ভারতের শেয়ারবাজারে রাতারাতি বড় পরিবর্তন - Gift Nifty থেকে ইউক্রেন শান্তি আলোচনার প্রভাব, মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ও সোনার দামের উত্থান রাতারাতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ভারতের শেয়ারবাজারের পরবর্তী গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে চলেছে। রবিবার গভীর রাতে মার্কিন বাজার, এশীয় বাজার, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার ও ভূরাজনৈতিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বাজার বিশ্লেষকরা আজকের ট্রেডিং সেশনকে উচ্চ ঝুঁকি উচ্চ প্রত্যাশার দিন বলে উল্লেখ করেছেন। Gift Niftyর শক্তিশালী সূচনা, ইউক্রেন রাশিয়া শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি, মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি সূচক ও খুচরা বিক্রয়ের ডেটা, সোনার দামের উত্থান সব মিলিয়ে আজকের বাজারে চরম দোলাচলের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের শেয়ারবাজারে আজকের দিনটি যে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক বাজারের রাতারাতি গতিবিধি থেকেই। মার্কেটের ওঠানামা কখনও শুধু দেশীয় অবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সূচক, ভূরাজনৈতিক ঘটনা, পণ্যবাজারের ওঠানামা, ট্রেড ডিল, এমনকি এক দেশের ভোক্তা আস্থা কোথায় দাঁড়িয়েছে—এসব মিলিয়ে বাজার তৈরি করে সামগ্রিক মনোভাব। আজকের ভারতীয় বাজারও তার ব্যতিক্রম নয়।
রবিবার গভীর রাতে মার্কেট ওপেন হওয়ার আগে ১০টি বড় পরিবর্তন ঘটে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। এই পরিবর্তনগুলো শুধু মার্কিন বাজারকেই না, এশিয়ার বাজারকেও প্রভাবিত করেছে। Gift Nifty-র শক্তিশালী সূচনা, ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি, আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি সংক্রান্ত নতুন তথ্য, সোনার দামের উল্লম্ফন, মার্কিন খুচরা বিক্রয়ের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে ভারতীয় শেয়ারবাজারে বড়সড় প্রভাব পড়তে চলেছে।
চলুন, লেন্সপিডিয়া বাংলা নিউজের দর্শকদের জন্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করি—রাতারাতি বাজারে কী কী ঘটল? ভারতীয় শেয়ারবাজারের কোন কোন সেক্টরে এর প্রভাব পড়বে? বিনিয়োগকারীরা কীভাবে দিনের শুরু করবেন? এবং সামনে বাজার কোন দিকে যেতে পারে?
ভারতীয় বাজার ওপেন হওয়ার আগে সবচেয়ে নজরে থাকে Gift Nifty–র ওপর। এটি ভারতীয় বাজারের আগাম ইঙ্গিত দেয়। রবিবার রাত সোয়াএকটার পর Gift Nifty ট্রেড করছিল প্রায় ২৬,১৪৯ পয়েন্টে—অর্থাৎ Nifty 50–র আগের বন্ধের তুলনায় ৯৩ পয়েন্ট বেশি। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে বাজার সম্ভবত সবুজে খুলতে চলেছে।
কেন Gift Nifty এত উপরে খুলল? কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে একাধিক ইতিবাচক সিগন্যাল পাওয়া গেছে:
মার্কিন ফেড সুদের হার কমাতে পারে এমন জল্পনা
ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি
মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি স্বস্তিতে
ডাও–নাসডাক–এসঅ্যান্ডপি তে সীমিত ঊর্ধ্বগতি
তবে Gift Nifty ঊর্ধ্বমুখী হলেও বাজার খোলার সময় সবসময় সেই গতি বজায় থাকে না। অনেক সময় বাজার ওপেনিং–এর পরে পরিবর্তন দেখা যায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর নির্ভর করে। তবে আজকের জন্য Gift Nifty স্পষ্ট ইতিবাচক সিগন্যাল দিয়েছে।
রাতারাতি সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক খবর এসেছে পূর্ব ইউরোপ থেকে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং প্রাথমিক শান্তিচুক্তি নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।
এটি আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র স্বস্তি এনেছে। কারণ:
যুদ্ধ থেমে গেলে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হবে
গম–ভুট্টা–ডাল জাতীয় কৃষিপণ্য বাজারে সরবরাহ বাড়বে
ইউরোপীয় বাজারের চাহিদা বাড়বে
ডলার ইনডেক্স দুর্বল হতে পারে
ইকুইটি মার্কেটে আত্মবিশ্বাস ফেরে
ভারতের বাজারে এর প্রভাব কী?
