কলকাতার যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠানে দর্শকদের ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলার মধ্যেই অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় লিওনেল মেসির সঙ্গে একাধিক ছবি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে GOAT India Tour-এ বাংলার ফিল্ম ফ্যাটারনিটির প্রতিনিধিত্বের কথা লিখতেই ট্রোলের ঝড় ওঠে। অনেকেই দাবি করেন, হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও মেসিকে কাছে থেকে দেখেননি তাই VIP কালচার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কটাক্ষে কমেন্ট অফ করেন তিনি। ঘটনা দ্রুত ভাইরাল হয়।
কলকাতায় ফুটবলপ্রেমীদের বহু প্রতীক্ষিত “GOAT India Tour” ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা একদিনেই বদলে গেল ক্ষোভ, হতাশা এবং বিতর্কে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন (সল্টলেক স্টেডিয়াম)–এ লিওনেল মেসির উপস্থিতিকে ঘিরে আয়োজনে চরম অব্যবস্থা, দর্শকদের মাঠে নেমে আসা, চেয়ার ভাঙচুর, নিরাপত্তা-হইচই—সব মিলিয়ে শনিবারের সেই ছবিটা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
আর ঠিক এই আবহেই আরেকটি প্রসঙ্গ দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়—অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের মেসির সঙ্গে ছবি পোস্ট। যে মুহূর্তে বহু দর্শক দাবি করছেন, টিকিট কেটে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তাঁরা মাঠে মেসিকে ঠিকমতো দেখতে পাননি, সেই সময় একজন পরিচিত মুখ কীভাবে মেসির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সুযোগ পেলেন—এই প্রশ্নই এক নিমেষে ট্রোলিংয়ের রসদ হয়ে ওঠে।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের তুলনায় মেসির উপস্থিতি অনেক কম ছিল—যেখানে ৪৫ মিনিটের কথা ছিল, সেখানে তিনি প্রায় ২০ মিনিটের মতো থাকেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরেই বহু দর্শকের ক্ষোভ চরমে ওঠে, মাঠে নানা জিনিস ছোড়া, সিট ছেঁড়া, কয়েকজনের মাঠে ঢুকে পড়া—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে পুলিশ-নিরাপত্তার সঙ্গে ধস্তাধস্তিও দেখা যায়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও (AP) জানিয়েছে, অনেক দর্শক টিকিট কেটেও মেসিকে ঠিকমতো দেখতে পারেননি—কেউ মাঠে, কেউ স্ক্রিনে—ফলে হতাশা থেকে বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনার গুরুত্ব বোঝা যায় প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া থেকে। রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং তদন্তের নির্দেশ দেন। একই রিপোর্টে আরও আছে—আয়োজক হিসেবে উল্লেখ করা একজনকে পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
এ ধরনের বড় ইভেন্টে সাধারণ দর্শক এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকা নতুন নয়। কিন্তু এবারের বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল “দেখার সুযোগ”—অনেকের অভিযোগ, VIP–দের ভিড়, অপ্রতুল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে মাঠের সাধারণ দর্শকরা ‘মেসি-মুহূর্ত’টা ঠিকমতো উপভোগ করতে পারেননি। রয়টার্সের রিপোর্টে এমন কথাও এসেছে যে, বড় এক দল/এনট্যুরাজ মেসিকে ঘিরে রাখায় দর্শকদের অনেকে খুব সামান্যই তাঁকে দেখতে পেয়েছেন।
এ দিকেই ইঙ্গিত করে অনলাইনে নানা পোস্ট, ভিডিও, ক্ষোভ উগরে পড়া মন্তব্য—সব মিলিয়ে “এই ইভেন্ট কার জন্য—ফ্যানদের জন্য, না প্রভাবশালীদের জন্য?” এই প্রশ্ন বারবার উঠতে থাকে। (এ ধরনের ভাইরাল ক্লিপ/দাবি নিয়ে বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে আলোচনা হলেও, সব বক্তব্য বা ক্লিপের সত্যতা সবসময় স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় না—তাই সংবাদসূত্রভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে আলাদা করে দেখাই জরুরি।)
ABP লাইভ বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঠে বিশৃঙ্খলার আবহেই শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ছবি পোস্ট করেন—যার মধ্যে মেসির পাশে দাঁড়িয়ে তোলা ছবি, স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে তাঁর উপস্থিতির ছবি ইত্যাদি ছিল। ওই প্রতিবেদনে ক্যাপশন হিসেবে “GOAT India tour-এ বাংলার ফিল্ম ফ্যাটারনিটির প্রতিনিধিত্ব করছি”—এই বক্তব্যও উদ্ধৃত হয়েছে।
সমস্যা হল, একই সময়ে অনেকে দাবি করছিলেন—হাজার হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কেটেও তাঁরা মেসিকে ‘ভালো করে দেখতেই’ পাননি। ফলে শুভশ্রীর পোস্ট মুহূর্তে ভাইরাল হয় এবং তার সঙ্গে শুরু হয় তুলনা, ক্ষোভ, কটাক্ষ। ABP–র প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—যিনি ফুটবলের বড় ভক্ত নাও হতে পারেন, তিনি কীভাবে এমন কাছ থেকে ছবি তোলার সুযোগ পেলেন; আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচিতি ঘিরে অনুমানভিত্তিক মন্তব্যও করেন (এগুলো নেটিজেনদের মন্তব্য হিসেবে রিপোর্টে উল্লেখ, যাচাই করা অভিযোগ হিসেবে নয়)।
