শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও উদ্যোগের ফলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ক্রমশ বাড়ছে। তাঁর মতে, এই ইতিবাচক পরিবর্তন আগামী দিনে শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অভিভাবকদের আস্থা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে দাবি করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষা পরিকাঠামো, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষাদানের পদ্ধতি, প্রশাসনিক নজরদারি এবং পড়ুয়াদের সার্বিক বিকাশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে যে সমস্ত পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকেরা শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে নতুন করে মূল্যায়ন করছেন বলে তাঁর মত।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, কোনও রাজ্য বা দেশের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হল শিক্ষা। শিক্ষার মান শক্তিশালী না হলে শুধু অর্থনৈতিক বা পরিকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য তৈরি করে না, বরং তাদের আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। সেই কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে মানুষের বিশ্বাস ও অভিভাবকদের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকেরা যখন বিদ্যালয়, শিক্ষক এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উপর ভরসা করতে পারেন, তখন তাঁরা সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে আরও সক্রিয় হন। বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, সন্তানের উপস্থিতির দিকে নজর দেওয়া, পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। ফলে বিদ্যালয়, শিক্ষক, পড়ুয়া এবং পরিবারের মধ্যে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে এই পারস্পরিক বিশ্বাসের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু সরকার বা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমেই শিক্ষা ক্ষেত্রে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব। সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ এই সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে সহায়তা করছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
বর্তমান সময়ে অভিভাবকেরা শুধু সন্তানকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখছেন না। তাঁরা জানতে চান বিদ্যালয়ে কীভাবে পড়ানো হচ্ছে, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না, পরীক্ষার ফলাফল কেমন হচ্ছে, সন্তান দুর্বল হলে তাকে আলাদাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে কি না এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কি না।
পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার, কম্পিউটার শিক্ষা, ভাষাগত দক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সাধারণ জ্ঞান এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। অভিভাবকেরা চান তাঁদের সন্তান শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন না করে বাস্তব জীবনের সমস্যার মোকাবিলা করার দক্ষতাও অর্জন করুক।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, শিক্ষাব্যবস্থাকে এই পরিবর্তিত প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে পারলে মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অভিভাবকদের বিশ্বাস অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
শিক্ষার মান শুধু পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে না। একটি বিদ্যালয়ের পরিবেশও পড়ুয়াদের শেখার আগ্রহ, মানসিক বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাসের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরাপদ পানীয় জল, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার, খেলার মাঠ, গ্রন্থাগার এবং বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের মতো পরিকাঠামো শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করে তুলতে পারে।
বিদ্যালয়ের পরিবেশ নিরাপদ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ হলে পড়ুয়ারা নিজেদের সমস্যা শিক্ষককে জানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে মানসিক নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অসুবিধা অথবা সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সংবেদনশীল ভূমিকা শিক্ষার্থীদের পুনরায় মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষা পরিকাঠামো উন্নত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সন্তান বিদ্যালয়ে গিয়ে নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করছে—এই বিশ্বাস তৈরি হওয়া অভিভাবকদের আস্থা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শর্ত।
শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিক্ষকরা। উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি অথবা নতুন পাঠ্যক্রম থাকলেও দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং মানবিক শিক্ষক ছাড়া প্রকৃত শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি পড়ুয়াদের প্রশ্ন করতে শেখান, চিন্তা করতে উৎসাহ দেন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সাহস জোগান।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, শিক্ষক সমাজের মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পঠনপাঠন, সময়ানুবর্তিতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকরা যখন আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ান, তখন অভিভাবকদের মধ্যে বিদ্যালয়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আস্থা তৈরি হয়।
অভিভাবক-শিক্ষক বৈঠক নিয়মিত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের বৈঠকের মাধ্যমে সন্তানের পড়াশোনা, আচরণ, উপস্থিতি, দুর্বলতা এবং বিশেষ প্রতিভা সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত করা যায়। একই সঙ্গে অভিভাবকেরাও সন্তানের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার কথা শিক্ষককে জানাতে পারেন। এর ফলে পড়ুয়াকে কেন্দ্র করে একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে ওঠে।
