অভিনেতা সৌরভ চক্রবর্তী জানালেন, স্মৃতি মানেই বেদনা নয়। প্রাক্তন স্ত্রী মধুমিতা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সৌজন্যমূলক ভাবনা প্রকাশ করে বললেন, দূরত্বেই সম্পর্কের সৌন্দর্য। ইঙ্গিত দিলেন, ২০২৬-এ আসতে পারে জীবনের নতুন খবর।
সময় চলে যায়, সম্পর্ক বদলায়, তবুও কিছু স্মৃতি রয়ে যায় মনে— সেই স্মৃতিগুলোই হয়তো কখনও কষ্ট দেয়, কখনও আবার শেখায় নতুনভাবে বাঁচতে। অভিনেতা ও পরিচালক সৌরভ চক্রবর্তী যেন সেই শিক্ষা নিয়েই আজ আরও পরিণত, আরও শান্ত। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন স্ত্রী অভিনেত্রী মধুমিতা সরকারকে নিয়ে নিজের খোলামেলা ভাবনা ভাগ করলেন তিনি। জানালেন, “স্মৃতি মানেই বেদনা নয়। বরং দূরত্ব কখনও কখনও সম্পর্কের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। আমরা এখন দু’জন স্বাধীন মানুষ, অতীত আঁকড়ে বাঁচার কোনও মানে নেই।”
এই কয়েকটি বাক্যেই যেন স্পষ্ট হয়ে যায় সৌরভের বর্তমান মানসিক অবস্থান। যে মানুষ একসময় নিজের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ছিলেন, তাঁকেই নিয়ে এখন সৌজন্যপূর্ণ নির্লিপ্ততায় কথা বলেন অভিনেতা। জীবনের পথ চলায় অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, সম্পর্ক মানে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়; সম্পর্ক মানে শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং মাঝে মাঝে দূরত্ব বজায় রাখাও।
মধুমিতা-সৌরভ: এক সময়ের আলোচিত জুটি
টেলিভিশনের জনপ্রিয় জুটি ছিলেন সৌরভ চক্রবর্তী ও মধুমিতা সরকার। ধারাবাহিক বোঝেনা সে বোঝেনা-এর দিনগুলো থেকেই দর্শকদের মনে তাদের নাম উচ্চারিত হত একসঙ্গে। অন-স্ক্রিন রসায়নের বাইরে বাস্তবেও তারা ঘর বেঁধেছিলেন। শিল্পের জগতে কাজের সূত্রেই একে অপরকে চিনেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন, তারপর একসঙ্গে জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিছু বছর পরেই সেই সম্পর্কে দেখা দেয় ফাটল। পারস্পরিক মতভেদের জেরে বিচ্ছেদ ঘটে— যা সেই সময় আলোড়ন তুলেছিল টলিপাড়ায়।
তবে বিচ্ছেদের পরেও একে অপরের প্রতি কোনও তিক্ততা প্রকাশ করেননি কেউই। বরং নিজেদের পথ আলাদা হলেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেছেন দু’জনেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন— সৌরভ অভিনয় ও পরিচালনায়, মধুমিতা টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হিসেবে।
সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা
সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে সৌরভের মুখে শোনা গেল ভীষণ পরিণত এক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বলেন, “আমরা যখন কাছাকাছি থাকি, তখন অনেক সময়ই সম্পর্কের সৌন্দর্য চোখে পড়ে না। কিন্তু দূরত্ব তৈরি হলে আমরা বুঝতে পারি, আসলে সেই মানুষটিই আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসা যায়, কীভাবে নিজের মতো বাঁচা যায়। সম্পর্কের আসল মানে তখনই বোঝা যায়।”
এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জীবনের প্রতি তাঁর নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। অতীতের কোনও তিক্ততা নয়, বরং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া প্রশান্তি আজ তাঁর সঙ্গী। সৌরভ মনে করেন, জীবনে এগিয়ে চলার জন্য অতীতকে সম্মান জানানো দরকার, কিন্তু সেটাকে আঁকড়ে থাকা নয়। তিনি বলেন, “আমরা দু’জনেই এখন স্বাধীন মানুষ। প্রত্যেকের নিজের পথ, নিজের সিদ্ধান্ত। অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি, কিন্তু সেটা নিয়ে বাঁচা যায় না।”
মধুমিতা ও দেবমাল্যের আসন্ন বিবাহ
সম্প্রতি অভিনেত্রী মধুমিতা সরকারের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। শোনা যাচ্ছে, অভিনেতা দেবমাল্য রায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। এই প্রসঙ্গ উঠতেই সাংবাদিকরা সৌরভের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। তিনি হেসে বলেন, “ওদের জীবন ওদের মতোই চলুক। আমি কে মন্তব্য করার?”
