কয়েক দিন আগের ঘটনা। মুম্বইয়ে পরিচালক রোহিত শেট্টীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় কিছু দুষ্কৃতি। তার পরেই হুমকিবার্তা পাঠানো হয় রণবীরের আপ্তসহায়ককে।হোয়াট্‌সঅ্যাপে একটি ভয়েস নোট। তার পর থেকেই শুরু বিতর্ক। খুনের হুমকি দেওয়া হয় অভিনেতা রণবীর সিংহকে। সঙ্গে দাবি করা হয়েছিল ১০ কোটি টাকা। জানা গিয়েছে হ্যারি বক্সার নামে বিশ্নোই গ্যাংয়ের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি অভিনেতাকে হুমকিবার্তা পাঠিয়েছেন। এ বার খবর, মুম্বইয়ের অপরাধদমন শাখা তার নামে জারি করেছে ‘লুক আউট’ নোটিস।
কয়েক দিন আগের ঘটনা। মুম্বইয়ে পরিচালক রোহিত শেট্টীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় কিছু দুষ্কৃতি। তার পরেই এই হুমকিবার্তা গিয়েছিল রণবীরের আপ্তসহায়কের কাছে। একের পর এক এমন ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে মুম্বই পুলিশের অপরাধদমন শাখা। মুম্বই পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, একটি আমেরিকান ফোন নম্বর থেকে এসেছিল এই হুমকিবার্তা। সেই ভয়েস নোটটি পঞ্জাব এবং হরিয়ানার এজেন্সির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় যদিও এখনও কোনও এফআইআর দায়ের করা হয়নি। তদন্ত চলছে।
তবে এই হুমকিবার্তা আসার পরে আরও জোরদার হয়েছে রণবীর এবং দীপিকা পাড়ুকোনের নিরাপত্তা। অভিনেতার বাড়ি কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে। সমাজমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে যদিও ‘ধুরন্ধর’ অভিনেতার পক্ষ থেকে কোনও বিজ্ঞপ্তি বা বার্তা এখনও দেওয়া হয়নি। খবরটি ছড়ানোর পর থেকেই উদ্বিগ্ন তাঁর অনুরাগীরা।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরে মুক্তি পেয়েছে রণবীরের ‘ধুরন্ধর’। ছবির সাফল্য উপভোগ করছিলেন অভিনেতা। তার মধ্যেই এসেছে এই হুমকিবার্তা। আগামী ১৯ মার্চ মুক্তি পাবে ‘ধুরন্ধর ২’।
মুম্বই—ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের প্রাণকেন্দ্র। এই শহর শুধু স্বপ্ন তৈরি করে না, সেই স্বপ্নকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রভাব, জনপ্রিয়তা এবং কখনও কখনও অপরাধ জগতের অন্ধকার ছায়াও। কয়েক দিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আবারও সেই অন্ধকার দিকটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক রোহিত শেট্টীর বাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ, তার পর অভিনেতা রণবীর সিংহকে খুনের হুমকি, এবং মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি—সমস্ত কিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।
ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকেই মুম্বই পুলিশ ও অপরাধদমন শাখা (Crime Branch) তৎপর হয়ে ওঠে। তদন্তের প্রাথমিক সূত্র ধরে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর নাম—হ্যারি বক্সার, যিনি বিশ্নোই গ্যাংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলে জানা গিয়েছে। তাঁর নামেই জারি হয়েছে ‘লুক আউট নোটিস’। ফলে গোটা ঘটনাটি এখন শুধু বলিউডকেন্দ্রিক আতঙ্ক নয়, বরং জাতীয় স্তরে সংগঠিত অপরাধচক্রের কার্যকলাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগে গভীর রাতে মুম্বইয়ের এক অভিজাত আবাসিক এলাকায় অবস্থিত পরিচালক রোহিত শেট্টীর বাড়ির বাইরে কয়েক রাউন্ড গুলি চালানো হয়। যদিও সেই সময় বাড়ির ভেতরে থাকা কেউ শারীরিকভাবে আহত হননি, তবু ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সংঘটিত—এমনটাই প্রাথমিকভাবে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
স্থানীয় সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পারে, মোটরবাইকে করে আসা কয়েকজন দুষ্কৃতি খুব অল্প সময়ের মধ্যে হামলা চালিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাঁদের মুখ ঢাকা ছিল এবং নম্বরপ্লেট আংশিকভাবে আড়াল করা ছিল বলে জানা গেছে। ফলে তদন্ত আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এই গুলিচালনার ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন মোড় নেয় বিষয়টি। অভিনেতা রণবীর সিংহের এক ঘনিষ্ঠ আপ্তসহায়কের হোয়াটসঅ্যাপে আসে একটি ভয়েস নোট। সেই অডিও বার্তায় সরাসরি অভিনেতাকে খুনের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, হুমকিদাতারা দাবি করে ১০ কোটি টাকা চাঁদা।
ভয়েস নোটে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে অভিনেতা এবং তাঁর পরিবারের ক্ষতি করা হবে। ভাষা, উচ্চারণ এবং ব্যবহৃত কিছু কোডওয়ার্ড বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা সংগঠিত অপরাধচক্রের যোগসূত্র খুঁজে পান।
বলিউড তারকা ও প্রযোজক-পরিচালকদের লক্ষ্য করে হুমকি বা চাঁদাবাজির ঘটনা নতুন নয়। ৯০-এর দশক থেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাংশ চলচ্চিত্র জগতকে অর্থ উপার্জনের বড় উৎস হিসেবে দেখেছে। সিনেমা প্রযোজনায় বিনিয়োগ, ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ন্ত্রণ, তারকাদের তারিখ নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রেই একসময় অপরাধচক্রের প্রভাব ছিল প্রবল।
যদিও গত দুই দশকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে সেই প্রভাব অনেকটাই কমেছে, তবু বিচ্ছিন্নভাবে হুমকি, চাঁদাবাজি বা ভয় দেখানোর ঘটনা এখনও সামনে আসে। এই সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই প্রবণতারই অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তদন্তের অগ্রগতিতে উঠে আসে বিশ্নোই গ্যাংয়ের সম্ভাব্য যোগসূত্র। উত্তর ভারতকেন্দ্রিক এই সংগঠিত অপরাধচক্র সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক চাঞ্চল্যকর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে খবরের শিরোনামে এসেছে। বলিউডের কয়েকজন তারকাকে অতীতেও এই গ্যাংয়ের তরফে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
