বাপ্পিদা বিশ্বাস করতেন যে তিনি বেঁচে থাকলে আজও কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেন এবং গানেই মগ্ন থাকতেন।
আজ বাপ্পিদার জন্মদিন এবং এই দিনটি আমার জন্য খুবই বিশেষ কারণ আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে জানি এবং তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। বাপ্পিদার সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত যোগ ছিল যা আজও আমি অনুভব করি। তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ছিল এবং তিনি আমাকে অনেক ভালবাসতেন। ছোটবেলা থেকেই আমি তাঁর গান শুনে অনেক কিছু শিখেছি এবং তাঁর অমূল্য পরামর্শ পেয়েছি। তাঁর গানগুলো আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বাপ্পিদা আমাকে শুধুমাত্র সুরের জগতে পথ দেখাননি বরং মানুষের হৃদয়ে কীভাবে পৌঁছাতে হয় তা শিখিয়েছেন। তিনি আমার গান শুনে ফোন করে তাঁর অনুভূতি আমার সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। আমার ‘মুসকুরানে কি ওয়াজা’ গানটি তিনি খুব ভালবাসতেন এবং বিশেষ করে তার অন্তরার অংশটি তিনি পছন্দ করেছিলেন। আমি সেই দিনগুলোতে বাপ্পিদার প্রতি তাঁর অসীম প্রশংসা ও ভালবাসা অনুভব করেছিলাম এবং সেই অনুভূতি এখনও আমার হৃদয়ে অম্লান। তাঁর পরামর্শ ও সঙ্গীতের গভীরতা আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
বাপ্পিদা একজন সুরকার হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। তাঁর কাজের পরিধি এতটাই বিশাল ছিল যে একদিকে তিনি নাচের গান রচনা করতেন এবং অন্যদিকে সুরেলা গানও তৈরি করতেন। তাঁর সৃষ্টিগুলির মধ্যে একাধিক জনপ্রিয় গান রয়েছে যেমন ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘ডান্স ডান্স’, ‘এ আমার গুরুদক্ষিণা’ এবং ‘তখন তোমার একুশ বছর’। এই গানগুলি দেখিয়ে বাপ্পিদা কতটা ব্যাপ্তি নিয়ে সঙ্গীত সৃষ্টি করেছিলেন তা বোঝা যায়। তার সৃষ্টি সঙ্গীতজগতের অন্যতম মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
বাপ্পিদার অন্যতম সৃষ্টি ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ এখনও সঙ্গীত জগতে চিরন্তন হয়ে আছে এবং এর নামের ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব যখন আমার কাঁধে এসে পড়ে তখন আমি বাপ্পিদাকে ফোন করে বলেছিলাম ‘দাদা তুমি আমাকে আশীর্বাদ কোরো এবং সাহস দিয়ো’। এই গানটি সত্যিই এমন একটি সৃষ্টি যা চিরকাল বেঁচে থাকবে। বাপ্পিদা আমাকে শুধু বলেছিলেন ‘তুমি মন দিয়ে কাজটা কোরো’। এই একটি কথা আমার জন্য অনেক ছিল এবং সেটি আমার পুরো কাজের প্রতি এক ধরনের অভিজ্ঞতা ও আশাবাদ তৈরি করেছিল। এরপর যখন ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির ‘বাতাসে গুনগুন’ এবং ‘ঝিরিঝিরি’ গান দুটি প্রকাশিত হয় বাপ্পিদা সেগুলি খুব পছন্দ করেছিলেন। তার স্ত্রী চিত্রাণী বৌদি আমাকে ফোন করে এই গানগুলো সম্পর্কে ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলেন। আমাদের সম্পর্ক ছিল একদম পরিবারের মতো। আমি এবং আমার স্ত্রী চন্দ্রানীকে তিনি কতবার মাছভাত খাওয়েছেন সেটা কখনও ভুলব না। বাপ্পিদার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল এক দারুণ পারিবারিক বন্ধন যা আজও অটুট রয়েছে। আমরা এক পরিবারের মতোই আছি এবং বাপ্পিদার দেওয়া সব মূল্যবান পরামর্শ এখনও আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।
