অহমদাবাদে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ের ফয়সালা। নির্ণায়ক ম্যাচের আগে ভারতের সম্ভাব্য প্রথম একাদশ নিয়ে তুঙ্গে জল্পনা
লখনউয়ে নির্ধারিত ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ বৃষ্টির কারণে ভেস্তে যাওয়ায় সিরিজ়ের সমীকরণ এখন একেবারে পরিষ্কার। আর কোনও ম্যাচ না থাকায় ভারতের সামনে আর হারার আশঙ্কা নেই। এখন থেকে সিরিজ়ের ফল হতে পারে মাত্র দু’টি—হয় ভারত এই টি-টোয়েন্টি সিরিজ় জিতবে, নয়তো সিরিজ় ড্র হবে। এই পরিস্থিতিতেই অহমদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে আয়োজিত শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচটি কার্যত একটি ‘ফাইনাল’-এর রূপ নিয়েছে।
ভারতীয় শিবিরের লক্ষ্য স্পষ্ট। তারা চাইছে, এই ম্যাচ জিতেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ় শেষ করতে। এর পেছনে রয়েছে সফরের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট। লাল বলের সিরিজ়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর এক দিনের সিরিজ় জিতে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল ভারত। এখন সাদা বলের দুই ফরম্যাটেই সিরিজ় জিতে সফর শেষ করলে দলের মনোবল আরও বাড়বে, বিশেষ করে আসন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে।
অহমদাবাদের ম্যাচকে কেন্দ্র করে দলের ভিতরে প্রস্তুতির মাত্রা তুঙ্গে। নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পিচ সাধারণত ব্যাটিং সহায়ক হলেও ম্যাচের মাঝের ওভারে বোলারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই একাদশ নির্বাচনে ভারসাম্যের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। ব্যাটিংয়ে আক্রমণাত্মক সূচনা যেমন দরকার, তেমনই প্রয়োজন মাঝের ওভারে রান নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা।
এই ম্যাচের গুরুত্ব শুধু সিরিজ় জয়ের দিক থেকে নয়, বরং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার দিক থেকেও। বেশ কয়েক জন ক্রিকেটারের জন্য এটি নিজেকে প্রমাণ করার বড় সুযোগ। শেষ ম্যাচে ভাল পারফরম্যান্স জাতীয় দলে তাঁদের জায়গা আরও পোক্ত করতে পারে। পাশাপাশি কোচ গৌতম গম্ভীর ও টিম ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন কম্বিনেশন পরীক্ষা করে দেখার সুযোগও পাচ্ছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকাও অবশ্য সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। সিরিজ় ড্র করে ফিরলেও তারা মানসিক দিক থেকে লাভবান হতে চাইবে। ফলে ম্যাচের উত্তেজনা শুরু থেকেই চরমে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। দুই দলের মধ্যকার সাম্প্রতিক লড়াইয়ের ইতিহাস বলছে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ম্যাচের রাশ কার হাতে থাকবে, তা বলা কঠিন।
সব মিলিয়ে, লখনউয়ের ম্যাচ ভেস্তে যাওয়ার পর অহমদাবাদের শেষ টি-টোয়েন্টি এখন শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং সিরিজ় জয়ের লড়াই। ভারতীয় শিবিরের লক্ষ্য স্পষ্ট—এই ‘ফাইনাল’ জিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি অধ্যায় শেষ করা
