Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

যাদবপুরে হকার উচ্ছেদ ঘিরে উত্তেজনা, পুলিশ-বাম-কংগ্রেস কর্মীদের খণ্ডযুদ্ধ

যাদবপুরে হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। উচ্ছেদ অভিযানের বিরোধিতা করে বাম ও কংগ্রেস কর্মীরা প্রতিবাদে নামলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধস্তাধস্তি ও খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

যাদবপুরে হকার উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল এলাকা। যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন ২১২ বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া এলাকায় হকার উচ্ছেদের আশঙ্কা ঘিরে রবিবার সন্ধ্যার পর থেকেই উত্তেজনা ছড়ায় বলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে। ঘটনাস্থলের কাছে বুলডোজার রাখা ছিল এবং কলকাতা পুলিশ, রেল পুলিশ ও বাহিনী মোতায়েন ছিল বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে বাম ও কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকরা। তাঁদের দাবি, হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা উচিত নয়। অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে বেআইনি দোকান ও নির্মাণ সরানোর প্রক্রিয়া চালানো হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি, বচসা এবং পরে লাঠিচার্জের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং সিপিএম নেতা সৃজন ভট্টাচার্য-সহ কয়েকজনকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

যাদবপুরের মতো ব্যস্ত এলাকায় হকার উচ্ছেদ শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি বহু মানুষের রুটি-রুজির সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি সংবেদনশীল বিষয়। স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে বহু ছোট ব্যবসায়ী, খাবারের দোকানদার, চা বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা, বই ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রেতা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তাঁদের অনেকের দাবি, হঠাৎ উচ্ছেদ হলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার খবর ছড়াতেই এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় হকার উচ্ছেদের প্রস্তুতি ঘিরে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, পর্যাপ্ত সময়, লিখিত নোটিস বা পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা ছাড়া এমন অভিযান হলে বহু পরিবার বিপাকে পড়বে। হকারদের বক্তব্য, তাঁরা বেআইনি দখলদার নন, বরং দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, প্রশাসন চাইলে রাস্তা পরিষ্কার রাখতে পারে, যান চলাচলের সুবিধা করতে পারে, কিন্তু তার আগে হকারদের জন্য বিকল্প জায়গা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা দরকার।

বাম ও কংগ্রেস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উচ্ছেদ অভিযানের বিরোধিতা করেন। তাঁদের অভিযোগ, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়ার আগে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। প্রতিবাদকারীদের একাংশ বুলডোজারের সামনে অবস্থান করেন, কেউ কেউ রাস্তার ধারে বিক্ষোভ দেখান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁদের উপর বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। যদিও প্রশাসনের তরফে সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তিই সামনে আনা হয়।

এই ঘটনায় যাদবপুর স্টেশন চত্বর এবং ২১২ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। অফিসফেরত মানুষ, যাত্রী, স্থানীয় দোকানদার এবং পথচারীরা আচমকা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। অনেকেই নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। এলাকায় যান চলাচলেও প্রভাব পড়ে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের ফলে গোটা এলাকা কার্যত নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে যায়।

হকার উচ্ছেদ নিয়ে কলকাতায় এর আগেও বারবার বিতর্ক হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, স্টেশন, বাজার ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রশ্নে প্রশাসনিক অভিযান যেমন জরুরি বলে অনেকেই মনে করেন, তেমনই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরোধিতাও দীর্ঘদিনের দাবি। শহর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে ফুটপাত পথচারীদের জন্য খোলা রাখা দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে হকার অর্থনীতি কলকাতার নগরজীবনের একটি বড় অংশ। কম দামে খাবার, দৈনন্দিন সামগ্রী এবং ছোটখাটো পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও হকাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

যাদবপুরের ঘটনায় এই দুই বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে। একদিকে আইন, রাস্তা, জনপরিসর ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন; অন্যদিকে জীবিকা, পুনর্বাসন, মানবিকতা এবং দরিদ্র মানুষের অধিকার। এই দ্বন্দ্বের কারণেই হকার উচ্ছেদ অভিযান প্রায়শই শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়।

