Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

চৈত্রের বসন্তে সূর্য আরাধনায় ভক্তদের ভিড়ে মুখর চৈতী ছটপুজোর পবিত্র উদযাপন

কার্তিকের মতো চৈত্র মাসেও ষষ্ঠী তিথিতে ছট ব্রত পালন করতে নদীর পাড়ে ভিড় করলেন ব্রতীরা অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য প্রদান করলেন

কালচিনি অনন্যা দে চৈত্রের মৃদু বসন্ত হাওয়ায় ভোর থেকেই এক আলাদা পবিত্র আবহ তৈরি হয়েছিল কালচিনি ব্লকের বিভিন্ন নদীর ঘাটে কার্তিক মাসের মতোই চৈত্র মাসেও পালিত হয় ছট পুজো আর সেই উপলক্ষে ভিড় জমিয়েছিলেন অসংখ্য ব্রতী ও পুণ্যার্থী চৈত্র মাসের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত এই ব্রত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয় ভোরের আলো ফোটার আগেই অনেকেই পৌঁছে যান নদীর ধারে নিজের নিজের ঘাট তৈরি করতে কেউ কলা গাছ মাটিতে পুঁতে সাজিয়ে তুলছেন ঘাট কেউ আবার ফুল দিয়ে সাজাচ্ছেন পবিত্র স্থানটি চারপাশে একধরনের শান্ত এবং ভক্তিময় পরিবেশ বিরাজ করছিল।

কালচিনি জয়গাঁ এবং দলসিংপাড়ার বিভিন্ন নদীর ঘাটে দেখা যায় একই চিত্র কোথাও নেই বড় আয়োজন বা জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা তবুও ভক্তদের বিশ্বাস এবং অনুভূতির গভীরতা এই উৎসবকে করে তুলেছিল আরও অর্থবহ ছোট ছোট উপকরণ দিয়েই সাজানো হয়েছিল ঘাটগুলি কলা গাছ ফুল ধূপ আর প্রদীপের আলোয় ধীরে ধীরে এক পবিত্র পরিবেশ তৈরি হয় দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে অনেকেই উপস্থিত হন এই বিশেষ ব্রতে অংশগ্রহণ করতে।

এই ছট পুজো দুবার পালিত হয় একটি কার্তিক মাসে এবং অন্যটি চৈত্র মাসে চৈত্র মাসের এই পুজো চৈতি ছট নামে পরিচিত পুণ্যার্থীদের মতে এই তিথিতে দেবী যমুনা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাই এই পুজোকে যমুনা ছট বলেও ডাকা হয় এই বিশ্বাস থেকেই ভক্তরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন এই ব্রত চারদিন ধরে চলে এই পুজোর নিয়ম প্রথম দিন নাহায় খায় দ্বিতীয় দিন খরনা তৃতীয় দিন অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য প্রদান এবং চতুর্থ দিনে উদিত সূর্যের পুজোর মাধ্যমে শেষ হয় এই আচার।

সকাল থেকেই ব্রতীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে নদীর ঘাটে পৌঁছে প্রথমেই তারা মাটি পরিষ্কার করে কলা গাছ পুঁতে ঘাট তৈরি করেন কোথাও বাঁশ বা কাপড়ের তৈরি ঘাট দেখা যায়নি খুবই সরল এবং প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে ওঠে এই পূজার স্থান নদীর ধারে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে জলে নামেন ব্রতীরা সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে তখন শুরু হয় অর্ঘ্য দেওয়ার মুহূর্ত একে একে সবাই জলে দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যকে প্রণাম জানিয়ে অর্ঘ্য নিবেদন করেন।

এই সময় চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা এবং ভক্তির আবহ তৈরি হয় কারও মুখে উচ্চস্বরে কথা নেই শুধুই প্রার্থনার সুর এবং মন থেকে উঠে আসা বিশ্বাস সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়ার পর আরতি করা হয় প্রদীপের আলো আর ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ মহিলারা একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন যা সৌভাগ্য এবং সুস্থ জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় পরিবারের সকলের মঙ্গল কামনায় এই আচার পালন করা হয়।

