গলের দুর্গ ভেঙে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের লক্ষ্য স্পষ্ট করলেন ভারত অধিনায়ক শুভমন গিল।
গলের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দুরন্ত জয় দিয়ে নতুন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ভারতীয় টেস্ট দল। শ্রীলঙ্কার অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গলে প্রথম টেস্টে স্বাগতিকদের ১৬৫ রানের বড় ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজে দাপুটে সূচনা করল ভারত। পাঁচ দিনের লড়াইয়ের পর বুধবার ম্যাচের শেষ দিনে জয় নিশ্চিত করে শুভমন গিলের দল। তবে এই জয়কে শুধুমাত্র একটি টেস্ট ম্যাচের সাফল্য হিসেবে দেখছেন না ভারতীয় অধিনায়ক। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দলের সামনে আরও বড় লক্ষ্য রয়েছে—বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া।
শ্রীলঙ্কার মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জেতা কখনওই সহজ নয়। বিশেষ করে গলের উইকেটে স্বাগতিক স্পিনারদের মোকাবিলা করে ম্যাচের পাঁচ দিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যে কোনও সফরকারী দলের কাছেই কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গায় ভারত যেভাবে চাপ সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ১৬৫ রানে জয় তুলে নিয়েছে, তাতে দলের চরিত্র এবং মানসিক দৃঢ়তা দুটোই ফুটে উঠেছে।
ম্যাচের পর শুভমন গিলও সেই বিষয়টিই তুলে ধরেন। ভারতীয় অধিনায়ক জানান, টেস্ট ক্রিকেটে কোনও জয়ই সহজে আসে না। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে প্রতিটি সেশন গুরুত্বপূর্ণ এবং সামান্য ভুলেও ম্যাচের গতিপথ বদলে যেতে পারে। সেই কারণে গলের এই জয় তাঁর কাছে বিশেষ তৃপ্তির।
ভারতের জয় নিশ্চিত হওয়ার ঠিক পরেই গলে প্রবল বৃষ্টি নামে। পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে মাঠে স্বাভাবিকভাবে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আয়োজন করাও সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে অনুষ্ঠান সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় স্টেডিয়ামের ভিতরে। সেখানেই ম্যাচ নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান শুভমন।
ভারত অধিনায়কের কথায়, “বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠাই আসল লক্ষ্য। টেস্টে জয় সহজে পাওয়া যায় না। সে দিক থেকে এই জয় খুব তৃপ্তির। আবহাওয়ার কারণে চিন্তায় ছিলাম যে ম্যাচটা পুরো হবে কি না। দল দারুণ ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”
শুভমনের এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, ভারতের নজর শুধুমাত্র শ্রীলঙ্কা সিরিজ জেতার দিকে নয়। প্রতিটি টেস্ট ম্যাচ থেকে যত বেশি সম্ভব পয়েন্ট সংগ্রহ করে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই টিম ম্যানেজমেন্টের প্রধান লক্ষ্য।
বর্তমান টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পাশাপাশি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়েছে। প্রতিটি ম্যাচের ফল সরাসরি WTC পয়েন্ট টেবিলে প্রভাব ফেলে। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট ভুলও দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে দলের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। সেই কারণে গলের মতো কঠিন ভেন্যুতে পাওয়া জয় ভারতের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
এই ম্যাচে ভারতের সাফল্যের নেপথ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির মধ্যে অন্যতম মানব সুতার। দুই ইনিংস মিলিয়ে তিনি তুলে নিয়েছেন মোট ১০টি উইকেট। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর বোলিং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কয়েক বলের ব্যবধানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে তিনি কার্যত স্বাগতিক ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন।
একটা সময় পর্যন্ত ম্যাচে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল শ্রীলঙ্কা। লক্ষ্য কঠিন হলেও উইকেট হাতে থাকায় ভারতের শিবিরে কিছুটা চাপ ছিল। তার উপর আকাশের পরিস্থিতিও ভারতীয় দলকে চিন্তায় রেখেছিল। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে ম্যাচের পর্যাপ্ত ওভার খেলা সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নও ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের দরকার ছিল দ্রুত উইকেট।
ঠিক সেই সময় ম্যাচে নিজের ছাপ রাখেন সুতার।
শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা যখন ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন ধারাবাহিকভাবে সঠিক জায়গায় বল রেখে তাঁদের ভুল করতে বাধ্য করেন ভারতীয় স্পিনার। কয়েক বলের মধ্যে চার উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কার প্রতিরোধ কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর ম্যাচ ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং শেষ পর্যন্ত শুভমনদের জয় আটকাতে পারেনি স্বাগতিক দল।
সুতারের পারফরম্যান্সে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত শুভমন গিল। তরুণ বোলারের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “অসাধারণ বল করছে। খুব প্রতিভাবান একজন বোলার। আমার মনে হয় দীর্ঘ দিন ভারতের হয়ে ও খেলবে।”
ভারত অধিনায়কের এই মন্তব্য সুতারের জন্য নিঃসন্দেহে বড় স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করতে তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়মিত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অধিনায়ক এবং টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থাও প্রয়োজন হয়। গল টেস্টে ১০ উইকেট নিয়ে সুতার সেই আস্থা অর্জনের পথে বড় পদক্ষেপ করলেন।
উপমহাদেশের উইকেটে ভারতের স্পিন বোলিং বরাবরই শক্তিশালী। তবে দেশের বাইরে বা প্রতিপক্ষের মাঠে স্পিনারদের কার্যকর হয়ে ওঠার জন্য উইকেটের প্রকৃতি দ্রুত বুঝে নেওয়া জরুরি। গলের পিচে সুতার যে নিয়ন্ত্রণ এবং ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা ভারতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্যও ইতিবাচক বার্তা।
শুধু উইকেট নেওয়াই নয়, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্রেকথ্রু এনে দেওয়ার ক্ষমতাই একজন ম্যাচ উইনার বোলারের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সুতার এই ম্যাচে সেটাই করে দেখিয়েছেন। তাঁর ১০ উইকেটের পারফরম্যান্স ভারতের এই জয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে, ব্যাট হাতে নজর কেড়েছেন দেবদত্ত পডিক্কল। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁকে অত্যন্ত প্রতিভাবান ব্যাটার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘরোয়া ক্রিকেট এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করার পর টেস্ট ক্রিকেটেও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছেন তিনি।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে গলের কঠিন পরিবেশে তাঁর ব্যাটিং ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টকে স্বস্তি দিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে শুধুমাত্র রান করাই যথেষ্ট নয়; কখনও পরিস্থিতি বুঝে ধৈর্য ধরে খেলতে হয়, কখনও আবার প্রতিপক্ষের উপর পাল্টা চাপ তৈরি করতে হয়। পডিক্কল সেই পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
শুভমন গিলও তাঁর পারফরম্যান্সে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ভারতের টেস্ট দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তরুণ ক্রিকেটারদের গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা এই ম্যাচ থেকেই স্পষ্ট। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখাটা ভারতীয় দলের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
এই ম্যাচে ভারতের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত দলগতভাবে চাপ সামলানোর ক্ষমতা। পাঁচ দিনের টেস্টে ম্যাচের পরিস্থিতি একাধিকবার বদলেছে। কখনও ভারত এগিয়ে থেকেছে, কখনও শ্রীলঙ্কা পাল্টা চাপ তৈরি করেছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারত প্রতিপক্ষকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয়নি।
টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যই হল, এখানে একটি ভালো সেশন যেমন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, তেমনই একটি খারাপ সেশনও সমস্ত পরিকল্পনা নষ্ট করে দিতে পারে। শুভমনের দল সেই জায়গায় নিজেদের স্থির রেখেছে।
বিশেষ করে পঞ্চম দিনের ক্রিকেটে চাপের মাত্রা সবসময়ই বেশি থাকে। একদিকে প্রতিপক্ষ ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টা করে, অন্যদিকে বোলিং দল দ্রুত উইকেট নেওয়ার জন্য মরিয়া থাকে। তার সঙ্গে যদি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা যোগ হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
গলেও সেটাই হয়েছিল।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর বৃষ্টি যে ভাবে নেমেছে, তাতে কিছুটা আগে বৃষ্টি শুরু হলে ভারতের জয় পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারত। এই কারণেই শুভমন জানিয়েছেন, আবহাওয়া নিয়ে ভারতীয় শিবিরে চিন্তা ছিল।
দলের প্রয়োজন ছিল সময়ের মধ্যে শ্রীলঙ্কার বাকি উইকেট তুলে নেওয়া। সুতারের দুরন্ত স্পেল সেই চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
ভারতীয় অধিনায়কের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—দলের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব সময় পরিকল্পনামতো ম্যাচ এগোয় না। প্রতিপক্ষও পাল্টা আঘাত করে। সেই সময় দল কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটাই অনেক সময় ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে।
গল টেস্টে ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একাধিকবার কঠিন হয়েছে। কিন্তু দল হিসেবে তারা নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে যায়নি।
শুভমন গিলের অধিনায়কত্বের ক্ষেত্রেও এই ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় টেস্ট দলের নেতৃত্ব পাওয়া যেমন সম্মানের, তেমনই বিশাল দায়িত্বেরও। প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়। বোলিং পরিবর্তন থেকে ফিল্ড প্লেসমেন্ট, ব্যাটিং অর্ডার থেকে ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা—সবকিছুতেই অধিনায়কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
গলের মতো ভেন্যুতে জয় তাই শুভমনের অধিনায়কত্বের অধ্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তবে ভারতীয় অধিনায়ক ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে দলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকেই সামনে রাখছেন। তাঁর মন্তব্যে পরিষ্কার, এই জয় নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে চান না তিনি।
কারণ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে হলে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলতে হবে।
একটি বা দুটি ম্যাচ জিতলেই কাজ শেষ হবে না। ঘরের মাঠের সিরিজে যেমন পূর্ণ পয়েন্টের লক্ষ্য রাখতে হবে, তেমনই বিদেশের কঠিন সফরেও সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে এই জয় সেই দিক থেকে ভারতের জন্য দুর্দান্ত সূচনা।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতিটি সিরিজের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। আগে কোনও দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হারলেও পরবর্তী সিরিজে দল নতুনভাবে শুরু করতে পারত। এখন প্রত্যেকটি ফলের সঙ্গে পয়েন্ট টেবিলের হিসাব জড়িয়ে রয়েছে।
এই বাস্তবতা ভারতীয় দলের কাছেও অজানা নয়।
তাই শুভমন যখন বলেন WTC ফাইনালই তাঁদের আসল লক্ষ্য, তখন সেটি শুধুমাত্র ম্যাচ-পরবর্তী একটি সাধারণ মন্তব্য নয়। এর মধ্যে ভারতের বর্তমান টেস্ট পরিকল্পনার দিকনির্দেশও লুকিয়ে রয়েছে।
টিম ইন্ডিয়া সম্ভবত এখন প্রতিটি সিরিজকে আলাদাভাবে দেখলেও সামগ্রিক লক্ষ্য হিসেবে WTC ফাইনালকে সামনে রেখেই এগোচ্ছে।
আর সেই দীর্ঘ যাত্রায় গলের এই ১৬৫ রানের জয় বড় ভূমিকা নিতে পারে।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভারতের টেস্ট ইতিহাসে বিদেশের মাটিতে জয় সবসময়ই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শ্রীলঙ্কার কন্ডিশনে দ্রুত মানিয়ে নিতে হয়। বিশেষ করে গলের উইকেট সাধারণত ম্যাচ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে স্পিনারদের সাহায্য করতে শুরু করে। ব্যাটারদের জন্য বলের টার্ন, বাউন্স এবং পিচের গতি বুঝে খেলা কঠিন হয়ে ওঠে।
সেই পরিস্থিতিতে প্রথমে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা এবং পরে বোলারদের দিয়ে ম্যাচ শেষ করানো—ভারত পরিকল্পনামাফিক কাজ করেছে।
এই ম্যাচে তরুণ ক্রিকেটারদের সাফল্য ভারতের জন্য আরও একটি বড় প্রাপ্তি।
ভারতের টেস্ট দলে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী বেঞ্চ স্ট্রেংথ তৈরির চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচিতে একই দল দিয়ে প্রতিটি সিরিজ খেলা প্রায় অসম্ভব। চোট, বিশ্রাম এবং ফর্মের কারণে নিয়মিত নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে হয়।
সুতার এবং পডিক্কলের মতো ক্রিকেটাররা যদি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে দল নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের হাতে আরও বেশি বিকল্প থাকবে।
বিশেষ করে স্পিন বিভাগে নতুন ম্যাচ উইনার তৈরি হওয়া ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সুতারের এই ১০ উইকেটের পারফরম্যান্স তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকেও ভবিষ্যতের ম্যাচে তাঁর বিরুদ্ধে আলাদা পরিকল্পনা করতে বাধ্য করবে।
একজন তরুণ বোলারের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর চেয়ে ভালো বার্তা আর কী হতে পারে?
