Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

শীতের ছুটিতে নৌবিহারের স্বাদ ৫টি জলাধার নিয়ে জমজমাট ভ্রমণসূচি

শীতের নরম রোদ আর হিমেল হাওয়ার ছোঁয়ায় জলাধারে নৌবিহারের আনন্দ যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। নীল জলের বুকে নৌকার দুলুনি, চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর শান্ত পরিবেশ সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই স্বাদ পেতে চাইলে কোথায় যাবেন, কোন জলাধারে কী কী দেখবেন আর কীভাবে সাজাবেন আপনার ভ্রমণসূচি, রইল তারই খুঁটিনাটি।

শীতকাল মানেই ভ্রমণের আদর্শ সময়। বর্ষার মতো অতিবৃষ্টি নেই, গ্রীষ্মের মতো অসহনীয় গরমও নেই। তার উপর রয়েছে হালকা শীতের আমেজ, সকালের কুয়াশা আর দিনের বেলায় গায়ে মাখা নরম রোদ। এই সময়েই জলাধারকেন্দ্রিক ভ্রমণ সবচেয়ে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। নৌকায় ভেসে থাকা, জলের ধারে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা কিংবা জলাধারের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা—সব মিলিয়ে শীতের ভ্রমণ হয়ে ওঠে একেবারে আলাদা অভিজ্ঞতা।

পাহাড় বা সমুদ্রের ভিড় এড়িয়ে অনেকেই এখন খুঁজছেন শান্ত, নিরিবিলি অথচ মনোরম গন্তব্য। সেই চাহিদা পূরণ করে জলাধারগুলি। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে ছড়িয়ে থাকা একাধিক জলাধার শীতের দিনে হয়ে উঠছে ভ্রমণপিপাসুদের প্রথম পছন্দ। কাছেপিঠে হওয়ায় খুব বেশি ছুটির প্রয়োজন নেই। এক বা দুই দিনের মধ্যেই ঘুরে আসা যায়। পরিবার, বন্ধু কিংবা একা—সব ধরনের ভ্রমণেই জলাধার উপযুক্ত।

 জলাধারকেন্দ্রিক ভ্রমণের আকর্ষণ

জলাধার মানেই শুধু বাঁধ বা জল জমার জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় জীবনযাপন। কোথাও জলাধার ঘিরে তৈরি হয়েছে পাহাড়ি পরিবেশ, কোথাও বনভূমি, আবার কোথাও প্রাচীন মন্দির বা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। নৌবিহারের সঙ্গে সঙ্গে তাই পাওয়া যায় নানা রকম অভিজ্ঞতা।

শীতের দিনে জলাধারে নৌবিহারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল আবহাওয়া। হালকা ঠান্ডা, পরিষ্কার আকাশ আর রোদের উষ্ণতা—এই পরিবেশে দীর্ঘ সময় নৌকায় বসে থাকলেও ক্লান্তি আসে না। জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়া মনকে সতেজ করে তোলে। অনেক জায়গায় শীতকালে জলস্তর কিছুটা কমে যায়, ফলে চারপাশের পাহাড়, টিলা বা বনভূমি আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এই কারণেই শীতের ভ্রমণসূচি সাজাতে জলাধারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করলে এক ঢিলে বহু পাখি মারা যায়—ভ্রমণও হয়, নৌবিহারও হয়, আবার প্রকৃতির সান্নিধ্যও মেলে।


মাইথন: স্বল্প ছুটিতে আদর্শ জলভ্রমণ

যাঁদের হাতে খুব বেশি ছুটি নেই, তাঁদের জন্য মাইথন হতে পারে একেবারে আদর্শ গন্তব্য। কলকাতা থেকে সকালের ট্রেন বা বাস ধরলে ঘণ্টা চার-পাঁচের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়। বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানা লাগোয়া এই জলাধার আসানসোল হয়ে যেতে হয়। শীত পড়লেই এখানে পিকনিকের আমেজ জমে ওঠে।

