ছোটদের ক্রিকেটে ভারত প্রায় অপ্রতিরোধ্য। টানা ছ’বার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে প্রমাণ করে দিল আয়ুষ মাত্রের দল। সবচেয়ে বেশি পাঁচ বার ছোটদের বিশ্বকাপ জিতেছে ভারত।
ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় যোগ করল ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দল। টানা ষষ্ঠবারের মতো ছোটদের বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করল হৃষিকেশ কানিতকারের নেতৃত্বাধীন দল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনও দলই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে এতবার ধারাবাহিক ভাবে ফাইনালে ওঠার নজির দেখাতে পারেনি। হারারের ২২ গজে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে ৭ উইকেটের দুরন্ত জয় শুধু ফাইনালের টিকিটই নিশ্চিত করল না, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের সম্ভাবনাকেও আরও উজ্জ্বল করে তুলল।
সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুটি শক্তিশালী দল—ভারত ও আফগানিস্তান। আফগানিস্তান এই টুর্নামেন্টে নিজেদের ব্যাটিং শক্তি ও স্পিন আক্রমণের জন্য ইতিমধ্যেই আলোচনায় ছিল। অন্যদিকে ভারত টুর্নামেন্ট জুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেদের ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। দুই দলের মধ্যকার এই ম্যাচকে অনেকেই ফাইনালের আগে কার্যত একটি ‘মিনি ফাইনাল’ হিসেবে দেখছিলেন।
টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন আফগানিস্তানের অধিনায়ক মাহবুব খান। প্রথম দিকে অবশ্য আফগান ওপেনাররা পাওয়ার প্লের সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি। ওসমান সাদাত ও খালিদ আহমেদজ়াই ধীরে শুরু করেন, প্রথম উইকেটের জুটিতে ১২.২ ওভারে ৫৩ রান তোলেন। এই মন্থর শুরু ভারতের বোলারদের কিছুটা স্বস্তি দেয়।
কিন্তু ইনিংসের মাঝামাঝি সময় দৃশ্যপট বদলে দেন ফয়জল শিনোজ়াদা ও উজ়াইরুল্লা নিয়াজ়াই। দুই ব্যাটারই অসাধারণ ব্যাটিং দক্ষতা দেখান। শিনোজ়াদা ৯৩ বলে ১১০ রান করেন, তাঁর ইনিংসে ছিল ১৫টি চার। অন্যদিকে নিয়াজ়াই ৮৬ বলে অপরাজিত ১০১ রান করেন, তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১২টি চার ও ২টি ছক্কা।
তৃতীয় উইকেটের জুটিতে তাঁরা যোগ করেন ১৪৮ রান, যা আফগান ইনিংসের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে। এই সময় ভারতীয় বোলারদের ওপর চাপ বাড়ে। দীপেশ দেবেন্দ্রন ও কণিষ্ক চৌহানের মতো বোলাররা প্রত্যাশিত নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। ফিল্ডিংয়েও কিছু ভুল ছিল, যা আফগান ব্যাটারদের বড় ইনিংস খেলতে সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারে আফগানিস্তান ৪ উইকেটে ৩১০ রান তোলে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের জন্য এটি একটি বড় স্কোর ছিল এবং ভারতকে কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করায়।
৩১১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতীয় ওপেনার বৈভব সূর্যবংশী শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সি এই তরুণ ব্যাটার তাঁর প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে আফগান বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। ৩৩ বলে ৬৮ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি, যেখানে ছিল ৯টি চার ও ৪টি ছক্কা।
বৈভবের ব্যাটিং ভারতীয় ইনিংসের গতি নির্ধারণ করে দেয়। পাওয়ার প্লে-তে দ্রুত রান তুলে আফগানিস্তানের বোলারদের পরিকল্পনা ভেস্তে দেন তিনি। তাঁর আউট হওয়ার সময় ৯.৩ ওভারে ভারতের রান ছিল ৯০, যা বড় রান তাড়ার ক্ষেত্রে একটি আদর্শ শুরু বলা যায়।
বৈভব আউট হওয়ার পর দায়িত্ব পড়ে অ্যারন জর্জ ও অধিনায়ক আয়ুষ মাত্রের কাঁধে। দু’জনেই আগের ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছিলেন, ফলে তাঁদের ওপর বাড়তি চাপ ছিল। কিন্তু সেমিফাইনালের মঞ্চে তাঁরা নিজেদের সেরা রূপে ধরা দেন।
