Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

নিজের রক্তেই মিলবে মুক্তি হাঁটুর বাতের যন্ত্রণা কমাতে কতটা কার্যকর প্লেটলেট প্লাজমা থেরাপি

হাঁটুর দীর্ঘদিনের ব্যথা বা অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে অস্ত্রোপচার ছাড়াই আরাম দিতে পারে প্লেটলেট রিচ প্লাজমা (PRP) থেরাপি। রোগীর নিজের রক্ত থেকেই তৈরি এই বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতিতে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু দ্রুত মেরামতের সুযোগ তৈরি হয়, কমে ব্যথা ও বাড়ে হাঁটুর কার্যক্ষমতা।

? হাঁটুর ব্যথা ও অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস: অস্ত্রোপচার ছাড়াই কি সম্ভব উপশম?

হাঁটুর ব্যথা বর্তমান সময়ে একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু একই সঙ্গে জটিল শারীরিক সমস্যা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন এই সমস্যা বৃদ্ধি পায়, তেমনই এখন অল্প বয়সিদের মধ্যেও হাঁটুর যন্ত্রণা ক্রমশ বাড়ছে। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, ভুল ভঙ্গিতে হাঁটা বা দৌড়নো—সব মিলিয়ে হাঁটু আজ সবচেয়ে বেশি চাপে থাকা অস্থিসন্ধিগুলির একটি।

হাঁটুর ব্যথার কারণ একাধিক হতে পারে। জন্মগত ভাবে হাড়ের গঠনে কোনও ত্রুটি থাকলে ছোট বয়স থেকেই ব্যথা শুরু হতে পারে। কোনও সংক্রমণ হলে, দুর্ঘটনায় চোট লাগলে, লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে বা কার্টিলেজে আঘাত লাগলেও হাঁটুতে ব্যথা দেখা দেয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে টিউমারের মতো গুরুতর কারণেও হাঁটুতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে।

তবে এই সবের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হল হাঁটুর বাত বা অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস।

? অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস কী এবং কেন এটি এত যন্ত্রণাদায়ক?

অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস হল একটি ডিজেনারেটিভ জয়েন্ট ডিজিজ। সহজ ভাষায় বললে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটুর জয়েন্টে থাকা কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। কার্টিলেজ মূলত হাড়ের দুই প্রান্তকে রক্ষা করে এবং মসৃণ ভাবে চলাচলে সাহায্য করে। যখন এই কার্টিলেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন হাড়ের সঙ্গে হাড়ের ঘর্ষণ শুরু হয়।

এর ফলেই দেখা দেয়—

  • দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা

  • হাঁটু শক্ত হয়ে যাওয়া

  • হাঁটা বা বসা-ওঠায় সমস্যা

  • হাঁটু ফুলে যাওয়া

  • চলাফেরার ক্ষমতা কমে যাওয়া

প্রথম দিকে ওষুধ, ফিজিওথেরাপি বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনে কিছুটা আরাম মিললেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এই উপায়গুলি কার্যকর থাকে না। তখন চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন, যেমন নি রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি।

কিন্তু অস্ত্রোপচার মানেই বড় ঝুঁকি, দীর্ঘ বিশ্রাম, খরচ এবং মানসিক চাপ। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখন এমন পদ্ধতির খোঁজ চলছে, যা অস্ত্রোপচার ছাড়াই হাঁটুর ব্যথা কমাতে পারে। এই জায়গাতেই উঠে এসেছে প্লেটলেট রিচ প্লাজমা বা PRP থেরাপির নাম।

? প্লেটলেট রিচ প্লাজমা (PRP) থেরাপি কী?

মানুষের রক্ত মূলত তিনটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত—

  1. লোহিত রক্তকণিকা

  2. শ্বেত রক্তকণিকা

  3. প্লাজমা বা রক্তরস

এই প্লাজমার মধ্যেই থাকে প্লেটলেট বা অণুচক্রিকা। প্লেটলেটের প্রধান কাজ হল ক্ষত সারাতে সাহায্য করা। রক্ত জমাট বাঁধানো ছাড়াও প্লেটলেটের মধ্যে থাকে একাধিক গ্রোথ ফ্যাক্টর ও বায়োঅ্যাকটিভ প্রোটিন, যা—

  • ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করে

  • নতুন কোষ গঠনে সাহায্য করে

  • প্রদাহ কমাতে সহায়ক

প্লেটলেট রিচ প্লাজমা থেরাপি এমন এক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে রোগীর নিজের রক্ত থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্লেটলেট আলাদা করে তা ব্যথার জায়গায় ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়।

⚙️ PRP থেরাপি কীভাবে প্রস্তুত করা হয়?

এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করা হয়। সাধারণত ধাপগুলি হল—

? ধাপ ১: রক্ত সংগ্রহ

রোগীর শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত নেওয়া হয়, ঠিক যেমন সাধারণ রক্তপরীক্ষার সময় নেওয়া হয়।

? ধাপ ২: সেন্ট্রিফিউগেশন

সংগৃহীত রক্ত একটি বিশেষ যন্ত্রে (সেন্ট্রিফিউজ মেশিন) উচ্চ গতিতে ঘোরানো হয়। এতে রক্তের বিভিন্ন স্তর আলাদা হয়ে যায়।

? ধাপ ৩: প্লেটলেট আলাদা করা

এই প্রক্রিয়ার পর প্লেটলেট সমৃদ্ধ প্লাজমা স্তরটি আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়। এটিই হল PRP।

? ধাপ ৪: ইনজেকশন প্রয়োগ

আঘাতপ্রাপ্ত বা ব্যথার জায়গা চিহ্নিত করে সেখানে ইনজেকশনের মাধ্যমে PRP প্রবেশ করানো হয়। সাধারণত দুই সপ্তাহ অন্তর তিনটি সেশন দেওয়া হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

? PRP থেরাপি কীভাবে কাজ করে?