এর কারণ শুধু এই সিরিজ় নয়, বরং সামগ্রিক সফরের প্রেক্ষাপট। লাল বলের সিরিজ়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হার দিয়েই সফর শুরু করেছিল ভারত। সেই হতাশার ছাপ কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গিয়েছিল এক দিনের সিরিজ় জিতে। এখন টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ও জিতে সফর শেষ করতে চায় ভারতীয় দল। সাদা বলের দুই ফরম্যাটেই সিরিজ় জিতে আত্মবিশ্বাসের রসদ নিয়ে ঘরে ফিরতে চাইবেন কোচ গৌতম গম্ভীর ও তাঁর টিম ম্যানেজমেন্ট।
তবে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন একটাই—শুভমন গিল। ছোট ফরম্যাটে ভারতের সহ-অধিনায়ক খেলবেন কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দলের সঙ্গে অহমদাবাদে পৌঁছেছেন শুভমন। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি মানেই যে তিনি খেলবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
শুভমনের চোটের ঘটনা নতুন নয়। লখনউয়ে বুধবার ম্যাচের আগে নেট প্র্যাকটিস চলাকালীন একটি বল তাঁর পায়ে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যান তিনি। সতীর্থরা ছুটে আসেন। দলের চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখেন তাঁর অবস্থা। সেই সময়ের পর আর ব্যাট হাতে নেটেই দেখা যায়নি শুভমনকে। ম্যাচ শুরুর আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়, লখনউয়ের ম্যাচে তিনি খেলছেন না। যদিও শেষ পর্যন্ত ঘন কুয়াশার কারণে ম্যাচই হয়নি। ফলে শুভমনের জায়গায় অন্য কেউ খেলতে পারেননি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—অহমদাবাদে কি ঝুঁকি নিয়ে শুভমনকে খেলানো হবে? সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এক কর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চান না। অর্থাৎ সামান্য যন্ত্রণাও থাকলে শুভমনকে বিশ্রামই দেওয়া হবে। এর পিছনে রয়েছে সাম্প্রতিক অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ় চলাকালীনই চোট পেয়েছিলেন শুভমন। কলকাতায় প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিন ঘাড়ে টান ধরেছিল তাঁর। পরিস্থিতি এমনই ছিল যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। সেই টেস্টের বাকি অংশ তো বটেই, গুয়াহাটিতে হওয়া দ্বিতীয় টেস্টেও মাঠে নামতে পারেননি তিনি। পরে এক দিনের সিরিজ়েও দলে ছিলেন না। দীর্ঘ পুনর্বাসনের পর টি-টোয়েন্টি সিরিজ় দিয়েই প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি। কিন্তু আবার চোট পাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে টিম ম্যানেজমেন্টের।
আর কয়েক মাসের মধ্যেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এই সময় চোট নিয়েই খেলতে নামলে তা গুরুতর আকার নিতে পারে। বিশ্বকাপের আগে শুভমনকে পুরোপুরি ফিট রাখতে চাইছে ভারতীয় শিবির। তাই অহমদাবাদে তাঁর না খেলার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
শুভমন না খেললে স্বাভাবিক ভাবেই দলে ঢোকার সবচেয়ে বড় দাবিদার সঞ্জু স্যামসন। চলতি টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ে এখনও পর্যন্ত একটি ম্যাচেও সুযোগ পাননি তিনি। কিন্তু শুভমনের অনুপস্থিতিতে প্রথম একাদশে তাঁর জায়গা প্রায় নিশ্চিত। সঞ্জু ঢুকলে তিনি অভিষেক শর্মার সঙ্গে ওপেন করতে পারেন। অভিষেক ইতিমধ্যেই আগ্রাসী ব্যাটিং করে নিজের জায়গা বেশ শক্ত করেছেন। সঞ্জুর সঙ্গে তাঁর জুটি ভারতের ইনিংসের শুরুতেই রান তুলতে সাহায্য করতে পারে।
সঞ্জুর অন্তর্ভুক্তি মানেই দলে কাঠামোগত পরিবর্তন। কারণ সঞ্জু নিজেই একজন উইকেটরক্ষক। ফলে জিতেশ শর্মার জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলে দু’জন উইকেটরক্ষকের প্রয়োজন নেই বলেই মনে করছেন গৌতম গম্ভীর। তাঁর দর্শন বরাবরই ব্যালান্সের দিকে ঝোঁকে—একজন উইকেটরক্ষক ও অতিরিক্ত একজন অলরাউন্ডার।