তেল শোধনকারী ও লজিস্টিক কোম্পানিগুলি লাভবান হতে পারে
এভিয়েশন শেয়ারগুলিতে তেলের দাম কমলে বড় স্বস্তি আসবে
FMCG কোম্পানির র ফ–ম্যাটেরিয়াল খরচ কমতে পারে
ব্যাংকিং সেক্টরে স্থিতিশীলতার বার্তা যাবে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাইকারি মূল্য সূচক (PPI) কিছুটা বেড়েছে। এটি সাধারণত উৎপাদনকারীরা ভবিষ্যতে যে দামে পণ্য বিক্রি করবেন তার সূচক। PPI বাড়া মানে মুদ্রাস্ফীতির চাপ ভবিষ্যতে বাড়তে পারে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—
ফেডারেল রিজার্ভ এখনো ডিসেম্বর মাসে সুদের হার কমানোর পথে এগোতে পারে, কারণ অন্যান্য সূচক তুলনামূলক দুর্বল।
এর প্রতিফলন ভারতীয় বাজারে কী হবে?
IT সেক্টরের শেয়ার উঠতে পারে (কারণ ডলার–রুপি স্থিতিশীল)
ব্যাংকিং সেক্টরে সামান্য চাপ
রিয়েল এস্টেটে দ্রুত সুদের হার কমলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে
মার্কিন ভোক্তা আস্থা সূচক ৫ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে এসেছে। খুচরা বিক্রয়ও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল।
এটি দু’ভাবে বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে:
ইতিবাচক —
ফেড সুদের হার কমাবে, ফলে বাজারে টাকা ঢুকবে
প্রযুক্তি শেয়ার লাভবান হতে পারে
নেতিবাচক —
বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমতে পারে
ভারতের রপ্তানি–শিল্প চাপে পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“ভোক্তা আস্থা কমা মানে ভবিষ্যতের মার্কেট অস্থির হতে পারে, তবে সুদের হার কমার পথে বাজার আরও স্থিতিশীলতা পেতে পারে।”
চীন ঘোষণা করেছে যে তারা আরও বেশি আমেরিকান পণ্য আমদানি করবে। এটি ট্রেড ওয়ার–এর তীব্রতা কমিয়ে দিয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়া:
এশিয়ার বাজার চাঙ্গা
মেটাল ও মাইনিং সেক্টরে জোয়ার
বেস মেটাল–এর দাম বাড়ছে
ভারতে Tata Steel, JSW Steel, Hindalco–র মতো শেয়ারে উত্তেজনা দেখা যেতে পারে
গত তিন ট্রেডিং সেশনে ভারতীয় বাজারে বিক্রির চাপ ছিল। Sensex ও Nifty টানা তিন দিন লাল রঙে বন্ধ হয়েছে। এর মূল কারণ FII বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি, মার্কিন ডেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং চীনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা।
আপাতত বাজারের মনোভাব এমন—
“আজ বাজার হয়তো শক্তিশালী ওপেন করবে, তবে দিনের শেষে স্থিতিশীলতা আসবে কিনা তা নির্ভর করবে FII-দের আচরণের ওপর।”
বৈশ্বিক বাজারে সোনার দাম বাড়ছে। কারণ:
সুদের হার কমলে বন্ডের রিটার্ন কমে
ফলে সেফ অ্যাসেট হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ে
দেখা যাচ্ছে—
সোনার দাম প্রতি আউন্সে বেড়েছে
রুপোর দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
ভারতের ক্ষেত্রে:
জুয়েলারি কোম্পানিগুলি চাপে পড়বে
কিন্তু খনি কোম্পানি বা মাইনিং–শেয়ার লাভবান
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি বড় ট্রেড ডিল নিয়ে দ্রুত অগ্রগতি হচ্ছে। এটি দীর্ঘদিনের আটকে থাকা একটি চুক্তি।
চুক্তি হলে:
ভারতীয় টেক্সটাইল রপ্তানি বাড়বে
ফার্মা সেক্টর জোয়ারে উঠবে
অটোমোবাইল সেক্টরে বিশেষ সুবিধা
MSME রপ্তানিকারীরা লাভবান
এটি ভারতের GDP–তে বাড়তি প্রবাহ নিয়ে আসতে পারে।
FII বিক্রির চাপ
মার্কিন সুদের হার এখনও অনিশ্চিত
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারের অস্থিরতা
ডলার ইনডেক্স আবার শক্তিশালী হলে বিপদ
ডলার স্থিতিশীল, মার্কিন ইকোনমিক ডেটা দুর্বল → IT কোম্পানির অর্ডার বাড়তে পারে।
চীন–US ট্রেড ডিলের প্রভাব সরাসরি মেটাল মার্কেটে পড়বে।
সুদের হার কমার জল্পনা সাময়িক চাপ আনতে পারে।
SpiceJet, Indigo–র মতো শেয়ারে গতি আসতে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি কমলে FMCG–র ইনপুট কস্ট কমবে।
প্রথম ঘণ্টায় বাজারের গতি দেখে সিদ্ধান্ত নিন
আজ বড় ট্রেন্ড দেখা যেতে পারে—তাড়াহুড়ো নয়
মেটাল ও IT নজরে রাখুন
ব্যাংকিংয়ে অতিরিক্ত লং পজিশন নেবেন না
আন্তর্জাতিক খবরের ওপর নজর রাখুন
সোনায় বিনিয়োগকারীরা প্রফিট বুকিং বিবেচনা করতে পারেন
কারণ—
তিন দিন পতনের পর আজ বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে
আন্তর্জাতিক বাজারের সংকেত ইতিবাচক
যুদ্ধ–শান্তি চুক্তির মতো বড় খবর এসেছে
চীন–US ট্রেড ডিল বাজারকে চাঙ্গা করেছে
মার্কিন ভোক্তা ও মুদ্রাস্ফীতির নতুন ডেটা বাজারকে দিক দেখাবে
আজকের দিনটি তাই ভারতীয় শেয়ারবাজারের কাছে পরীক্ষার দিন—
বাজার কি আবার সবুজে ফেরে, নাকি নতুন কোনও উদ্বেগ সামনে আসে?