PRP ইনজেকশন দেওয়ার পর প্লেটলেট থেকে ধীরে ধীরে গ্রোথ ফ্যাক্টর নিঃসৃত হয়। এগুলি—

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিয়মিত ও সঠিকভাবে PRP প্রয়োগ করলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে হাঁটুর কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পায়।

? কাদের জন্য PRP থেরাপি কার্যকর হতে পারে?

সব রোগীর জন্য এই পদ্ধতি উপযোগী নয়। তবে নিচের ক্ষেত্রে ভালো ফল মিলতে পারে—

  • প্রাথমিক বা মাঝারি স্তরের অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস

  • খেলাধুলা বা দুর্ঘটনায় লিগামেন্টে আঘাত

  • অল্প বয়সে হাঁটুর দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা

  • যাঁরা অস্ত্রোপচার করতে চান না বা আপাতত এড়িয়ে চলতে চান

তবে রোগীর বয়স, ওজন, রোগের স্তর ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিচার করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

⚠️ কাদের ক্ষেত্রে PRP কাজ নাও করতে পারে?

  • শেষ পর্যায়ের অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস

  • হাঁটুর হাড় মারাত্মক ভাবে ক্ষয়ে গেলে

  • গুরুতর অস্থিসন্ধি বিকৃতি থাকলে

এই ধরনের ক্ষেত্রে হাঁটু প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচারই শেষ বিকল্প হয়ে ওঠে।

PRP থেরাপির সুবিধা

  • রোগীর নিজের রক্ত ব্যবহৃত হয়

  • অ্যালার্জি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি কম

  • স্টেরয়েডের প্রয়োজন নেই

  • অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা

  • দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়

PRP থেরাপির সীমাবদ্ধতা

  • সব রোগীর ক্ষেত্রে সমান ফল নাও মিলতে পারে

  • একাধিক সেশন প্রয়োজন

  • খরচ তুলনামূলক বেশি হতে পারে

  • ধৈর্য প্রয়োজন, ফল ধীরে আসে

? শেষ কথা

হাঁটুর ব্যথা বা অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস মানেই যে অস্ত্রোপচার, তা নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্লেটলেট রিচ প্লাজমা থেরাপি হাঁটুর ব্যথা নিরাময়ে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে এটি কোনও ম্যাজিক চিকিৎসা নয়। সঠিক রোগী নির্বাচন, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নিয়ম মেনে থেরাপি করানোই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

হাঁটুর ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে চললে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে, নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবশ্যই অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

হাঁটুর ব্যথা বা অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসকে অনেকেই বয়সজনিত অবধারিত সমস্যা বলে ধরে নেন। ফলে ব্যথা সহ্য করতে করতেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দেন, যতক্ষণ না হাঁটা–চলা বা দৈনন্দিন কাজকর্ম প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা গেলে হাঁটুর ব্যথা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, এমনকি অস্ত্রোপচার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এই জায়গাতেই প্লেটলেট রিচ প্লাজমা বা PRP থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আধুনিক রিজেনারেটিভ মেডিসিনের এই পদ্ধতিতে শরীরের নিজস্ব ক্ষমতাকেই কাজে লাগানো হয়। রোগীর নিজের রক্ত থেকে নেওয়া প্লেটলেট ক্ষতিগ্রস্ত জায়গায় প্রয়োগ করে স্বাভাবিক নিরাময় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা হয়। ফলে দীর্ঘদিনের প্রদাহ কমে, ব্যথার তীব্রতা হ্রাস পায় এবং অনেক ক্ষেত্রে হাঁটুর নড়াচড়ার ক্ষমতাও উন্নত হয়।

তবে মনে রাখতে হবে, PRP থেরাপি কোনও জাদুকাঠি নয় যে একদিনেই সব সমস্যা মিটে যাবে। এটি ধৈর্য ও নিয়ম মেনে চলার চিকিৎসা। সাধারণত একাধিক সেশন প্রয়োজন হয় এবং ফলাফল ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে সঠিক রোগী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক বা মাঝারি স্তরের অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে এই থেরাপি ভালো কাজ করলেও, শেষ পর্যায়ের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।

এছাড়াও, থেরাপির পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস—এই সব কিছুর সমন্বয়েই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পাওয়া যায়। শুধু ইনজেকশনের উপর ভরসা করে অন্য দিকগুলি উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত উপকার মিলতে নাও পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হাঁটুর ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে চললে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নেওয়া। ইন্টারনেট বা পরিচিতের পরামর্শে চিকিৎসা শুরু না করে অবশ্যই অভিজ্ঞ অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই হাঁটুর ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পথ।

কারণ হাঁটুর ব্যথার পেছনে কারণ একেক জনের ক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে সামান্য কার্টিলেজ ক্ষয় থেকেই সমস্যা শুরু হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে লিগামেন্টে আঘাত বা দীর্ঘদিনের প্রদাহ বড় আকার নেয়। তাই অন্যের ক্ষেত্রে যে চিকিৎসা কাজে এসেছে, সেটি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে—এমনটা ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। ভুল চিকিৎসায় ব্যথা সাময়িকভাবে কমলেও ভিতরের সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ রোগীর বয়স, জীবনযাত্রা, এক্স-রে বা এমআরআই রিপোর্ট বিচার করে চিকিৎসার পথ ঠিক করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এড়িয়ে চলার সুযোগ যেমন থাকে, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে হাঁটুর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখাও সম্ভব হয়।

Preview image