মাইথন ড্যাম দমোদর নদীর উপর নির্মিত। বিশাল জলাধারকে ঘিরে রয়েছে ছোট-বড় টিলার সারি। এই টিলাগুলি জলাধারের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। শিকারায় কিংবা স্পিড বোটে চেপে জলাধার ঘোরার সুযোগ রয়েছে। জলের বুকে নৌকার দুলুনি আর চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে এক অপূর্ব অনুভূতি তৈরি হয়।

শীতের দিনে মাইথনের প্রকৃতি খানিক রুক্ষ হলেও আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম। সকালে হালকা ঠান্ডা, দুপুরে আরামদায়ক রোদ আর সন্ধ্যায় হিমেল বাতাস—এই ছন্দেই কাটে সময়। নৌবিহারের পাশাপাশি দেখে নেওয়া যায় কল্যাণেশ্বরী মন্দির। বহু পুরনো এই মন্দির স্থানীয় মানুষের কাছে যেমন পবিত্র, তেমনই পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়।

কোথায় থাকবেন

মাইথনের আশপাশে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে আসানসোল শহরেও বিভিন্ন হোটেলে রাত্রিবাস করা যায়।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে আসানসোলগামী ট্রেন কিংবা ধর্মতলা থেকে বাস। আসানসোল থেকে বাস, অটো বা গাড়িতে মাইথন।


 পাঞ্চেত ও গড় পঞ্চকোট: ইতিহাস, পাহাড় আর জলাধারের মেলবন্ধন

মাইথন থেকে খুব কাছেই পাঞ্চেত জলাধার। মাইথন ও পাঞ্চেতের দূরত্ব বড়জোর ২০ কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের সীমানায় দমোদর নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে পাঞ্চেত জলাধার। শীতকালে এখানে জলস্তর কিছুটা কম থাকে, তবে আবহাওয়া হয় অত্যন্ত মনোরম।

পাঞ্চেতের একটি বড় আকর্ষণ হল হাতে টানা নৌকা। এখানে স্পিড বোট বা যন্ত্রচালিত নৌকা না থাকলেও ধীর লয়ের নৌবিহারের আলাদা মজা রয়েছে। জলের ওপর দিয়ে ধীরে এগোতে এগোতে চারপাশের পাহাড় আর প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।

পাঞ্চেত পাহাড়ের পাদদেশেই রয়েছে গড় পঞ্চকোট—পঞ্চকোট রাজাদের প্রাচীন গড়ের ধ্বংসাবশেষ। অরণ্যঘেরা এই জায়গাটি ইতিহাসপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে সমান আকর্ষণীয়। ফাল্গুন-চৈত্রে যেখানে আগুনরঙা পলাশ চোখে পড়ে, শীতে সেখানে সবুজ আর শান্ত পরিবেশ মন কেড়ে নেয়। দিনের বেলা আবহাওয়া আরামদায়ক হলেও রাতে ভালোই ঠান্ডা পড়ে।

কোথায় থাকবেন

গড় পঞ্চকোটে পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের অতিথি আবাস ও একাধিক বেসরকারি হোটেল রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে কুমারডুবি, বরাকর বা আসানসোল স্টেশনে নেমে অটো বা গাড়িতে গড় পঞ্চকোট। দুই রাতের ভ্রমণসূচি হলে পাঞ্চেত ও মাইথন একসঙ্গে ঘোরা যায়।


 মুকুটমণিপুর: বিশাল জলরাশি আর দীর্ঘ নৌবিহার

বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুর ড্যাম পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় জলাধার। কংসাবতী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি এই জলাধার এতটাই বিশাল যে এক কূল থেকে অন্য কূল চোখে পড়ে না। প্রায় ১১.২৭ কিলোমিটার জুড়ে এর বিস্তৃতি।

বর্ষায় এর রূপ আলাদা হলেও শীতই মুকুটমণিপুর ভ্রমণের আদর্শ সময়। যন্ত্রচালিত নৌকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। নৌবিহারের সময় আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি দেখে নেওয়া যায়—পরেশনাথ শিব মন্দির, ডিয়ার পার্ক, কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থল, মুসাফির আনা ভিউ পয়েন্ট।