জর্জ একবার সহজ ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান, তবে সেই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগান। ঝুঁকিহীন ব্যাটিং করে তিনি ধীরে ধীরে শতরানের দিকে এগিয়ে যান। ১০৪ বলে ১১৫ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন জর্জ, যেখানে ছিল ১৫টি চার ও ২টি ছক্কা।
অন্যদিকে অধিনায়ক মাত্রে ৫৯ বলে ৬২ রান করেন, ৫টি চার ও ৪টি ছক্কা মারেন। তাঁদের দ্বিতীয় উইকেটের জুটি ১১৪ রান যোগ করে, যা ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দেয়। এই জুটি আফগান বোলারদের পরিকল্পনা পুরোপুরি নষ্ট করে দেয় এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়।
জর্জ আউট হওয়ার সময় ভারত জয় থেকে মাত্র ১১ রান দূরে ছিল। চার নম্বরে নেমে বিহান মলহোত্র দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন এবং অপরাজিত ৩৯ রান করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বেদান্ত ত্রিবেদী, যিনি অপরাজিত ৫ রান করে ম্যাচ শেষ করেন।
ভারত ৪১.১ ওভারে ৩ উইকেটে ৩১১ রান তুলে ম্যাচ জিতে নেয়। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে রেকর্ড রান তাড়া করে ৫৩ বল বাকি থাকতেই জয় পাওয়া ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আফগানিস্তানের শক্তির অন্যতম দিক ছিল তাদের স্পিন আক্রমণ। কিন্তু এই ম্যাচে সেই অস্ত্র পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি তারা। ভারতীয় ব্যাটাররা স্পিন বোলারদের বিরুদ্ধে সাবলীল ব্যাটিং করে রান তুলেছেন প্রায় প্রতি ওভারেই।
ওমরজ়াই ৬৪ রানে ২ উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানের সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন। ওয়াহিদুল্লা জ়াদরান ৬৭ রানে ১ উইকেট নেন। তবে বড় স্কোর রক্ষা করার মতো চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি আফগান বোলাররা।
এই জয় ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে ধারাবাহিক আধিপত্যের প্রমাণ। টানা ছ’বার ফাইনালে ওঠা শুধু প্রতিভা নয়, বরং শক্তিশালী ক্রিকেট কাঠামো, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও স্কাউটিং সিস্টেমের সফলতার প্রতিফলন।
ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দল অতীতেও বহু তারকা ক্রিকেটার উপহার দিয়েছে—বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, চেতেশ্বর পূজারা, যশস্বী জয়সওয়াল, শুভমন গিলের মতো ক্রিকেটাররা এই স্তর থেকে উঠে এসেছেন। বর্তমান দলেও বৈভব সূর্যবংশী, অ্যারন জর্জ, আয়ুষ মাত্রে, বিহান মলহোত্রদের মতো প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা ভবিষ্যতের ভারতীয় ক্রিকেটের স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারেন।
আগামী শুক্রবার ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটেও শক্তিশালী দল এবং তাদের পেস আক্রমণ ও ব্যাটিং গভীরতা যে কোনও দলকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম।
এই ফাইনাল শুধু একটি শিরোপার লড়াই নয়, বরং ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের দুই সম্ভাবনাময় প্রজন্মের মুখোমুখি সংঘর্ষ। ভারত যদি এই ম্যাচ জিতে নেয়, তবে তারা নিজেদের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট ইতিহাসে আরও একটি সোনালি অধ্যায় যোগ করবে।
হারারের সেমিফাইনাল ছিল শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচ নয়, ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ শক্তির এক শক্তিশালী ঘোষণা। টানা ছ’বার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে ভারত যে শুধু বর্তমানের শক্তিশালী দল নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্রিকেট কাঠামোর সফল ফল—এই ম্যাচ সেই কথাই নতুন করে প্রমাণ করে দিল।
৩১১ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে ৫৩ বল বাকি থাকতেই জয় ছিনিয়ে নেওয়া অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক স্মরণীয় কীর্তি। বড় ম্যাচে বড় লক্ষ্য তাড়া করার মানসিক দৃঢ়তা, পরিকল্পিত ব্যাটিং এবং দলগত পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে ভারতীয় দল যে চাপের মুখে কতটা পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী, তার বাস্তব প্রমাণ মিলল এই ম্যাচে।