সব চোখ থাকবে Sensex–Nifty–এর ওপেনিং ঘণ্টায়।
প্রথমেই Gift Nifty। ভারতীয় শেয়ারবাজার খোলার আগে এটি ছিল প্রায় ২৬,১৪৯ পয়েন্টে—আগের বন্ধের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ৯৩ পয়েন্ট বেশি। এটি স্পষ্ট করে যে বাজার আজ সবুজে ওপেন করতে পারে। এই ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির একাধিক ইতিবাচক সিগন্যাল। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ডিসেম্বরেই সুদের হার কমাতে পারে এমন প্রত্যাশা বাজারে নতুন উদ্দীপনা জাগিয়েছে। সুদের হার কমলে ঋণ নেওয়া সহজ হয়, বিনিয়োগ বাড়ে এবং ব্যবসায়িক আস্থা ফেরে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে IT, রিয়েল এস্টেট ও ব্যাংকিং সেক্টরে।
অন্যদিকে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধবিরতি ও শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় স্বস্তির সঞ্চার করেছে। যুদ্ধ কমলে তেলের দাম স্থিতিশীল হবে, কৃষিপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং ইউরোপীয় বাজারের চাহিদা পুনরুদ্ধার হবে। ভারতীয় এভিয়েশন কোম্পানি ও FMCG কোম্পানিগুলি এতে লাভবান হতে পারে, কারণ তাদের ইনপুট কস্ট অনেকটাই কমে আসবে।
এদিকে মার্কিন খুচরা বিক্রয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় ও ভোক্তা আস্থা কমায় বাজারে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। তবে এই দুর্বলতা ফেডকে সুদের হার কমানোর দিকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ববাজারের জন্য ইতিবাচক। প্রযোজক মূল্য সূচক (PPI) সামান্য বাড়লেও সামগ্রিকভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
সোনার দাম রাতারাতি বাড়ার কারণও ফেডের প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত। সুদের হার কমলে বিনিয়োগকারীরা বন্ড ছেড়ে সোনার দিকে ঝোঁকেন, ফলে সোনার বাজার চাঙ্গা হয়। রুপোর দামেও উল্লম্ফন দেখা গেছে। ভারতের জুয়েলারি কোম্পানিগুলি এর ফলে সাময়িক চাপে পড়লেও মাইনিং–কোম্পানিগুলি লাভবান হতে পারে।
চীন–আমেরিকা নতুন ট্রেড চুক্তির সম্ভাবনা বাজারে আরও জোয়ার এনেছে। চীন ঘোষণা করেছে তারা মার্কিন পণ্য আমদানি বাড়াবে, ফলে ট্রেড ওয়ারের চাপ কিছুটা কমেছে। এই খবরের জেরে মেটাল ও মাইনিং শেয়ারগুলি আজ বিশেষ গতিশীল হতে পারে।
একইসঙ্গে ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট আলোচনায় অগ্রগতি ভারতের রপ্তানি শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। টেক্সটাইল, অটোমোবাইল, ফার্মা ও MSME সেক্টরে বড় সুবিধা আসতে পারে।
সব মিলিয়ে আজকের বাজার ‘high volatility with positive bias’—অর্থাৎ ইতিবাচক সম্ভাবনা থাকলেও বাজারে দোলাচল থাকবে। Sensex–Nifty টানা তিন দিন পতনের পর আজ পুনরুদ্ধার হতে পারে, তবে FII–দের আচরণ আজকের দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।