নৌকা ছাড়াও ই-রিকশা বা টোটো করে ঘুরে নেওয়া যায়। দুই ধরনের ভ্রমণেই মুকুটমণিপুরের আলাদা আলাদা সৌন্দর্য ধরা পড়ে।

কোথায় থাকবেন

ড্যামের কাছেই সরকারি যুব আবাস, অতিথিশালা ও বেসরকারি হোটেল রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া, শালিমার বা সাঁতরাগাছি থেকে বাঁকুড়াগামী ট্রেন। বাঁকুড়া থেকে বাস বা গাড়িতে মুকুটমণিপুর।


 তালবেড়িয়া ড্যাম (ঝিলিমিলি): নিরিবিলি পাহাড়ি স্বাদ

বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের ঝিলিমিলিতে অবস্থিত তালবেড়িয়া ড্যাম দেখলে মনে হয় পাহাড়ি কোনও হ্রদ। চারপাশে শাল-সেগুনের জঙ্গল, স্বচ্ছ পরিষ্কার জল আর নিরিবিলি পরিবেশ—সব মিলিয়ে জায়গাটি মন ভালো করে দেয়।

জলাধারটি আকারে খুব বড় না হলেও এর সৌন্দর্য আলাদা। শীতের বিশেষ ছুটির দিন ছাড়া এখানে ভিড় খুব বেশি হয় না। নৌকায় ভেসে থাকার সময় শহরের কোলাহল একেবারে ভুলে যাওয়া যায়।

ঝিলিমিলি থেকে বেলপাহাড়ি, মুকুটমণিপুর, সুতানের জঙ্গল—এই সব জায়গা সহজেই ঘোরা যায়। হাতে দুই-তিন দিন সময় থাকলে এই অঞ্চল জুড়ে সুন্দর ভ্রমণসূচি তৈরি করা সম্ভব।

কোথায় থাকবেন

ঝিলিমিলি ও রানিবাঁধে একাধিক হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

ব্যক্তিগত গাড়িতে সড়কপথে যাওয়া যায়। ধর্মতলা থেকে বাস, অথবা ট্রেনে ঝাড়গ্রাম পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া সম্ভব।


 চান্ডিল: স্পিড বোট, পাহাড় আর ইতিহাস

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে হলেও শীতের জলাধার ভ্রমণের তালিকায় চান্ডিলের নাম না থাকলে তালিকা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা-খারসোয়ান জেলার চান্ডিল ব্লকে সুবর্ণরেখা নদীর উপর অবস্থিত চান্ডিল বাঁধ। জলাধার থেকে দেখা যায় দলমা পাহাড়ের দৃশ্য।

পড়ন্ত বিকেলে স্পিড বোটে চেপে বিশাল জলাধারের বুকে ছুটে চলা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। জল-হাওয়ার ঝাপটা সামলে ক্যামেরাবন্দি করা মুহূর্তগুলি আজীবন স্মৃতিতে থেকে যায়। কাছেই সুবর্ণরেখা ও কারকই নদীর মিলনস্থল। রয়েছে প্রায় ২০০০ বছরের পুরনো শিলালিপি সংরক্ষিত একটি মিউজিয়াম।

কোথায় থাকবেন

চান্ডিল ও টাটানগরে বেসরকারি হোটেল ও লজ রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে চক্রধরপুর এক্সপ্রেস বা টাটানগরগামী ট্রেন। চান্ডিল স্টেশন থেকে অটো বা গাড়িতে ড্যাম।


 উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতের দিনে জলাধারকেন্দ্রিক নৌবিহার মানেই শুধু ভ্রমণ নয়—এ এক ধরনের মানসিক প্রশান্তির ঠিকানা। নীল জলের দোল, হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া আর নরম রোদের উষ্ণতায় কয়েকটা দিন কাটালেই মনে হয়, শীত ছাড়া এমন অভিজ্ঞতা সত্যিই অসম্ভব। পাহাড় বা সমুদ্র নয়, এই শীতে একবার জলাধারের পথেই পা বাড়িয়ে দেখুন—ভ্রমণের সংজ্ঞা বদলে যেতে বাধ্য।

