সুনীল গাভাস্কার কলকাতার পিচ নিয়ে মন্তব্য করেছেন যে এটি কোনো তীব্র টার্নিং পিচ ছিল না। তাঁর মতে, পিচে টার্ন ছিল, তবে তা এমন ধরনের নয় যা খেলোয়াড়দের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেছিল।
ভারতীয় ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তি এবং প্রাক্তন অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার সম্প্রতি কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সের পিচ নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, যা ক্রিকেট বিশ্লেষক এবং ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর মতে, কলকাতার পিচটি যে তীব্র টার্নিং উইকেট হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছিল, বাস্তবে তা মোটেই সেরকম ছিল না। এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন ভারতীয় পিচ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও সমালোচনা চলছে।
গাভাস্কারের এই বিশ্লেষণ শুধুমাত্র একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং এটি একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের দৃষ্টিভঙ্গি যিনি নিজে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পিচগুলোতে খেলেছেন এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছেন। তাঁর মতামত ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স ভারতীয় ক্রিকেটের এক পবিত্র তীর্থস্থান। ১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়াম অসংখ্য ঐতিহাসিক ম্যাচের সাক্ষী হয়েছে। এখানকার পিচ সবসময়ই ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ইডেন গার্ডেন্সের পিচ ব্যাটসম্যানদের জন্য বেশ সহায়ক হিসেবে পরিচিত ছিল, বিশেষত ম্যাচের প্রথম তিন দিন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ভারতীয় ক্রিকেটে হোম অ্যাডভান্টেজ সর্বাধিক করার প্রবণতা দেখা গেছে। এর ফলে, কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন ভেন্যুতে স্পিন-ফ্রেন্ডলি পিচ তৈরি করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তন স্বাভাবিক এবং বৈধ – প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব শক্তি অনুযায়ী পিচ প্রস্তুত করে। অস্ট্রেলিয়ায় বাউন্সি পিচ, ইংল্যান্ডে সুইং-সহায়ক পরিবেশ – এগুলো সবই হোম অ্যাডভান্টেজের অংশ।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছিল যে, কলকাতার পিচ কি অতিরিক্ত স্পিন-ফ্রেন্ডলি হয়ে গিয়েছিল? ব্যাটিং কি অসম্ভব কঠিন হয়ে পড়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে সুনীল গাভাস্কার স্পষ্ট এবং দৃঢ়ভাবে বলেছেন – না।
সুনীল গাভাস্কার তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্ট করেছেন যে, কলকাতার পিচে নিঃসন্দেহে টার্ন ছিল, কিন্তু সেই টার্ন এমন পর্যায়ের ছিল না যাকে 'ভিসিয়াস' বা তীব্র বলা যায়। তাঁর কথায়, "টার্ন ছিল, তবে তীব্রতা ছিল না। যে ধরনের পিচে খেলোয়াড়দের কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তা এখানে ছিল না। এটি একটি সাধারণ টেস্ট পিচ ছিল, যেখানে স্পিনাররা সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু সেটা অতটা কঠিন ছিল না।"
এই মন্তব্যের গভীরতা বোঝার জন্য টেস্ট ক্রিকেটের পিচের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। একটি আদর্শ টেস্ট পিচ পাঁচ দিনের খেলার জন্য ভারসাম্য প্রদান করে। প্রথম দিন ব্যাটসম্যানদের জন্য সুবিধাজনক, দ্বিতীয়-তৃতীয় দিন সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং উইকেট, এবং চতুর্থ-পঞ্চম দিনে স্পিনারদের জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। গাভাস্কারের মতে, কলকাতার পিচ এই স্বাভাবিক প্যাটার্নই অনুসরণ করেছিল।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, পিচে 'সঠিক পরিমাণে সহায়ক টার্ন' ছিল। এর মানে হলো, বল পিচে পড়ার পর ঘুরছিল, যা স্পিন বোলারদের জন্য স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই টার্ন এতটাই অপ্রত্যাশিত বা তীব্র ছিল না যে ব্যাটসম্যানরা কোনো শট খেলতে পারছিলেন না বা প্রতিটি বলই উইকেট নেওয়ার হুমকি ছিল।
