রোহিতের বাড়ির সামনে গুলি! তাঁর বাড়িতে কি ডাকাতির উদ্দেশ্য ছিল দুষ্কৃতীদের? এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এল রোহিতের সম্পত্তির পরিমাণ।গভীর রাতে গুলি চলেছে পরিচালক রোহিত শেট্টীর বাড়ির সামনে। বলিউডে এ যেন রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পর পর চার বার গুলি চলে। তবে হতাহতের কোনও খবর নেই। ইতিমধ্যেই ওই ঘটনা নিয়ে পরিচালকের বয়ান রেকর্ড করেছে মুম্বই পুলিশ।
মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় একটি আবাসনের ১০ তলায় স্ত্রী মায়ার সঙ্গে থাকেন ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’-এর পরিচালক রোহিত। শনিবার মাঝরাতে তাঁদের ফ্ল্যাট লক্ষ্য করেই গুলি চালানো হয় বলে জানা গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর বাড়িতে কি চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্য ছিল দুষ্কৃতীদের? এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এল রোহিতের সম্পত্তির পরিমাণ।
অসংখ্য হিট ছবি রয়েছে রোহিত শেট্টীর পরিচালনায়। বলিউডে তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছে ‘কপ ইউনিভার্স’। এ ছাড়াও একটি জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো-এর সঞ্চালক তিনি। বর্তমানে রোহিত ২৮০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক। শুধু জুহুতে নয়। নবি মুম্বইয়ে আরও একটি বিলাসবহুল বা়ড়ি রয়েছে রোহিতের, যার দাম ৬ কোটি টাকা।
রোহিতের সম্ভারে রয়েছে বেশ কিছু দামি গাড়ি। তার মধ্যে রয়েছে ১.৬৪ কোটি টাকার রেঞ্জ রোভার স্পোর্টস, ৩.১৫ কোটি টাকার ল্যামবর্ঘিনি। ২.৫৫ কোটি টাকার একটি মার্সিডি়জ়, ২ কোটি টাকার একটি স্পোর্টস গাড়ি, ৮০ লক্ষের একটি ফোর্ড গাড়িও রয়েছে তাঁর। সম্প্রতি তাঁর সম্ভারে যোগ হয়েছে ৪.৫৭ কোটি টাকার একটি পরিবেশবান্ধব গাড়ি। রোহিতের নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থাও রয়েছে তাঁর।
রোহিত শেট্টী পরিচালিত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবিগুলির মধ্যে রয়েছে ‘গোলমাল’, ‘সিংহম’ এবং ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’।
বলিউডে যাঁদের নাম শুনলেই আলাদা করে পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না, রোহিত শেট্টী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অ্যাকশন, কমেডি, স্টান্ট, গাড়ি ওড়ানো—এই সব মিলিয়েই তাঁর নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে। দর্শক জানেন, রোহিত শেট্টীর ছবি মানেই দুই ঘণ্টার নিখাদ বিনোদন। আর সেই বিনোদনের জোরেই বছরের পর বছর ধরে বক্স অফিসে সাফল্য এনে দিয়েছেন তিনি। তার ফলেই আজ রোহিত শেট্টী শুধু একজন সফল পরিচালক নন, তিনি বলিউডের ধনীতম পরিচালকদের তালিকাতেও প্রথম সারিতে জায়গা করে নিয়েছেন।
বর্তমানে রোহিত শেট্টীর মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২৮০ কোটি টাকা। এই বিপুল সম্পত্তি এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পিছনে রয়েছে প্রায় দুই দশকের কঠোর পরিশ্রম, ধারাবাহিক হিট ছবি এবং দর্শকের নাড়ি বোঝার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি এমন এক পরিচালক, যিনি কখনও নিজেকে ‘আর্ট ফিল্ম’ বা পরীক্ষামূলক ছবির গণ্ডিতে বেঁধে রাখেননি। বরং শুরু থেকেই সাধারণ দর্শকের রুচিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আর সেখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