চারদিকে সারি সারি গাছগাছালি। কোথাও সবুজে মোড়া ছোট-বড় টিলা চোখে পড়ে, আবার কোথাও শীতের নরম রোদ এসে ঝিকমিকিয়ে তোলে বিস্তীর্ণ জলরাশি। নীল জলের বুকে কখনও দ্রুতগতির স্পিড বোট ছুটে চলে, আবার কোথাও ধীর লয়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে যায় শিকারা কিংবা সাধারণ নৌকা। জল, আকাশ আর সবুজের এমন সহাবস্থান মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এমন সুখানুভূতি কি শীত ছাড়া আদৌ সম্ভব?

news image
আরও খবর

শীতকাল মানেই ভ্রমণের আদর্শ সময়। বর্ষার মতো অতিবৃষ্টি নেই, গ্রীষ্মের মতো অসহনীয় গরমও নেই। তার উপর রয়েছে হালকা শীতের আমেজ, সকালের কুয়াশা আর দিনের বেলায় গায়ে মাখা নরম রোদ। এই সময়েই জলাধারকেন্দ্রিক ভ্রমণ সবচেয়ে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। নৌকায় ভেসে থাকা, জলের ধারে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা কিংবা জলাধারের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা—সব মিলিয়ে শীতের ভ্রমণ হয়ে ওঠে একেবারে আলাদা অভিজ্ঞতা।

পাহাড় বা সমুদ্রের ভিড় এড়িয়ে অনেকেই এখন খুঁজছেন শান্ত, নিরিবিলি অথচ মনোরম গন্তব্য। সেই চাহিদা পূরণ করে জলাধারগুলি। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে ছড়িয়ে থাকা একাধিক জলাধার শীতের দিনে হয়ে উঠছে ভ্রমণপিপাসুদের প্রথম পছন্দ। কাছেপিঠে হওয়ায় খুব বেশি ছুটির প্রয়োজন নেই। এক বা দুই দিনের মধ্যেই ঘুরে আসা যায়। পরিবার, বন্ধু কিংবা একা—সব ধরনের ভ্রমণেই জলাধার উপযুক্ত।

জলাধারকেন্দ্রিক ভ্রমণের আকর্ষণ

জলাধার মানেই শুধু বাঁধ বা জল জমার জায়গা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় জীবনযাপন। কোথাও জলাধার ঘিরে তৈরি হয়েছে পাহাড়ি পরিবেশ, কোথাও বনভূমি, আবার কোথাও প্রাচীন মন্দির বা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। নৌবিহারের সঙ্গে সঙ্গে তাই পাওয়া যায় নানা রকম অভিজ্ঞতা।

শীতের দিনে জলাধারে নৌবিহারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল আবহাওয়া। হালকা ঠান্ডা, পরিষ্কার আকাশ আর রোদের উষ্ণতা—এই পরিবেশে দীর্ঘ সময় নৌকায় বসে থাকলেও ক্লান্তি আসে না। জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়া মনকে সতেজ করে তোলে। অনেক জায়গায় শীতকালে জলস্তর কিছুটা কমে যায়, ফলে চারপাশের পাহাড়, টিলা বা বনভূমি আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এই কারণেই শীতের ভ্রমণসূচি সাজাতে জলাধারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করলে এক ঢিলে বহু পাখি মারা যায়—ভ্রমণও হয়, নৌবিহারও হয়, আবার প্রকৃতির সান্নিধ্যও মেলে।


মাইথন: স্বল্প ছুটিতে আদর্শ জলভ্রমণ

যাঁদের হাতে খুব বেশি ছুটি নেই, তাঁদের জন্য মাইথন হতে পারে একেবারে আদর্শ গন্তব্য। কলকাতা থেকে সকালের ট্রেন বা বাস ধরলে ঘণ্টা চার-পাঁচের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়। বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমানা লাগোয়া এই জলাধার আসানসোল হয়ে যেতে হয়। শীত পড়লেই এখানে পিকনিকের আমেজ জমে ওঠে।