অনলাইনে ট্রোলিংয়ের একটা চেনা প্যাটার্ন আছে—ঘটনার বাস্তব ক্ষোভ (এক্ষেত্রে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট) থেকে ফোকাস ধীরে ধীরে ব্যক্তিবিশেষের দিকে সরে যায়। এই ঘটনাতেও সেটাই ঘটে। ABP–র প্রতিবেদন বলছে, কটাক্ষের তোড়ে শুভশ্রী ইনস্টাগ্রামে কমেন্ট বক্স অফ করে দেন। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, সেদিন শুভশ্রী ছাড়াও তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহকারীর মেসির সঙ্গে ছবি ভাইরাল হয় এবং তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।
এখানে দুটো আলাদা বিষয় একসঙ্গে মিশে যায়—
ইভেন্টের অব্যবস্থা ও দর্শকের ক্ষোভ (প্রশাসনিক পদক্ষেপ/তদন্ত/আটক ইত্যাদি) সেলিব্রিটির “অ্যাক্সেস” ও জনমানসে ন্যায্যতার প্রশ্ন (কে কীভাবে আমন্ত্রণ পেলেন, কার কতটা দায়িত্ব, ইত্যাদি)
যে কোনও বড় ইভেন্টে “দর্শক নিরাপত্তা” এবং “টিকিটের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত অভিজ্ঞতা”—দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, পুলিশের তরফে আয়োজককে আটক করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে টিকিট রিফান্ডের বিষয়ও সামনে আসে।
অন্যদিকে AP রিপোর্টেও তদন্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং কীভাবে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেল—সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটো বিপরীত সুর দেখা যায়—
একদল বলছেন, দর্শকের কষ্টার্জিত টাকায় কেনা টিকিটের অভিজ্ঞতা যখন ভেস্তে গেল, তখন ভিআইপি–দের ছবি-ভিডিও পোস্ট “অসংবেদনশীল” মনে হওয়া স্বাভাবিক।
আরেকদল বলছেন, কোনও সেলিব্রিটি আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকলে ছবি তোলা বা পোস্ট করা ‘অপরাধ’ নয়; আসল দায় ইভেন্ট পরিচালনার, নিরাপত্তার, গেট-ম্যানেজমেন্টের, স্ক্রিনিং/ভিউয়িংয়ের, এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার।
ABP–র রিপোর্টে স্পষ্ট যে শুভশ্রী এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি—এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিতর্ক আরও বাড়ে।
এই ঘটনাটা কয়েকটি বড় প্রশ্ন সামনে এনে দেয়—
বড় আন্তর্জাতিক তারকা এলে ভারতের মতো দেশে ক্রাউড কন্ট্রোল কতটা প্রস্তুত? টিকিটেড ইভেন্টে দর্শককে কী কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এবং বাস্তবে কী দেওয়া হল? সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ আর ব্যক্তিগত আক্রমণের সীমারেখা কোথায়? (এটা অবশ্যই বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন; প্রতিটি ঘটনায় আলাদা প্রসঙ্গ থাকে।)
একদিকে যেমন সরকার/পুলিশ/প্রশাসন তদন্তের কথা বলছে, অন্যদিকে সাধারণ দর্শকের মনে ‘বিশ্বাসভঙ্গ’—এই দুয়ের মাঝখানে সেলিব্রিটির ছবি পোস্টকে ঘিরে যে রাগটা জমা পড়েছে, তা অনেক সময় আসল সমস্যাকে আড়ালও করে দিতে পারে।
অনেক পরিচিত মানুষ ট্রোলিং বাড়লে কমেন্ট অফ করেন—এটা ডিজিটাল সেফটির দিক থেকে স্বাভাবিক পদক্ষেপ। কিন্তু পাবলিক মুড যদি তুঙ্গে থাকে, তখন কমেন্ট অফ করাকে কেউ কেউ “জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া” হিসেবেও দেখেন। এই দ্বন্দ্বটাই সোশ্যাল মিডিয়ার বাস্তবতা—একদিকে মানসিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে জনমানসের প্রত্যাশা। ABP–র রিপোর্ট অনুযায়ী, শুভশ্রী কমেন্ট বক্স অফ করেন এবং বিষয়টি আরও আলোচনার জন্ম দেয়।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—পরবর্তী শহরগুলিতে (যদি ট্যুরের বাকি পর্ব থাকে) আয়োজকরা কীভাবে ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট, নিরাপত্তা, ভিউয়িং অ্যাক্সেস এবং দর্শক-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করবেন। কারণ একবার বড় ঘটনার মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে ভবিষ্যতের আয়োজনগুলিতেও আস্থা নড়বড়ে হয়। রয়টার্স ও AP–এর রিপোর্টে যে তদন্ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং দায় নির্ধারণের কথা এসেছে—সেটাই এখন পরবর্তী ধাপ।
মেসির মতো তারকার সঙ্গে ছবি—স্বাভাবিকভাবেই সেলিব্রিটি জগতের কাছে একটি বড় মুহূর্ত। কিন্তু যখন একই সময় হাজার হাজার দর্শক নিজেদের “একবারের স্বপ্ন” ভেঙে যেতে দেখেন, তখন সেই মুহূর্তের প্রদর্শন (পোস্ট/ক্যাপশন) জনমানসে ভুল বার্তা দিতে পারে—এটাই এই ঘটনার মূল শিক্ষা হিসেবে উঠে আসছে। আবার এটাও সত্যি, ট্রোলিং যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমানের দিকে চলে যায়, তাহলে তা সমস্যার সমাধান নয়—বরং নতুন সমস্যা তৈরি করে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো—আয়োজনে কোথায় কী গলদ ছিল, দর্শক কেন প্রতিশ্রুত অভিজ্ঞতা পেলেন না, নিরাপত্তা কেন ভেঙে পড়ল, এবং ভবিষ্যতে যাতে কোনও আন্তর্জাতিক ইভেন্টে এমন “কলঙ্কিত” ছবি না তৈরি হয়—সেটাই নিশ্চিত করা।