসির কাটআউট বসানো শুরু হয়েছে। হাতিবাগান, গড়িয়াহাট এবং ধর্মতলার জার্সি মার্কেটগুলোতে আর্জেন্টিনার তিন তারকাবিশিষ্ট জার্সির স্টক শেষ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় যা জার্সি বিক্রি হয়েছে, তা গত এক বছরেও হয়নি।

মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থকরাও এই একদিনের জন্য তাদের রেষারেষি ভুলে নীল-সাদা জার্সিতে এক হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন। এক প্রবীণ ফুটবল প্রেমী, যার বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই, তিনি বলেন, "আমি ১৯৭৭ সালে এই মাঠে পেলেকে দেখেছি, ২০০৮ সালে মারাদোনাকে দেখেছি, ২০১১ সালে মেসিকে দেখেছি। ভেবেছিলাম আর হয়তো দেখা হবে না। কিন্তু ঈশ্বর মুখ তুলে চেয়েছেন। বিশ্বজয়ী মেসিকে নিজের শহরে দেখার অনুভূতিই আলাদা। আমি আমার নাতিকে নিয়ে যাব, ওকে বলব—দেখ, ফুটবলের ঈশ্বর আমাদের মাটিতে হাঁটছেন।"

স্টেডিয়াম প্রস্তুতি: এক নতুন যুবভারতী

যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। পিচ কিউরেটররা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ঘাসের মান যাতে ইউরোপীয় মানের হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। ড্রেসিংরুম, প্লেয়ার্স টানেল এবং ভিআইপি বক্সগুলোর আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, আর্জেন্টিনা দলের অনুরোধে ড্রেসিংরুমে বিশেষ জাকুজি এবং আইস বাথের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এলইডি ফ্লাডলাইটগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে যাতে ম্যাচের সময় কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি না হয়। প্রেস বক্সেও আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, কারণ সারা বিশ্ব থেকে সাংবাদিকরা এই ম্যাচ কভার করতে আসবেন।

টিকিট যুদ্ধ এবং কালোবাজারির আশঙ্কা

news image
আরও খবর

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—টিকিট পাব তো? ৮৫,০০০ আসনের স্টেডিয়াম, কিন্তু টিকিটের চাহিদা তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, টিকিটের দাম সাধারণের সাধ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হবে, যাতে ছাত্রছাত্রীরাও খেলা দেখতে পারে। তবে ভিআইপি টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া হতে পারে। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও কিছু টিকিট পাওয়া যাবে। টিকিট বিক্রি শুরু হবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে।

তবে কালোবাজারি একটা বড় চিন্তার কারণ। অতীতেও দেখা গেছে বড় ম্যাচের আগে টিকিটের দাম ১০ গুণ বেড়ে যায়। এই সমস্যা রুখতে এবার আধার কার্ড লিঙ্ক করে টিকিট কাটার ব্যবস্থা করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি টিকিট কাটতে পারবেন না এবং স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় পরিচয়পত্র দেখাতে হবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব: স্পোর্টস টুরিজম

মেসির এই সফর কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি কলকাতার অর্থনীতির জন্যও এক বড় বুস্ট। হোটেল এবং হসপিটালিটি সেক্টরে ইতিমধ্যেই খুশির হাওয়া। শহরের সব ফাইভ স্টার হোটেল বুকিং হয়ে যাচ্ছে। তাজ বেঙ্গল, আইটিসি সোনার এবং জে ডব্লিউ ম্যারিয়ট—যেখানে দুই দলের থাকার সম্ভাবনা আছে, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সময় কলকাতায় আসবেন। এর ফলে বিমান সংস্থা, রেস্তোরাঁ এবং ছোট ব্যবসায়ীদের বিশাল লাভ হবে। অর্থনীতিবিদরা একে 'স্পোর্টস টুরিজম'-এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

বাংলার ফুটবলে সুদূরপ্রসারী প্রভাব

মেসির এই সফর বাংলার খুদে ফুটবলারদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হতে চলেছে। জানা গেছে, ম্যাচের আগের দিন মেসি এবং আর্জেন্টিনা দল শহরের কিছু বাছাই করা ফুটবল একাডেমির বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাবেন। টাটা ফুটবল একাডেমি এবং আইএফএ-র উদ্যোগে এই কর্মশালার আয়োজন করা হবে। একজন ৮ বছরের বাচ্চার কাছে মেসির হাত থেকে বল নেওয়া বা তার কাছ থেকে একটা টিপস পাওয়া—এটা সারা জীবনের সম্পদ হতে পারে। এই ঘটনাটি হয়তো আগামী দিনে বাংলা থেকে নতুন কোনো নক্ষত্র উঠে আসার কারণ হবে।

লিওনেল স্কালোনির পরিকল্পনা

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি জানিয়েছেন, তিনি এই ম্যাচটিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। বিশ্বকাপের আগে এটি তাদের দলের সংহতি ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ। তাই মেসি ছাড়াও এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, জুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্ডেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো তারকাদেরও প্রথম একাদশে রাখার সম্ভাবনা প্রবল। জাপানের গতিময় ফুটবলের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা কীভাবে খেলে, সেটাই দেখার বিষয়।

নিরাপত্তা: দুর্ভেদ্য দুর্গ

মেসি মানেই ভিড়, মেসি মানেই পাগলামি। তাই কলকাতা পুলিশ কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। বিমানবন্দর থেকে হোটেল এবং হোটেল থেকে স্টেডিয়াম—পুরো রুটটি 'গ্রিন করিডর' করা হবে। তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় থাকবে দলের চারপাশে। শোনা যাচ্ছে, ইজরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা এবং আর্জেন্টিনার নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষীরা কলকাতা পুলিশের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে। স্টেডিয়ামের ভেতরেও ড্রোন নজরদারি এবং ফেস রেকগনিশন ক্যামেরা বসানো হবে।

উপসংহার: আবেগের মহোৎসব

২০২৬-এর মে মাসটি কলকাতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কাতার বিশ্বকাপের সেই জাদুর রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও মেসির বাঁ পায়ের জাদুতে মাতবে তিলোত্তমা। যুবভারতীর গ্যালারি থেকে যখন ১ লক্ষ মানুষ সমস্বরে "মেসি... মেসি..." বলে চিৎকার করবে, তখন সেই গর্জন হয়তো সুদূর রোজারিওতেও পৌঁছে যাবে।

ফুটবল যদি ধর্ম হয়, তবে মেসি তার ঈশ্বর। আর কলকাতা সেই ঈশ্বরের একনিষ্ঠ ভক্ত। এই ম্যাচটি কেবল হার-জিতের ম্যাচ নয়, এটি একটি উদযাপন। বিশ্বসেরা ফুটবলারের প্রতি এক শহরের নিঃশর্ত ভালোবাসার উদযাপন। ১৯শে মে রাতে হয়তো কলকাতার কেউ ঘুমোবে না, অপেক্ষা শুধু ২০শে মে-র সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। যখন রেফারির বাঁশি বাজবে এবং ১০ নম্বর জার্সি পিঠে এক জাদুকর বল পায়ে দৌড় শুরু করবেন বাংলার সবুজ ঘাসে। সেই দৃশ্য দেখার জন্য আমরা সবাই প্রস্তুত। কলকাতা প্রস্তুত তার রাজপুত্রকে বরণ করে নিতে। ওয়েলকাম লিও, ওয়েলকাম হোম।

Preview image