পুলিশের দাবি, হ্যারি বক্সার নামে যে ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে, তিনি এই গ্যাংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। ফলে তদন্ত শুধু মুম্বই বা মহারাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না—কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গেও সমন্বয় করা হচ্ছে।
হ্যারি বক্সারের নামে জারি হওয়া ‘লুক আউট নোটিস’ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই নোটিস জারি হলে দেশের সব বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তে সতর্কতা জারি হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে আটক করা যায়।
অনেক সময় অপরাধীরা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে আইনের হাত এড়ানোর চেষ্টা করে। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মুম্বই অপরাধদমন শাখা।
হুমকিবার্তার পর থেকেই অভিনেতা রণবীর সিংহের নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। তাঁর বাসভবন, শুটিং লোকেশন এবং জনসমক্ষে উপস্থিতির সময় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বলিউডের অন্যান্য তারকাদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা জারি হয়েছে। কারণ তদন্তকারীরা মনে করছেন, এটি একক লক্ষ্যভিত্তিক ঘটনা নাও হতে পারে; বরং বড় পরিসরের চাঁদাবাজি চক্রের অংশ হতে পারে।
পরিচালক রোহিত শেট্টী আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি মন্তব্য না করলেও ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, তিনি ঘটনায় উদ্বিগ্ন কিন্তু ভীত নন। তিনি তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন। তাঁর বাড়ির নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই বলিউডে উদ্বেগ ছড়ায়। প্রযোজক সংগঠন, শিল্পী সমিতি এবং বিভিন্ন গিল্ড আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানায়। তাঁদের বক্তব্য—শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কাজের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, কেন বারবার চলচ্চিত্র জগতকে লক্ষ্য করা হচ্ছে? এর পেছনে কি অর্থনৈতিক প্রভাব, না কি জনপ্রিয়তার কারণে সহজ প্রচার পাওয়ার কৌশল—তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
হুমকিবার্তা যেহেতু হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস নোটের মাধ্যমে এসেছে, তাই সাইবার ফরেনসিক টিম তদন্তে নেমেছে। অডিওর ভয়েস প্যাটার্ন, ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ, সার্ভার রাউটিং—সব বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অনেক সময় ভার্চুয়াল নম্বর, ভিপিএন বা আন্তর্জাতিক সার্ভার ব্যবহার করে হুমকি পাঠানো হয়। তাই প্রযুক্তিগত তদন্ত এই মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে।
১০ কোটি টাকার দাবি ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এটি সরাসরি চাঁদাবাজির চেষ্টা। বলিউডে উচ্চ পারিশ্রমিক ও বড় বাজেটের কারণে অপরাধচক্র মনে করে, ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা সম্ভব।
অতীতেও বহু তারকা, প্রযোজক ও পরিবেশক হুমকি পেয়েছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, আবার কেউ নীরব থেকেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া পদক্ষেপে অনেক চক্র ভেঙে গেলেও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি।
সন্দেহভাজনদের কল ডিটেল রেকর্ড খতিয়ে দেখা
সিসিটিভি ফুটেজ উন্নত প্রযুক্তিতে বিশ্লেষণ
আন্তঃরাজ্য অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগসূত্র খোঁজা
আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনা
এ ধরনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি করে। কারণ বলিউড তারকারা জনজীবনের অংশ। তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শহরের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটিকে সংগঠিত অপরাধের পুনরুত্থান বলছেন, কেউ আবার বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ পুলিশ।
তারকাদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা মানে চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা। শুটিং, প্রচার, জনসংযোগ—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়ে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
খুনের হুমকি, চাঁদাবাজি, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার—সব মিলিয়ে একাধিক ফৌজদারি ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে।
‘লুক আউট নোটিস’ জারি হওয়া মানে তদন্তকারীরা বিদেশে পলায়নের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। সংগঠিত অপরাধচক্র প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে কাজ করে—অর্থ লেনদেন, অস্ত্র সরবরাহ, আশ্রয়—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়।
রোহিত শেট্টীর বাড়িতে গুলিচালনা, রণবীর সিংহকে খুনের হুমকি এবং ১০ কোটি টাকার দাবি—এই তিনটি ঘটনাই আলাদা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অপরাধচক্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। হ্যারি বক্সারের নামে ‘লুক আউট নোটিস’ জারি হওয়া তদন্তকে নতুন গতি দিয়েছে।
এখন নজর পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপে—অভিযুক্তদের গ্রেফতার, চক্র ভাঙা এবং বলিউডসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ চলচ্চিত্র জগত শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শিল্প। সেই শিল্প যদি ভয় ও সন্ত্রাসের ছায়ায় ঢেকে যায়, তবে তার প্রভাব পড়বে সমাজের বহু স্তরে।
তদন্ত চলছে, নজরদারি বাড়ছে, নিরাপত্তা জোরদার হচ্ছে—এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশা, দ্রুত আইনি পদক্ষেপে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে। তবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে চলচ্চিত্র মহল এবং সাধারণ মানুষ।