পোশাক নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফের প্রশ্ন তুললেন অভিনেত্রী অহনা দত্ত। জিমের পোশাকে রাস্তায় বেরোলে কী ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়, তা প্রকাশ করতেই সামনে নিয়ে এলেন নিজের অভিজ্ঞতা।
পোশাক নিয়ে বিতর্ক যেন ভারতীয় সমাজের চিরন্তন আলোচ্য বিষয়। শহরের মোড় থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়—যেখানেই পোশাকের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ ওঠে, সেখানেই জন্ম নেয় নানা প্রশ্ন, সমালোচনা, ভুল ব্যাখ্যা ও অসংগত মন্তব্য। সময় এগিয়েছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, জীবনযাপন বদলেছে, তবু মানসিকতার গতি একই জায়গায় স্থির হয়ে থাকলো কি? অভিনেত্রী জাহ্নবী কপূর নিজের জিম পোশাকে ছবি তোলা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন কিছুদিন আগে। আর এবার একই বিষয় নিয়ে মুখ খুললেন টলিপাড়ার জনপ্রিয় মুখ অহনা দত্ত। জিমের পোশাকে রাস্তায় বেরোলেই যে তির্যক দৃষ্টি, অযাচিত মন্তব্য ও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে—এই কথাই তিনি সরাসরি জানিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই পোশাক, সমাজ, নারীর স্বাধীনতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফের জোরালো আলোচনার ঢেউ উঠেছে।
জাহ্নবী কপূরের কথায়—জিমের পোশাকে ছবি তুললে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন; তাঁর মতে, এমন মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি করা ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ। জন্মান্য মানুষেরা সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত প্রকাশ্যে নিয়ে আসতেই হবে। জিম, ওয়ার্কআউট, ব্যক্তিগত সময়—এসব কিছুই ব্যক্তিগত পরিসরের অন্তর্গত; কিন্তু সেই সীমারেখা রক্ষা করা যে সমাজের বহু মানুষের কাছে এখনও কঠিন, তা বুঝিয়ে দিল অহনার অভিজ্ঞতা।
একটি ভিডিওর মাধ্যমে অহনা জানান, প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট টোটোয় চেপে জিমে যান তিনি। সাধারণ মানুষের মতোই শহরের রাস্তায় চলাফেরা করেন। কিন্তু জিমের পোশাকে রাস্তায় নামলেই তাঁকে ‘তির্যক দৃষ্টি’ সম্মুখীন হতে হয়। কখনও অযথা তাকিয়ে থাকা, কখনও কৌতূহলী চোখ, কখনও আবার অস্বস্তিকর হাসি—এই অভিজ্ঞতা অভিনেত্রীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। তিনি বলেন, “গাড়ি না থাকলে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে উঠতে ভয় লাগে। নিরাপত্তাহীন লাগে। মানুষ যেভাবে তাকায়, তা সত্যিই অস্বস্তিকর।”
শিল্পী কিংবা সাধারণ মানুষ—যে-ই হোন না কেন, পোশাক বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক ব্যক্তিগত অধিকার। তবুও, বিশেষত নারীদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য, সমালোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ সমাজের অনেক জায়গায় এখনও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। আজকের যুগে দাঁড়িয়েও কেন একজন নারী জিমের পোশাক পরে রাস্তায় বেরোতে ভয় পাবেন? কেন সাধারণ মানুষ শুধু ‘দেখা’ নয়, ‘তির্যকভাবে দেখা’কে অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছে?
অহনার এই অভিজ্ঞতা সামনে আসতেই টলিপাড়ার বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। কেউ মনে করেন, এটা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আঘাত; আবার কেউ মনে করেন, সমাজের কিছু অংশ স্বাধীনতার নামে অন্য কিছু করে ফেলে দেয়, যার ফলে সমস্যার শিকার হন অন্যরাও।
শ্রীলেখা মিত্র: স্বাধীনতার ব্যাখ্যাই সমস্যার মূল
অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের মতে, পোশাককে কেন্দ্র করে সমস্যাকে দু’ভাবে দেখা যায়। তিনি বলেন, “যে যা খুশি পরতে পারে—এটা সত্যি। এখন তো স্বাধীনতার কথা খুব বলা হয়। কিন্তু কখনও কখনও এই স্বাধীনতার অপব্যবহার হয়। ফলে যাঁরা সেই ‘ব্যবহার’-এর আওতায় পড়ে যান না, তাঁদেরও অস্বস্তির মুখোমুখি হতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যদি যোগভ্যাসের ছবি পোস্ট করি, মানুষের চোখ প্রথমে যাবে ক্লিভেজে। এটা একটা সামাজিক বাস্তবতা। এর মধ্যে অসংখ্য শেড আছে। শুধু নারীর পোশাক নয়, মানুষের মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি—সব কিছুই এই আলোচনার কেন্দ্রে। একমাত্র পোশাককে দায়ী করা যায় না।”
স্বস্তিকা দত্ত: আত্মবিশ্বাস থাকলে বিচার অপ্রাসঙ্গিক
স্বস্তিকা দত্ত ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, মানুষের ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। “আমি কী পোশাক পরছি সেটা আমার ব্যাপার। যদি আমি আত্মবিশ্বাসী হই, তাহলে কে কী ভাবল, তা নিয়ে মাথা ঘামাই না। সাধারণ মানুষ যে ভাবেই দেখুক, সেটা নিয়ে গুরুত্ব না দিলেই ভালো,” বলেন স্বস্তিকা।
এই বক্তব্য একধরনের বাস্তববাদী মানসিকতার প্রতিফলন। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—নারীদের কি সবসময় নিজেকে মানসিকভাবে ‘প্রস্তুত’ করে রাখতে হবে সমাজের তির্যক দৃষ্টির জন্য?
