মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছেন দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার। তিনি জানিয়েছেন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে ওই গুদামের দমকলের তরফে কোনও ছাড়পত্র ছিল না। এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিজি।
রবিবার রাত। কলকাতার পূর্ব প্রান্তে আনন্দপুর এলাকা তখন গভীর ঘুমে। হঠাৎই রাত প্রায় ৩টে নাগাদ নাজিরাবাদের একটি মোমো প্রস্তুতকারী সংস্থার গুদাম থেকে আকাশে উঠে আসে আগুনের বিশাল শিখা। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন পাশের আরেকটি ডেকরেটার্সের গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় এক ভয়াবহ বিপর্যয়—যার রেশ কাটেনি ৩২ ঘণ্টা পরেও।
মঙ্গলবার দুপুরেও ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া, কোথাও ধিকিধিকি আগুন। চারদিকে পোড়া গন্ধ, ছাই আর ধ্বংসের স্তূপ। ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটে। নিখোঁজ অন্তত ১৪ জন। আশঙ্কা—মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কলকাতা শহরের ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়ে গেছে আনন্দপুরের এই জোড়া গুদাম দুর্ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রথমে মোমো কারখানার দিক থেকে হালকা ধোঁয়া দেখা যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণের মতো কিছু ঘটে। এরপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের ডেকরেটার্সের গুদামে, যেখানে প্লাস্টিক, কাপড়, থার্মোকল, রংসহ বিপুল দাহ্য সামগ্রী মজুত ছিল।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন—
“প্রথমে ভেবেছিলাম শর্ট সার্কিট। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। গরমে জানালা কেঁপে উঠছিল।”
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকলের প্রথম ইঞ্জিন। পরে একে একে আসে মোট ১২টি দমকল ইঞ্জিন। কিন্তু সমস্যার শুরু হয় এখানেই।
গুদাম দুটি ছিল—
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যে
সরু রাস্তার ভিতরে
পর্যাপ্ত জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছাড়া
ফলে প্রথম কয়েক ঘণ্টা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
এক দমকল কর্মীর বক্তব্য—
“ভেতরে কী পরিমাণ দাহ্য বস্তু আছে আমরা ধারণাই করতে পারিনি। আগুন নেভানো যাচ্ছিল না, বরং ভিতরে ঢুকলেই নতুন করে শিখা উঠছিল।”
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন—
এই ধরনের গুদামে যখন প্লাস্টিক, রাবার, থার্মোকল, কেমিক্যাল থাকে, তখন তা ধিকিধিকি আগুন তৈরি করে। উপরের আগুন নিভলেও ভিতরে গলিত দাহ্য পদার্থ জ্বলতে থাকে দীর্ঘ সময়।
ফলে সোমবার রাত পেরিয়েও আগুন পুরোপুরি নেভেনি। মঙ্গলবার দুপুরেও কালো ধোঁয়া বেরোতে দেখা যায়।
এখনও পর্যন্ত—
৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত
১৪ জন নিখোঁজ
দেহাংশ শনাক্ত করা যাচ্ছে না
কারণ দেহগুলি এতটাই দগ্ধ যে পরিচয় বোঝা সম্ভব নয়। ফরেন্সিক পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্তকরণের চেষ্টা চলছে।
এক স্বজন কাঁদতে কাঁদতে বলেন—
“আমরা শুধু চাই একবার দেহটা দেখতে… অন্তত শেষকৃত্যটা করতে পারি।”
জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) ও রাজ্য বিপর্যয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভিতরে কেউ আটকে আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রেসকিউ কর্মীরা জানিয়েছেন—
“ভেতরে ঢোকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কাঠামো যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।”
মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে যান দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার।
তিনি বলেন—
“এই গুদামের কোনও বৈধ ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই অভিযোগ দায়ের হয়েছে।”
এই বক্তব্যের পরই প্রশ্ন ওঠে—
অনুমোদন ছাড়াই কীভাবে দিনের পর দিন এই গুদাম চলছিল?