যদিও কার্তিক মাসের ছট পুজোর মতো এখানে তেমন কোনও মেলা বা বড় আকারের আয়োজন দেখা যায়নি তবুও ভক্তদের উপস্থিতি এবং তাদের আবেগ এই পুজোকে করে তুলেছিল প্রাণবন্ত শিশুদের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর রাখছিলেন অভিভাবকরা কারণ নদীর ধারে ভিড়ের মধ্যে সাবধানতা অবলম্বন করা খুবই জরুরি ছিল।

অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়ার পর সবাই ধীরে ধীরে ঘাট ছাড়তে শুরু করেন কিন্তু পুজোর শেষ এখানেই নয় আগামী ভোরে আবারও একই স্থানে উপস্থিত হয়ে উদিত সূর্যকে অর্ঘ্য প্রদান করবেন ব্রতীরা সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন সবাই কারণ এই শেষ দিনের পুজো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

চৈত্রের এই ছট পুজো প্রমাণ করে যে বড় আয়োজন না থাকলেও মানুষের বিশ্বাস এবং আস্থা দিয়েই একটি উৎসব কতটা গভীর হয়ে উঠতে পারে কালচিনির নদীর পাড়ে এই সরল অথচ আবেগঘন উদযাপন যেন সেই কথাই আবারও মনে করিয়ে দিল ভক্তি নিষ্ঠা আর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে মিলেমিশে তৈরি হল এক অনন্য পবিত্রতার ছবি যা দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো।

এই পবিত্র উৎসবের মূল শক্তি লুকিয়ে থাকে মানুষের অন্তরের বিশ্বাসে আর সেই বিশ্বাসই প্রতি বছর নতুন করে প্রাণ পায় চৈত্রের এই সময়ে কালচিনির নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে চারপাশে নেই কোনো কোলাহল নেই কোনো কৃত্রিমতা আছে শুধু মানুষের সহজ সরল ভক্তি আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকার অনুভূতি ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই যারা ঘাটে এসে পৌঁছে যায় তাদের চোখে মুখে থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন এই ব্রত শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয় বরং নিজের মনকে শুদ্ধ করার এক গভীর প্রয়াস।

নদীর ধারে বসে থাকা বৃদ্ধা থেকে শুরু করে তরুণী মহিলারা সবাই একসঙ্গে প্রস্তুতি নিতে থাকেন কারও হাতে ফুল কারও হাতে ধূপ কেউ আবার কলা গাছ সাজাতে ব্যস্ত ছোট ছোট বাচ্চারাও এই পরিবেশে নিজেদের মতো করে অংশ নেয় যদিও তাদের বোঝার ক্ষমতা সীমিত তবুও এই আবহ তাদের মনেও এক বিশেষ ছাপ ফেলে যায় পরিবারের বড়রা ধীরে ধীরে তাদের এই আচার এবং বিশ্বাসের কথা শেখান যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য অটুট থাকে।

news image
আরও খবর

চৈত্রের মৃদু হাওয়া আর নদীর জলের শব্দ একসঙ্গে মিশে তৈরি করে এক শান্ত সুর এই সুরের মধ্যেই শুরু হয় প্রার্থনা সূর্য যখন ধীরে ধীরে অস্ত যায় তখন সেই মুহূর্তটিকে ঘিরে থাকে এক গভীর আবেগ সবাই জলে নেমে দাঁড়িয়ে দু হাত জোড় করে প্রার্থনা করেন নিজেদের পরিবারের সুখ শান্তি আর সুস্থতার জন্য অনেকের চোখে জলও দেখা যায় কারণ এই প্রার্থনা শুধুই নিয়ম নয় এটি হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক অনুভব।

এই পুজোর সবচেয়ে বড় দিক হল এর সরলতা এখানে নেই কোনো আড়ম্বর নেই কোনো প্রতিযোগিতা কে কত বড় করে আয়োজন করবে বরং সবাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী যতটা সম্ভব নিষ্ঠা দিয়ে পালন করেন এই ব্রত কলা গাছ আর ফুল দিয়েই যখন একটি ঘাট তৈরি হয় তখন বোঝা যায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জা না থাকলেও এই ঘাটগুলির সৌন্দর্য যেন আলাদা করে চোখে পড়ে কারণ তা তৈরি হয় ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে।

