উত্তরপ্রদেশে মোমো খাওয়ার নেশায় মায়ের আলমারি থেকে দিনের পর দিন গয়না চুরি করেছে এক কিশোর পুলিশি তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নিজের বাড়ি থেকেই দিনের পর দিন গয়না চুরি করল কিশোর, উধাও পাড়ার মোমো বিক্রেতা
উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলা-র এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গোটা এলাকা জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি যে কখনও কখনও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে। মোমো খাওয়ার নেশায় পড়ে নিজের বাড়ি থেকেই দিনের পর দিন লক্ষাধিক টাকার গয়না চুরি করেছে এক ১৪ বছরের কিশোর। আর সেই গয়নাগুলি আত্মসাৎ করে নিয়ে পাড়ার এক মোমো বিক্রেতা দোকান গুটিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে দেওরিয়া জেলার রামপুর কারখানা থানা এলাকা-য়। প্রথমে বিষয়টি পরিবারের কারও নজরেই আসেনি। দিনের পর দিন মায়ের আলমারি থেকে গয়না উধাও হলেও কেউ বুঝতে পারেননি কীভাবে তা হারিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই পুরো ঘটনার ভয়াবহতা সামনে আসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই কিশোর একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা স্থানীয়ভাবে কাজ করেন এবং মা গৃহবধূ। সংসারের যাবতীয় সঞ্চয় ও মূল্যবান গয়নাগুলি মায়ের আলমারিতেই রাখা ছিল। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস ছিল, ঘরের ভিতরেই সবকিছু নিরাপদ। সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
কিশোরটি দীর্ঘদিন ধরেই ফাস্টফুডে অত্যধিক আসক্ত ছিল। রাস্তার ধারের এগরোল, চাউমিন এবং বিশেষ করে মোমো তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। এলাকার একটি মোমোর দোকানে সে নিয়মিত যাতায়াত করত। প্রথমদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে টাকা দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড তার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। তাই টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় পরিবার।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় বিপত্তি।
পরিবার টাকা দেওয়া বন্ধ করতেই কিশোর বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রথমে সে মায়ের আলমারি থেকে ছোটখাটো গয়না নিয়ে যেত। পরে ধীরে ধীরে বড় ও দামি গয়নাও চুরি করতে শুরু করে।
প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও গয়না সে আলমারি থেকে বের করত—কখনও কানের দুল, কখনও চেন, কখনও আবার আংটি বা বালা। এরপর সেগুলি সে সরাসরি পাড়ার ওই মোমো বিক্রেতার হাতে তুলে দিত। বিনিময়ে বিক্রেতা তাকে বিনা টাকায় প্রচুর মোমো খাওয়াত।
পরিবারের কেউ কোনওদিন টেরই পায়নি, যে ঘরের ভিতরেই এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। আলমারি খোলা হলেও অনেক গয়না একসঙ্গে না দেখে কেউ সন্দেহ করেননি। ধীরে ধীরে গয়নাগুলি উধাও হয়ে যাওয়ায় পরিবারের সর্বস্বান্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হচ্ছিল।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায়, যখন কিশোরের এক আত্মীয় নিজের প্রয়োজনে কিছু গয়না নিতে ওই বাড়িতে আসেন। মায়ের আলমারি খুলতেই তাঁর চোখ কপালে ওঠে। আলমারির ভিতরে প্রায় কোনও গয়নাই নেই।
প্রথমে পরিবারের সবাই ভেবেছিলেন, হয়তো অন্য কোথাও গয়না রাখা হয়েছে। কিন্তু খোঁজাখুঁজি করেও কিছু পাওয়া যায়নি। তখনই সন্দেহ দানা বাঁধে। কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই সে প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ভয় ও চাপে ভেঙে পড়ে সব স্বীকার করে নেয়।
সে জানায়, মোমো খাওয়ার জন্যই সে একে একে সমস্ত গয়না মোমো বিক্রেতার হাতে তুলে দিয়েছে।
পরিবারের দাবি, আলমারিতে থাকা গয়নাগুলির মোট মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা। অনেক গয়না ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া, কিছু ছিল বিয়ের সময় পাওয়া। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানসিক দিক থেকেও পরিবার ভেঙে পড়েছে।
এক পরিবারের সদস্য বলেন,
“আমরা কখনও ভাবতেই পারিনি, নিজের ঘরের ভিতরেই এমনটা হতে পারে। ছেলের প্রতি বিশ্বাসটাই আমাদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে।”
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর পুলিশ এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওই মোমো বিক্রেতা তার দোকান গুটিয়ে ফেলেছে। দোকানটি এখন বন্ধ, আশপাশের কেউই জানে না সে কোথায় গেছে।
পুলিশের অনুমান, অভিযোগের আঁচ পেতেই বিক্রেতা গয়না নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। এখনও পর্যন্ত তার কোনও হদিস মেলেনি। উদ্ধার করা যায়নি কোনও গয়নাই।
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে রামপুর কারখানা থানার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। কিশোর যেহেতু নাবালক, তাই তার বিষয়ে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মোমো বিক্রেতার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও চুরির মাল আত্মসাতের অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে।
এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন,
“আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালাচ্ছি। দোকানদারের পরিচয়, পূর্বের ঠিকানা ও যোগাযোগ সূত্র ধরে তদন্ত এগোচ্ছে। শীঘ্রই তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
এই ঘটনা শুধু একটি চুরি বা প্রতারণার কাহিনি নয়। এটি সমাজের সামনে এক বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, শিশুদের উপর নজরদারির অভাব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভ কীভাবে একসঙ্গে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর বয়সে নেশার প্রবণতা খুব দ্রুত গড়ে ওঠে। তা যদি সময়মতো চিহ্নিত না করা যায়, তবে তার পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে। এখানে কিশোর নিজেও অপরাধের অংশ হলেও সে একই সঙ্গে এক ধরনের শিকারও।
মনোবিদদের মতে, শুধুমাত্র টাকা বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত বাইরের খাবারের প্রতি টান বা গোপনীয়তা—এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় পরিবার বুঝতেই পারেনি, তাদের সন্তানের নেশা কোন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আর সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছে এক অসাধু বিক্রেতা।
মোমোর মতো একটি সাধারণ খাবার যে একটি পরিবারের জীবনে এমন ভয়াবহ ঝড় তুলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক নির্মম প্রমাণ। বাইরে থেকে দেখলে এটি নিছক একটি চুরি, একটি প্রতারণা কিংবা একটি কিশোরের ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এই ঘটনা আসলে বহু স্তরের ব্যর্থতার গল্প—একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং আমাদের সময়ের।
আজ সেই পরিবার সর্বস্বান্ত। বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা গয়নাগুলি আর কেবল ধাতুর টুকরো ছিল না—সেগুলির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন, সংকটের দিনে শেষ ভরসা। আর আজ সেই সব স্মৃতি ও সঞ্চয় মিলিয়ে গিয়েছে এক অসাধু বিক্রেতার হাত ধরে, যে নিজের স্বার্থে একটি শিশুর দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি।
অন্যদিকে, সেই ১৪ বছরের কিশোর—যে আজ অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে—সে নিজেও এক অর্থে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের প্রতীক। বয়স যেখানে স্বপ্ন দেখার, খেলাধুলা আর শেখার, সেখানে সে আজ ভবিষ্যতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। তার সামনে এখন শুধু প্রশ্ন—সে কি সত্যিই অপরাধী, নাকি সে নিজেই একটি বড় ষড়যন্ত্রের শিকার?
আর মোমো বিক্রেতা? সে গা ঢাকা দিয়েছে। হয়তো অন্য কোনও শহরে আবার নতুন করে দোকান খুলবে, নতুন কোনও এলাকায় বিশ্বাস গড়ে তুলবে। কিন্তু তার ফেলে যাওয়া ক্ষত থেকে যাবে—একটি পরিবারের মনে, একটি শিশুর জীবনে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, বিপদ আসে বাইরে থেকে। অচেনা মানুষ, অজানা পরিবেশ, অন্ধকার রাস্তা—এই সবকিছুকেই আমরা ভয় পাই। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বিপদ অনেক সময় ঘরের ভিতরেই ধীরে ধীরে বড় হয়।
এই কিশোর কোনও তালা ভাঙেনি, কোনও জানালা দিয়ে ঢোকেনি। সে ছিল ঘরেরই সদস্য। তার হাতে ছিল বিশ্বাসের চাবিকাঠি। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই দিনের পর দিন গয়না উধাও হয়ে গেছে, অথচ কেউ টেরই পায়নি।
এটা শুধু এই পরিবারের গল্প নয়। অসংখ্য পরিবারে এমন ছোট ছোট ঘটনা ঘটে—যেগুলো আমরা গুরুত্ব দিই না। আজ একটি ছোট মিথ্যে, কাল একটি ছোট চুরি, পরশু আরও বড় কিছু। আমরা ভাবি, “বাচ্চা তো, বুঝবে না”, কিংবা “ও তো আমাদেরই লোক।” আর ঠিক এই জায়গাতেই বিপদ জন্ম নেয়।