Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শেয়ার বাজারে পতন অব্যাহত, ফের চাপে বিনিয়োগকারীরা

সপ্তাহের শুরুতেই বড়সড় পতন শেয়ার বাজারে। সোমবার ১,১২৪ পয়েন্ট পড়ল সেনসেক্স, বাড়ল বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ।

নয়াদিল্লি: সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় শেয়ার বাজার। সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ব্যাপক বিক্রির চাপে এক ধাক্কায় ১,১২৪ পয়েন্টেরও বেশি পড়ল বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক সেনসেক্স। দিনের শেষে সেনসেক্স ১,১২৪.০২ পয়েন্ট বা ১.৫২ শতাংশ কমে ৭২,৭৭১.৭২ পয়েন্টে থামে। একইসঙ্গে জাতীয় শেয়ার সূচক নিফটিতেও দেখা যায় বড় পতন। এদিন নিফটি ৩৬০.২৫ পয়েন্ট বা ১.৫৬ শতাংশ নেমে ২২,৭৮০.২৫ পয়েন্টে বন্ধ হয়।

বাজারের এই পতনের পিছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বড় প্রভাব রয়েছে বলে বাজার-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং তার জেরে অশোধিত তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশ্ব বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশীয় বাজারেও।

একদিনেই বড় পতন সেনসেক্সে

সোমবারের লেনদেনে শুরু থেকেই চাপের মধ্যে ছিল ভারতীয় শেয়ার বাজার। দিনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১.৫ শতাংশের বেশি পতন নিয়ে দিন শেষ করে দুই প্রধান সূচকই।

সেনসেক্সের ১,১২৪ পয়েন্টের পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ২২,৮০০-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে নিফটি। বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যে বিভিন্ন বড় সংস্থার শেয়ারেও চাপ দেখা যায়। সোমবারের বাজারে Hindustan Unilever, HDFC Bank, Adani Ports, Power Grid এবং Larsen & Toubro-সহ একাধিক বড় সংস্থার শেয়ারে ২ শতাংশের বেশি পতন দেখা যায়।

বাজারের এই পতনকে শুধু দেশীয় কোনও একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অপরিশোধিত তেলের দাম, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক বাজারের গতিবিধি—একাধিক বিষয় একই সময়ে ভারতীয় বাজারকে প্রভাবিত করছে।

পশ্চিম এশিয়ার অশান্তির প্রভাব

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ও দামের উপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সোমবারের বাজার পতনের সময়ও তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের নজরে ছিল।

রিপোর্ট অনুযায়ী, সোমবার Brent crude-এর দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৬ ডলারের কাছাকাছি ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। সেই কারণেই তেলের দামের গতিবিধি দেশীয় শেয়ার বাজারের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তেলের দাম বৃদ্ধি শুধু জ্বালানি খাতেই প্রভাব ফেলে না। পরিবহণ থেকে শুরু করে উৎপাদন, লজিস্টিক্স এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে খরচ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের পরিস্থিতির উপর নজর রাখেন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রিও চাপ বাড়িয়েছে

সোমবার ভারতীয় শেয়ার বাজারে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিক্রিও বাজারের উপর চাপ বাড়িয়েছে। ওই দিন বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় ইক্যুইটিতে প্রায় ৩,৬৯৩.৯৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেন। এর বিপরীতে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২,৮৩৮.১৭ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ভারতীয় বাজারের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে অনেক সময় বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে তাঁদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেন। এর প্রভাব উদীয়মান বাজারগুলিতেও পড়তে পারে।

তবে বাজারের এক দিনের পতনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার একমাত্র সূচক হিসেবে দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, কোম্পানির আর্থিক ফল, সুদের হার, মুদ্রার বিনিময়মূল্য, তেলের দাম এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণ—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই শেয়ার বাজারের গতিপথ নির্ধারিত হয়।

শিল্পোৎপাদনের পরিসংখ্যানে আশার খবর

শেয়ার বাজারে যখন বড় পতন দেখা দিয়েছে, তখনই দেশের শিল্পক্ষেত্র থেকে এসেছে তুলনামূলক ইতিবাচক খবর। আগস্ট ২০২৬-এ ভারতের শিল্পোৎপাদন বা Index of Industrial Production (IIP) ৮ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ের সংশোধিত ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় আগস্টের পরিসংখ্যান বেশি। এই তথ্য ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয়েছে।

শিল্পোৎপাদনের এই বৃদ্ধির ক্ষেত্রে manufacturing sector গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আগস্টে manufacturing output ৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে electricity and gas supply sector-এর উৎপাদন ১২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে mining sector-এ ৫.৬ শতাংশ সংকোচন দেখা গিয়েছে।

অর্থাৎ অর্থনীতির সব শিল্পক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়নি। উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতে শক্তিশালী বৃদ্ধি থাকলেও mining sector-এ পতন হয়েছে। এই বৈপরীত্য শিল্পক্ষেত্রের সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

news image
আরও খবর

উৎপাদন শিল্পে বৃদ্ধির নেপথ্যে কী?