রোহিত শেট্টীর জীবনের শুরুটা কিন্তু মোটেও এতটা ঝকঝকে ছিল না। তিনি পরিচালক এম বি শেট্টীর ছেলে। তাঁর বাবা ছিলেন স্টান্টম্যান এবং পরবর্তীতে পরিচালক। ছোটবেলা থেকেই শুটিং ফ্লোর, ক্যামেরা, স্টান্ট—এই পরিবেশেই বড় হয়েছেন রোহিত। কিন্তু বাবার পরিচয় থাকলেও নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করে ধীরে ধীরে ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের পা শক্ত করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁকে এক জন আত্মবিশ্বাসী পরিচালক হিসেবে গড়ে তোলে।
রোহিত শেট্টীর পরিচালনায় অসংখ্য হিট ছবি রয়েছে। ‘গোলমাল’ সিরিজ তাঁর কেরিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ‘গোলমাল’ থেকেই দর্শক বুঝে গিয়েছিলেন, এই পরিচালক কমেডিকে অন্য স্তরে নিয়ে যেতে চান। ভুল বোঝাবুঝি, স্ল্যাপস্টিক হাস্যরস, দ্রুত সংলাপ—সব মিলিয়ে ‘গোলমাল’ হয়ে ওঠে সুপারহিট। এরপর একের পর এক সিক্যুয়েল—‘গোলমাল রিটার্নস’, ‘গোলমাল ৩’, ‘গোলমাল এগেন’—প্রতিটিই বক্স অফিসে দারুণ ব্যবসা করেছে। এই সিরিজই রোহিত শেট্টীকে প্রথম সারির পরিচালকের আসনে বসিয়ে দেয়।
এর পর আসে ‘সিংহম’। এই ছবির মাধ্যমে রোহিত শেট্টী তৈরি করেন বলিউডের বিখ্যাত ‘কপ ইউনিভার্স’। একজন সৎ, নির্ভীক পুলিশ অফিসার—বাজিরাও সিংহম—এই চরিত্রটি দর্শকের মনে গেঁথে যায়। ‘সিংহম’ শুধু হিটই হয়নি, বরং বলিউডে অ্যাকশন ছবির ধারা বদলে দেয়। বাস্তবতার সঙ্গে অতিনাটকীয় অ্যাকশন, শক্তিশালী সংলাপ, দেশপ্রেমের আবহ—সব মিলিয়ে এই ছবি রোহিত শেট্টীর কেরিয়ারে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
‘সিংহম’-এর সাফল্যের পর রোহিত থেমে থাকেননি। তিনি সেই ইউনিভার্সকে আরও বড় করেছেন ‘সিংহম রিটার্নস’, ‘সিম্বা’ এবং ‘সূর্যবংশী’র মতো ছবির মাধ্যমে। এই সব ছবিতে আলাদা আলাদা পুলিশ চরিত্রকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছেন তিনি। বলিউডে এই ধরনের ‘ইউনিভার্স’ ভাবনা তখনও খুব একটা চালু ছিল না। রোহিত শেট্টী সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন, এবং দর্শক তা লুফে নেয়। আজ ‘কপ ইউনিভার্স’ বলিউডের অন্যতম সফল ফ্র্যাঞ্চাইজি।
রোহিত শেট্টীর পরিচালিত আর একটি উল্লেখযোগ্য ছবি হল ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’। শাহরুখ খান ও দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত এই ছবি মুক্তির পর রেকর্ড ব্যবসা করেছিল। দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি, অ্যাকশন আর রোমান্সকে মিশিয়ে একেবারে আলাদা ধাঁচের একটি ছবি বানিয়েছিলেন রোহিত। সমালোচক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এলেও সাধারণ দর্শক ছবিটিকে মাথায় তুলে নেয়। বক্স অফিস কালেকশনই তার প্রমাণ। এই ছবির সাফল্য রোহিত শেট্টীর সম্পত্তির অঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়।
শুধু ছবি পরিচালনা করেই নয়, রোহিত শেট্টী আয় করেছেন আরও নানা উৎস থেকে। তিনি একটি জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো-এর সঞ্চালকও। টেলিভিশনে তাঁর উপস্থিতি দর্শকের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। কঠোর কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সঞ্চালনা, প্রতিযোগীদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ—সব মিলিয়ে এই শো-টিও জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছে। এই শো থেকে পাওয়া পারিশ্রমিকও তাঁর আয়ের বড় অংশ।
রোহিত শেট্টীর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থাও রয়েছে। নিজের ছবির পাশাপাশি তিনি অন্য প্রজেক্টেও বিনিয়োগ করেন। এতে এক দিকে যেমন সৃজনশীল স্বাধীনতা পান, তেমনই আর্থিক লাভও বাড়ে। প্রযোজক হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্ত বরাবরই নিরাপদ বাণিজ্যিক ফর্মুলার দিকে ঝুঁকে থাকে, যা তাঁকে ক্ষতির মুখে পড়তে দেয় না।
এত সাফল্যের ফলেই তাঁর জীবনযাপনও অত্যন্ত বিলাসবহুল। মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় তাঁর একটি দামি বাড়ি রয়েছে। জুহু মানেই বলিউডের অভিজাত এলাকা। সেখানে বাড়ি থাকা নিজেই এক ধরনের স্ট্যাটাস সিম্বল। শুধু জুহুতেই নয়, নবি মুম্বইতেও তাঁর আরও একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যার দাম প্রায় ৬ কোটি টাকা। এই বাড়িগুলি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং তাঁর সাফল্যের প্রতীক।
গাড়ির প্রতি রোহিত শেট্টীর দুর্বলতা আলাদা করে বলার মতো। তাঁর গ্যারাজে রয়েছে একাধিক দামি এবং বিলাসবহুল গাড়ি। ১.৬৪ কোটি টাকার রেঞ্জ রোভার স্পোর্টস তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়াও ৩.১৫ কোটি টাকার একটি ল্যামবর্ঘিনি রয়েছে তাঁর সংগ্রহে, যা তাঁর অ্যাকশনপ্রেমী স্বভাবের সঙ্গে বেশ মানানসই। ২.৫৫ কোটি টাকার একটি মার্সিডিজ়, ২ কোটি টাকার একটি স্পোর্টস গাড়ি এবং প্রায় ৮০ লক্ষ টাকার একটি ফোর্ড গাড়িও রয়েছে তাঁর।
সম্প্রতি তাঁর গাড়ির সম্ভারে যোগ হয়েছে ৪.৫৭ কোটি টাকার একটি পরিবেশবান্ধব গাড়ি। এই সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়, রোহিত শুধু বিলাসিতায় বিশ্বাসী নন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতার দিকেও নজর রাখছেন। পরিবেশবান্ধব গাড়ি কেনা আজকের দিনে শুধুই ট্রেন্ড নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বের দিকও তুলে ধরে।
তবে এত সম্পত্তি, এত সাফল্যের পরেও রোহিত শেট্টী ব্যক্তিগত জীবনে বেশ মাটির কাছাকাছি মানুষ বলেই পরিচিত। তিনি খুব বেশি পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যান না। কাজই তাঁর প্রধান ফোকাস। শুটিং ফ্লোরে তিনি অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড। স্টান্টের ক্ষেত্রে কোনও আপস করেন না, কিন্তু একই সঙ্গে সুরক্ষার দিকেও সমান নজর দেন।
রোহিত শেট্টীর ছবিতে স্টান্ট একটি আলাদা চরিত্রের মতো। উড়ন্ত গাড়ি, বিস্ফোরণ, ধাওয়া—এই সব তাঁর ছবির সিগনেচার এলিমেন্ট। এই স্টান্টের জন্য আলাদা করে পরিকল্পনা করেন তিনি। অনেক সময় বাস্তব স্টান্টই ব্যবহার করেন, যাতে পর্দায় আলাদা বাস্তবতা আসে। এই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তই তাঁকে অন্য পরিচালকদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
সমালোচকরা অনেক সময় বলেন, রোহিত শেট্টীর ছবিতে গল্পের গভীরতা কম। কিন্তু দর্শক বরাবরই তাঁকে সমর্থন করেছে। কারণ তিনি কখনও দাবি করেননি যে তাঁর ছবি বুদ্ধিবৃত্তিক সিনেমা। তিনি পরিষ্কার জানেন, তাঁর লক্ষ্য দর্শককে আনন্দ দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই তিনি অবিচল।
সব মিলিয়ে রোহিত শেট্টী আজ শুধু একজন পরিচালক নন, তিনি একটি ব্র্যান্ড। ২৮০ কোটি টাকার সম্পত্তি সেই ব্র্যান্ডেরই আর্থিক মূল্যায়ন। কিন্তু তার থেকেও বড় তাঁর অর্জন—দর্শকের ভালোবাসা এবং বিশ্বাস। যত দিন তিনি এই বিশ্বাস ধরে রাখতে পারবেন, তত দিন তাঁর সম্পত্তির অঙ্ক আরও বাড়তেই থাকবে।