শুধু বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা বিচার করা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, মৌখিক পরীক্ষা, দলগত আলোচনা এবং ব্যবহারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পড়ুয়াদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
কোনও শিক্ষার্থী গণিত, ভাষা বা বিজ্ঞানের কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বল হলে তার জন্য আলাদা সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় একটি ছোট দুর্বলতা ধীরে ধীরে বড় শিক্ষাগত ব্যবধানে পরিণত হতে পারে। অভিভাবকেরা যখন দেখেন বিদ্যালয় তাঁদের সন্তানের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সাহায্য করছে, তখন শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি তাঁদের বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুসারে, শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক পড়ুয়ার দিকে আলাদাভাবে নজর দেওয়া দরকার। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদেরও পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা তখনই সফল হবে, যখন কোনও পড়ুয়া আর্থিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী, শিক্ষামূলক ভিডিও, ভার্চুয়াল পরীক্ষাগার এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কঠিন বিষয়গুলিকেও সহজভাবে বোঝানো সম্ভব। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শুধু শহর বা নির্দিষ্ট কিছু বিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী এখনও পর্যাপ্ত ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস বা ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ পায় না। এই বৈষম্য দূর করা শিক্ষাক্ষেত্রের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি বই, শিক্ষক এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বও বজায় রাখতে হবে।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা গেলে পড়ুয়ারা আরও ভালোভাবে বিষয় বুঝতে পারবে। একই সঙ্গে অভিভাবকেরাও সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেতে পারেন। উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল এবং বিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি ডিজিটাল মাধ্যমে জানানো হলে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যালয়ের অর্থব্যবস্থা, পরিকাঠামোগত প্রকল্প, শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা দরকার।
কোনও অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষের বিশ্বাস বাড়ে। বিপরীতে দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম বা তথ্য গোপনের অভিযোগ শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
অভিভাবকেরা যেন সহজেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দপ্তরের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। অভিযোগ জানানোর পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিও অভিযোগকারীকে জানানো উচিত। এই প্রক্রিয়া বিদ্যালয় এবং অভিভাবকদের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে পারে।
বিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিদ্যালয় ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং সুরক্ষিত যাতায়াত ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
এছাড়া বুলিং, শারীরিক শাস্তি, মানসিক নির্যাতন, লিঙ্গবৈষম্য এবং অনলাইন হয়রানির মতো সমস্যার বিরুদ্ধেও বিদ্যালয়কে সতর্ক থাকতে হবে। পড়ুয়ারা যেন ভয় ছাড়াই নিজেদের সমস্যা জানাতে পারে, তার জন্য পরামর্শদান বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, সন্তান বিদ্যালয়ে নিরাপদ রয়েছে—এই নিশ্চয়তা অভিভাবকদের আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পড়ুয়াদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনওরকম আপস করা উচিত নয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, অভিভাবক এবং প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা তৈরি করা নয়। একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরি করাও শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
পরীক্ষার ফল ভালো হলেও যদি একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ তৈরি না হয়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং দলগত প্রকল্পের মাধ্যমে পড়ুয়াদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ দেওয়া দরকার।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মকে শুধু প্রতিযোগিতার জন্য নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে তৈরি করতে হবে।
শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় প্রশ্ন। অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পরেও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে সমস্যায় পড়েন। তাই বিদ্যালয় স্তর থেকেই যোগাযোগ দক্ষতা, কম্পিউটার শিক্ষা, আর্থিক সচেতনতা, সমস্যা সমাধান এবং দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
বিভিন্ন কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো হলে পড়ুয়ারা নিজেদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ পেশা নির্বাচন করতে পারবে। সব শিক্ষার্থীকে একই ধরনের পেশার দিকে ঠেলে না দিয়ে বহুমুখী কর্মজীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, শিক্ষাকে বাস্তব জীবন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে অভিভাবকদের আস্থা আরও বাড়বে। তাঁরা বুঝতে পারবেন যে বিদ্যালয়ের শিক্ষা সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবনে সরাসরি কাজে লাগছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে শহর এবং গ্রামের মধ্যে সুযোগের ব্যবধান নিয়ে আলোচনা চলছে। শহরের বহু বিদ্যালয়ে উন্নত পরিকাঠামো, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, পরীক্ষাগার এবং প্রযুক্তিগত সুযোগ থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বিদ্যালয় এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি।
এই ব্যবধান দূর না হলে সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক, নিয়মিত পরিদর্শন, পরিবহণ ব্যবস্থা, ডিজিটাল সুবিধা এবং শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া দরকার। পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা বুঝে শিক্ষার পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, শিক্ষাক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে আরও বেশি আস্থা তৈরি হবে। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান বা পরিবারের আর্থিক অবস্থার উপর নির্ভর করা উচিত নয়।