সেই জায়গাতেই সামনে আসছে বাংলার অলরাউন্ডার শাহবাজ় আহমেদের নাম। জিতেশের বদলে শাহবাজ়কে খেলানোর সম্ভাবনা প্রবল। এর আরও একটি বড় কারণ হল অক্ষর পটেলের ছিটকে যাওয়া। চোটের কারণে এই সিরিজ়ে আর খেলতে পারবেন না অক্ষর। তাঁর অভাব পূরণ করার জন্য শাহবাজ় আদর্শ বিকল্প বলেই মনে করছেন নির্বাচক ও কোচিং স্টাফ।
শাহবাজ় বাঁহাতি ব্যাটার, পাশাপাশি বাঁ হাতে স্পিন বলও করেন। একেবারে অক্ষরের মতো প্রোফাইল। উপরন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন তিনি। ব্যাটে যেমন ধারাবাহিক, তেমনই বল হাতেও কার্যকর। এই কারণে আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখা যেতে পারে তাঁকে।
এই ম্যাচটি শাহবাজ়ের কাছে শুধু একটি সুযোগ নয়, বরং বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার সুবর্ণ সুযোগ। ভাল খেলতে পারলে তাঁর সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দরজাও খুলে যেতে পারে। বিশেষ করে ভারত যদি বিশ্বকাপের দলে এক জন অতিরিক্ত স্পিন অলরাউন্ডার নিতে চায়, তা হলে শাহবাজ় জোরালো দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন।
বোলিং বিভাগেও কিছু পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যক্তিগত কারণে সিরিজ়ের মাঝে বাড়ি ফিরলেও আবার দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন জসপ্রীত বুমরাহ। তবে তাঁকে অহমদাবাদের ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে বলে জল্পনা চলছে। কারণ আগের ম্যাচে হর্ষিত রানা যথেষ্ট ভাল পারফর্ম করেছেন। শুধু বোলিং নয়, প্রয়োজন পড়লে ব্যাট হাতেও কিছুটা অবদান রাখতে পারেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে অর্শদীপ সিংহের সঙ্গে নতুন বল হাতে হর্ষিতকেই দেখা যেতে পারে। বুমরাহকে বিশ্রাম দিয়ে তাঁকে সতেজ রাখা হলে তা বিশ্বকাপের দিক থেকেও লাভজনক হবে বলে মনে করছে টিম ম্যানেজমেন্ট।
সব মিলিয়ে অহমদাবাদের ম্যাচে ভারতের প্রথম একাদশে একাধিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। শুভমন গিলের চোট, সঞ্জু স্যামসনের অন্তর্ভুক্তি, শাহবাজ় আহমেদের ফেরার সম্ভাবনা এবং বুমরাহকে বিশ্রাম—এই সব মিলিয়ে ম্যাচের আগেই উত্তেজনা তুঙ্গে।
নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পিচ সাধারণত ব্যাটিং সহায়ক হলেও স্পিনাররা মাঝের ওভারে সাহায্য পান। সে ক্ষেত্রে শাহবাজ়ের মতো একজন স্পিন অলরাউন্ডার দলের ভারসাম্য বাড়াতে পারে। অন্য দিকে, ওপেনিংয়ে অভিষেক-সঞ্জু জুটি ভারতকে দ্রুত সূচনা এনে দিতে পারে।
এই ম্যাচ জিতলেই সিরিজ় জয় নিশ্চিত ভারতের। ড্র হলে ট্রফি ভাগাভাগি হবে। কিন্তু গম্ভীরের ভারত ড্রতে সন্তুষ্ট থাকবে না। তাঁরা চাইবে, শেষ ম্যাচ জিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সফর শেষ করতে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে দলের কম্বিনেশন আরও একবার ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ হিসেবেই দেখছে ভারতীয় শিবির।
সব নজর এখন অহমদাবাদের দিকে। শেষ মুহূর্তে শুভমন গিলকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটাই নির্ধারণ করে দেবে ভারতের প্রথম একাদশের চূড়ান্ত চেহারা। আর সেই সিদ্ধান্তের উপরই অনেকটা নির্ভর করছে সিরিজ়ের শেষ অধ্যায়।