মাইথন ড্যাম দমোদর নদীর উপর নির্মিত। বিশাল জলাধারকে ঘিরে রয়েছে ছোট-বড় টিলার সারি। এই টিলাগুলি জলাধারের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। শিকারায় কিংবা স্পিড বোটে চেপে জলাধার ঘোরার সুযোগ রয়েছে। জলের বুকে নৌকার দুলুনি আর চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে এক অপূর্ব অনুভূতি তৈরি হয়।

শীতের দিনে মাইথনের প্রকৃতি খানিক রুক্ষ হলেও আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম। সকালে হালকা ঠান্ডা, দুপুরে আরামদায়ক রোদ আর সন্ধ্যায় হিমেল বাতাস—এই ছন্দেই কাটে সময়। নৌবিহারের পাশাপাশি দেখে নেওয়া যায় কল্যাণেশ্বরী মন্দির। বহু পুরনো এই মন্দির স্থানীয় মানুষের কাছে যেমন পবিত্র, তেমনই পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়।

কোথায় থাকবেন

মাইথনের আশপাশে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। চাইলে আসানসোল শহরেও বিভিন্ন হোটেলে রাত্রিবাস করা যায়।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে আসানসোলগামী ট্রেন কিংবা ধর্মতলা থেকে বাস। আসানসোল থেকে বাস, অটো বা গাড়িতে মাইথন।


পাঞ্চেত ও গড় পঞ্চকোট: ইতিহাস, পাহাড় আর জলাধারের মেলবন্ধন

মাইথন থেকে খুব কাছেই পাঞ্চেত জলাধার। মাইথন ও পাঞ্চেতের দূরত্ব বড়জোর ২০ কিলোমিটার। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের সীমানায় দমোদর নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে পাঞ্চেত জলাধার। শীতকালে এখানে জলস্তর কিছুটা কম থাকে, তবে আবহাওয়া হয় অত্যন্ত মনোরম।

পাঞ্চেতের একটি বড় আকর্ষণ হল হাতে টানা নৌকা। এখানে স্পিড বোট বা যন্ত্রচালিত নৌকা না থাকলেও ধীর লয়ের নৌবিহারের আলাদা মজা রয়েছে। জলের ওপর দিয়ে ধীরে এগোতে এগোতে চারপাশের পাহাড় আর প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।

পাঞ্চেত পাহাড়ের পাদদেশেই রয়েছে গড় পঞ্চকোট—পঞ্চকোট রাজাদের প্রাচীন গড়ের ধ্বংসাবশেষ। অরণ্যঘেরা এই জায়গাটি ইতিহাসপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে সমান আকর্ষণীয়। ফাল্গুন-চৈত্রে যেখানে আগুনরঙা পলাশ চোখে পড়ে, শীতে সেখানে সবুজ আর শান্ত পরিবেশ মন কেড়ে নেয়। দিনের বেলা আবহাওয়া আরামদায়ক হলেও রাতে ভালোই ঠান্ডা পড়ে।

কোথায় থাকবেন

গড় পঞ্চকোটে পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের অতিথি আবাস ও একাধিক বেসরকারি হোটেল রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে কুমারডুবি, বরাকর বা আসানসোল স্টেশনে নেমে অটো বা গাড়িতে গড় পঞ্চকোট। দুই রাতের ভ্রমণসূচি হলে পাঞ্চেত ও মাইথন একসঙ্গে ঘোরা যায়।


মুকুটমণিপুর: বিশাল জলরাশি আর দীর্ঘ নৌবিহার

বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুর ড্যাম পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় জলাধার। কংসাবতী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি এই জলাধার এতটাই বিশাল যে এক কূল থেকে অন্য কূল চোখে পড়ে না। প্রায় ১১.২৭ কিলোমিটার জুড়ে এর বিস্তৃতি।

বর্ষায় এর রূপ আলাদা হলেও শীতই মুকুটমণিপুর ভ্রমণের আদর্শ সময়। যন্ত্রচালিত নৌকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। নৌবিহারের সময় আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি দেখে নেওয়া যায়—পরেশনাথ শিব মন্দির, ডিয়ার পার্ক, কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থল, মুসাফির আনা ভিউ পয়েন্ট।