এই জয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছেন মাত্র ১৪ বছর বয়সি বৈভব সূর্যবংশী। তাঁর ৩৩ বলে ৬৮ রানের বিধ্বংসী ইনিংস ভারতীয় ইনিংসের ভিত গড়ে দেয় এবং আফগান বোলারদের মনোবল ভেঙে দেয়। বয়সের তুলনায় তাঁর ব্যাটিং পরিণত ও ভয়ডরহীন, যা ভবিষ্যতে তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
অন্যদিকে অ্যারন জর্জ ও আয়ুষ মাত্রের দায়িত্বশীল ইনিংস প্রমাণ করে দিল, বড় ম্যাচে অভিজ্ঞতার অভাব থাকলেও মানসিক দৃঢ়তা থাকলে বড় ইনিংস খেলা সম্ভব। জর্জের শতরান ও মাত্রের অর্ধশতরান শুধু স্কোরবোর্ডে রান যোগ করেনি, বরং দলের আত্মবিশ্বাসকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় উইকেটের ১১৪ রানের জুটি ভারতের জয়ের ভিত হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।
বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে কিছু ভুল থাকলেও ভারতীয় দল ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে সেই ঘাটতি ঢেকে দিয়েছে। বড় লক্ষ্য তাড়া করার ক্ষেত্রে বোলারদের পারফরম্যান্সের চেয়েও ব্যাটারদের মানসিক দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর সেই জায়গায় ভারতীয় দল ছিল অনবদ্য।
আফগানিস্তানের জন্য এই ম্যাচ ছিল মিশ্র অনুভূতির। দুই ব্যাটারের শতরান, ৩১০ রানের বিশাল স্কোর—সব কিছু সত্ত্বেও জয় হাতছাড়া হয়েছে। এটি আফগান ক্রিকেটের জন্য একটি বড় শিক্ষা, যে বড় স্কোর করলেই জয় নিশ্চিত নয়; বোলিং ও ফিল্ডিংয়ের ধারাবাহিকতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবু শিনোজ়াদা ও নিয়াজ়াইয়ের ইনিংস ভবিষ্যতে আফগান ক্রিকেটের শক্ত ভিত হয়ে উঠতে পারে।
টানা ছ’বার ফাইনালে ওঠা ভারতের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট কাঠামোর সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে বয়সভিত্তিক দল, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, স্কাউটিং নেটওয়ার্ক এবং প্রতিভা উন্নয়নের পরিকল্পিত কাঠামো—সব মিলিয়ে ভারত এমন এক ক্রিকেট ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, যা ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমানের ক্রিকেটার তৈরি করে চলেছে। অতীতে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শুভমন গিল, যশস্বী জয়সওয়ালের মতো তারকারা যেমন এই স্তর থেকে উঠে এসেছেন, তেমনই বর্তমান দলের অনেক ক্রিকেটার ভবিষ্যতে ভারতীয় সিনিয়র দলের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারেন।
এখন সামনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফাইনাল। পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড শক্তিশালী দল, তাদের পেস আক্রমণ, ব্যাটিং গভীরতা এবং টুর্নামেন্ট অভিজ্ঞতা ভারতকে কঠিন চ্যালেঞ্জ দেবে। তবে সেমিফাইনালের এই জয় ভারতীয় দলকে যে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, তা ফাইনালের মঞ্চে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
এই ফাইনাল শুধুই ট্রফির লড়াই নয়, বরং ভবিষ্যৎ ক্রিকেটের দুই প্রজন্মের সম্ভাব্য তারকাদের সংঘর্ষ। যে দল জয়ী হবে, তারা শুধু শিরোপাই জিতবে না, বরং আগামী দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আধিপত্যের বার্তা দেবে।
সব মিলিয়ে হারারের এই সেমিফাইনাল ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। বৈভব সূর্যবংশীর বিস্ফোরক শুরু, অ্যারন জর্জের শতরান, আয়ুষ মাত্রের নেতৃত্ব, দলের সমষ্টিগত পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে এটি ছিল তরুণ প্রতিভার উৎসব।
ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল, তা আর শুধু কথায় নয়, মাঠের পারফরম্যান্সেই প্রমাণ হয়ে গেল। এখন শুধু অপেক্ষা শুক্রবারের ফাইনালের—যেখানে এই তরুণ দল ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাবে এবং ভারতীয় ক্রিকেটের সোনালি অধ্যায়ে আর একটি নতুন অধ্যায় যোগ করতে পারে।