ক্রিকেট বিশ্লেষণে 'টার্ন' এবং 'তীব্র টার্ন'-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ টার্ন মানে বল পিচে পড়ার পর একটি নির্দিষ্ট দিকে ঘুরে যায়, যা স্পিনারদের জন্য উপকারী কিন্তু ব্যাটসম্যানরা যদি সতর্ক থাকেন এবং সঠিক টেকনিক প্রয়োগ করেন, তাহলে মোকাবেলা করা সম্ভব।
অন্যদিকে, তীব্র টার্ন মানে বল অপ্রত্যাশিতভাবে এবং অত্যধিক মাত্রায় ঘুরে যায়, যা ব্যাটসম্যানদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে মোকাবেলা করা। এ ধরনের পিচে ভালো বোলিং না করেও উইকেট পাওয়া যায়, যা টেস্ট ক্রিকেটের চেতনার বিরুদ্ধে যায়।
গাভাস্কারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কলকাতার পিচ প্রথম ক্যাটাগরিতে পড়ে। এখানে দক্ষ ব্যাটসম্যানরা যারা স্পিনের বিরুদ্ধে খেলতে জানেন, তারা রান করার এবং ইনিংস গড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এটি একটি চ্যালেঞ্জিং কিন্তু ন্যায্য পিচ ছিল।
সুনীল গাভাস্কার মনে করেন যে, কলকাতার পিচ ব্যাটসম্যানদের দক্ষতা, মনোযোগ এবং সহনশীলতার প্রকৃত পরীক্ষা ছিল। এটি এমন একটি পিচ যেখানে শুধুমাত্র শক্তি বা আগ্রাসী শট দিয়ে সফল হওয়া যায় না, বরং খেলার বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত নিখুঁততা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, এই ধরনের পিচেই প্রকৃত ব্যাটিং দক্ষতার পরিচয় মেলে। যারা স্পিনের বিরুদ্ধে ফুটওয়ার্ক ব্যবহার করতে জানেন, যারা রিভার্স সুইপ, সুইপ এবং প্যাডেলের মতো বিভিন্ন শট খেলতে পারেন, যারা পিচের অবস্থা পড়তে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করতে সক্ষম – তারাই এখানে সফল হতে পারেন।
ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা এই পিচে তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে পিচটি ব্যাটিংয়ের জন্য অসম্ভব ছিল না। যদি পিচ সত্যিই অত্যন্ত কঠিন হতো, তাহলে উভয় দলের ব্যাটসম্যানরাই সংগ্রাম করতেন। কিন্তু দক্ষ খেলোয়াড়রা তাদের প্রতিভা দিয়ে পরিস্থিতি সামলেছেন, যা একটি ভালো টেস্ট পিচের বৈশিষ্ট্য।
ভারতীয় পিচ নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং কিছু সাবেক খেলোয়াড়ের সমালোচনা নতুন কিছু নয়। বিশেষত যখন বিদেশি দল ভারতে এসে স্পিনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, তখন পিচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু গাভাস্কারের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের এই বিশ্লেষণ একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।
এটা মনে রাখা জরুরি যে, প্রতিটি দেশই তাদের শক্তি অনুযায়ী পিচ প্রস্তুত করে। ইংল্যান্ডে ডিউক বল দিয়ে সুইং বোলিংয়ের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করা হয়, অস্ট্রেলিয়ায় শক্ত, বাউন্সি পিচ যেখানে পেস বোলাররা প্রাধান্য পায়, দক্ষিণ আফ্রিকায় সিম এবং সুইং-বান্ধব উইকেট – এগুলো সবই স্বাভাবিক এবং খেলার অংশ।
ভারতে যদি স্পিন-সহায়ক পিচ তৈরি করা হয়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ না সেই পিচ খেলার জন্য বিপজ্জনক বা অসম্ভব হয়ে ওঠে। গাভাস্কারের মূল যুক্তি হলো – কলকাতার পিচ সেই সীমা অতিক্রম করেনি। এটি চ্যালেঞ্জিং ছিল, কিন্তু ন্যায্য এবং খেলার উপযোগী ছিল।
গাভাস্কার স্বীকার করেছেন যে, কলকাতার পিচ স্পিন বোলারদের জন্য নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক ছিল। ভারতীয় স্পিনাররা – রবিচন্দ্রন অশ্বিন, রবীন্দ্র জাদেজা, অক্ষর প্যাটেল – এই পিচে তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। তারা বলের ফ্লাইট, বৈচিত্র্য এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে উইকেট নিয়েছেন।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা শুধুমাত্র পিচের সহায়তায় নয়, বরং তাদের দক্ষতা এবং কৌশলের মাধ্যমে সফল হয়েছেন। যদি পিচ অত্যধিক সহায়ক হতো, তাহলে মাঝারি মানের স্পিনাররাও উইকেট পেতেন। কিন্তু বাস্তবে, অভিজ্ঞ এবং দক্ষ স্পিনাররাই সবচেয়ে বেশি সফলতা পেয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে দক্ষতার মূল্য ছিল।