নৌকা ছাড়াও ই-রিকশা বা টোটো করে ঘুরে নেওয়া যায়। দুই ধরনের ভ্রমণেই মুকুটমণিপুরের আলাদা আলাদা সৌন্দর্য ধরা পড়ে।

কোথায় থাকবেন

ড্যামের কাছেই সরকারি যুব আবাস, অতিথিশালা ও বেসরকারি হোটেল রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া, শালিমার বা সাঁতরাগাছি থেকে বাঁকুড়াগামী ট্রেন। বাঁকুড়া থেকে বাস বা গাড়িতে মুকুটমণিপুর।


তালবেড়িয়া ড্যাম (ঝিলিমিলি): নিরিবিলি পাহাড়ি স্বাদ

বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ব্লকের ঝিলিমিলিতে অবস্থিত তালবেড়িয়া ড্যাম দেখলে মনে হয় পাহাড়ি কোনও হ্রদ। চারপাশে শাল-সেগুনের জঙ্গল, স্বচ্ছ পরিষ্কার জল আর নিরিবিলি পরিবেশ—সব মিলিয়ে জায়গাটি মন ভালো করে দেয়।

জলাধারটি আকারে খুব বড় না হলেও এর সৌন্দর্য আলাদা। শীতের বিশেষ ছুটির দিন ছাড়া এখানে ভিড় খুব বেশি হয় না। নৌকায় ভেসে থাকার সময় শহরের কোলাহল একেবারে ভুলে যাওয়া যায়।

ঝিলিমিলি থেকে বেলপাহাড়ি, মুকুটমণিপুর, সুতানের জঙ্গল—এই সব জায়গা সহজেই ঘোরা যায়। হাতে দুই-তিন দিন সময় থাকলে এই অঞ্চল জুড়ে সুন্দর ভ্রমণসূচি তৈরি করা সম্ভব।

কোথায় থাকবেন

ঝিলিমিলি ও রানিবাঁধে একাধিক হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

ব্যক্তিগত গাড়িতে সড়কপথে যাওয়া যায়। ধর্মতলা থেকে বাস, অথবা ট্রেনে ঝাড়গ্রাম পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া সম্ভব।


চান্ডিল: স্পিড বোট, পাহাড় আর ইতিহাস

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে হলেও শীতের জলাধার ভ্রমণের তালিকায় চান্ডিলের নাম না থাকলে তালিকা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা-খারসোয়ান জেলার চান্ডিল ব্লকে সুবর্ণরেখা নদীর উপর অবস্থিত চান্ডিল বাঁধ। জলাধার থেকে দেখা যায় দলমা পাহাড়ের দৃশ্য।

পড়ন্ত বিকেলে স্পিড বোটে চেপে বিশাল জলাধারের বুকে ছুটে চলা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। জল-হাওয়ার ঝাপটা সামলে ক্যামেরাবন্দি করা মুহূর্তগুলি আজীবন স্মৃতিতে থেকে যায়। কাছেই সুবর্ণরেখা ও কারকই নদীর মিলনস্থল। রয়েছে প্রায় ২০০০ বছরের পুরনো শিলালিপি সংরক্ষিত একটি মিউজিয়াম।

কোথায় থাকবেন

চান্ডিল ও টাটানগরে বেসরকারি হোটেল ও লজ রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন

হাওড়া থেকে চক্রধরপুর এক্সপ্রেস বা টাটানগরগামী ট্রেন। চান্ডিল স্টেশন থেকে অটো বা গাড়িতে ড্যাম।


উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতের দিনে জলাধারকেন্দ্রিক নৌবিহার মানেই শুধু ভ্রমণ নয়—এ এক ধরনের মানসিক প্রশান্তির ঠিকানা। নীল জলের দোল, হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া আর নরম রোদের উষ্ণতায় কয়েকটা দিন কাটালেই মনে হয়, শীত ছাড়া এমন অভিজ্ঞতা সত্যিই অসম্ভব। পাহাড় বা সমুদ্র নয়, এই শীতে একবার জলাধারের পথেই পা বাড়িয়ে দেখুন—ভ্রমণের সংজ্ঞা বদলে যেতে বাধ্য।

Preview image