প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য, আগে আলোচনা হোক, বিকল্প ব্যবস্থা হোক, তারপর প্রশাসন পদক্ষেপ করুক। তাঁদের দাবি, রাতারাতি দোকান ভেঙে দিলে হকারদের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকেও বড়। অনেক হকারের দোকানই তাঁদের একমাত্র আয়ের উৎস। দোকান ভেঙে গেলে শুধু ব্যবসায়ী নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যরাও বিপদের মুখে পড়েন। সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি, চিকিৎসার খরচ—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে যায়।

news image
আরও খবর

অন্যদিকে উচ্ছেদের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। যাত্রী ও পথচারীদের একাংশের অভিযোগ, স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত দোকানপাটের কারণে চলাচলে অসুবিধা হয়। আগুন লাগা, দুর্ঘটনা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যানজট এবং নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে আসে। প্রশাসনের কাজ হল জনপরিসরকে সুরক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখা। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই কাজ কীভাবে করা হবে? হঠাৎ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে, নাকি আলোচনার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে?

যাদবপুরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে আলোচনার বদলে বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতি ঘটনাকে আরও আলোচিত করে তোলে। বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, হকারদের পাশে দাঁড়ানো তাঁদের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। তাঁদের বক্তব্য, উন্নয়নের নামে গরিব মানুষের জীবিকা কেড়ে নেওয়া চলতে পারে না।

এই ঘটনায় স্থানীয় মানুষও বিভক্ত মত প্রকাশ করছেন। কেউ বলছেন, হকারদের জন্য চলাচলে সমস্যা হয়, তাই নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আবার কেউ বলছেন, উচ্ছেদ করার আগে পুনর্বাসন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। যাঁরা প্রতিদিন এই দোকানগুলির উপর নির্ভর করেন, তাঁদের কাছেও বিষয়টি সংবেদনশীল। অনেক সাধারণ মানুষ কম দামে খাবার, চা, জলখাবার, ফল, বই বা অন্য সামগ্রী কিনতে এই হকারদের উপর নির্ভর করেন।

রাজনৈতিক মহলেও যাদবপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির দাবি, প্রশাসনের পদক্ষেপে মানবিকতার অভাব রয়েছে। তারা বলছে, হকারদের সঙ্গে আলোচনা না করে উচ্ছেদ করলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেআইনি দখল সরানো এবং জনপরিসর মুক্ত করার যুক্তি তুলে ধরা হতে পারে। ফলে ঘটনাটি আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিতে পারে।

এই ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্বচ্ছতা। কারা প্রকৃত হকার, কারা বেআইনি নির্মাণ করেছেন, কারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন, কাদের পুনর্বাসনের অধিকার রয়েছে—এসব প্রশ্ন পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। শুধু বুলডোজার চালিয়ে দোকান ভাঙলে সাময়িকভাবে এলাকা খালি হতে পারে, কিন্তু জীবিকা হারানো মানুষের সমস্যা থেকে যায়। আবার নিয়মহীনভাবে ফুটপাত দখল চলতে দিলে জনসাধারণের অসুবিধাও বাড়ে।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, হকার সমস্যার সমাধানে দরকার পরিকল্পিত নীতি। হকারদের তালিকা তৈরি, নির্দিষ্ট জোন চিহ্নিত করা, ফুটপাতের একটি অংশ পথচারীদের জন্য বাধামুক্ত রাখা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা এবং নিয়মিত লাইসেন্স বা পরিচয়পত্র দেওয়া—এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে হকারদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে শহরের শৃঙ্খলাও বজায় থাকবে।

যাদবপুরের ঘটনায় পুনর্বাসনের প্রশ্ন সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। উচ্ছেদ যদি করতেই হয়, তবে আগে বিকল্প জায়গা বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকা উচিত—এমন দাবি উঠছে। বিশেষ করে যাঁরা বহু বছর ধরে ওই এলাকায় ব্যবসা করছেন, তাঁদের হঠাৎ সরিয়ে দিলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করে।

ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। তবে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক হকার এখনও আশঙ্কায় রয়েছেন যে আবারও অভিযান হতে পারে। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।

এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ। প্রতিবাদকারীদের একাংশ দাবি করেছেন, পুনর্বাসন বা আইনি বিষয় নিষ্পত্তির আগে উচ্ছেদ করা ঠিক নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাম নেতাদের বক্তব্যে আদালতের নির্দেশ ও পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানতে প্রশাসন, রেল কর্তৃপক্ষ এবং আদালত-সংক্রান্ত নথি যাচাই করা জরুরি।

Preview image