স্পিন বোলিংয়ের শিল্প একটি জটিল এবং সূক্ষ্ম বিষয়। শুধুমাত্র বল ঘুরানো নয়, বরং কোথায় বল করতে হবে, কতটা ফ্লাইট দিতে হবে, কখন দ্রুত এবং কখন ধীর বল করতে হবে – এই সব কিছুই একজন ভালো স্পিনারের অস্ত্রাগারের অংশ। কলকাতার পিচ এই দক্ষতাগুলোকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েছিল।
যদি আমরা বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যান্য ভেন্যুগুলোর সাথে কলকাতার পিচ তুলনা করি, তাহলে গাভাস্কারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা আরও স্পষ্ট হয়। পার্থের ডাব্লিউএসিএ পিচ, যেখানে বল মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় এবং ব্যাটসম্যানদের শারীরিক আঘাতের ঝুঁকি থাকে; ইংল্যান্ডের কিছু ভেন্যুতে অতিরিক্ত সিম এবং সুইং যেখানে ব্যাটিং অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে – এগুলোর সাথে কলকাতার পিচ অনেক বেশি সুষম।
দক্ষিণ আফ্রিকার নিউল্যান্ডস বা সেঞ্চুরিয়ন, যেখানে পিচে প্রচুর সিম মুভমেন্ট পাওয়া যায়, সেখানেও ব্যাটিং সহজ নয়। নিউজিল্যান্ডের সবুজ টপ সিম বোলারদের জন্য স্বর্গ। এই সব পিচেও ব্যাটসম্যানদের সংগ্রাম করতে হয়, কিন্তু সেগুলো নিয়ে তেমন বিতর্ক হয় না।
গাভাস্কারের যুক্তি হলো, কলকাতার পিচ এই সব পিচের মতোই একটি চ্যালেঞ্জিং কিন্তু ন্যায্য উইকেট। এটি স্থানীয় শক্তি (স্পিন বোলিং) কে সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু খেলাকে একতরফা বা অসম্ভব করে তোলেনি।
গাভাস্কার জোর দিয়ে বলেছেন যে, কলকাতার পিচে সফল হতে হলে ব্যাটসম্যানদের সঠিক কৌশল এবং মানসিক দৃঢ়তা প্রয়োজন ছিল। এটি এমন একটি পিচ যেখানে তাড়াহুড়ো করলে বা অধৈর্য হলে ব্যর্থতা নিশ্চিত। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরতে পারেন, যারা খারাপ বল বাছাই করে সেগুলোতে রান করতে পারেন, তাদের জন্য সুযোগ ছিল।
স্পিনের বিরুদ্ধে খেলার কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে – ভালো ফুটওয়ার্ক, নরম হাত, পিচ থেকে বল পড়ার পর তার লাইন-লেংথ বিচার করা, এবং সঠিক শট নির্বাচন। যারা এই নীতিগুলো মেনে চলেছেন, তারা সফল হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে পিচ খেলার উপযোগী ছিল।
মানসিক দিক থেকেও এই পিচ একটি পরীক্ষা ছিল। প্রতিটি বল উইকেট নেওয়ার হুমকি নিয়ে আসে না, কিন্তু ব্যাটসম্যানদের সতর্ক থাকতে হয়। এই মানসিক চাপ সামলানো এবং একই সাথে রান সংগ্রহ করা – এটিই টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য।
সুনীল গাভাস্কারের বিশ্লেষণ কলকাতার পিচ সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং খেলার গভীর বোঝাপড়া তাঁর এই মন্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
তাঁর মূল বক্তব্য স্পষ্ট – কলকাতার পিচ চ্যালেঞ্জিং ছিল, স্পিনারদের জন্য সহায়ক ছিল, কিন্তু এটি কোনো তীব্র টার্নিং পিচ ছিল না যেখানে ব্যাটিং অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি একটি সাধারণ, কার্যকর টেস্ট পিচ যেখানে দক্ষতা, ধৈর্য এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সফল হওয়া সম্ভব।
এই ধরনের পিচই টেস্ট ক্রিকেটের প্রকৃত চেতনা বহন করে – যেখানে ব্যাট এবং বলের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকে, যেখানে খেলোয়াড়দের দক্ষতার মূল্য আছে, এবং যেখানে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট সম্ভব। গাভাস্কারের এই বিশ্লেষণ শুধুমাত্র কলকাতার পিচকে রক্ষা করে না, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের পিচ প্রস্তুতির পদ্ধতিকেও সমর্থন করে।
ক্রিকেট একটি বৈচিত্র্যময় খেলা যেখানে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি এবং চ্যালেঞ্জ খেলোয়াড়দের মুখোমুখি হতে হয়। কলকাতার পিচ সেই বৈচিত্র্যের একটি অংশ, এবং গাভাস্কারের দৃষ্টিতে, এটি একটি ন্যায্য এবং উপযুক্ত চ্যালেঞ্জ যা টেস্ট ক্রিকেটের মর্যাদা বৃদ্ধি করে, হ্রাস করে না।