মহিলাদের ভূমিকা এই পুজোয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তারা উপোস থেকে শুরু করে সমস্ত নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন নিজেদের পরিবারের মঙ্গল কামনায় তারা যে আত্মত্যাগ করেন তা সত্যিই প্রশংসনীয় সন্ধ্যার সময় যখন তারা একে অপরের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন তখন সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে আরও আবেগঘন এই সিঁদুর শুধু একটি রীতি নয় এটি ভালোবাসা সম্পর্ক আর পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।

কালচিনির এই নদীর ঘাটগুলিতে হয়তো বড় শহরের মতো আলোকসজ্জা নেই নেই কোনো মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তবুও এখানে যে শান্তি পাওয়া যায় তা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন কারণ এখানে সবকিছুই স্বতঃস্ফূর্ত মানুষ নিজের ইচ্ছায় নিজের বিশ্বাসে এই পুজো পালন করেন কোনো বাহ্যিক চাপ বা প্রদর্শন নেই এই কারণেই এই পুজো এতটা হৃদয়ের কাছাকাছি।

শিশুদের জন্যও এই দিনটি বিশেষ তারা নতুন জামা পরে পরিবারের সঙ্গে ঘাটে আসে যদিও তাদের নিরাপত্তার দিকে সবসময় নজর রাখা হয় তবুও তারা এই পরিবেশে আনন্দ খুঁজে নেয় বড়রা তাদের শেখান কিভাবে এই পুজো করতে হয় কিভাবে সূর্যকে প্রণাম করতে হয় এই শেখার মধ্য দিয়েই তারা বড় হয়ে ওঠে এবং একদিন নিজেরাও এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

পরের দিনের ভোর যেন আরেকটি নতুন আশার প্রতীক সূর্যোদয়ের সময় আবার সবাই ঘাটে এসে জড়ো হন সেই সময়ের আবহ একেবারেই আলাদা থাকে ভোরের ঠান্ডা হাওয়া আর প্রথম সূর্যের আলো একসঙ্গে মিশে তৈরি করে এক অপূর্ব দৃশ্য তখন আবারও প্রার্থনা করা হয় আবারও অর্ঘ্য দেওয়া হয় এইবার উদিত সূর্যকে যা নতুন শুরুর প্রতীক।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয় এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনুভূতি এখানে রয়েছে কৃতজ্ঞতা রয়েছে আশার আলো রয়েছে নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও কিছু বড় করার ইচ্ছা কালচিনির এই সরল ছট পুজো তাই শুধু একটি উৎসব নয় এটি মানুষের অন্তরের এক প্রতিচ্ছবি যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত আনন্দ আর শান্তি খুঁজে পাওয়া যায় সরলতার মধ্যেই।

এই পুজোর মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি আসে সূর্য নদী মাটি সবকিছুর সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয় যা আজকের ব্যস্ত জীবনে খুবই প্রয়োজনীয় তাই এই ছট পুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় এটি একটি জীবন দর্শন যা আমাদের শেখায় কিভাবে সহজভাবে বাঁচতে হয় কিভাবে নিজের বিশ্বাসকে ধরে রাখতে হয় এবং কিভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে চলতে হয়।

শেষ পর্যন্ত বলা যায় কালচিনির এই চৈত্রের ছট পুজো এক অনন্য অভিজ্ঞতা যা শুধুমাত্র চোখে দেখা যায় না তা অনুভব করতে হয় প্রতিটি মুহূর্ত প্রতিটি প্রার্থনা প্রতিটি আচার মিলে তৈরি হয় এক গভীর আবেগ যা মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় এবং প্রতি বছর আবারও নতুন করে মানুষকে টেনে নিয়ে আসে এই পবিত্র নদীর ঘাটে।

Preview image