অনেক পরিবারের কাছে সন্তানকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো একটি আর্থিক চ্যালেঞ্জ। বই, পোশাক, যাতায়াত, অতিরিক্ত পড়াশোনা এবং অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর খরচ বহন করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হতে পারে। এই কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ছুট হয়ে পড়ে বা অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়।
আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের পড়ুয়াদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষাসামগ্রী, পুষ্টিকর খাদ্য এবং অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া দরকার। কোনও প্রকল্পের ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত উপভোক্তার কাছে সুবিধা পৌঁছচ্ছে কি না, তার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা শিশুর কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। দরিদ্র পরিবারের সন্তান ভালো শিক্ষা পেলে শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের উন্নয়ন সম্ভব হয়।
শিশু ও কিশোরদের বিদ্যালয়ছুট হওয়া শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুতর সমস্যা। আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা, অল্প বয়সে বিয়ে, শিশুশ্রম, পড়াশোনায় দুর্বলতা এবং বিদ্যালয়ে অনাগ্রহের কারণে অনেক পড়ুয়া মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
বিদ্যালয়ের উপস্থিতির তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা উচিত। শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে সেই শিক্ষার্থীকে পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি বিদ্যালয়ছুট শিশুকে শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও শিশুকে হারিয়ে যেতে দিলে ভবিষ্যতে তার সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবকদের আস্থা বাড়াতে হলে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। বিদ্যালয় পরিচালন সমিতি, অভিভাবক সভা এবং সামাজিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিবারের প্রতিনিধিরা বিদ্যালয়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে মতামত দিতে পারেন।
তবে অংশগ্রহণ যেন শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অভিভাবকদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব বাস্তবায়নের চেষ্টা করা দরকার। এতে বিদ্যালয়ের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ এবং মালিকানার অনুভূতি বাড়ে।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে দূরত্ব কমানো গেলে শিক্ষার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। সন্তানকে ঘিরে শিক্ষক এবং অভিভাবক একই লক্ষ্যে কাজ করলে পড়ুয়ার সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ে।
বর্তমানে পরীক্ষার নম্বর নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক চাপ দেখা যায়। ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই কোনও শিশুর সামগ্রিক যোগ্যতার একমাত্র পরিচয় নয়। একজন শিক্ষার্থী খেলাধুলা, সংগীত, ছবি আঁকা, অভিনয়, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব বা সামাজিক কাজে বিশেষ দক্ষ হতে পারে।
বিদ্যালয়ের দায়িত্ব হল পড়ুয়াদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিভা চিহ্নিত করা এবং বিকাশের সুযোগ দেওয়া। শুধুমাত্র নম্বরের ভিত্তিতে তুলনা করলে অনেক শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারে।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষা এমন হওয়া উচিত যাতে পড়ুয়ারা নিজেদের প্রতিভা আবিষ্কার করতে পারে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতা, পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক পড়ুয়া মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে।
বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা পরামর্শদাতার ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাবে। শিক্ষক এবং অভিভাবকদেরও শিশু-কিশোরদের মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।
সন্তান বিদ্যালয়ে শুধু পড়াশোনা নয়, মানসিক সহায়তাও পাচ্ছে—এমন ধারণা অভিভাবকদের আস্থা বাড়াতে পারে। শুভেন্দু অধিকারীর মতে, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত না করে প্রকৃত শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
বিদ্যালয় শিক্ষার পর শিক্ষার্থীরা কোন বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা করবে, কোথায় ভর্তি হবে অথবা কোন পেশায় যেতে পারে—এই প্রশ্নে অনেক পরিবার বিভ্রান্ত থাকে। বিদ্যালয় স্তরে কর্মজীবন সংক্রান্ত পরামর্শ বা ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে পড়ুয়ারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
বিভিন্ন শিক্ষাক্রম, প্রবেশিকা পরীক্ষা, বৃত্তি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া দরকার। বিশেষ করে প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পরিবারের কাছে এই ধরনের তথ্য সহজে পৌঁছায় না।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিতে হবে। এতে অভিভাবকেরা বিদ্যালয়কে শুধু পাঠদানের কেন্দ্র নয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সহযোগী হিসেবে দেখবেন।
শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিলেও সেই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী করা বড় চ্যালেঞ্জ। কোনও উদ্যোগ সাময়িকভাবে শুরু হলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ না থাকলে তার সুফল টেকসই হয় না।
শিক্ষার ক্ষেত্রে নীতির ধারাবাহিকতা জরুরি। প্রশাসনিক পরিবর্তন বা রাজনৈতিক মতভেদের কারণে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা উচিত। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৈরি করতে হবে।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, অভিভাবকদের মধ্যে যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে, তা ধরে রাখতে হলে বাস্তব কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। শুধু প্রচার বা ঘোষণা নয়, প্রতিটি পদক্ষেপের বাস্তব ফল বিদ্যালয় এবং পড়ুয়াদের জীবনে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।