অন্যদিকে পডিক্কলের পারফরম্যান্স ভারতের ব্যাটিং বিভাগেও প্রতিযোগিতা বাড়াবে। টেস্ট দলে জায়গা ধরে রাখতে হলে ধারাবাহিক রান করা প্রয়োজন। তাঁর সামনে এখনও দীর্ঘ পথ রয়েছে, তবে শ্রীলঙ্কার মাটিতে ভালো পারফরম্যান্স তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য আত্মবিশ্বাস দেবে।
ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এই অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ইতিবাচক।
কারণ কোনও খেলোয়াড় যদি জানেন তাঁর জায়গার জন্য আরও একাধিক যোগ্য ক্রিকেটার অপেক্ষা করছেন, তাহলে নিজের পারফরম্যান্স ধরে রাখার চাপও বাড়ে। ফলস্বরূপ দলের সামগ্রিক মান উন্নত হয়।
গল টেস্টের ফল আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—ভারত এখন বিদেশের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
এক সময় উপমহাদেশের বাইরে বা এমনকি প্রতিবেশী দেশের কঠিন উইকেটে ভারতের জয়ের জন্য মূলত কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের উপর নির্ভর করতে হত। বর্তমান দলের ক্ষেত্রে দায়িত্ব অনেক বেশি ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
কখনও ব্যাটাররা ম্যাচ জেতাচ্ছেন, কখনও পেসাররা, আবার কখনও স্পিনাররা।
এই ম্যাচে মানব সুতারের দুরন্ত বোলিং তারই উদাহরণ।
শুভমন গিলের অধিনায়কত্বেও সম্ভবত এই দলগত সংস্কৃতির উপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মন্তব্যে কোনও একজনকে কেন্দ্র করে জয় ব্যাখ্যা করার প্রবণতা নেই। বরং তিনি দল কীভাবে কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
একজন অধিনায়কের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিকতা।
কারণ দীর্ঘ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রতিটি ম্যাচে একই ক্রিকেটার নায়ক হবেন না। কোনওদিন একজন ব্যাটার ম্যাচ বাঁচাবেন, অন্যদিন বোলার ম্যাচ জেতাবেন। দলগত সাফল্যের জন্য প্রত্যেক ক্রিকেটারের নিজের দায়িত্ব বোঝা প্রয়োজন।
গলের জয় সেই দিক থেকেই ভারতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
শ্রীলঙ্কার দিক থেকে দেখলে এই হার অবশ্যই হতাশার। ঘরের মাঠে ১৬৫ রানের ব্যবধানে হার স্বাগতিক দলের জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে ম্যাচে বিভিন্ন সময়ে সুযোগ তৈরি করার পরও তা কাজে লাগাতে না পারা তাদের ভাবাবে।
ভারতের বোলারদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে আরও বেশি ধৈর্য দেখানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একবার উইকেট পড়তে শুরু করার পর শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং দ্রুত ভেঙে পড়ে।
ভারত সেই দুর্বল মুহূর্তটিই কাজে লাগিয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেটে অনেক সময় একটি ছোট পর্যায়ের চাপ পুরো ইনিংসকে ধসিয়ে দিতে পারে। সুতারের কয়েক বলের ব্যবধানে চারটি উইকেট তুলে নেওয়ার ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
শ্রীলঙ্কা যখন ম্যাচ বাঁচানোর আশায় ছিল, তখন আচমকাই একের পর এক উইকেট হারিয়ে সেই আশা শেষ হয়ে যায়।