এই এক বাক্যেই যেন ধরা পড়ে সৌরভের পরিপক্বতা। বিচ্ছেদের পরেও কোনও বিরাগ নয়, বরং প্রাক্তনের জীবনের নতুন সূচনায় শুভেচ্ছা জানানোই যেন তাঁর স্বভাব। সৌরভ স্পষ্ট করে দেন, “যে সম্পর্ক একসময় আমার জীবনের অংশ ছিল, তাকে আমি সম্মান করি। এখন ওর সুখেই আমি আনন্দ পাই।”
নতুন প্রেমের গুঞ্জন
অভিনেতার জীবনে কি আসছে নতুন প্রেম? প্রশ্নটা যতই ব্যক্তিগত হোক, জনতার কৌতূহল কিন্তু থেমে থাকে না। হাসতে হাসতেই সৌরভ বলেন, “সব প্রশ্নের উত্তর একদিন দেওয়া যাবে। এখন শুধু বলতে পারি, ২০২৬-এ একটা নতুন খবর শুনবেন।”
এই ‘নতুন খবর’ নিয়ে এখন থেকেই শুরু হয়েছে জল্পনা। কেউ বলছেন, হয়তো নতুন কোনও সম্পর্কের আভাস; কেউ আবার মনে করছেন, হয়তো নতুন কোনও সৃজনশীল প্রকল্পের ইঙ্গিত দিচ্ছেন অভিনেতা। সৌরভ অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটেছেন। শুধু বলেছেন, “জীবনে নতুন কিছু আসছে, তবে সেটা প্রেম নাকি কাজ— তা সময়ই বলবে।”
পরিণত মানসিকতার প্রতিচ্ছবি
একসময় যিনি আবেগপ্রবণ, উত্তেজনাপ্রবণ যুবক ছিলেন, আজ সেই সৌরভ অনেক বেশি সংযত ও স্থির। তিনি জানেন, জীবনের প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব পরিসর থাকে। যখন সেই পরিসর শেষ হয়, তখন তা শ্রদ্ধার সঙ্গেই বিদায় জানানো উচিত। তিনি বলেন, “প্রত্যেক সম্পর্কই একটা অভিজ্ঞতা। কিছু শেখায়, কিছু ভুল শোধরায়। সেই শেখাটাই আসলে জীবনের মূল।”
অভিনেতার এই পরিণত মানসিকতা অনেকের মন ছুঁয়েছে। বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনের ঝড় নিয়েই মিডিয়া সরগরম থাকে, সেখানে সৌরভের সংযম ও সংবেদনশীলতা সত্যিই প্রশংসনীয়।
শিল্প ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য
বর্তমানে সৌরভ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনায়ও সমান মনোযোগ দিচ্ছেন। তাঁর কথায়, “শিল্পই এখন আমার ভালোবাসা। কাজের মধ্যেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই।”
তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীর জীবনে সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একাকীত্বও প্রয়োজনীয়। “একাকীত্ব অনেক সময় সৃজনশীলতাকে তীব্র করে তোলে। সেই নিঃসঙ্গতাই হয়তো আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়,” বলেন সৌরভ।
মধুমিতার প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা
প্রাক্তন স্ত্রী সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি কোনও অভিযোগ তোলেননি। বরং তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় শ্রদ্ধা। “মধুমিতা আজ যেখানে পৌঁছেছে, সেটা ওর পরিশ্রমের ফল। ওকে নিয়ে আমি গর্বিত। আমাদের পথ আলাদা, কিন্তু শ্রদ্ধা রয়ে গেছে আগের মতোই।”
এমন পরিণত প্রতিক্রিয়া সাধারণত দেখা যায় না। প্রাক্তন সঙ্গীর সাফল্যে খুশি হওয়া সহজ নয়, কিন্তু সৌরভ যেন ব্যতিক্রম। তাঁর চোখে সম্পর্ক ভাঙলেও শ্রদ্ধা নষ্ট হওয়া উচিত নয়। “যে সময়টা আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি, সেটা আমার জীবনের এক মূল্যবান অধ্যায়। সেটাকে অস্বীকার করার মানে নেই,” যোগ করেন তিনি।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