ইন্দ্রজিৎ বসু: আজকের যুগেও এমন ঘটনা—কাম্য নয়
অভিনেতা ইন্দ্রজিৎ বসুর মতে, পোশাক নিয়ে অস্বস্তির মুখোমুখি হওয়া আধুনিক সমাজের লজ্জা। তাঁর কথায়, “এই যুগে দাঁড়িয়েও নারীরা পোশাকের কারণে অস্বস্তির সম্মুখীন হচ্ছেন—এটা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের উচিত নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো।”
সুদীপ মুখোপাধ্যায়: স্বাধীনতা মানেই উচ্ছৃঙ্খলতা নয়
শিল্পী সুদীপ মুখোপাধ্যায় বহু বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। তাঁর মতে, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সকলেরই সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে। “স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব আছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের মধ্যে নিয়ম বেশি, মানবিকতা কম। মেয়েদের এখনও অনেক জায়গায় পণ্য হিসেবে দেখা হয়।”
তিনি মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত এই সমস্যাকে আরও চাঙ্গা করছে। “মানুষ এখন মন্তব্য করার জন্যই মন্তব্য করে। ব্যক্তিগত আক্রমণ যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা অনেকেই বোঝেন না।”
ভারতীয় উপমহাদেশে পোশাক বহুদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। স্লিভলেস ব্লাউজ থেকে রিপড জিন্স—সব কিছু নিয়েই অনলাইন ও অফলাইন সমালোচনা কম নয়। সমাজ পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ‘পোশাকের ওপর বিচার’-এর প্রবণতা কমেনি। নারীদের পোশাক যেন এখনও অনেকের কাছে ‘চরিত্র’ পরিমাপের মাধ্যম। কেন?
১. পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখার মানসিকতা বহু বছর পুরোনো। শরীর মানেই 'শালীনতা', আর শালীনতা মানেই 'সঠিক পোশাক'—এই চিন্তাধারা নারীদের স্বাধীনতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
2. সামাজিক শর্ত আরোপ
“মেয়েরা এটা পরবে না”, “এটা পরলে অসভ্য দেখাবে”—এ ধরনের শর্ত পরিবার থেকেই অনেক সময় শুরু হয়। ফলে স্বাধীনতা শেখার আগে বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
3. দৃষ্টিভঙ্গির অভাব
মানুষ কী পোশাক পরছে সেটা তার ব্যক্তিগত পছন্দ। কিন্তু আমাদের সমাজ এখনও পর্যন্ত পোশাককে চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে।
জিমের পোশাক সাধারণত দেহসৌষ্ঠব অনুযায়ী তৈরি হয়—আরামদায়ক, ফিটিং, লিক্রা বা স্প্যানডেক্স উপাদানের। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনও শরীর নিয়ে অতি-কৌতূহল। ফলে জিমের পোশাকে নারীদের দেখতে পেলে অনেকে ভুল জায়গায় দৃষ্টি স্থির রাখেন। অথচ এই পোশাক কেবলই শরীরচর্চার পোশাক—তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
শিক্ষিত সমাজও যখন নারীর পোশাক দেখে মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না, তখন শুধু পুরোনো প্রজন্মকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব যত বাড়ছে, মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ততই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
অহনার বক্তব্য সেই কারণেই আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিনেত্রী যখন নিজের অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন, তখন বোঝা যায়—এই সমস্যা ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক।
এটাই মূল প্রশ্ন।
কোনও নারী যদি জিমের পোশাক পরে রাস্তায় হাঁটেন, তাতে তাঁর অপরাধ কোথায়?
অথবা তিনি যদি স্কার্ট, জিন্স বা ওভারসাইজ টি-শার্ট পরেন—তা নিয়েই বা এত আলোড়ন কেন?
সমাজ যদি নারীর প্রতিটি পদক্ষেপকে ‘মন্তব্যের’ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে কোথায় দাঁড়াবে নারীর স্বাধীনতা?
নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
পোশাক নয়, মানুষের চরিত্র দেখা শিখতে হবে।
পুরুষদের সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতা শেখানো জরুরি।
পরিবার থেকে শুরু করতে হবে—শিশুদের পোশাক নিয়ে বিচার-আলোচনা না করতে শেখানো জরুরি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণের বিরুদ্ধে কড়া সামাজিক ও মানসিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অহনা দত্তর অভিজ্ঞতা নতুন নয়, কিন্তু গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় আনা প্রয়োজন। জিমের পোশাক, কিংবা যেকোনও পোশাক—একজন নারীর স্বাধীনতার পরিচয়। পোশাক নিয়ে তির্যক দৃষ্টি, মন্তব্য অথবা দোষারোপ—এই মনোভাব শুধু নারীদের নয়, পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, প্রজন্মও বদলাচ্ছে। কিন্তু যদি দৃষ্টিভঙ্গি না বদলায়, তাহলে আমরা এগোলাম কোথায়?
সমাজ যখনই নারীর পোশাকের বিচার করা বন্ধ করবে, সেদিনই প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা পাবে।