ডিজি স্বীকার করেন—
“বিভাগীয় স্তরে কোনও ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে। তদন্ত হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে—
ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া গুদাম চালানো
দাহ্য পদার্থ মজুত
শ্রমিকদের আবাসিক উপস্থিতি
কোনও জরুরি নির্গমন পথ না থাকা
সব মিলিয়ে এটি একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছান দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু।
তিনি ধ্বংসস্তূপ ঘুরে দেখেন, দমকল কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন, মৃতদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সুজিত বলেন—
“এই এলাকা একেবারে জতুগৃহের মতো। ৩৫ হাজার বর্গফুট জুড়ে দুটি গুদাম পাশাপাশি ছিল। ভিতরে বিপুল দাহ্য পদার্থ ছিল। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাস্থলে পৌঁছান বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্ডা ও স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা।
তাঁরা দমকলমন্ত্রীকে ঘিরে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন।
পাল্টা তৃণমূল সমর্থকরাও প্রতিবাদ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
পরে পুলিশ হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিজেপির বক্তব্য—
“রাজ্য সরকারের চরম অবহেলার ফল এই দুর্ঘটনা।”
তৃণমূলের পাল্টা দাবি—
“বিপর্যয়ের সময় রাজনীতি না করে উদ্ধারকাজে সাহায্য করা উচিত।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে—
গুদামের ভেতর বহু শ্রমিক রাতের শিফটে কাজ করছিলেন। তাঁদের অনেকেই ভিন্রাজ্যের শ্রমিক।
ঘুমের ঘোরে আগুন লাগার সময় বেরোতে পারেননি।
এক সহকর্মী বলেন—
“ওরা ভিতরেই ঘুমোত। বেরোনোর কোনও বিকল্প দরজা ছিল না।”
পুলিশ জানিয়েছে—
অগ্নিনির্বাপণ আইন লঙ্ঘন
অবৈধ দাহ্য সামগ্রী মজুত
অবহেলাজনিত মৃত্যু
এই ধারায় মামলা রুজু হবে। দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির মুখে পড়বে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—
কলকাতার বহু—
গুদাম
কারখানা
শপিং কমপ্লেক্স
আবাসিক ভবন
এখনও ফায়ার অডিট ছাড়াই চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“এটি সময়ের অপেক্ষা ছিল।”
২০১০: স্টিফেন কোর্ট
২০১১: AMRI হাসপাতাল
২০১৫: বড়বাজার
২০২2: বোরো মার্কেট
প্রতিবার তদন্ত, প্রতিশ্রুতি—তারপর ফের অবহেলা।
এই দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—
অবৈধ গুদাম চিহ্নিত করা
বাধ্যতামূলক ফায়ার অডিট
শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জরুরি নির্গমন পথ বাধ্যতামূলক করা
ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে আছেন স্বজনেরা।
এক মা বলেন—
“ও বাঁচুক বা না বাঁচুক, একবার তো বের করে দিন…”
এই অপেক্ষাই এখন আনন্দপুরের সবচেয়ে ভারী দৃশ্য।
পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরে জোড়া গুদামে আগুন লেগে ৩২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লেগে থাকা এই বিপর্যয় শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনা আমাদের শেখাচ্ছে যে—শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবহেলা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা কতটা ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
অগ্নিকাণ্ড নিভে যাওয়ার পরও মৃতের সংখ্যা, নিখোঁজদের তালিকা এবং ভাঙা ধ্বংসস্তূপের ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে, এটি সামান্য সতর্কতা না নেওয়ার পরিণতি। এই ঘটনায় শুধুমাত্র গুদাম পোড়েনি; পুড়েছে শ্রমিকদের জীবন, স্বজনদের আশা, প্রশাসনের সতর্কতার অভাব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবহেলা।
অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন চলমান গুদাম, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা, জরুরি নির্গমন পথের অভাব—সবকিছু একসাথে মিলিয়ে একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছবি দাঁড় করিয়েছে। ডিজি রণবীর কুমারের স্বীকারোক্তি যে “বিভাগীয় স্তরে ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে”—এটি শুধুমাত্র ঘটনার মাত্রা স্পষ্ট করছে। এটি ভারতের বড় শহরের শিল্প ও গুদামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক দৃষ্টান্তমূলক সতর্কবার্তা।
ভিন্রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরা যারা রাতের শিফটে কাজ করছিলেন, তাদের প্রায় সকলের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছিল। একেকটি ভাঙা দরজা, একেকটি ধ্বংসস্তূপ—এই মুহূর্তে জীবনের নিরাপত্তা নির্ভর করছিল ভাগ্যের উপর। এই পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে, শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা ও অগ্নি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কতটা জরুরি।
বিপর্যয়ের দিনে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও অগ্নিশিখার মতো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগান—এটি দেখিয়েছে, বিপর্যয়জনিত মুহূর্তেও রাজনীতি মানুষের নিরাপত্তার চেয়ে প্রাধান্য পেতে পারে। এই রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে এবং উদ্ধারকাজের উপর প্রভাব ফেলেছে।
ঘটনাস্থলে যাওয়া দমকল আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে আগুন নেভানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি আমাদের শেখাচ্ছে যে, শহরে এমন গুদাম বা শিল্পাঞ্চলে ফায়ার অডিট, সতর্কতা প্রশিক্ষণ, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ প্রযুক্তি এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
এই দুর্ঘটনা প্রমাণ করেছে—
অগ্নি নিরাপত্তা কেবল একটি নিয়ম নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয় হাতিয়ার।
শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এবং জরুরি নির্বাহের পথ থাকা আবশ্যক।
প্রশাসনিক ত্রুটি ও অনুমোদনবিহীন গুদামের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি বাধ্যতামূলক করা উচিত।
ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা, স্থানীয় প্রশাসন, শিল্প মালিক এবং শ্রমিকদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানবিক দিক। ৩২ ঘণ্টা আগুন নিভানো যায়নি, কিন্তু মানুষের অপেক্ষা, দুঃখ এবং হতাশা এখনও স্থির। মৃতদের পরিবার, নিখোঁজদের স্বজন, এবং আহত শ্রমিকরা সকলেই একটাই বার্তা দিচ্ছেন—“নিরাপত্তা শুধুমাত্র নিয়ম নয়, এটি আমাদের জীবন।”
আমরা যদি এই শিক্ষা না নিই, তবে শুধুমাত্র আনন্দপুর নয়, দেশের যে কোনো শিল্পাঞ্চল আবার বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তাই কেবল শাস্তি বা রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, এই দুর্ঘটনা থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ড নিভে গেলেও, প্রশ্নগুলো এখনও জ্বলছে—পরের আনন্দপুর কোথায়?
আমাদের শহরের ভবিষ্যৎ, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধ—সবই এই ঘটনায় পুনঃনির্মাণের ডাক দিচ্ছে।
আনন্দপুরের ধিকিধিকি আগুনের চিহ্ন শুধু ধ্বংস নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে চিত্রিত করছে।
এখন সময় এসেছে—শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপে এই শিক্ষা প্রয়োগ করার। নয়তো, ৩২ ঘণ্টার আগুনের মতো আরও বিপর্যয় আমাদের শহর ও মানুষের জীবনে ধ্বংস জাগাতে পারে।