ধর্মেন্দ্রর প্রয়াণে কাশ্মীর জুড়ে নেমেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়দের মনে আবার ফিরে এসেছে ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’-র শুটিংয়ের স্মৃতি—যে সময় অভিনেতার সরলতা আর জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়েছিল পুরো উপত্যকা
সাল ১৯৬৬। কাশ্মীর তখনও তার স্বর্গীয় সৌন্দর্যের মোহে মুগ্ধ করে রাখত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষদের। যদিও আজও সেই সৌন্দর্যের কিছু অংশ রয়ে গিয়েছে, কিন্তু সময়ের অনেক ওঠাপড়ার পর কাশ্মীরের সেই আসল মোহময় দিনগুলি যেন আলাদা করে চিহ্নিত হয়ে যায়। সেই সময়েই কাশ্মীরের উপত্যকার এক নির্জন অথচ মনোরম গ্রামে পৌঁছেছিল এক বলিউডের ইউনিট—শুটিং চলছে সি.এল. রাওয়ালের পরিচালনায় নির্মীয়মাণ ছবি ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’। ছবির নায়ক, তখন পরিচিতি পাচ্ছেন ক্রমে, কিন্তু শীঘ্রই যে তিনি বলিউডের অন্যতম অনন্য তারকা হয়ে উঠবেন তা হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না। তিনি ধর্মেন্দ্র—যাঁকে প্রকৃত অর্থেই ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে ‘অরিজিনাল হ্যান্ডসাম হাঙ্ক’ বলা হয়।
শুটিংয়ের প্রতিটি দিনই ছিল এক উৎসব। গ্রামবাসীরা যেন ভিড় জমিয়ে দেখতেন বলিউডের ছবি কীভাবে প্রাণ পায়। সেই সময়ে সিনেমা ছিল এক অদ্ভুত মোহ, আলো আঁধারের এক জগত। দূর থেকে দেখা তারাদের যেন হঠাৎ সামনে পাওয়ার আনন্দেই তারা যেন বিমুগ্ধ হয়ে থাকতেন। আর ধর্মেন্দ্র—তাঁর আকর্ষণীয় উপস্থিতি, বিনয়ী আচরণ, আন্তরিক হাসি—সব মিলিয়ে গ্রামবাসীদের কাছে তিনি খুব তাড়াতাড়িই হয়ে ওঠেন ‘নিজেদের মানুষ’।
শুটিং চলাকালীন বহুবার দেখা গেছে, ক্যামেরা বন্ধ হলেই ধর্মেন্দ্র গ্রামবাসীদের মধ্যে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে গল্প করছেন, তাঁদের থেকে জানতে চাইছেন জীবনযাপন, সংস্কৃতি, পরিবেশ, পাহাড়ি মানুষের সমস্যা, হাসি-মজা—সব। এই আচরণই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল। সেই সময়ে খুব কম তারকাই এইভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতেন। তাঁর সহ-অভিনেতা বা ইউনিট মেম্বারদের কাছ থেকেও শোনা যায়, ধর্মেন্দ্র সেই বয়সেই ছিলেন অত্যন্ত সরল জীবনযাপনকারী, বাস্তবসম্মত এবং অত্যন্ত ভদ্র মানুষ।
কাশ্মীরের সেই গ্রামে ছিলেন আব্দুল রজ়াক—তখন তরুণ, আজ নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়স। রজ়াকের চোখে এখনও ভাসে সেই দিনের স্মৃতি। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন তিনি, কিন্তু স্মৃতি বলতে গেলে যেন আবার নবীন শক্তি ফিরে পান। ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুসংবাদ পৌঁছতেই কাশ্মীরের বহু মানুষই শোকাহত হন। কিন্তু রজ়াক যেন ফিরলেন ছেষট্টির সেই সময়ে, সেই বিকেলে, সেই সকালগুলোয়—যখন ধর্মেন্দ্রর হাসি, তাঁর কথাবার্তা এবং তাঁর আন্তরিকতা তাদের প্রত্যেকের দিনকে সাজিয়ে দিত।
রজ়াক সংবাদমাধ্যমকে বলেন—“পাহাড়ি গ্রাম হলে কী হবে, ওঁকে আমরা দেখে ছোট বড় সবাই মুগ্ধ হয়ে যেতাম। শুটিং বন্ধ হলেই আমাদের ডেকে নিতেন। কখনও চা খাওয়াতেন, কখনও আমাদের খাবার খেতেন। তিনি আমাদের সম্পর্কে জানতে চাইতেন—আমরা কী করি, কীভাবে থাকি, কী খাই, কী পড়াশোনা করি, এই অঞ্চলে কী সমস্যা—সব!”
ধর্মেন্দ্রর কথা বলতে বলতে রজ়াকের চোখে হালকা জল, আকাশের দিকে চেয়ে বলেন—“তিনি ছিলন খুব ভালো মানুষ। শুধু নায়ক নন, মানুষ হিসেবে যে কী বড় ছিলেন তা বলে বোঝানো যাবে না। তিনি আমাদের সম্মান করতেন। ধর্ম বা ভাষা, কাশ্মীরি আর পাঞ্জাবি—কিছুই ছিল না তাঁর কাছে প্রাধান্য। সকলকে মানুষ হিসাবে দেখতেন। ওঁর যে বড় মনের অধিকারী ছিলেন তা আমরা তখনই বুঝেছিলাম।”
রজ়াকের কথাতেই ওঠে আরেকটি অদ্ভুত অথচ হৃদয়গ্রাহী ঘটনা—তাঁর ছেলের নাম ‘অশোক’। ধর্মেন্দ্রর ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’-তে চরিত্রের নাম ছিল অশোক। রজ়াক বলেন, “ওঁকে এত ভালবাসতাম যে আমার ছেলে জন্মানোর পর আর কোনও নাম ভাবিনি। বললাম, আমার ছেলে হবে অশোক—জাস্ট ওঁর মতো একজন ভাল মানুষ।”
আজ সেই ছেলেও বড় হয়ে গিয়েছে। অন্য কোথাও চাকরি করে। কিন্তু তাঁর নামের পিছনে যে আবেগ, যে ইতিহাস, যে স্মৃতি—তা আজও কাশ্মীরের মানুষদের কাছে আলো করে রাখে ধর্মেন্দ্রর স্মৃতি।
ধর্মেন্দ্রর মৃত্যু যেন এই আবেগকে আরও বেশি করে জীবন্ত করে দিয়েছে। কাশ্মীরে যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ পৌঁছায়, বহু বৃদ্ধ মানুষ আক্ষেপ করে বলেন—“আমাদের নায়ক চলে গেল!” যদিও ধর্মেন্দ্র কখনও বসবাস করেননি কাশ্মীরে, কিন্তু সেই স্বল্প সময়েই তিনি যে ছাপ রেখে গিয়েছিলেন তা আজও অবিকল রয়ে গেছে।
গ্রামে আজও রয়েছে একটি স্মৃতিফলক—গ্রামবাসীদের ভাষায় “দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া বোর্ড”। কাঠের তৈরি, সময়ের সঙ্গে কিছুটা বিবর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী। সেখানে লেখা আছে—এই গ্রামে ১৯৬৬ সালে শুটিং হয়েছিল ওই ছবির। বহু পর্যটকও আজ সেই বোর্ড খুঁজে বের করেন, ছবি তোলেন, স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে গল্প শোনেন। শুটিং স্থলটি আজও সেই সময়ের মতোই শান্ত, সবুজে ঢাকা, পাহাড়ের কোলে এক অনন্য সৌন্দর্য।
ধর্মেন্দ্র পরবর্তীতে আরও কয়েকটি ছবির শুটিং করেছেন কাশ্মীরে। এর মধ্যে ‘নফরৎ কি আঁধি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ছবির শুটিংয়েও তিনি ছিলেন আগের মতোই প্রাণবন্ত, চনমনে। গ্রামবাসীদের সঙ্গে থাকতেন, গল্প করতেন, তাঁদের সংস্কৃতি জানার চেষ্টা করতেন। জিতেন্দ্র, মাধবী, অনিতা রাজ—এঁদের উপস্থিতিতেও ইউনিট ছিল বেশ বড়। কিন্তু ধর্মেন্দ্রই ছিলেন সবার প্রিয় মুখ।
তাঁকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত শুটিং স্পটের আলাদা উষ্ণতা। একবার কোনও স্থানীয় বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ইউনিটের মেডিক্যাল ভ্যান ডেকে পাঠান। এমনকি নিজের গাড়ি পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেন। এই মানবিকতা সেই সময় স্থানীয়দের আরও বেশি করে কাছে টেনে আনে তাঁর ব্যক্তিত্বকে।
অন্যদিকে ধর্মেন্দ্রর জন্য কাশ্মীরও ছিল বিশেষ। বহু সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, কাশ্মীরের প্রকৃতি, মানুষ, রীতি-নীতি তাঁর কাছে ছিল হৃদয়ের এক বিশেষ অংশ। অনেক সময় বলেছিলেন—“কাশ্মীর আমার কাছে শুধু লোকেশন নয়, আমার কাছে এটি এক আবেগ।”
সময় গড়িয়ে গেছে। বছর পেরিয়ে দশক পেরিয়েছে। বলিউড বদলেছে, কাশ্মীরও বদলেছে। কিন্তু সেই ১৯৬৬ সালের স্মৃতি, ধর্মেন্দ্রর হাসি, গ্রামবাসীদের সঙ্গে চায়ের আড্ডা, গান-বাজনা—সব কিছুর টুকরো টুকরো অংশ আজও জড়িয়ে আছে কাশ্মীরের মাটিতে। বিশেষ করে সেই ছোট্ট গ্রামে যেখানে আজও মানুষ জানেন—একসময় এখানে এসেছিলেন এক নায়ক। যে নায়ক শুধু রূপালি পর্দার ছিলেন না, মানুষের হৃদয়ে রয়ে যাওয়ার মতো ছিলেন।
২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ এল, তখন শুধু চলচ্চিত্র জগতই নয়, বহু সাধারণ মানুষও স্তব্ধ হয়ে পড়লেন। কাশ্মীরে সেই শোক আরও গভীর। অনেকেই বলেন—“যখন একজন মানুষ সত্যিই ভাল হন, তখন তাঁর মৃত্যু যেন ব্যক্তিগত ক্ষতির মতো অনুভূত হয়।” ধর্মেন্দ্রর মৃত্যু সেই রকমই ছিল কাশ্মীরবাসীদের কাছে।
আজ সেই স্মৃতিগুলি কেবল স্মৃতি নয়—এ এক ইতিহাস, একটি আবেগ, এক অমূল্য অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের এক সাক্ষী হয়ে রয়েছে গ্রামের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’-র বোর্ড। যে বোর্ড শুধু একটি ছবির নয়—একটি সম্পর্কের, একটি উষ্ণতার, একটি মনমুগ্ধকর সময়ের প্রতীক।
ধর্মেন্দ্রর চলে যাওয়া যেন আরও জাগিয়ে তুলেছে সেই ভুলতে না পারা মুহূর্তগুলোকে। আর রজ়াকের মতো মানুষ আজও বলেন—“নায়করা অনেক দেখেছি… কিন্তু ধর্মেন্দ্রর মতো মানুষ আর কখনও দেখিনি
ধর্মেন্দ্রর চলে যাওয়া যেন কাশ্মীরের বহু মানুষের মনে আরও একবার সেই পুরোনো দিনগুলিকে ফিরে দেখার দরজা খুলে দিয়েছে। আজ যখন রজ়াক বা তাঁর সমবয়সী অন্যরা সেই শুটিংয়ের দিনের কথা বলেন, তাঁদের চোখে-মুখে যেন ফুটে ওঠে এক বিশেষ উজ্জ্বলতা। বয়সের ভারে দেহ নুয়ে পড়েছে, কিন্তু স্মৃতিরা ঠিকই তরতাজা। সেই সময়ের কাশ্মীর ছিল যেন ছবির মতো সুন্দর—গাছের ফাঁকে আলো খেলা, দূর পাহাড়ে বরফের রেখা, আর মাঝে মাঝে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়া—এই সৌন্দর্যের মধ্যে ধর্মেন্দ্রর মতো একজন তারকা এসে মিশে যাওয়া ছিল এক অপূর্ব ঘটনা।
গ্রামবাসীরা বলেন, ধর্মেন্দ্র শুধু শুটিং করতেন না, তাঁদের সঙ্গে জীবন যাপন করতেন। অনেকদিনের পুরোনো লোকেরা মনে করেন, একবার শুটিংয়ের ফাঁকে গ্রামের বাচ্চাদের সঙ্গে খেলছিলেন ধর্মেন্দ্র। বাচ্চারা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। কেউ তাঁর হাত টানছে, কেউ বলছে, “ধর্ম স্যার, এইদিকে আসুন!” তিনি হেসে বলছিলেন, “আমি তো তোমাদেরই মানুষ।” এই কথাটাই নাকি আজও লোকে ভুলতে পারে না।
গ্রামের এক বৃদ্ধা, যিনি তখন কিশোরী ছিলেন, বলেন—“ওঁর চোখে ছিল এক অদ্ভুত ভালোবাসা। কোনও তারকার মতো দূরে থাকতেন না। আমাদের জিজ্ঞেস করতেন, ‘তোমাদের বাড়িতে কী রান্না হয়, কাশ্মীরে শীত কেমন লাগে, তোমরা কী গান গাও।’ এইভাবে কথা বলতেন। আমরা তো ভাবতাম, সিনেমার মানুষরা সাধারণ মানুষের কাছে আসে না, কিন্তু উনি আমাদের ভুল প্রমাণ করেছিলেন।”
ধর্মেন্দ্রর এই সহজাত উষ্ণতাই তাঁকে কাশ্মীরের কাছে এক আলাদা জায়গায় তুলে ধরেছিল। পরে যখন তিনি অন্য ছবির শুটিং করতে আবার কাশ্মীরে আসেন, গ্রামবাসীরা তাঁকে পুরোনো দিনের মতোই স্বাগত জানান। ধর্মেন্দ্রও চিনে নিতেন তাঁদের—কেউ বলতেন, তিনি মনে রেখেছেন আগের বার দেখা সেই ছেলেটিকে, যাকে তিনি বলেছিলেন “পড়াশোনা ভালো করে করো।” সেই ছেলে আজ বৃদ্ধ, কিন্তু আজও বলেন—“তিনি বলেছিলেন, আর আজও মনে আছে।”
এই সমস্ত স্মৃতির ভাঁড়ারই যেন আবার খুলে গেল তাঁর মৃত্যুর পর। বহু মানুষ শোকসভা করলেন নিজেদের মতো করে—কেউ তাঁর ছবি রেখে ফুল দিলেন, কেউ সন্ধ্যার আড্ডায় শুধু তাঁর গল্প বললেন। কাশ্মীরের কয়েকটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এমনও জানিয়েছে যে, যেদিন সংবাদ পৌঁছায়—সেই সন্ধ্যায় অনেক বাড়িতে দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া, শোলে, চুপকে চুপকে বা অনুপম—এই ধরনের ধর্মেন্দ্রর অভিনীত ছবি চালানো হয়।
গ্রামে যে স্মৃতিফলকটি রয়েছে, তার সামনে আজও লোকে দাঁড়ায়। ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর পরে নাকি সেখানে আরও একটি ফুলের মালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় যুবকেরা। তাঁদের বক্তব্য—“তিনি আমাদের গ্রামের ইতিহাসের অংশ। তিনি আমাদের হৃদয়ের মানুষ।”