আসন্ন বছরগুলিতে সৌরভের লক্ষ্য স্পষ্ট— আরও ভালো কাজ করা, নিজের অভিজ্ঞতাকে সৃজনশীলতায় রূপান্তরিত করা। তিনি জানান, “আমি এখন নিজেকে নিয়ে অনেক বেশি শান্ত। জীবনের গতি বুঝে চলছি। ২০২৬-এ কিছু নতুন পরিকল্পনা আছে— সেটা নিয়েই এখন কাজ করছি।”
তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, সৌরভ নতুন একটি ওয়েব সিরিজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে তিনি শুধু অভিনয়ই নয়, পরিচালনাও করবেন। যদিও এ বিষয়ে সৌরভ মুখ খুলতে নারাজ। “সময় এলেই সবাই জানতে পারবেন,” শুধু এটুকুই বলেন তিনি।
সম্পর্কের প্রতি দর্শন
সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি বলেন, “আমরা সাধারণত মনে করি, সম্পর্ক মানেই কাছাকাছি থাকা। কিন্তু আমি মনে করি, সম্পর্কের আসল সৌন্দর্য তখনই বোঝা যায়, যখন দূরত্ব থেকেও শ্রদ্ধা ও মমতা বজায় থাকে। কেউ যদি আমার জীবনে থেকে শেখায় কীভাবে নিজেকে বুঝতে হয়, সেই মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব চিরকাল।”
এই এক কথাতেই যেন প্রকাশ পায় তাঁর দর্শন। জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা মানে মালিকানা নয়; ভালোবাসা মানে মুক্তি। সেই মুক্তিতেই সৌন্দর্য।
সৌরভ-মধুমিতার সম্পর্কের উত্তরাধিকার
তাদের সম্পর্ক হয়তো আজ অতীত, কিন্তু সেই সম্পর্কের স্মৃতি আজও অনেক ভক্তের মনে গেঁথে আছে। সামাজিক মাধ্যমে আজও অনেকে পুরোনো ছবি বা দৃশ্য শেয়ার করেন, লেখেন— “তাদের chemistry আজও অনন্য।”
এই প্রসঙ্গে সৌরভ বলেন, “মানুষের ভালোবাসা পেয়ে ভালো লাগে। তবে বাস্তব জীবনে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। ভক্তদের স্মৃতির প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু এখন আমি চাই, মানুষ আমাকে নতুনভাবে চিনুক— আমার বর্তমান কাজের মাধ্যমে।”
পরিসমাপ্তি: দূরত্বেই প্রশান্তি
জীবনের নানা উত্থান-পতনের পর সৌরভ আজ অনেক শান্ত। তিনি জানেন, সব সম্পর্কেরই একটা সময় থাকে, আর সেই সময় শেষে থেকে যায় অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি। সেই স্মৃতিকে তিনি বেদনা হিসেবে নয়, বরং সৌন্দর্যের এক রূপ হিসেবে দেখতে চান।
তাঁর নিজের ভাষায়, “দূর থেকে পাহাড়কে যেমন দেখলে তার পূর্ণ রূপ ধরা দেয়, সম্পর্কও তেমনই। দূরত্ব থেকেই কখনও কখনও বোঝা যায়, কতটা মূল্যবান ছিল কোনও মানুষ বা কোনও অধ্যায়।”
এই উপলব্ধিই হয়তো আজকের সৌরভ চক্রবর্তীকে করে তুলেছে আরও পরিণত, আরও গভীর। তিনি এখন নিজের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছেন, অতীতকে রেখে দিয়েছেন স্মৃতির জায়গায়— না বেদনা হিসেবে, না অনুতাপ হিসেবে, বরং শেখার এক অমূল্য অভিজ্ঞতা হিসেবে।
২০২৬-এ তিনি কী “নতুন খবর” দেন, তা সময়ই বলবে। কিন্তু এখনকার সৌরভকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি প্রস্তুত— জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য, হৃদয়ের নতুন দরজা খুলে দেওয়ার জন্য।