সম্প্রতি ‘সারেগামাপা’ অনুষ্ঠানে বাপ্পিদাকে উৎসর্গ করে একটি পর্ব করা হয়েছিল এবং আমি বৌদিকে ফোন করে সেই বিষয়টি জানিয়েছিলাম। সত্যি বলতে তখনও চোখে জল চলে এসেছিল কারণ বাপ্পিদা আমাদের জীবনে যে গভীর প্রভাব রেখে গেছেন তা কখনও ভুলে যাওয়ার নয়। তিনি সঙ্গীতের জগতের জন্য অনেক কিছু করেছেন এবং তাঁর সৃষ্টি সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। তার হাত ধরেই আমাদের কাছে এসেছিল অর্কেস্ট্রা ও ডিস্কো-র সেই বিশেষ সাউন্ড যা আজও প্রতিটি গানের মধ্যে জীবিত। একদিকে যেমন ‘ইয়াদ আ রহা হ্যায়’ গানটি, অন্যদিকে ‘আজি এ প্রভাতে’ গানটি—এই দুটো গানই তার সঙ্গীতের বিশাল পরিধি এবং তার সুরের বিশালতা তুলে ধরে। বাপ্পিদার সঙ্গীতের মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পেরেছি যে সঙ্গীত কেবলমাত্র সুর নয় বরং এক অদৃশ্য শক্তি যা মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। আমি নিজেও বাপ্পিদার কাছ থেকে বহু পরামর্শ পেয়েছি এবং সে পরামর্শই আমি আমার কাজের মধ্যে প্রয়োগ করেছি। একদিকে যেমন ‘ভজ গৌরাঙ্গ’ গানটি, অন্যদিকে ‘হমারি অধুরি কহানি’ গানটি—এই ধরনের গান বাঁধার সাহস আমি পেয়েছিলাম বাপ্পিদার কাছ থেকেই। তাঁর পথপ্রদর্শক পরামর্শ আমাকে সঙ্গীতের প্রতি আরও গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে এবং আমি চেষ্টা করছি তাঁর দেখানো পথে চলার।
বাপ্পিদা ছিলেন একজন সুরস্রষ্টা, কিন্তু শুধু সুর নয়, তাঁর তালের ওপরও অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি তবলা বাজাতে পারতেন এবং খুব সুন্দরভাবে বাজাতেন। তার তালজ্ঞান ছিল অপরিসীম, আর যে ব্যক্তি তালজ্ঞান বোঝে তাঁর সঙ্গীতও নিশ্চয়ই শ্রুতিমধুর হবে। বাপ্পিদা কণ্ঠশিল্পী হিসাবেও অতুলনীয় ছিলেন। তিনি যেভাবে সঙ্গীতের মধ্যে নিজের কণ্ঠকে মিশিয়ে দিতেন তাতে সঙ্গীতের আবহ বদলে যেত। আমি যখন আমার পরিচালনায় বিভিন্ন শিল্পীদের গান রেকর্ড করিয়েছি তখন বাপ্পিদার কণ্ঠ মাইকের সামনে আসলেই পুরো পরিবেশ বদলে যেত। তাঁর কণ্ঠ যেন ম্যাজিক করে দিত।
বাপ্পিদা শুধু সঙ্গীতের জন্যই নয় বরং তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্যও বিশেষ ছিলেন। তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত আপন মানুষ যিনি কখনও নিজেকে বড় ভাবতেন না বরং তাঁর হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে সবাইকে কাছে টানতেন। তাঁর মানবিক গুণগুলোই তাঁকে আরও বড় করে তুলেছিল। সঙ্গীতের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দয়ালু মানুষ যিনি সকলের সঙ্গে সহজে মিশে যেতেন। মুম্বইয়ে থাকলেও বাপ্পিদা ছিলেন এক আদ্যোপান্ত বাঙালি। তাঁর বাড়িতে প্রায়ই বাঙালি খাবারের আয়োজন থাকত এবং তিনি ছিলেন একজন খাদ্যরসিক। মাছ ছিল তাঁর প্রিয় খাবার আর এই বিষয়ে তিনি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। আমাদের মুম্বইয়ের বাড়িতে প্রায়ই রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা যেত এবং বই পড়ার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। তাঁর খাবারের তালিকায় আলু পোস্ত এবং মাছের ঝোল ছিল একেবারে অবধারিত। এমন একটি জীবনযাপন ছিল বাপ্পিদার যা তাঁর সঙ্গীতজীবনকে আরও পূর্ণতা দিয়েছে। তিনি একদম সাধারণ মানুষ ছিলেন যিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতেন এবং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতেন।
করোনা অতিমারির পর একদিন বাপ্পিদা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন সেদিনটি এখনো আমার মনে গেঁথে আছে সেই দিনের অনুভূতি আজও অম্লান হয়ে রয়েছে। বাপ্পিদা ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি সঙ্গীতের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও নিষ্ঠা কখনও কমেনি। তাঁর অসীম সৃজনশীলতা ও একনিষ্ঠতা আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর সুর, গান, এবং শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা আমাদের হৃদয়ে চিরকাল থাকবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে যদি বাপ্পিদা বেঁচে থাকতেন তবে তিনি আজও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং সঙ্গীতের সুরে ডুবে থাকতেন। তাঁর চলে যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় ক্ষতি, কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাঁর পরিবারে। চিত্রাবৌদি যিনি তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন এবং সব সময় তাঁর পাশে ছিলেন, তাঁর জীবন অনেকটাই শূন্য হয়ে গেছে। বাপ্পিদার শূন্যতা শুধুমাত্র আমাদের জীবনে নয় বরং তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবনে প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে।
বাপ্পিদা শুধুমাত্র একজন সুরকার নয়, তিনি ছিলেন এক মহান মানুষ ও শিক্ষক। তাঁর সঙ্গীতের জন্য তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এবং সঙ্গীত জগতের প্রতি তাঁর অবদান চিরকাল অম্লান থাকবে। তিনি যে সঙ্গীত সৃষ্টি করেছেন তা শুধুমাত্র গান নয়, বরং মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়া এক মহা সৃষ্টি ছিল যা আজীবন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। বাপ্পিদার সুরের মাধ্যমে তিনি যেভাবে মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছেন তা পৃথিবী থেকে কখনো মুছে যাবে না। তাঁর সঙ্গীত, তার সৃষ্টি, এবং তার কথা সবকিছুই মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। বাপ্পিদার সৃষ্টি শুধু একটি শিল্পী হিসেবে নয়, একজন মানুষের প্রতিভার প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।
বাপ্পিদার সঙ্গীতের মাধ্যমেই তিনি আমাদেরকে দেখিয়েছেন কীভাবে শিল্পের মধ্যে জীবনকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়। তাঁর সুরের প্রতিটি নোট ছিল গভীর অনুভূতির প্রতিফলন, যা আমাদের হৃদয়ে তার অভ্যন্তরীণ শক্তির কথা বলত। সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি মানুষকে একত্রিত করেছিলেন, একে অপরকে অনুভব করতে শিখিয়েছিলেন এবং কখনো কখনো সঙ্গীতের মাধুর্য্যে অশ্রু ঝরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গীতের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি সুর, এবং প্রতিটি কথা যেন তাঁর জীবন এবং কর্মের সাক্ষী ছিল।
বাপ্পিদা ছিলেন একজন জীবন্ত কিংবদন্তি, যার শিল্পে ছিল গভীর মানবিকতা, এক অদ্বিতীয় সুরের প্রজ্ঞা, এবং মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। তাঁর সুরে আমরা শুধু গান শোনাইনি বরং জীবনকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করেছি। তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে সঙ্গীত শুধু একটি শখ নয় বরং এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম যার মাধ্যমে একে অপরকে বোঝা যায়, একে অপরকে অনুভব করা যায়, এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা যায়।
বাপ্পিদা আমাদের যে উপহার দিয়েছেন তা কখনও মুছে যাবে না। তাঁর সঙ্গীত এবং তাঁর সৃষ্টি চিরকাল আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে এবং তাঁর প্রভাব সঙ্গীত জগতে চিরকাল অম্লান থাকবে। তাঁর সঙ্গীত, তার সুর, এবং তাঁর কণ্ঠ প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে। আমাদের জীবনে তাঁর অভাব চিরকাল থাকবে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে এবং তা আমাদের চিরকাল অনুপ্রাণিত করবে।
আমরা জানি যে বাপ্পিদা আর আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু তাঁর সঙ্গীত আমাদের মাঝে তার উপস্থিতি নিয়ে থাকবে। সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছেন তা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কাজে লাগাতে হবে। তাঁর স্মৃতি আমাদের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে এবং আমরা তাঁর দেখানো পথে চলতে চেষ্টা করব। বাপ্পিদার সুর, গান এবং সৃষ্টি চিরকাল আমাদের সাথে থাকবে, তাকে আমরা কখনো ভুলবো না।