আগস্টের IIP পরিসংখ্যানে manufacturing sector-এর ৯ শতাংশ বৃদ্ধি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে manufacturing output-এর বৃদ্ধি জুলাইয়ের ৮.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ শতাংশ হয়েছে এবং এটি টানা তৃতীয় মাসে ৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।

উৎপাদন শিল্পের বিভিন্ন অংশে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। বিশেষ করে motor vehicles, electrical equipment এবং other transport equipment-এর উৎপাদনে শক্তিশালী বৃদ্ধি ছিল। Financial Express-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে motor vehicles-এর উৎপাদন ২৫.২ শতাংশ এবং electrical equipment-এর উৎপাদন ৩০.৯ শতাংশ বেড়েছে।

এছাড়াও capital goods production ১৬.৯ শতাংশ এবং consumer durables ১১.১ শতাংশ বেড়েছে। এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যকলাপের কিছু অংশে শক্তিশালী গতি দেখা যাচ্ছে বলে বোঝা যায়।

এপ্রিল-আগস্টেও শিল্পোৎপাদনে বৃদ্ধি

শুধু আগস্টের পরিসংখ্যান নয়, চলতি আর্থিক বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়েও শিল্পোৎপাদনে বৃদ্ধি হয়েছে। এই পাঁচ মাসে সামগ্রিক IIP ৬.৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে manufacturing sector-এর বৃদ্ধি ছিল ৭.৪ শতাংশ এবং electricity and gas supply sector-এর বৃদ্ধি ৯.৫ শতাংশ।

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই cumulative industrial growth-ও বেশি। ফলে শেয়ার বাজারে সাময়িক চাপ থাকলেও অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে।

তবে শিল্পোৎপাদনের পরিসংখ্যানকে শেয়ার বাজারের তাৎক্ষণিক গতিপথের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। শেয়ার বাজার ভবিষ্যৎ আয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সুদের হার, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং ঝুঁকির প্রত্যাশা-সহ একাধিক বিষয়কে আগে থেকেই বিবেচনায় নেয়। ফলে একই সময়ে শিল্পোৎপাদনে বৃদ্ধি এবং শেয়ার বাজারে পতন—দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটতে পারে।

বাজারের নজরে এখন কোন বিষয়গুলি?

সোমবারের পতনের পর বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে। প্রথমত, পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কেনাবেচার প্রবণতা বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং ভারতীয় টাকার গতিবিধিও বিনিয়োগকারীদের নজরে থাকবে। সোমবার ভারতীয় মুদ্রা ডলারের তুলনায় ৯৫.৮১ স্তরে ছিল বলে বাজার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকও গুরুত্বপূর্ণ। আগস্টের IIP-এর ৮ শতাংশ বৃদ্ধি শিল্পক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে manufacturing sector-এর শক্তিশালী বৃদ্ধি দেশের উৎপাদন কার্যকলাপ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।

শেয়ার বাজারে অস্থিরতার সময় কী মনে রাখা জরুরি?

শেয়ার বাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক। কোনও একটি দিনের বড় পতন দেখেই বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, বিনিয়োগের সময়সীমা এবং নির্দিষ্ট সংস্থার আর্থিক অবস্থার মতো বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি এবং দেশীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান—দুই দিকেই নজর রাখা জরুরি। একদিকে পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা ও তেলের দামের বৃদ্ধি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, অন্যদিকে শিল্পোৎপাদনের শক্তিশালী বৃদ্ধি অর্থনীতির কিছু অংশে ইতিবাচক গতি দেখাচ্ছে।

সোমবারের লেনদেন তাই ভারতীয় অর্থনীতির দুই ভিন্ন দিককে সামনে এনেছে। শেয়ার বাজারে সেনসেক্স ও নিফটির উল্লেখযোগ্য পতন বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের ছবি তুলে ধরেছে। অন্যদিকে আগস্টের শিল্পোৎপাদনের ৮ শতাংশ বৃদ্ধি, manufacturing-এর ৯ শতাংশ এবং electricity and gas supply-এর ১২.৩ শতাংশ বৃদ্ধি দেশের উৎপাদন ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিয়েছে।

আগামী দিনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তেলের দাম, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন এবং দেশীয় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক—এই সবকিছুর উপরই বাজারের নজর থাকবে। তাই শেয়ার বাজারের সাম্প্রতিক অস্থিরতা বুঝতে শুধু সূচকের ওঠানামা নয়, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও দেখা প্রয়োজন।

Preview image