সারা রাত চার্জে রাখা ইলেকট্রিক স্কুটারের ব্যাটারি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনে পুড়ে গলে যায় বাড়ির বিস্তীর্ণ অংশ। এই দুর্ঘটনায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে এক পরিবার।
ইলেকট্রিক স্কুটারের ব্যাটারি সারা রাত চার্জে দেওয়াই যে কতটা ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তারই ভয়াবহ উদাহরণ সামনে এল জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি শহরে। গভীর রাতে ইলেকট্রিক স্কুটারের ব্যাটারি বিস্ফোরণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যার ফলে পুড়ে গলে যায় একটি বাড়ির বিস্তীর্ণ অংশ। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন গ্রাস করে নেয় তিনটি ঘর ও রান্নাঘর। এই ঘটনায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে এক পরিবার।
ঘটনাটি ঘটেছে ময়নাগুড়ি শহরের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। জানা গিয়েছে, ওই এলাকার বাসিন্দা সুশীল বারুই রাতে তাঁর ইলেকট্রিক স্কুটারের ব্যাটারি চার্জে বসিয়েছিলেন। প্রতিদিনের মতোই রাতভর চার্জে রাখা হয়েছিল ব্যাটারিটি। কিন্তু গভীর রাতে আচমকাই ব্যাটারিটি বিস্ফোরিত হয়। বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় গোটা এলাকার বাসিন্দাদের। মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাটারি থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ঘরের বিভিন্ন অংশে।
ঘটনার সময় গৃহকর্তা সুশীল বারুই বাথরুমে ছিলেন। ঘরের ভেতরে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান। হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ এবং আগুনের লেলিহান শিখা দেখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণপণে ছুটে এসে স্ত্রী ও শিশুদের উদ্ধার করেন সুশীল বারুই। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান পরিবারের সদস্যরা। তবে আগুনের ভয়াবহতায় ঘরের ভেতরে থাকা কোনো আসবাবপত্র বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগুন এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। রান্নাঘর, শোবার ঘর এবং বসার ঘরের সমস্ত আসবাব, কাপড়, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, নগদ টাকা ও সোনার গয়না আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। ঘরের দেওয়াল ও ছাদও তীব্র তাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দারা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। বালতি করে জল ঢেলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা হলেও আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে তা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের চোখের সামনেই একের পর এক ঘর আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর একটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
দমকল সূত্রে জানানো হয়েছে, ইলেকট্রিক স্কুটারের ব্যাটারির অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া বা শর্ট সার্কিট থেকেই এই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় চার্জে থাকার কারণেই ব্যাটারির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এই ঘটনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন সুশীল বারুই ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি। চোখের সামনে জীবনের সঞ্চয় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্য কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তাঁরা।
সুশীল বারুই বলেন,
“হঠাৎ করে বিকট শব্দ হয়, তারপরই আগুন দেখতে পাই। ঘরে তখন স্ত্রী ও দুই সন্তান ছিল। আমি বাথরুমে ছিলাম। শব্দ শুনে ছুটে এসে দেখি আগুন লেগে গিয়েছে। কোনোমতে স্ত্রী ও শিশুদের বের করি। ঘরের ভেতরে যা কিছু ছিল—আসবাব, নগদ টাকা, সোনার গয়না—সবই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এখন আমরা সর্বস্বান্ত।”
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ময়নাগুড়ি থানার আইসি সহ পুলিশ বাহিনী। পুলিশ গোটা এলাকা ঘিরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে এবং ঘটনার তদন্ত শুরু করে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে যান ময়নাগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান মনোজ রায় এবং ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অমিতাভ চক্রবর্তী। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন। পুরসভার পক্ষ থেকে কীভাবে পরিবারটিকে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে ইলেকট্রিক স্কুটার ও অন্যান্য ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যাটারি নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষ করে রাতভর চার্জে রাখা ব্যাটারি কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন, ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যাটারি দীর্ঘ সময় চার্জে রাখা বিপজ্জনক হতে পারে। সঠিক চার্জার ব্যবহার, অতিরিক্ত চার্জ এড়িয়ে চলা এবং খোলা জায়গায় চার্জ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
ময়নাগুড়ির এই ঘটনা কার্যত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সামান্য অসতর্কতাই কীভাবে একটি পরিবারের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সৌভাগ্যবশত প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও, একটি পরিবার আজ নিঃস্ব। এই ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইলেকট্রিক যান ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এই ঘটনার পর নতুন করে তীব্রভাবে সামনে এসেছে ইলেকট্রিক স্কুটার ও অন্যান্য ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যাটারি নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন। বিশেষ করে রাতভর চার্জে রাখা ব্যাটারি কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরে ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্য এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে বহু মানুষ ইলেকট্রিক স্কুটার ও বাইকের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এই ঘটনার পর অনেকেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন, এই যানবাহনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আদৌ কতটা নির্ভরযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রিক যানবাহনে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতিরিক্ত তাপ, নিম্নমানের চার্জার, দীর্ঘ সময় ধরে চার্জ দেওয়া বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মতো সমস্যার কারণে ব্যাটারির ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়া অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। এর ফলেই হঠাৎ বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকেন, তখন এই ধরনের দুর্ঘটনা আরও মারাত্মক আকার নিতে পারে।
বিদ্যুৎ ও যানবাহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, ইলেকট্রিক স্কুটার বা বাইকের ব্যাটারি কখনওই সারারাত চার্জে রাখা উচিত নয়। চার্জ সম্পূর্ণ হলে সঙ্গে সঙ্গে প্লাগ খুলে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শুধুমাত্র কোম্পানি অনুমোদিত চার্জার ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। বাজারে সস্তা বা নকল চার্জার ব্যবহার করলে ব্যাটারির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সময় খোলা এবং বাতাস চলাচল করে এমন জায়গা বেছে নেওয়া উচিত। অনেকেই জায়গার অভাবে ঘরের ভেতরে, এমনকি শোবার ঘর বা রান্নাঘরের কাছেই স্কুটার চার্জে বসান। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে এবং তখন প্রাণহানির আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
ময়নাগুড়ির এই ঘটনা কার্যত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সামান্য অসতর্কতা কীভাবে একটি পরিবারের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে একটি পরিবারের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সম্পদ আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেল। সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি হয়নি। কিন্তু তাতেই যে বিপদ কম, তা নয়। একটি পরিবার আজ কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছে, যাদের নতুন করে জীবন শুরু করা অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই ঘটনা গভীর প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই আতঙ্কে তাঁদের ইলেকট্রিক স্কুটার বা বাইক চার্জ দেওয়ার পদ্ধতি বদলানোর কথা ভাবছেন। কেউ কেউ রাতে চার্জ দেওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার অনেকে বাড়ির বাইরে বা খোলা জায়গায় চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন।
এই ঘটনার পর প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ইলেকট্রিক যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কড়া নিয়মকানুন ও জনসচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু যানবাহন বিক্রি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়, ব্যবহারকারীদের নিয়মিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও নির্দেশিকা দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাটারির মান নিয়ন্ত্রণ এবং চার্জিং ব্যবস্থার উপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
ময়নাগুড়ির এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যেন ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে থাকল। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি তার ঝুঁকি সম্পর্কেও সচেতন হওয়া যে কতটা জরুরি, তা আবারও প্রমাণিত হলো। এই ধরনের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইলেকট্রিক যান ব্যবহারকারীদের আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বলে মত স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞদের।